ছায়াহীন গতিহীন / ফজলুল হক তুহিন

গতিশীল যন্ত্রযান গতিহীন রাজপথ, গাছের ছায়ার
অশরীরী সত্তার উপর দিয়ে শব্দ তুলে আমাকে বহন
করে নিয়ে যায়, নিয়ে আসে। আমার গন্তব্য, আমার প্রাঙ্গণ
প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততায় ভরে ওঠে। গতি পায় স্থিরতার

শিরা উপশিরা। যদিও আমরা সবাই আহ্নিক গতিতে
বেগবান। সূর্যের রশ্মিতে পৃথিবীর গায়ে গাছের ছায়ার
দুলুনি- আমার যানে পৃষ্ঠ হয় গ্রাহ্যহীন আনন্দ ভঙ্গিতে।
অতঃপর রোদ নিভে যায়, ডেকে নিয়ে আসে রাত্রি- অন্ধকার।

অন্য সব আলো জ্বলে ওঠে ক্রমান্বয়ে। আবার সেই ছায়ারা
প্রাণ পায়। আমার নিজের অবিচ্ছেদ্য ছায়া আমার গতির
সঙ্গি। রূপকথার মৃত্তিকা থেকে জেগে ওঠে ছায়ার প্রেতাত্মা-
আমার সংশয়, অবিশ্বাস এবং মৃত্যুর নখেরা গভীর
গর্ত খোড়ে আমার ভেতর। আমি ভয়ে ভয়ে ফু দিই আলোয়।
গতিকে গুটিয়ে ফেলি। ছায়াহীন গতিহীন অন্য পৃথিবীর
স্বস্তির নিশ্চিন্ত অধিবাধী হই।

২৬.০৭.২০০০

সত্য, হাঁ সত্য / ফজলুল হক তুহিন

সত্য!
হাঁ
সত্য,
সূর্যোদয় প্রসবের মতো
মানুষ জন্মের মতো
মানুষ মৃত্যুর মতো
এবং
ডুবে যাওয়া সূর্যের আত্মার মতো
সত্য
আজ আমি চিনে নিতে চাই।
সত্যের গভীরে আমি মুহূর্তের জন্যে হলেও
প্রবেশ করতে চাই।

২.
সত্যের বিদ্যুতে আমার ভেতর
ঝলসিত
উদ্ভাসিত
আলোকিত
হোক আজ।

৩.
আজ
পৃথিবীর জন্মদিন
আজ
পৃথিবীর মৃত্যুদিন
আজ
পৃথিবীর সত্যদিন।

৪.
আমার আত্মার অন্ধকার
আমার গ্রহের অন্ধকার
পাতার মতন পুড়ে যাক
কাচের মতন ভেঙে যাক
ধুলোর মতন উড়ে যাক
আজকে আসুক ধেয়ে
আলোর বৈশাখ
সত্যের বৈশাখ
হে
আমার অনন্ত
হে
আমার গন্তব্য!
১৬.০১.২০০০

শ্রাবণ গীতিকা / ফজলুল হক তুহিন

ক.
এক পৃথিবী হেঁটে হেঁটে
একটি জীবন ভিজে ভিজে
তোমার কাছে পৌঁছে গেলাম কদম হাতে।
দেখে ছিলাম সেই যে তোমার
গভীর চোখে দরদমাখা
গভীর শ্রাবণ- শেষ দেখাতে, শেষ দেখাতে।
মনে পড়ে তোমার মনে?
সে কী তোমার কষ্ট শ্রাবণ
নীল বেদনার দুঃখ শ্রাবণ
সত্যি কী তা অন্য ঘরে যাবার নিরব রক্ত ক্ষরণ?
না আমাকে করুণা জল
দেখিয়ে তুমি জ্বেলে দিলে
মনের মধ্যে ক্ষোভের অনল?
না আমি সেই নদী চোখে দেখেছিলাম আমার মরণ?
প্রাণদ শ্রাবণ?

খ.
কৃষ্ণচূড়া মেঘের মতন তোমার সম্পন্ন ঠোঁটে
কবির আকাক্সক্ষা কদমের সবুজ পাতায়
শ্রাবণের প্রার্থিত প্রথম বিন্দু! নীল শিহরণ!
কবির মগ্নতা রাজহাঁস অতঃপর দ্রুত সাঁতরায়
তোমার ভেতর……
কবির আবেগ অকথিত। তুমি কী বুঝবে
কবির মৌনতা? কবিদের উৎসমূল জেনো
হৃদয়, মগজ। জেনো কবিরা সহজ। কবিদের
জীবাশ্মে পৃথিবী বেঁচে আছে এখনো- মৃত্তিকা
প্রাণোজ সবুজ আঁকে তার রক্তবিষ শুষে নিয়ে।
কবির শ্রাবণে তুমি বাংলার পুষ্পিত মাটি হও!
দুষিত স্পর্শের অন্ধকার মুছে কবির আলোয়
শুদ্ধ হও! ঋদ্ধ হও! কবি ছাড়া তুমি পূর্ণ নও।

