পুতুল খেলার গল্প (২০১৭) / সাইফ আলি

স্মৃতির পাখিরা আজ খসে পড়া দেয়ালের রঙ
কালের গেলাসে তবু টলকায় স্বপ্ন শরাব…

কবিতাক্রম

পুতুল খেলার গল্প
কয়েক টুকরো আমি
নাফের বুকে হয়তো কিছু ফানুস ভাসে
বনসাই
দয়া করে সাঁতারটা ভুলে যান
আশার শিশুরা তবু
ঝিলামের শিশুগুলো
আজকাল কিরকম
আমি শুধু অশ্রুভেজা চোখে
তারা আর ঘুমাতেই যায় না কখনো!!
লাশেরাও কথা কয়
আমাদের কথাগুলো আমাদের নয়
ডুবে যাই শুধু
যে আগুন জ্বালাও তুমি
কাশ্মীর জেগে আছে তবুও
সেই চোখে ওরা তবু মানুষ দেখে না
আমার এখন প্রেম হয়েছে লাশের সঙ্গে
হঠাৎ করে আটকে গেলো পা দুটো
তবু এই মানুষেরা
নংদনু বালো না
মৃত্যুপথযাত্রী জীবন
ক্ষণজন্মা
ইনকিলাব
নায়ক এবার মঞ্চে প্রবেশ করো
ভালোই হতো রাতের মতো
অবাক লাগে
তুমি আসলে সেদিন আমজনতার মঞ্চে
ডাইনে-বামে
তাকিয়ে ছিলে মৃত্যু শীতল চোখে
দেখা
স্বপ্নকে সত্য করে তুলতেই
বন্দুকের স্বাধীনতা
জনাব, আপনি বিশ্রাম করুন
তবু পরাজয় মানিনি এখনো
শেষমেশ সকলেই
আমাকে বিভক্ত করে
না, আমি শোকাহত নই
ঘৃণার কবিতা
মেলেনা জবাব
আত্মসমালোচনা
ভাবনার ভুল
অথচ মিললো না
কারাগার বলতেই
রক্ত-গোলাব
মানুষ
আদতে সবাই এই
কফ
ভালোবাসি, বাসি না
দৃশ্যপটে ছিলেন তিনি এক জনাব কুকুর
আমাদের আজকাল
এ কেমন অন্ধকারে
আয়নায় নিজেকে দেখে না
পিপাশা এখন
দায়
বিবেক বিক্রি হতে দেখে

Advertisements

ভূমিকা; পুতুল খেলার গল্প / সায়ীদ আবুবকর

%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-0%e0%a7%a7‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ বাস্তবিকই কবিদের মধ্যে তাঁরাই শ্রেষ্ঠ যারা মানুষকে নিয়ে কবিতা রচনা করেন। কবিতা যখন মানুষের ব্যথা বুকে ধারণ করে সৃষ্টি হয়; তখন সে-কবিতা দেশ কাল স্থানের ঊর্ধ্বে উঠে অমরত্ত্ব প্রাপ্ত হয়। আনন্দের কথা, প্রথম দশকের প্রতিশ্রুতিশীল কবি সাইফ আলির পুতুল খেলার গল্প কাব্যগ্রন্থটি মানবপ্রেমে সিক্ত হয়ে মানবতার এক অনন্য উচ্চারণ রূপে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ কবিরা যখন তরল প্রেমের গদ্য কবিতার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের আমিত্বের অন্ধকারে হারিয়ে ফেলছে তখন সাইফ আলি নিজেকে নিমজ্জিত করেছেন মানবপ্রেমের মহাসমুদ্রে। সত্যিকার অর্থে এই কবি কাল্পনিক দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে রোমান্টিক আবহের কবিতা রচনার পক্ষপাতি নন। টি বি শেলির মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যেন এই কবি ফুঁসে ওঠেন মানবতার মহামন্ত্রে। কবিরাই শ্রেষ্ঠ আইনপ্রণেতা, কবিরাই শ্রেষ্ঠ সত্যের ধারক, কবিরাই মানুষের প্রকৃত মুক্তিদাতা- এই মন্ত্রে উজ্জিবিত হয়ে কবি সাইফ আলি নির্ভয়ে-নিঃসঙ্কোচে কলম ধরতে জানেন নির্যাতিত মানুষের পক্ষে। সঙ্গত কারণেই পুতুল খেলার গল্প হয়ে উঠেছে নিপিড়িত মানুষের আর্তনাদের রক্তাক্ত দলিল। এই কবি যখন উচ্চারণ করেন-
গণমাধ্যম যেখানে মরা গরুর খোঁজে ভাগাড়ে ভাগাড়ে ঘুরে বেড়ায়
মানবতাবাদের দালালেরা যেখানে উটপাখি হয়ে মাথা গুঁজে পড়ে থাকে চুপচাপ
সেখানে তো তোমাকেই দিতে হবে জবাব হে ছেলে,
তার আগে বলো দেখি এমন সাহস তুমি কোথা থেকে পেলে!?
তখন পাঠকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে যায় কবির মানবতাবোধ নিয়ে।

