মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

দ্বাদশ সর্গ

ছিলো মজে জার্মানীতে সখীদের সাথে
দু-তনয়া; হেসেখেলে, গেয়ে আর ঘুরে
বসন্তের পাখি যেন, ইউরোপকুঞ্জে।
গেছেন হাসিনা তাঁর পুতুল ও জয়
দু-সন্তান নিয়ে স্বামী ওয়াজেদ আলী
মিয়ার কর্মস্থলে; সাথে তাঁর ছোট ভগ্নি
শেখ রেহানাও। হেথা ঘোরে, সেথা ঘোরে,
কি-অপূর্ব দেশ, যত দ্যাখে তত জাগে
দেখবার সাধ এর নিত্যনবরূপ!
ঐশ্বর্যে-বৈচিত্র্যে রেখেছে সাজিয়ে যেন
প্রতিটা শহর মহাসম্রাজ্ঞীর মতো।
ধনাঢ্য রূপসী রাজকন্যা প্রকৃতির
গোটা ইউরোপ যেন, অনন্ত যৌবনা;
কে না চায়, দেখে তারে জুড়ায় নয়ন!
মিললো দুদিনের ছুটি ওয়াজেদ মিয়ার;
চললেন সে-ছুটিতে সবাইকে নিয়ে
বেলজিয়ামের রাজধানী স্বর্গপুরী
ব্রাসেলসে; তারিখ চৌদ্দ আগস্ট। সোজা
উঠলেন গিয়ে বেলজিয়াম-রাষ্ট্রদূত
সানাউক হকের বাসায়। প্রেসিডেন্ট-
তনয়া ও জামাতার উপস্থিতি, যেন
হাতে পাওয়া চাঁদ, দিয়েছে বাড়িয়ে তাঁর
আভিজাত্য আরো। অভিভূত রাষ্ট্রদূত
জানালেন অভ্যর্থনা মহামর্যাদায়
রাষ্ট্রীয় অতিথিদের। দূতাবাসে কর্ম-
রত বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা-
কর্মচারী যত, রাষ্ট্রদূত হতে নিম্ন
পদমর্যাদার, এ দূর বিদেশভুয়ে
ব্যস্ত সকলেই নির্ভুল মনোরঞ্জনে
অভ্যাগতা রাজঅতিথির; যা-ই চায়,
চোখের পলকে চলে আসে; চায় না যা,
তাও এসে গড়াগড়ি খায় কন্যাদের
পায়ের তলায়। ভৃত্য যারা, ক্রীতদাস,
তারা চিরদিন চেয়ে থাকে শকুনের
মতো শ্যেন-চোখে মনিবের সন্তুষ্টির
দিকে; মনিবের তুষ্টি ছাড়া, তোষামোদি
ছাড়া বাঁচে না জগতে তারা একদিনও।
ছিলো ডুবে প্রেসিডেন্ট-তনয়ারা অথৈ
হর্ষোল্লাসে, মৎস্য যেন মহাসাগরের,
কাঁটছিল আনন্দসাঁতার দূর দেশে;
সাথে দুই পুষ্পশিশু, জয় ও পুতুল।
রাষ্ট্রদূত হকের কন্যারা প্রাণ খুলে
করছিল গল্পগুজব, কৌতুক, হাসি-
ঠাট্টা নবাগতা সখীদের সাথে, রাত্রি
জেগে জেগে। পনেরো আগস্ট মধ্যরাতে
রেহেনার অট্টহাসি ছড়ালো ঝংকার
সুপ্ত জনে জনে। তবু না বিরক্ত কেউ;
বরং জনাব হক বললেন হেসে:
“হাসারই বয়স; হাসবেই তো; হাসুক না!”