আহ্ আমি যদি পারতাম / ফজলুল হক তুহিন

তাদের মতন আমি যদি ঘুমিয়ে থাকতে পারতাম তিন শ বছর
দূরের কোন গুহায় কিংবা নিজ বাসস্থানে। জেগে উঠে আমার শহর
কতটা বিশ্বাসী আর কতটা মৃত পাথর হলো তা দেখতে পারতাম।
আহ্ আমি যদি পারতাম-

কী নিশ্চিন্তে, প্রশান্তিতে ঘুমের মধ্যেই বয়ে যেত এক একটি শতাব্দী
দেখতে পেতাম আকাক্সক্ষার শান্তিগন্ধী সবুজ শহর, সুখময় গ্রাম
আমার ভ্রমণ হতো অবাধ নিসর্গে, ছুটন্ত নদীতে, সুস্বচ্ছ নারীতে
আহ্ আমি যদি পারতাম-

হয়তো তাহলে এই অভিনব অন্ধকারে-
সকালের স্বপ্নের আকাশ ছিনতাই হওয়া অন্ধকারে
মধ্যাহ্নের ক্লান্ত মুহূর্তের কিশোরী ধর্ষিত অন্ধকারে
নাক্ষত্রিক সন্ধ্যার আলোয় মানুষ মাতাল অন্ধকারে
আমাকে নিশ্বাস নিতে হতো না কখনো।
আহ্ আমি যদি পারতাম সত্যি সত্যি!

১৬.০৭.২০০১

তার কথা ভাবলেই / ফজলুল হক তুহিন

তার কথা ভাবলেই কেন যেন অসংখ্য নদীর
স্রোত চোখের সুস্বচ্ছ ক্যানভাসে আকাঁ হয়ে যায়।
সেই স্রোত বাংলাদেশের মানচিত্র করেছে প্লাবিত
জীবন্ত, শোভিত- বিশ্বাসের পাল ওড়ে
পদ্মা মেঘনা ও যমুনায়।

দশ দিগন্তে, পদ্মার ঢেউয়ে যে নাম ধ্বনিত
পিতৃপুরুষের জন্মভূমি যার প্রাণে আলোকিত
সময়ের অন্ধকার রাত তার হাতে পরাজিত
তিনি আমাদের আত্মার বাদক-
শাহ্ মখদুম।
তার বিশ্বাসের সুরে ভেঙে যাক পাথরের ঘুম।

০৭.০৮.২০০১

পৃথিবী মানুষ এবং তারা / ফজলুল হক তুহিন

পৃথিবী যখন ঘুমে প্রশান্তি প্রশান্তি ঘুমে ঘুমে নীল
মানুষ যখন স্বপ্নে সবুজ সবুজ স্বপ্নে স্বপ্নে অমলিন

তখন তাদের চোখ রক্তেআঁকা চোখ জ্বলে ওঠে দাউদাউ
শিশুদের হৃদয়ে হৃদয়ে তারা ভয়ের আওয়াজ তোলে: হাউমাউ!
হাউমাউ!

মানুষেরা যখন গভীর আস্থায় বিশ্বাসে পরস্পর গড়ে তোলে ব্রীজ
তখন তাদের মন যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রক্তের সিরিজ
চালু করে মানুষের সভ্যতায়। তারা চায় না সম্পর্ক মূলত কোথাও।

পৃথিবীর যেখানেই নির্মাণ আর সুস্থতা আর সবুজতা
সেখানেই শকুনের মত গন্ধ শুকে শুকে চলে আসে তাদের প্রেতাত্মা
অশরীরী ছায়ায় ছায়ায় অশুভ ক্ষুধায় নষ্টভ্রষ্ট করে মানবিক সত্তা।

মানুষ যখন প্রতিবাদী
মানুষ যখন দুঃসাহসী
মানুষ যখন স্বাধীনতা স্বাধীনতা উচ্চারণে
অসংখ্য হাতের আর অসংখ্য প্রাণের মিছিলে মিছিলে ভরে
ফেলে দিগন্তপৃথিবী
তখনই তারা ভয়ে শীতের সাপের মতো ভয়ে ভয়ে লুকায় পালায়।
অতঃপর গুপ্ত হত্যা আর ষড়যন্ত্রে আর মৃত্যুযন্ত্রে শীত মৌসুমের নিপুণ শিকারী!