কবিরা হলেন তাঁদের সময়ের শ্রেষ্ঠ বিবেক। মানুষের উপর যেকোনো ধরণের নিপিড়ন-নির্যাতন একজন প্রকৃত কবিকে উৎপিড়িত না করে পারে না। সাইফ আলি এই প্রকৃত কবিদেরই একজন। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ভোগবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের শিকার তৃতীয় বিশ্বের অসহায় মানুষের করুণ আর্তনাদ এই কবিকে ব্যথাক্লিষ্ট করে তোলে। তাই তিনি এভাবে উচ্চারণ করতে পারেন-
শুনতে পেলাম একটা পুতুল কাঁদছিলো
খুব বেশি না ছোট্ট বুকে পুতুল খেলার সাধ ছিলো;
পুতুল পুতুল ছিন্ন পুতুল বোমায়
বিশ্ব তখন ঘোমায়।
আকাশজুড়ে কয়েকটা চিল উড়ছিলো
মুহুর্মুহু মণ্ডামিঠাই ছুড়ঁছিলো
মণ্ডামিঠাই তেতো খুকুর কাছে
এসব খবর তার কি জানা আছে?
পুতুল পুতুল শান্ত পুতুল চোখ খোলো
মানবতার মিথ্যে গানের আকাশ ছেড়ে
নতুন করে ঢেউ তোলো;
ঘুমিয়ে থাকা বিবেক-বোধে ঢেউ তোলো।

স্বদেশ ও পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সব ঘটনা এই কবিকে বিচলিত করে তোলে। সবাই যখন দেখেও না দেখার ভান করে বিপন্ন মানবতার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যায় তখন তরুণ এই কবি থমকে দাঁড়ান অবাক বিস্ময়ে; অতঃপর ফেটে পড়েন দ্রোহে ও বিক্ষোভে:
যদি, উড়ন্ত পাখির বুকে
বন্দুকের নল তাক করে
লক্ষ্যভেদী নিশানারা মুচকি হেসে বলে-
এ আমার স্বাধীনতা
এ আমার অধিকার…
তবে, স্বাধীনতা এই সব পাখিদের রঙিন মিছিলে
অধিকার এইসব রক্তমাখা বুলেটের গায়ে,
লেগে থাক;
সমুন্নত থেকে যায় যাক।
আমি তার করিনে পরোয়া,
আমি তাকে ঘৃণা করি;
করে যাবো যতোদিন বাঁচি।

সাইফ আলি কবিতা রচনা করেন জেনেশুনে। তিনি জানেন কবিতাকে একজন স্থপতির মতো নিখুঁত নির্মাণ করতে হয়। এর জন্য থাকা চাই ছন্দ, অন্তমিল ও অলংকার শাস্ত্রের জ্ঞান। এই কবির পুতুল খেলার গল্প কাব্যগ্রন্থটি আদ্যপান্ত পাঠ করে আমার মনে হয়েছে তিনি কবিতাকে নির্মাণ করতে জানেন প্রয়োজনীয় মাল-মসলা দিয়ে। কবিতার রাস্তা বড়ই জটিল, দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। অনেক সাধনা, প্রণয় ও নিবেদনের মাধ্যমে পার হতে হয় এই পথ। কবি পাশাপাশি একজন চিত্রশিল্পী হওয়ায় তিনি তাঁর কবিতার ক্যানভাসও নানা রঙ, রূপ ও চিত্রকল্পে সাজিয়ে তুলতে পারেন। পুতুল খেলার গল্প কাব্যগ্রন্থটির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আমার বিশ্বাস এই কবি আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি স্থায়ী আসন করে নিতে পারবেন। আমি এই কাব্যগ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।