ভগ্নিপতি ওয়াজেদ মিয়া ছুটে এসে
ধমকালেন তাঁকে; বললেন ক্রুদ্ধস্বরে:
‘যত হাসি তত কান্না, মনে রেখো, মেয়ে।’
যত রাগে দোলাভাই তাঁর, তত যায়
হেসে গড়াগড়ি কন্যাগণে। হায়, তারা
জানতো যদি, কি-কঠিন দুঃসংবাদ
করছে অপেক্ষা, কি-দুর্দিন আসছে নেমে
জীবনে তাঁদের, কি-বৈরি বৈশাখি মেঘ
ভাগ্যের আকাশ তাঁদের ফেলেছে ঘিরে!

ফোন এলো ভোর বেলা। বাংলাদেশ থেকে।
তখনও ভাঙেনি কারো ঘুম। উঠে গিয়ে
রাষ্ট্রদূত ধরলেন রিসিভার: ‘এক
সেনা-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট
শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাস-
ভবনে নিহত, স্বপরিবারে।’ কাঁপছেন
শুনে তিনি ভয়ে। লাটিমের মতো যেন
ঘুরছে জগত। বুদ্ধি তাঁর নেমে যাচ্ছে
পারদের মতো নিচে। এখন উপায়?
দরজায় নক করে উঠালেন ডেকে
প্রেসিডেন্ট-জামাতাকে ঘুম থেকে। উঠে
এসে ওয়াজেদ আলী মিয়া শুনলেন
সব কথা। বাকরুদ্ধ তিনি দুঃসংবাদে।
অন্তরাত্মা তাঁর কেঁপে উঠলো ভয়ে-ত্রাসে:
‘হায়, খোদা! কী শোনালে এ কুক্ষণে তুমি!’
পড়লো আকাশ যেন ধসে, আচমকা
বসন্ত-কাননে; যেন বৃষ্টিহীন, মেঘ-
হীন, খর-রৌদ্রে নিদারুণ বজ্রপাত
হর্ষে হেঁটে চলা দূরগামী পথিকের
মাথার উপর; যেন সমুদ্রসৈকতে
ঝিনুক কুড়াতে কুড়াতে উচ্ছল হর্ষ-
শিশু, বেখেয়ালে, ডেবে গেল চোরা-
বালির হাঁ-এর ভেতর, ভাগ্যের দোষে;
হায়, প্রভু; কী শোনালে এ কুক্ষণে তুমি!

অবশ শরীর; নিশ্চল হাত-পা; যেন
ভারী পাথরের পা ফেলে, কি-কষ্টে তবু
ওয়াজেদ মিয়া বসলেন গিয়ে পাশে
সুপ্ত স্ত্রীর; পাশে তাঁর ঘুমায় শান্তিতে,
স্বর্গ থেকে নেমে আসা দুই স্বর্ণশিশু;
ফিরালেন চোখ তিনি দয়িতার দিকে-
কুসুমের মতো শুয়ে আছে কি-সুন্দর
যেন স্বর্গের অপ্সরী, পিতৃ-অন্ত প্রাণ,
পিতা-বঙ্গবন্ধু ছাড়া বোঝে না যে কিছু,
পুত্রের অধিক যে তাঁর জগদ্বিখ্যাত
পিতার নিকট; ‘হায়, হাসু, প্রিয়ংবদী,
জীবনসঙ্গিনী হে আমার, কোন্ প্রাণে
কবো এই কথা তোমাকে হে!’ বসে বসে
ভাবছেন তিনি; দুই চক্ষু বেয়ে তাঁর
দরদর করে ঝরছে অশ্রুজল; তার
কয় ফোঁটা পড়লে পুষ্পিত মুখে, ধড়-
ফড় করে উঠলেন যেন জেগে এক
ভয়ার্ত হরিণী; স্বামীর দুহাত ধরে
বললেন: ”হায়! কী হয়েছে! কী ব্যাপার!