অনন্ত সত্তার জন্যে বিশ্বাসীরা যখন জাগিয়ে তোলে সম্মিলিত প্রেম
আর তখনই তারা নেকড়ে মত্ততা নিয়ে দখল করতে আসে উজ্জ্বল জেরুজালেম।

৩০.০১.২০০২

দুঃস্বপ্নের কাকফেরি / ফজলুল হক তুহিন

ভাবতেই পারিনি আমরা সকালের সুবাতাস
এভাবে শোকের বিষে নষ্ট হবে আজ। পাখিদের
আর্তনাদে, বিলাপে বিদীর্ণ হবে নিজের নিশ্বাস!
কেউ কী জানতো কখনও পাখির কান্নার ভারে
ভেঙে পড়বে মায়ের বুক।

প্রথম যেদিন নীড় বুননের খড়কুটো নিয়ে
ছায়ার উঠোনে, পাতাবাহারের সবুজ আড়ালে
দুটো বুলবুলি এসে আশ্রয়ের নিচ্ছিল প্রস্তুতি;
সেদিন মা বললেন, দেখ্ দেখ্ পাখি দুটো
বাসা বানাচ্ছে, ডিম পাড়বে।

অতঃপর খোলস ছাড়িয়ে বের হয়ে এলো প্রাণ
ডানা, চোখ আর উড়বার দুরন্ত আকাঙ্ক্ষা। স্নেহে
মমতায় মা তাদের ঠোঁটে করে আহার, আদর
যোগালেন। কিন্তু কে-ই বা জানতো শাবকের দেহে
বসবে সুতীক্ষ্ম কাকের নখর।

আর আমার মায়ের, পাখি মায়ের বুকের
স্বপ্ন লাশ হয়ে কাকফেরি হবে দুঃস্বপ্নের
কেউ কী ভেবেছে?

৩১.০৫.২০০১

গান্ধীজীর প্রতি / ফজলুল হক তুহিন

দু হাজার দুই সাল। ঠিক এই সময়ে গান্ধিজী,
আপনার জন্মভূমে আগুনের স্বাদু খাদ্য হলো জীবন্ত মানুষ!
মানুষের কয়লায় হিংস্রতার পেট এখন ভরাট
দাউদাউ আগুনের চমৎকার জাহান্নাম আজ গুজরাট!

আপনার ‘সত্যাগ্রহ’ আপনার ভস্মের সাথেই
উধাও। সত্যের মতো নীতির মতো কবেই
আভিধানিক শব্দাবলী।
সে জন্যেই বুঝি আপনার সুসন্তানেরা সব
কী নিপুণভাবে চিরে ফেলছে গর্ভবতীর পেট
অতঃপর কী মহৎ নরবলী নরবলী উৎসব!

সত্যিই গান্ধিজী , আপনার দেশের তুলনা নাই
কী সুন্দরভাবে হত্যা হত্যা খেলায় উন্মত্ত দেশজ কসাই।
আমরা দারুণ অভিভূত বিস্মিত হয়েছি আপনার পুত্রদের
গণধর্ষণের সেবায়
লুটপাটের নেশায়!

ওসমান, ইব্রাহীমভাই, রাজা বন্ধুভাই- সকলেই মহানন্দে
দিনযাপন করছে উদ্বাস্তু শিবিরে- খোলা আকাশের নিচে।
জ্বলছে পুড়ছে বুকে শুধু সর্বস্ব হারানো সুখসুখ স্মৃতির অঙ্গার!
গান্ধিজী, সত্যিই আপনার জন্মভূমির এমন নয়নজুড়নো দৃশ্যাবলী
ইতিহাসে বিরল
এ রকম অপূর্ব আলোকচিত্রগুলো সত্যিই সংগ্রহে রাখার মত।

১২.০৩.২০০২

দুঃসময়ের প্রার্থনা / ফজলুল হক তুহিন

এইসব দিন এইসব রাত কিভাবে গড়ায় আমাদের প্রভু
তুমি তো জানোই- রাতগুলো আর দিনগুলো সব খুন হয়ে যায়!
আমরা তো প্রভু ত্রিকালদর্শী নই- সাধারণ আমরা সবাই
অতীত-আগামী দেখি না, বুঝি না কুটিল পাঁকের বর্তমানও।

বুঝি ইউনুস নবীর মতন আটকা পড়েছি ঘাতক মাছের পেটে
বিষাক্ত দাঁতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় এই প্রাণের সীমানা!
হায়, আমাদের বাঁচাবে কে প্রভু ? আমরা সবাই জনতা সরল
কী করে বাতাস নেবো ফুসফুসে? আমাদের চাই আলো মাটি জল।

প্রভু, আমাদের নদীগুলো সব আমাদের মতো মরে যায় দ্রত
প্রাণের ভূগোল অশুভ ছায়ার ঈগলে ঈগলে ভরে যায় দ্রত!
আমরা সবাই আজ রুস্তম- আমাদের কাঁধে সোহ্রাব লাশ
প্রভু, আমাদের মাথার উপরে উড়ে ঘুরে তাই ভয়াল শকুন!

