অদম্য চলার ইতিহাস / আল মাহমুদ

যারা আমাকে এ অদম্য চলার পথে নিয়ে এসেছে
তারা তো সবাই জানে আমার পা পাথর,
দৃষ্টি শক্তি স্বপ্নের কুয়াশায় আচ্ছন্ন।
তবু মানুষের মন বলে একটা কথা আছে। আছে না কি?
হ্যাঁ, মন বলছে এখনও আমার দিগন্তে পৌছার
খানিকটা পথ বাকি।

মানুষের কান্না, শিশুর কলরব, নারীর হা-হুতাশ-
আমি তো পার হয়ে এসেছি। কিন্তু কিছু মুখ
আকাশের নীলিমায় নবমির চাঁদ হয়ে
জোছনা ছড়াচ্ছে। কে বলে কবির কোনো
পিছু টান নেই? কে বলে কবির হাতে কোনো নিশান
থাকে না? কে বলে মানুষের চোখের পানির চেয়ে
অমরতাই কবির কাম্য। কেউ বিশ্বাস
করুক বা না করুক- এই মরজগতে মৃত্যুই সুন্দর।
সব অমরতার গল্পই কীটদ্রষ্ট কাগজমাত্র।

আমি শুরু করেছিলাম রাতের অন্ধকারে
উদয় কালে যাত্রা। আমি পৌছাতে
পারিনি বলে, আমার পা ভারি পাথর
হয়ে এসেছে বলে আমার সঙ্গিরা
সেখানে পৌছবে না, তা কে বলতে পারে?

তাদের গতির শব্দ আমাকে পেছনে রেখে
আফসোসের কফিনে মর্যাদার সাথে
শুইয়ে দিয়ে উদয় দিগন্তের ছবি আঁকা
পতাকা বাতাসে বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যাচ্ছে।
তাদের বিজয়ের ধ্বনি আমি মৃত্যুমগ্ন
কর্ণকুহরে ধারণ করে আল্লার শুকরিয়া
করি। আশা যিনি আমার শ্রবণেন্দ্রিয়
দিয়েছেন তিনি কতই না মহান। আমি থাকবো
না বলে যারা বিলাপ করে এবং একই সাথে
যারা আনন্দ করে তারা সমান মুর্খ।
আল্লার করুণা প্রার্থনা করি তাদের জন্য-

আমি থাকবো না, এর চেয়ে আনন্দের
সংবাদ আর কি হতে পারে। পৃথিবীটাতো
না থাকারই জায়গা। যারা ছিলেন
তারা তো মাত্র একটি শতাব্দীর মধ্যে ইতিহাসে
মিলিয়ে গেছেন। ইতিহাস? আমার হাসি পায়!

১২ ডিসেম্বর ২০০৪

Advertisements

এ কেমন দুলুনি? / আল মাহমুদ

যখন কেউ বলে লেখো,
আমার হাত কাঁপতে থাকে। বুঝতে পারি না
এ কোনো অভিজ্ঞতার দুলুনি কি-না। তবে হলফ করে বলতে পারি
এটা বয়সের ভারে কম্পমান অবস্থা নয়।
অভিজ্ঞতা বলতে আমিতো বুঝি একটা যুদ্ধক্ষেত্র
সামনে খোলারাখা চোখ, ট্রিগারে আঙুল
তারপর শুধু ধাতব শব্দের একটানা ঝঙ্কার
তবে কি সত্যিই আমার অভিজ্ঞতায় কেবল গুলির শব্দ?
আমি ফিরে আসতে চাই সর্বপ্রকার হিংস্রতা থেকে
মুছে ফেলতে চাই অতীত মৃত্যুর জানা ও অজানা ইতিহাস
এ জন্যেই মানুষকে আর বন্ধু করতে পারি না।