-সায়ীদ আবুবকর

জনাব, আপনি বিশ্রাম করুন / সাইফ আলি

  • জনাব কি চিন্তিত?
  • না, চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু কি ঘটেছে এখানে?
  • তবে?
  • তবে আর কি? দেখছিলাম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফ;
    উটপাখি নয়, একটা মানব শিশু সভ্যতার উলঙ্গ নৃত্য থেকে নিজেকে বাঁচাতে
    কি দারুণ মুখ গুঁজে পড়ে আছে ব্যথিত কাদায়…
  • ও আচ্ছা, এ আর নতুন কি জনাব-
  • নতুন তো নয়, সমুদ্রবিলাসী আয়লান কুর্দির মতোই এ এক পুরোনো খবর;
    আমি শুধু ভাবছিলাম- আমাদের চোখ দুটো কেমন পাথর হয়ে গেছে,
    যান্ত্রিক ক্যামেরায় ধারণকৃত এ দৃশ্য
    কেমন মানানসই হয়ে গেছে এখানে এখন!!
    আমরা বাঘের জন্য মিছিল করেছিলাম
    আমরা কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে কেঁদে উঠেছিলাম টুইন-টাওয়ার ধ্বসে পড়ায়,
    আমরা কেঁদেছিলাম, কারণ সে খবর মিডিয়ার হটকেক ছিলো।
    যান্ত্রিক গোলোযোগের কারণে আজ আর কান্না আসে না…
  • জনাব, আপনি বিশ্রাম করুন; আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন।

তবু পরাজয় মানিনি এখনো / সাইফ আলি

তুমি ভাবলেই ভেবে ফেলো এক মেঘহীন রাত তারা ঝলমলে শূন্য আকাশ
আমি ভাবলেই দেয়ালে বন্দী কেঁপে কেঁপে ওঠে শ্বাস-প্রশ্বাস,
তুমি ভাবলেই ফুল করে ভুল বিতরণ করে আতরের ঘ্রাণ
আমি ভাবলেই কারাগারে যেনো কেঁদে ওঠে কোনো নির্দোষ প্রাণ

আকাশ তবে কি কারো কারো হয়, বাতাস তবে কি সবার নয়?
জাগে সংশয়,
তবু পরাজয় মানিনি এখনো; অভিযোগ নেই কারোর উপর
ভাবছি কাটার তিক্ষ্ণতা দেখে বিশ্মিত হবো ফুলের মতোই…

কফ / সাইফ আলি

লক্ষ্য করলাম,
আজকের পত্রিকার পাতায় কোনো মৃত্যুর সংবাদ নেই
নেই কোনো ধর্ষণের রমরমা প্রতিবেদন;
নেই কোনো আত্মহত্যা কিংবা আত্মঘাতি বোমা হামলার সাধারণ চিত্রও।
আতিপাতি খুঁজতে শুরু করলাম কোনো অপঘাত কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার নূন্যতম একটা সংবাদের জন্য;
কিন্তু কি আশ্চর্য কোথাও কোনো সংবাদ পেলাম না যা দিয়ে ফেসবুকে কিংবা চায়ের কাপে সামান্য ঝড় তোলার প্রয়াস চালানো যায়!!

এভাবে চলতে থাকলে সকাল বেলায় কফের মতো জমে থাকা গালিটা ফেলবো কোথায়??

