আকাঙ্ক্ষা

আমি যদি হতাম নদী
সাগর দেখে আসতাম
চাঁদ হলে ওই নীল আকাশে
হাসিমুখে ভাসতাম

মেঘ হলে যে খরার দেশে
ধানপাটে জল ঢালতাম
প্রদীপ হলে আঁধার ঘরের
কোণে আলো জ্বালতাম

যদি আমি শস্য হতাম
সোনা হয়ে ফলতাম
আগুন হলে অত্যাচারীর
শরীর জুড়ে জ্বলতাম

কিন্তু যদি ক্ষেপণাস্ত্র
হতেই আমি পারতাম
বিশ্বে যারা যুদ্ধ আনে
তাদের আগে মারতাম।

Advertisements

মধুপুর গ্রাম / সায়ীদ আবুবকর

পৃথিবীর এক কোণে ছোট ছিমছাম
আমাদের গ্রামখানি, মধুপুর নাম
সেই গ্রামে পাখি ডাকে, চাষী গান গায়
বারো মাস ফুল ফুটে সুবাস ছড়ায়
সোনার থালার মতো ওঠে রবি পুবে
সন্ধ্যা হলেই যায় পশ্চিমে ডুবে
রাত্তিরে চাঁদ ওঠে ঘুচায় আঁধার
ছিমছাম গ্রাম তার জুড়ি মেলা ভার

আম জাম লিচু খেয়ে, খেলে মাঠে মাঠে
সেই গ্রামে আমাদের শিশুকাল কাটে
প্রীতিময় স্মৃতিময় গ্রাম ফেলে এসে
ছুটোছুটি করি আজ দেশ থেকে দেশে
কত কাল সেই গ্রামে পড়ে না চরণ
তবু গ্রামে প্রতিদিন পড়ে থাকে মন

রূপকথা

এই পথগুলো নদী ছিল একদিন
এই মাঠগুলো জলের মিছিল

ময়ূরপঙ্খীতে চড়ে এই পথে একদিন রাজকন্যে যেতো
বিপুল সওদা নিয়ে সওদাগর যেতো এই পথে
এই পথগুলো নদী ছিল
এই মাঠগুলো জলের মিছিল

এই মাঠে রূপালী মাছেরা উথাল পাথাল ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
কি-সুন্দর গড়াগড়ি যেতো কালো জলে!

পথিক।
আমি কি তোমাকে রূপকথা বললাম?

ইহুদির হাত

মানুষ ভেবেই এই হাত
দিয়েছিলাম বাড়িয়ে তার দিকে।

তার হাতে হাত রাখতেই
কি-এক বোটকা গন্ধে ভিজে গেল হাতভুঁই।

ধুলো দিয়ে ছাই দিয়ে
সুগন্ধি সাবান দিয়ে ঘষে মেজে সেই হাত

তারপর কত গঙ্গাস্নান করে
সমুদ্রস্নান করে

কত যে পবিত্র মাখলাম
ঘৃণা আর ভালোবাসা মাখলাম সারা গায়ে-

তবু এই হাত থেকে, গা থেকে অসহ্য সেই
অমানুষ অমানুষ গন্ধ গেল না তো কিছুতেই।

হায়, আমি শুধু সেই হাতটার কথা ভাবি-
সে কি কোনো লাশঘাটা শেয়ালের হাত, শকুন কিংবা হায়েনার হাত?

কবিকেই শেষমেশ

কবিকেই শেষমেশ নিতে হবে সংগ্রামের ভার
হৃদয়ের গান ভুলে, অবশেষে গাইতে হবে এই
যুদ্ধনীতি শান্তিনীতি। কে জালিম শান্তি কাড়ে কার-
তার সমাধানও বুঝি দিতে হবে আজ কবিকেই।

কবি ছাড়া এ-জমিনে আর কেউ শান্তিবাদী নেই
কবি ছাড়া মানুষের নেই কেউ মুক্তিদাতা আর;
আজ তাই অস্ত্রহীন, কৃশকায় কবির ’পরেই
পৃথিবীর বাঁচামরা, সভ্যতাকে বাঁচানোর ভার।

হঙরের মতো আসে মরণাস্ত্র, খেতে মজলুম-
কবির তো কিছু নেই শুধু এক ভাঙা মসি ছাড়া;
তবু এই মসি জানে পাথরেরও ভেঙে দিতে ঘুম,
ঝটিকার মতো দিতে পৃথিবীর খুঁটি ধরে নাড়া।

আর তবে চিত্রকল্প, ছন্দ নয়, নয় অন্ত্যমিল
আজ থেকে কাব্য হোক রাজপথ শ্লোগান মিছিল।

শোণিতের নিয়ম

শোণিতের এই তো নিয়ম, এক ফোঁটা ঝরলেই কেঁপে ওঠে থরথর পাপপোড়া ভুঁই
মহাকাশ কেঁপে ওঠে, কেঁপে ওঠে জাহান্নাম, পাপ ও বাতিল
পৃথিবী হঠাৎ হয় বেহেস্তবাগান, বাগান মুখর করে ফুটে ওঠে থোকা থোকা ভালোবাসা জুঁই
জীবনের কবিতায় ফিরে আসে রূপকথা, ফিরে আসে প্রাণঘষা উপমা ও মিল