কেন কাঁদো এইভাবে? খুলে কও সব।”
মুছলেন ত্রস্ত হাতে দুচোখের পানি;
পরমাণূ বিজ্ঞানী সে, শক্তি নিয়ে যাঁর
রাত্রিদিন গবেষণা; মানায় কি তাঁর
মেয়েলি ক্রন্দন? টানটান হয়ে তিনি
বললেন কম্পমান কণ্ঠে: “রেহেনাকে
ডাকো। গ-গোল প্রচ-, ঢাকায় । গুলি
ছুঁড়েছে সৈন্যরা বত্রিশ নম্বরে। আব্বা-
আম্মা-ওরা সব কেমন আছেন, কেউ
বলতে পারছে না।” “কী বলছো এসব!”
বলে ফুঁপিয়ে উঠলো যেন আষাঢ়ের
মেঘ, ঝরঝর: ছুটে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে
উঠালেন তিনি রেহেনাকে। দুই ভগ্নি
দুজনকে বুকে বেঁধে, ফুঁপিয়ে ফুুঁপিয়ে
কাঁদলেন কিছুক্ষণ, কিছু না বুঝেই।
কী ঘটেছে, কী হয়েছে-জানে না এখনো
তাঁরা; জানে না কী কারবালা ঘটিয়েছে
সীমারেরা বাংলার মসনদে। ও-দুখিনী
অনাথ মেয়েরা বাংলার, কে মোছাবে
তোমাদের আঁখিজল, যখন শ্রাবণ
বেঁধেছে অনন্ত বাসা তোমাদের চোখে?
কাঁদো, নারী, কাঁদো, যদি কেঁদে সুখ হয়,
যদি জুড়ায় হৃদয় কেঁদে বেইমান-
অকৃতজ্ঞ এই মীর জাফরের দেশে!

“কেঁদো না, কেঁদো না” বলে ওয়াজেদ মিয়া
লাগলো সান্ত¡না দিতে, প্রিয় জনে। “কেউ
যায়নি তো মারা?” বলে প্রেয়সী হাসিনা
চেয়ে রয় কি-করুণ দুর্বোধ্য স্বামীর
মুখের দিকে, অচেনা যেন কত এই
মুখ! বললেন: “এক্ষুণি বলবো কথা
বাবা-মার সাথে।” ওয়াজেদ মিয়া তার
প্রত্যুত্তরে খোঁজেন বাহানা কত, তাঁকে
ভোলাবার; ছোট ছোট মিথ্যা দিয়ে ঢেকে
রাখার আপ্রাণ চেষ্টা তাঁর ভয়াবহ
প্রাণঘাতী কঠিন সত্যকে: “ঢুকছে না
ফোন, হাসু। ধৈর্য ধরো। আস্তে আস্তে যাবে
জানা সব কথা। হয়ো না অস্থির মোটে।”
অস্থিরতা ততই যাচ্ছে যে বেড়ে! হায়,
ভাবেন রেহেনা, গত রাত্রির আমারই
অট্টহাসি যত অকল্যাণের মূল? কেন
চেয়ে আছে এইভাবে দোলাভাই তাঁর
দিকে? কেন এ বাড়ির লোকজন এত
পর পর, অচেনা ভীষণ, মনে হচ্ছে
হঠাৎ এভাবে? “হায়, আপু, কী হয়েছে,
রেখো না লুকিয়ে কিছু, খুলে বলো!” বলে
লুকায়ে ভগ্নির বুকে মুখ, হাউমাউ
করে কাঁদতে লাগলো অনাথ বালিকা
বাংলার, দূর দেশে। ভগ্নি তাঁর “চুপ
র্ক” বলে তাকালেন ফের ওয়াজেদ
মিয়ার দিকে: “কী হলো, ফোন করো, খোঁজ
নাও।” ধীর পদক্ষেপে, যেন জ্যান্ত লাশ,
গেলেন বাংলার ধীমান জামাতা উঠে
রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের নিকট।