গ্রহণের দিন কেটে যাক প্রভু, সূর্যালোকিত দিন চাই আজীবন
আমাদের এই চেতনার নদী জোয়ারে জোয়ারে হোক পূর্ণিমাময়।
জানি প্রভু জানি, পৃথিবীর সব একদিন হবে লয়
তবু যেন প্রভু, ক্রমাগত হতে থাকে ইতিহাসে বোধের বিজয়।

২২.১০.২০০২

ও বেহুলা ও সখিনা / ফজলুল হক তুহিন

ক.
কী এক খোয়াবে পোয়াতী মেঘের মতো কেঁদে ফ্যালে বেহুলা
সোয়ামি যে ঘরে মেখে দেবে তাকে প্রেমের প্রথম পরাগ
সেখানেই তার প্রাণিত স্বপন হয়ে যাবে নীল বিলাপ-
সে কথা কী হয় বিশ্বাস? তবু সাহসী বেহুলা।

অতঃপর এলো সেই কাল রাত! নাগিনীর বিষে আসমানে
জমে বিষমেঘ। জমিনে ঘাসেরা সবুজ হারায়। হাওয়ায়
হাওয়ায় রটে অলুক্ষণে কী এক পক্ষীর কাঁপা সুর।
নিখুঁত বাসরে আহা, বেহুলার হৃদয়পুর কী সুমধুর!

লক্ষিন্দর মনে সে তো এক প্রেমের স্বচ্ছ করতোয়া
ইচ্ছের কূলে বেহুলা হোক না আবগাহনের মহিমা ।
এই পবিত্র রাতের জোয়ারে হৃদয়ে ফুটুক পূর্ণিমা
জোছ্না অথই ধুয়ে ধুয়ে নিয়ে যাক পৃথিবীর কালিমা।

কালিমা কী যায় এই গ্রহ থেকে কোনদিন কোন সময়?
বেহুলার তাই আয়োজন রাত হয় না, হলো না সকাল।
নাগিনীর নীল দংশনে পুড়ে খাক হলো এই হৃদয়!
ভেসে যায় কেঁদে যায় চিরদিন বেহুলা ভাগ্য ত্রিকাল।

খ.
কেউ কী ভেবেছে সখিনার মন মরুভূমি হবে এই শুভক্ষণে?
এতদিন দেখা স্বপ্নবাসর আজকে কী হবে তৃষ্ণার জল?
সখিনা তবুও দিয়েছে বিদায় কাসেম ফিরবে এমন আশা-ভরসায়
চোখ কী শাসন মানে এই দিনে? চিরবিদায়ের সঙ্গীত মনে।

ঘোড়া পিঠে বীর সওয়ার হলো, সখিনার চোখে জলভরা মেঘ
মরুভূমি ভিজে সে মেঘ আবেগে- কান্নার ধ্বনি হারায় ফোরাতে।

কাসেমের হাতে তলোয়ার জ্বলে- এজিদ সৈন্য মরে সে আঘাতে
অতঃপর বীর ফিরে আসে শত তীর বুকে নিয়ে সখিনা হৃদয়ে।

যে হাত মেহেদি পারেনি রাঙাতে, সে হাত রক্তে হলো রাঙা আজ
সূর্যের শেষ রঙে মিলেমিশে একাকার বধু সখিনার সাজ।
হৃদয় গহীনে সাইমুম সব ওলোট পালোট করে দেয় নিমেষেই
আলোকিত এই স্বপ্নদিনের মৃত্যু , তা-ও কী নিয়তি ঘোষণা?

পারে না সখিনা পারে না সইতে, বিষাদের ভার বুকে সে বইতে
শুধু বয়ে যায় সখিনার চোখে ফোরাতের চির বহমান ধারা।
মানুষ রক্তে সে দুঃখে জাগে অসুরের প্রতি লড়ায়ের সাড়া
তবু থামতে না চায় কোনদিন সেই ক্রন্দসী- বিরহ মাতম।

গ.
ও বেহুলা!
ও সখিনা!
চোখ মেলে চাও বাংলার ফসলী প্রান্তরে-
সেই তোমাদের অদৃষ্টের শোক এখনও রোজ বহে নারীর অন্তরে অন্তরে।

৩০.০৮.২০০২