শোণিতের এই তো নিয়ম, এক ফোঁটা ঝরলেই মুহূর্তেই বহমান নদী হয়ে যায়
প্রেমান্ধ নারীর মতো সমুদ্রের সংগমে ছুটে পড়ে অতঃপর ছলাৎ ছলাৎ
বেপরোয়া সেই ¯্রােতে আলোর মাঝিরা সব দাঁড় মারে, বাদাম ওড়ায়
দাঁড়ের আঘাতে আর বাতাসের তোড়ে সময়ের বোঁটা ছিঁড়ে টুপ করে খসে পড়ে পাকাজাম রাত

শোণিতের এই তো নিয়ম, এক ফোঁটা ঝরলেই গজে ওঠে ঝড়তোলা বিশ্বাসের বট
গজে ওঠে মেঘরং সাহসের দেবদারু, উদ্যমের অন্ধকার আমলকী বন
অতঃপর ঝড় ওঠে, পাপধোয়া বৃষ্টি হয়, গড়গড় মেঘ ডাকে ভীষণ বিকট
পাপ ধুয়ে মৃত্যু ধুয়ে কলমিদামের মতো তরতাজা হয়ে ওঠে তাবৎ জীবন

শোণিতের এই তো নিয়ম, কেন তবে হে যুবক, হৃদয়ের দোলনায় ভয় খায় দোল
একদিন সে-ই হয় শতাব্দীর রাজা, চাপচাপ শোণিতে যে ভেজায় ভূগোল

আলোর গীটার

কে যেন দিয়েছে ফেলে অন্ধকার জাল
এ শহর জালে পড়া কাতলার মতো;
কখনও এখানে যেন আসেনি সকাল
থইথই অন্ধকারে এ শহর ডোবা

এ শহর রূপকথার যেন এক দ্বীপ;
অন্ধকারে কারা যেন দানবের মতো
তুলে নেয় কিশোরীর কপালের টিপ
অতঃপর কটমট অস্থিমজ্জা খায়

দানবের মতো যেন কারা শেষমেশ
সভ্যতাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায় হাড়গোড়
এখানে কি একজনও পীর দরবেশ
আসেননি কোনো কালে, এই অন্ধকারে?

তুমিই তবে হে কবি, নাও সেই ভার
বাজাও এ অন্ধকারে আলোর গীটার

পাথরবীর / সায়ীদ আবুবকর

এখানে মৃত্যু, খুন, সন্ত্রাস, খিধে
অষ্টপ্রহর খ্যালে ধ্বংসের খেলা;
চুরি, হাইজ্যাক,অবিচার, অসুবিধে
জীবনের খেতে ফলায় দুঃখঘাস

এখানে জীবন পদ্মা নদীর মতো
দু’পারে যে ধু-ধু বিষণ্ন বালুচর
তবু তো জীবন দুঃখে হয় না নত
পাহাড়ের মতো অবিচল হয়ে থাকে

এখানে যে খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস
দানবের মতো জীবনের লোভে আসে
জীবনের ’পরে অতঃপর বারো মাস
হামলা চালায় আজরাইলের মতো

তবু এই দেশ কি-এক পাথরবীর
দুঃখ-খরায় হয় না তো চৌচির!

বিশ্বাসের ভাটিয়ালি

বেপরোয়া এ-বাতাসে মাঝি তুমি ওড়াও বাদাম
অদৃষ্টের ঘাম মুছে দাঁড় ধরো ঠোসপড়া হাতে
কেটে চলো ক্রুব্ধ ঢেউ বিশ্বাসের আঘাতে আঘাতে
আর শুধু জপে যাও অস্তিত্বের আত্মীয়ের নাম

মাঝি তুমি তাঁর নামে বুকভাঙা ভাটিয়ালি গাও
মাঝি তুমি তাঁর নামে বেসামাল তোলো হে, জিগির
তরুণ বাতাসে দ্যাখো নদী কাঁপে, তরঙ্গ ও তীর
মাঝি তুমি এ-বাতাসে বিশ্বাসের বাদাম ওড়াও

অন্ধকার ঝরে পড়ে তাঁর নামে রাত্রি হয় ভোর
তাঁর নামে চাঁদ ভেঙে হয়ে যায় তর্মুজের ফালি
তাঁর নামে নদী হয় আকাঙ্ক্ষার মধুর নহর
মাঝি তুমি তাঁরই নামে বিশ্বাসের গাও ভাটিয়ালি

ক্রুব্ধ ঢেউ কেটে কেটে চাও যদি সৌভাগ্যের কূল
দাঁড় হাতে মাঝি তবে গেয়ে ওঠো রসুল রসুল

দুটি বছর ও গৃহবাসী

একটি বছর দু’চোখ ভিজিয়ে জলে
কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,
‘ভাই,
ছুটির ঘন্টা পড়েছে আমার, যাই।’

শুনে তার কথা ঘরের লোকটা ভাবে
একদিন সেও তার মতো চলে যাবে।

নতুন বছর দু’চোখে কাজল মেখে
কপালে ও ঠোঁটে রঙিন নকশা এঁকে
অঙ্গে ঝুলিয়ে গহনা ও দামি শাড়ি
দরজায় কড়া নাড়ে এসে তাড়াতাড়ি।

ঘরের লোকটা দরজাটা দিলে খুলে,
উল্লাসে খুব, ঝড়ো হাসি মুখে তুলে
নতুন বছর বললো, ‘হে গৃহবাসী,
আসি?’

ঘরের লোকটা তার দিকে চেয়ে ভাবে
সময় ফুরোলে এই হাসি মুছে যাবে।