গিয়ে শুনলেন তাঁর চাপা হট টক
টেলিফোনে, জার্মানীর বাংলাদেশের
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর
সাথে: “কি-উটকো ঝামেলা দেখুন! সব
আপদ এ দুঃসময়ে চেপে বসে আছে
আমার উপর। আপনি তো নির্ঝঞ্ঝাট-”
লজ্জায় ও অপমানে হয়ে উঠলো লাল
ওয়াজেদ মিয়ার বিষণ্ন মুখ: ‘হায়,
কী কয় চামচিকা! বঙ্গবন্ধু-তনয়ারা
রাষ্ট্রের আপদ? পঙ্কে নিপতিত যেন
বিশাল হস্তিনী, পা দেখায় মূর্খ ভেক
তাকে, সক্রোধে।’ জামাতা তিনি, প্রেসিডেন্ট
শেখ মুজিবের; কী সাহসে এ নির্বোধ
উচ্চারণ করে মুখে হেন ভাষা, তাঁর
সম্মুখে! পেলেন গন্ধ তিনি সুগভীর
ষড়যন্ত্রের, চারদিকে। এক্ষুণি বেরুতে
হবে তাঁকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে, দূরে কোথা,
এ নিবাস থেকে; যেভাবে পালিয়েছিল
লুৎফাকে নিয়ে পরাস্ত সিরাজ। তিনি
লুকিয়ে মনের ক্ষোভ মনে, বললেন
বিনয়ের সাথে: “লাইন দেবেন না কেটে;
দিন হুমায়ুন সাহেবের সাথে কথা
বলি।” বড়ই বিব্রত রাষ্ট্রদূত হক;
অগত্যা দিলেন তুলে ফোন তাঁর হাতে;
দিয়েই গেলেন ঢুকে ঘরে তস্করের
মতো; বিদূষী স্ত্রী তার, দিলেন ধিক্কার
মহারোষে: “অমানুষ তুমি! কথা কও
এইভাবে বিপদের দিনে কোন্ মুখে?”
উঠলো অস্ফুটস্বরে ফুঁসে রাষ্ট্রদূত,
যেন জাতসাপ: “বুঝো না আমার চেয়ে
বেশি; বঙ্গবন্ধু ঝাড়ে-বংশে শেষ; কার
ধড়ে মাথা ক’টা, ঠাঁই দেয় বেঁচে যাওয়া
তাঁর তনয়াকে!” ওদিকে আরেক ঘরে
তাঁরই কন্যাগণ কেঁদে জারজার, হায়,
সখীদের দুঃখে! এরকমই বুঝি হয়
নিয়তির খেলা, যাদের কল্যাণকথা
ভেবে ব্যতিব্যস্ত সারাক্ষণ, শত্রু ভেবে
ছোঁড়ে তারা নির্দয়ের মতো তীক্ষ্ন বাক্য-
বাণ! ‘হায়, যার জন্যে করি চুরি,সেই কয়
চোর!’ ভাবেন উন্মনা হয়ে তিনি। চলে
গেলে ওয়াজেদ আলী মিয়া, উঠলো বেজে
ফের ফোন। রাষ্ট্রদূত সানাউল হক
ছুটে এসে করলেন রিসিভ। জানালেন
জার্মানীর রাষ্ট্রদূত তাকে: পাঠাচ্ছেন
গাড়ি তিনি ব্রাসেলস আর জার্মানীর
বর্ডারে; ব্যবস্থা নেন যেন তিনি দ্রুত
বর্ডার পর্যন্ত তাঁদেরকে পাঠানোর।
‘হা-পরমেশ্বর! কী-বাঁচা বাঁচালে তুমি!’
এই বলে জানালো সে মনোতুষ্টি; পরে
দিলো সে ধিক্কার চাপাস্বরে: “বাকশাল
ও রক্ষিবাহিনী নিয়ে মেতেছিলে বড়;
হয়েছে পতন ঠিকই আপনারই দোষে !’