এইতো এখন আমি বৃক্ষের সাথে কথা বলতে শিখেছি
পাখি ও পতঙ্গের সাথে। অথচ যারা জবাব দেয় না
কিন্তু যাদের জীবন আছে তাদের প্রতি আমার মায়া
ও মমতার তরঙ্গ আমি বইয়ে দিয়েছি প্রকৃতিতে,
নিসর্গের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাকে ভেতর থেকে বিধ্বস্ত করে চলেছে।
সেই ভাঙা টুকরো আর জোড়া দিতে পারবো না।
আমিতো আর গাছপালার মধ্যে দিনযাপন করতে পারি না।
আমাকে ফিরে আসতে হয় এমন এক নারীর কাছে
যে আমাকে চেনে বলে দাবি করে। আমাকে চেনে?
এটাতো এক ভয়াবহ কথা। আমাকে চেনা মানে তো হলো
হিংস্রতাকে চেনা। অমানুষকে চেনা। অপরাধীকে চেনা।

আমি তার পাশে শুয়ে পড়ি, তার গন্ধ শুঁকি, তাকে বীজ বোনার
ক্ষেত্রের মতো ভাবি। কিন্তু তার দৃষ্টি উদাসী। মনে হয় আমার ভেতর দিয়ে
সে অন্য কাউকে দেখছে। এমন মানুষকে, যে সত্যিই একদা কবি ছিল।
আহা আমি যদি তার ওই উদাসীন দৃষ্টির
লক্ষ্যস্থল না হতাম, কতই না ভালো হতো।
কী ক্ষমাহীন সেই চাওনি।

রোদনের উৎস / আল মাহমুদ

আমার জন্যে যাদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না, ভাবত অকাজের কাজী লোকটা
আল্লা মালুম কোথায় হুমড়ি খেয়ে মরবে। কথা শোনে না, সাহায্যের
হাত বাড়ালেও ধরে না; একাকী শূন্যে হাতড়ে বেরিয়ে যায়। মনে হয়
যেনো বাতাসের পালক শক্ত করে ধরে আছে। অথচ দেখ, এই শহরে
কত খানাখন্দ! ম্যানহোলের ঢাকনাহীন পথের প্রতিটি বাঁকেমৃত্যু
হা করে আছে! কে তাকে ফেরাবে?

এই হাহাকার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, উদয়াস্ত আত্মীয়তা অতিক্রম করে আমি, সেই
লোকটা বাতাসের পালক টেনে ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছি। স্বপ্ন থেকে
স্বপ্নে। আশা থেকে অধিকতর আশায়। ভাষা থেকে ভাসমান প্রতীকের
গম্বুজে। আমি আনতে চলেছি ও মায়াবী ঢাকা শহর, তোমার জন্যে
স্বপ্ন,স্বস্তি, প্রেম এবং সুখনিদ্রা। আমাদের নিয়ে এত দুশ্চিন্তা কেন?
কেউ কি স্বপ্নাহারি কবির দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলে? সবাই তো ভাবে
কবির আবার ক্ষুৎ পিপাসা কী? আশ্রয় বা আস্তানা কী দরকার?

আমি তোমাদের কোনো প্রশ্নেরই জওয়াব দিতে অস্বস্তিবোধ করি না। তবু
আমার জন্যে কাঁদা অন্তত দুটি চোখ আমি পুঁতে রেখে এসেছি
পদ্মার এক চরে। সেই দুটি চোখ থেকে বেড়ে উঠেছে দুটি অদ্ভুত
উদ্ভিদ। তারা হাওয়ার দোলায় ফুটিয়েছে অশ্রুজল, কান্নার গুঞ্জন।
তা না হলে পৃথিবীতে বোধহয় রোদনধ্বনি লুপ্ত হয়ে যেতো।

আমি যদি স্বপ্নের বীজ থেকে কোনো অশত্থের ডাল-পালা
মেলে দিতে নাও পারি, আমার উমে যদি না ফোটাতে পারি হরিয়ালদের
লালখাদ্য, অশত্থের লাল ফল, তাহলে কান্নার বীজ থেকে কেনো
আমি কান্না ঝরিয়ে দেব না?