ভালোবাসি, বাসি না / সাইফ আলি

ধুসর প্রজাপতি,
তোমার একটা ডানা আমার বড্ড প্রয়োজন;
নান্দনিক একটা প্রচ্ছদের জন্য,
তোমার ডানা যে বইয়ের শোভা বর্ধন করবে তার মধ্যে রয়েছে
গোটা চল্লিশেক প্রেমের কবিতা।
কিন্তু তোমাকে মেরে তোমার ডানাটা ছিনিয়ে নিতে মন সায় দিচ্ছে না।

কি করবো বলো?
এখন শুধু তোমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া
আর কিই বা করার আছে…

কয়েক টুকরো আমি / সাইফ আলি

আয়নাটা হাত থেকে পড়ে যেতেই কয়েক টুকরো আমি ছড়িয়ে পড়লাম এদিক সেদিক,
দেখলাম একই সময়ে বাগদাদে একটা বোমার বিকট বিষ্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে ঝরে পড়লো কয়েকটি ফুল…
দেখলাম এই সামান্য সময়েই রোহিঙ্গাদের কয়েকটি গ্রাম পুঁড়ে ছাই হয়ে গেলো
এবং ইসরাইল জুড়ে জ্বলে উঠলো দাউ দাউ আগুন…

পুজিবাজারের দরপতনে চিন্তিত কয়েকটি মুখ নিজেদের মধ্যে সেরে নিল গোপণ বৈঠক-
পারমানবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে শান্তিবাদী হয়ে উঠলো অনেকেই,
আর এরই ফাঁকে এক টুকরো রুটি নিয়ে ছিটকে পালিয়ে গেলো একটা ক্ষুধার্ত ছেঁচড়া চোর।

আদালতের রায়ে ধর্ষণের দায় থেকে মুক্তি পেয়ে গেল যে যুবক সে আবারো এই মুহূর্তে ধর্ষণ করে বসলো স্বয়ং বিচারপতির একমাত্র মেয়েকে;
এবার হয়তো আর নিস্তার নেই বেহায়াটার…

আয়নার টুকরোগুলো ঝাঁট দিয়ে ফেলে দিতে অনুমতি চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাজের মেয়েটি-
আমি বললাম- সাবধানে, হাত কাটে না যেনো দেখিস…

নাফের বুকে হয়তো কিছু ফানুস ভাসে… / সাইফ আলি

কি ভাষায় করবো প্রকাশ, পাইনে ভাষা
জমাট বাঁধা কণ্ঠে আমার নীল কুয়াশা
স্বপ্ন দেখি গ্রহণকালের পর্ব শেষে
নতুম প্রেমের করবে আবাদ প্রেমিক চাষা

রোহিঙ্গারা প্রেম জানে না বললে তুমি
বাস্তুহারার কান্না তোমার ভাল্লাগে না
মাটির ঘরে সবাই করে বসত শেষে;
তবুও কেনো অহংকারে বাড়াও দেনা?

নাটাইছাড়া ঘুড্ডি হয়ে উড়ছে যারা
তাদেরও এক নাটাই ছিলো ভুললে কিসে?
কাঁটাতারের বাউন্ডারি টেনেই যদি
মানবতার তার ছিঁড়ে যায় এক নিমিশে!

তাহলে আর মানুষ নামে কি যায় আসে;
নাফের বুকে হয়তো কিছু ফানুস ভাসে।

আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৬ – ১১:৫১ | প্রকাশিত: শুক্রবার ০২ ডিসেম্বর ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ, দৈনিক সংগ্রাম

শেষমেশ সকলেই / সাইফ আলি

শেষমেশ সকলেই বাঘেদের পক্ষেই যায়
হরীণেরা কোনোদিন করবে না রাজ্য শাসন…

আমাকে বিভক্ত করে / সাইফ আলি

আমাকে বিভক্ত করে তুমি কোন সুখ পাও প্রিয়
পাসপোর্ট ভিসা ছাড়া সমগ্র পৃথিবী নিয়ে বাড়ালাম হাত
অথচ তোমার খুব কাটাতার ভালো লাগে তাই
টুকরো টুকরো করে গড়ে তোলো রাষ্ট্রের মায়া
মানুষ শাষনপ্রিয় খুব-
আমাকে বিভক্ত করে শাসন করতে চাও যদি
আমিও স্বাধীনচেতা কাটাতার মানবো না জেনো
যুদ্ধ চালিয়ে যাবো যতদিন বাঁচবো এখানে
একটাই পৃথিবী আমার
একটাই সংসার; আকড়ে ধরেছি ভালোবেসে…