বলে সে হাসলো দাঁতে দাঁতে শেয়াল ও
শকুনের হাসি, যেভাবে মীর জাফর-
ঘসেটি বেগম-রাজ বল্লভ-জগৎ
শেঠরা সানন্দে হেসেছিল প্রাণখুলে
সতেরো শ সাতান্নোয় বাংলার নবাব
সিরাজ উদ দৌলার করুণ মৃত্যুতে।

কি-বিচিত্র এই বঙ্গদেশ আর তার
মানুষেরা! চোখের পানিতে ভেসে ভেসে
মুজিবদুলালী শেখ হাসিনা ভাবতে
লাগলেন এক মনে। পাশে ভগ্নি কাঁদে;
মা-খালার কান্না দেখে, কাঁদে জয়; কাঁদে
অবুঝ পুতুলও পিতৃকোলে; কেবল হে
পাষ- সীমার, কাঁদলো না তোর মন;
কাঁপলো না হৃৎপি- তোর একবারও!

উঠলেন জার্মানীতে এসে অবশেষে
মুজিবকন্যারা। সাক্ষাৎ-ফেরেস্তা যেন
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
তটস্থ সারাক্ষণ মুজিবকন্যাদের
আদরআপ্যায়ণ ও নিরাপত্তা নিয়ে।
যাবে চাকরি? যাক। কী হবে চাকরি দিয়ে
যখন ঘাতক ছুড়েছে বুলেট প্রিয়
পিতার পিঞ্জরে! যাবে প্রাণ? যাক না হে!
কী হবে জীবন দিয়ে, যখন জাতির
জনক নিহত বাংলায়, যখন ঘৃণ্য
শকুনের হাতে আজ প্রাণের পতাকা,
লাল-সবুজ যে-পতাকার জন্যে ত্রিশ লক্ষ
বাঙালী দিয়েছে প্রাণ, দিয়েছে ইজ্জত
মাতাভগ্নি দুই লক্ষ। জনাব চৌধুরী
বললেন দৃঢ় কণ্ঠে: “আমার এখানে
থাকুন নিশ্চিন্তে; পাবেন না কোনো ভয়।”
মহীয়সী পত্নী তাঁর, শোনাতে লাগলো
অভয়বাণী। কেন এ অভয়? আসলে
কী ঘটেছে বত্রিশ নম্বরে? জানেন না
এখনো তা হাসিনা-রেহেনা বিস্তারিত।
খুললেন মুখ অবশেষে প্রিয় নেতা
শেখ মুজিবের মন্দাদৃষ্টা দু-কন্যার
উপর্যুপরি পীড়াপীড়িতে রাষ্টদূত
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী: “যা বাস্তব,
হবেই তা মেনে নিতে, আজ কিংবা কাল;
লাভ নেই লুকিয়ে সত্যকে, হবেই তা
প্রকাশিত একদিন না একদিন; হে
বঙ্গবন্ধু-তনয়ারা, ” কাঁপতে লাগলো
কণ্ঠ তাঁর বলতে গিয়ে, “তাহলে শুনুন,
বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই, করেছে সৈন্যরা
হত্যা তাঁকে ভোর রাতে।” “বেঁচে নেই?” বলে
গেলেন রেহেনা মুর্ছা হাসিনার কোলে।
হুমায়ুন-পত্নী তাঁকে পাঁজাকোলা করে
শোয়ালেন বেডে; ব্যস্ত হয়ে গেল সব
জ্ঞান ফেরানোর জন্যে তাঁর। ওয়াজেদ
মিয়া ধরে আছেন পত্নীকে শক্ত হাতে;
পত্নী তাঁর বাকরুদ্ধ হয়ে, দিয়েছেন
ছেড়ে অশ্রুজল, যেন পদ্মানদী তাঁর
অবাক দুচোখে হঠাৎ গিয়েছে মিশে;
পুতুল ও জয় ভয়ে, ধরে জননীর
গলা, জুড়ে দেছে কান্না উচ্চৈঃস্বরে। কে সে
পাষাণ, না কেঁদে পারে এই ক্ষণে! কাঁদে
ওয়াজেদ মিয়া, কাঁদে রাষ্ট্রদূত, কাঁদে
এ বাড়ির সব লোক একসাথে। হায়,
দেশ, মাতা বঙ্গ, তোমার চোখের পানি
শুকাবে না আর কোনোদিন; কেঁদে কেঁদে
যাবে যে তোমার প্রাণ, কারণ তোমার
শ্রেষ্ঠ যে-সন্তান সহস্র বছরে, তাঁকে
ফেলেছে যে হত্যা করে জারজ সীমার!