১৮ ডিসেম্বর, ২০০৪

এই পতাকার সূর্য সাক্ষী / আল মাহমুদ

দ্যাখো আজ পতাকা দেখারই দিন।
কলরব করে ওঠো, উচ্চারণ কর
মুক্তির ভাষা। আমিও তোমাদের সাথে দেখতে থাকি।

তোমাদের সাথে আমার অপরিচ্ছন্ন দৃষ্টির অশ্রুসজল
চোখ দু’টি মেলে দাঁড়িয়ে থাকি। কী লাল, সবুজ
পতাকার মধ্যে গোল হয়ে বসে আছে,
মনে হয় যেন পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের
রক্তের লোহিত কণায় অঙ্কিত হয়েছে এ সূর্য।

আমার ভেতরে কলরব করে ওঠে কত মুখ
কত আকাঙ্ক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টি। যারা আর
ফিরে আসেনি।
একজনের কথা মনে পড়ছে। মনতলা স্টেশনের
পাশ দিয়ে বামটিয়া বাজারের দিকে চলে গেছে যে পথ
সেখানে ছিল তার ক্যাম্প। ট্রেনিং নিতে গিয়ে
তার কুনুই থেকে রক্ত ঝরে ক্ষত হয়ে গিয়েছিল।
ফেরেনি সে। তার মাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা বা শব্দ
বাংলা ভাষার অবিধানে ছিল না। কিন্তু তার মার
সামনে দাঁড়িয়ে আমি যে ইংগিতে কথা বলেছিলাম
তাতে মহিলা শুধু একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে
ওই গোল সূর্যের মধ্যে তার পূত্রকে দেখেছিল,
অশ্রুসজল চোখে।

আরো একজনকে জানতাম- সে কুমিল্লা থেকে
বেরিয়ে পড়েছিল যুদ্ধের দিকে। গুলিটা লেগেছিল
তার কোমরে। আগরতলা হাসপাতালে আমি তাকে
দেখতে গিয়েছিলাম। ডাক্তাররা বিষাক্ত শিশার টুকরো
নিখুঁতভাবে বের করতে পারলেও সে আর হাঁটতে পারেনি।
তাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম
মুক্তির উৎসবে। ওই পতাকার লাল অংশে তার খানিকটা
রক্ত আছে। আমি সব সময় দেখি আর তার কথা ভাবি।
কী অবলীলায় তার নাম বাদ দিয়ে লেখা হয়ে যায়
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস! সে ছিল কুমিল্লার একটি
হিন্দু পরিবারের মেয়ে। তার পিতার উপজীব্য ছিল
সংগীত। আমি সাক্ষ্য দেই যে, পতাকার ঐ লাল অংশে
তার রক্তের লোহিত কণিকা মিশ্রিত আছে।
হে ইতিহাস, লেখো তার নাম।

কুষ্টিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছেলেটি।
কুষ্টিয়ার কাস্টম কলোনির পাশে, সে ঝাঁপিয়ে
পড়েছিল শত্রুদের জিপকে উড়িয়ে দিতে।
খন্ড খন্ড হয়ে উড়ে গিয়েছিল তার বাহু, উরু ও
পিঠের কিছু অংশ। হাসিবুল ইসলাম
আল্লাহু আকবার বলে সে আক্রমণ করেছিল।
তার বুক থেকে কলজে উড়ে গিয়ে ওই
পতাকায় লেগে আছে।
লেখো তার শেষ উচ্চারণ আল্লাহু আকবার।

কলরবমুখর হে ঢাকা মহানগরী
তোমাকে লিখতে হবে ওই রক্ত গোলকে
আসাধারণ বিবরণ। দেখতে হবে ইতিহাস নির্মাণ
করে কারা? আর কারা কেড়ে নেয় বীরত্বের পদকচিহ্ন!

দ্যাখো আজ পতাকা দেখারই দিন
কলরব করে ওঠো, উচ্চারণ কর-
মুক্তির ভাষা। আমিও তোমাদের সাথে দেখতে থাকি।

অগ্রহায়ণ / আল মাহমুদ

আমি এই মধ্য অগ্রহায়ণের আকাশে মেঘের গম্বুজ ভেঙ্গে পড়তে দেখেছি
কেউ তো আমার মতো অকাজের কারিগর নয়
যে মাটির উপর বিছানো মানবিক শত সমস্যা
মেলে রেখে আকাশের দিকে তাকাবে? ও অগ্রহায়ণের আকাশ
ঝরাও বৃষ্টি, এখন ঘরে ঘরে নবান্ন চলছে
মাঠগুলোতে উদগমের কাজ অবসন্ন কিন্তু আমার এখন বৃষ্টি দরকার
উদ্ভেদ ও উদগম দরকার।

যে নারী আমাকে পরিশ্রান্ত ভেবে, যার মাতৃদ্বার
রুদ্ধ করে দিয়েছিলো, তার মুখে প্রসন্নতা ছিটিয়ে দিয়ে
বর্ষাও বৃষ্টি কিংবা নামিয়ে দাও
মেঘের ভেতর থেকে মানব বা দানবের অংকুর। আমি,
হে অগ্রহায়ণের আকাশ
সত্তর বছরের এক পুরনো পানসিতে বৈঠা বেঁধেছি
নাওয়ের গলুইয়ের নিচে অংকিত করেছি
আমার প্রিয়তমা নারীর আয়ত দু’টি চোখ।
ঝরাও বৃষ্টি-অনবরত, অবিশ্রান্ত; অবিরাম।

হে অগ্রহায়ণের আকাশ, বাংলাদেশের মেয়েরা যখন
মানব না দানব জন্ম দেবার ভয়ে-মাতৃদ্বার
হাত দিয়ে চেপে ধরেছে তখন তাদের কানে এই বার্তা
পৌঁছে দাও এক কবির, এক অব্যর্থ কথার কারিগরের-
হে ব্যর্থস্তনী জননীরা আমার, তোমরা না হয়
গাছেরই জন্ম দাও, শত শত বনস্পতি-
ডালপালা মেলে দিক বাংলার আকাশে। কিন্তু
জন্ম বন্ধ করে দিও না, নিষ্ফলা করে দিও না
মাতৃত্বের বৈভকে। গাছ চাই। বৃক্ষের
ডালপালায় আচ্ছাদিত হোক মাটি ও মাতৃজঠর।

০১ ডিসেম্বর, ২০০৪

আমি ইচ্ছে পুরণের মাটি নই / আল মাহমুদ

যারা আমাকে পরামর্শ দিতো মানুষ একা থাকতে
পারে না। তারা হয়তো সত্যিই বলতো। কিন্তু আমি
ছিলাম অনমনীয়। ছিলাম একটা পোড়ামাটির
পাত্রের মতো। কারো ক্রোধ হলে পাত্রটিকে
পাথরে আছড়িয়ে চূর্ণ করতে পারবে। কিন্তু
দুমড়ে মুচড়ে আবার কাদার মতো ইচ্ছে
পুরণের মাটিতে পরিবর্তন করতে পারবে না।

প্রকৃত পক্ষে আমি অর্ধেক মানুষ আর বাকি
অর্ধেক তো কবিতা। সম্পূর্ণ মানুষ বলেতো
কখনও গণ্য হইনি, কেউ মানে নি।
বলো, এজন্যই কি আমি এতো একা?
ইতিহাসের তীর্যক গতির মধ্যে যারা এই
বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে চেয়ে দেখি
তাদের বয়স খুবই কম। তারা জানেও না
পতাকার ওই সূর্য কাদের রক্তে ভিজে
আছে। তারা লাল রঙটা দেখে আর
খলখলিয়ে হাসে। কিন্তু আমি তো জানি
সেখানে জমাট বেঁধে আছে মানুষের
রক্ত। যারা যোদ্ধা ছিলো।

যাদের নাম শহীদের তালিকায় নেই।
অথচ আমি তাদের নাম জানি।
কেউ জিজ্ঞাসা করুক? আমি তাদের নাম
একের পর এক বলে দিতে পারি। তোমরা
তাদের নামের পরে কোনো যতি চিহ্ন
ব্যবহার কোরো না। না কমা, না দাড়ি।
তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা নিয়ে মাথা
ঘামায়নি। কারণ তাদের চেতনার চেয়ে তাদের রক্তই
ওই পতাকায় জমাট বেঁধে আছে বেশী। অসহ্য
লালে রঞ্জিত। আমি কি উচ্চারণ করবো
তাদের নাম?