বিষণ্ন বদনে চেয়ে আছে সকলেই
শেখ মুজিবের শোকার্ত দুলালী শেখ
হাসিনার অশ্রু টলোমলো চোখে, যেন
তিনি অশ্রু-সরোবরে করুণ নয়নে
চেয়ে থাকা কোনো দুঃখকমল। মুখ
খুললেন তিনি অবশেষে এই বলে,
বিস্ময়ে: “এও কি সম্ভব! গুজব বোধ-
হয় ছড়িয়েছে বিরোধীরা।” বললেন
চৌধুরী: “আমরা খোঁজ নেবো তারও।” বলে
চললেন মুজিবতনায়া, যেন তিনি
শুনতে পাননি কিছু কিংবা শুনছেন না
কারো কথা: “বাঙালী কী করে পারে হত্যা
করতে আমার পিতাকে? পাকিস্তনীরাও
করেনি সাহস ছুঁড়তে বুলেট যাঁর
বুকে-!” বললেন ওয়াজেদ মিয়া, “পারে,
হাসু, পারে। রয়েছে যে মীর জাফরের
প্রেতাত্মারা ঘাপটি মেরে আজও শান্তিপ্রিয়
বাঙালীর মাঝে; সতের শ সাতান্নোয়
ওরা ছিলো, আজও আছে এবং থাকবে
চিরদিন।” হুতাশন যেন, উঠলেন
জ্বলে পত্নী তাঁর: “কোথায় সে মীরজাফর,
আমি আট কোটি বাঙালীকে সাথে নিয়ে
করবো মূলোৎপাটন তার, বাংলার
বুক থেকে। মিঃ এ্যামবাসাডার, আপনি
কালই ব্যবস্থা নিন আমাকে ঢাকাতে
পাঠানোর। কী ঘটেছে ঢাকায়, সচক্ষে
দেখতে চাই আমি।” বললেন হুমায়ুন
রশীদ চৌধুরী, “হে বঙ্গবন্ধু তনয়া,
শান্ত হোন। কিভাবে ঢাকায় ফিরবেন
আপনি-এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার
করেছে আপনাদের স্বদেশে ফেরার
ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি। আপাতত দেশে
ঢুকতে পারবেন না আপনারা, দু-বোনের
কেউ। ” “ঢুকতে পারবো না আমাদের দেশে
আমরা? শেখ মুজিবের বাংলায়? বলুন
কে সে সরকার, কার এত স্পর্ধা, রাখে
আটকে বৈদেশে বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে?
কন, প্রেসিডেন্ট নন আমার জনক?”
“ছিলেন। এখন মৃত।” “মৃত? আজ দেশে
কে তবে রাষ্ট্রপ্রধান?” “তিনি মহামান্য
প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক।” “ কে সে?