আমি জানি কেউ তাদের নাম শ্রবণেন্দ্রিয়ে
ধারণ করতে পারবে না। তাদের সব পর্দা ফেটে
যাবে। তারা পালাবে লেজ গুটিয়ে। যেমন চির
পরাজিতেরা গর্তে লুকোয়। তেমনি।

সাবধান আমার প্রতিটি কাব্যে বাক্যে উপমায়
অলংকারে আমি লুকিয়ে রেখেছি তাদের নাম।
এক একটা শতাব্দী এসে সে সব নাম উচ্চারণ
করতেই থাকবে।
পালাও হারামজাদারা। কোথায় পালাবে?
এক একটি শতাব্দীতে এক একটি নামের
পৃষ্ঠা বাতাসে উল্টে যাবে। পালাও
হারামজাদারা। কোথায় পালাবে?

১২ ডিসেম্বর ২০০৪

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি / আল মাহমুদ

কিছুকাল যাবত কিছু একটা পঁচে যাওয়া দুর্গন্ধ
আমাকে কেবলি তাড়না করে ফিরছে। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে
তা বুঝতে না পারলেও এটা আন্দাজ করতে পারছি কাছেই
কী একটা যেন মরে পচে এ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
আমি প্রতিটি নদীর পানি নাকের কাছে এনে
শুঁকে দেখেছি। না, মেঘনা যমুনা পদ্মা এই সব
স্রোতস্বিনী মাঝে মাঝে শুকিয়ে তলপেট বের করে দিলেও
পচা গন্ধটা নদী থেকে আসছে না।
পাহাড়-পর্বত, বৃক্ষরাজি, নাও-নদী সব কিছু আমি
শুঁকতে শুঁকতে হয়রান।

একদা গাঁয়ের বাড়িতে কোথাও ইঁদুর মরে গেলে
যেমন দুর্গন্ধ ছড়াতো আর তা দ্রুত অপসৃত করার জন্য
যেমন আমরা সবাই সবকিছু ফেলে ওই দুর্গন্ধের কারণ
উৎপাটন করতাম, এখন আমার নাকের কাছে
তীব্র পচা গন্ধটা আমাকে, আমার পরিবারকে, আমার
প্রতিবেশিদের মুহ্যমান করে ফেললেও আমরা নাচার।

খুঁজে পাচ্ছি না। ধরতে পারছি না। দেখতে পারছি না।

অথচ বিনিদ্র রজনী নিঃশব্দে কাটিয়ে দিয়ে
বারবার জেগে উঠছি।
আমি প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে দেখেছি। তারাও
আমার সাথে একমত। হ্যাঁ, একটা পচা গন্ধ আছে বটে।
কিন্তু তারা তা অসহনীয় মনে করছে না। তাদের ধারণা কত কিছুই তো
সময়ের সংঘাতে মরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাতে কেউ তো আর
দেশান্তরী হয়ে যাচ্ছে না। প্রাত্যহিক সূর্যের খরতাপে এই
বাসি গন্ধটাও থাকবে না। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু এটা তো আমার জন্য কোন প্রবোধ নয়
শেষ পর্যন্ত আমিও যখন হাল ছেড়ে দিয়েছি
ঠিক সে সময় আমার ভিতরের একটা প্রকোষ্ঠ,
যা হৃদয়ের বাঁ পাশে থাকে, এর অদৃশ্য
ডালা খুলে দিল। বুঝলাম এখানেই হয়ত
কিছু একটা মরে হেজে গেছে। গন্ধটা সেখান থেকেই।
অথচ লালনের গান থেকে আমি এ প্রকোষ্ঠের
নামকরণ করেছিলাম মনুষ্যত্ব। তবে কি আমার
কলজের পাশে সেই অচিন কুঠুরিতে মরে গেছে
কলরব মুখর পাখির ছটফটানি?

১৮ অক্টোবর,২০০৪