খন্দকার মোশতাক? পিতার কাছের
মানুষ- বাণিজ্য মন্ত্রী?” “কাছের মানুষ
বটে, কিন্তু ছিলেন না বিশ্বস্ত ” উঠলেন
বলে ওয়াজেদ আলী মিয়া, “জানি, তাঁকে
বাবাও কখনো করতেন না পছন্দ।
যুগে যুগে মার্কাস ব্রুটাস বন্ধুবেশে
করেছে হামলা জুলিয়াস সিজারের
’পরে মোক্ষম সময়ে। মনে করে দ্যাখো,
খোকাচাচা একবার মোশতাকের জন্যে
এসেছিল সুপারিশ নিয়ে; বাবা তাকে
বলেছিলেন, ‘রে খোকা, এসেছিস তুই
কার জন্যে? কখনো পশ্চাৎ থেকে কেউ
করে যদি ছুরিকাঘাত আমাকে, মনে
রাখিস, তাহলে করবে তা মোশতাক।’
এই সেই মোশতাক, রটিয়ে কুৎসা
তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে, বাবার কাছ
থেকে তাঁকে করেছিল বিচ্ছিন্ন; উদ্দেশ্য,
প্রকৃত বন্ধুরা যাতে ভিড়তে না পারে
তাঁর কাছে। আজ সব হয়ে যাচ্ছে স্পষ্ট।”

চোখ দুটো যেন জলে ডোবা পদ্মফুল;
সেই চোখে ভেসে উঠছে কত স্মৃতি এই
খন্দকার মোশতাকের, আঁঠার মতোই
থাকতো যে লেগে সারাক্ষণ তাঁর পিতা
প্রেসিডেন্ট-মুজিবের সাথে সাথে। হায়,
এই কি সেই মোশতাক, যার রুগ্ন স্ত্রীর
সেবাশুশ্রুষার সমস্ত দায়দায়িত্ব
তুলে নিয়েছিলেন মা কাঁধে, যখন সে
কারাগারে বন্দী, স্বাধীনতার আগে? হায়,
এই কি সেই মোশতাক, যে কিনা মাটিতে
গড়াগড়ি খেয়ে করেছিল কান্নাকাটি
দাদীর মৃত্যুর পর? শোকে মুহ্যমান
বাড়ির সবাই, দাদীর মৃত্যুতে; কিন্তু
যে রক্তের কেউ নয়, সেই কিনা শোকে
গড়াগড়ি খাচ্ছে ধুলোয়! তবে কি স্রেফ
অভিনয়ই ছিলো এইসব?-“বেইমান!”
বলে, উঠলেন কেঁদে মুজিবদুলালী:
“সব বেইমান! সব বিশ্বাসঘাতক!
কিন্তু এই আমি, জগত-বিখ্যাত পিতা
স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবের কন্যা আল্লার ইচ্ছায়
বেঁচে আছি পৃথিবীতে; আমার সন্তান
জয় ও পুতুলের কসম, জন্মদাতা
পিতার কসম, মায়ের কসম আর
আমার প্রাণের ভাই জামাল-কামাল-
রাসেলের কসম, কাউকে ছাড়বো না
আমি, কাউকেই ছাড়বো না; সব
ঘাতকেরই কল্লা আমি ছিঁড়ে নেবো এই
হাতে; প্রতিটা মৃত্যুর নিখুঁত হিসেব
বুঝে নেবো ঠিকই কড়ায় গ-ায়, পাই-
পাই করে; ঘাতক সে যেই হোক, টুটি
তার ছিঁড়ে ফেলবোই!” অতঃপর তিনি
জুড়লেন আর্তনাদ জননীর নামে:
“ও মাগো, আমাকে কেন পাঠালে বৈদেশে?
তুমি বুঝি অনেক আগেই পেয়েছিলে
টের, সবাইকে মেরে ফেলবে ওরা, বাঁচতে
দেবে না কাউকে? তাই বুঝি পুত্রদের
কাছে রেখে, আমাকে ও রেহেনাকে,
কন্যা বলে, ঠেলে দিলে দেশের বাইরে,
বাঁচতে তোমাদের ছাড়া? হয়তো সবার
চেয়ে বেসেছিলে ভালো; তাই আমাদের
চাওনি মরতে দিতে! ও মা, মাতৃহীন-
পিতৃহীন আজ দুই এতিম সন্তান
দেখে যাও পৃথিবীতে কি-শান্তিতে আছে!
তুমি দেখে যাও, পিতা, তোমার স্নেহের
দুলালীরা আজ হঠাৎ শেওলা হয়ে
ভাসতেছে কিভাবে ভাগ্যের দরিয়ায়,
জগতে যাদের খোদা ছাড়া কেউ নেই।”

মুজিবদুলালী হাসিনার এ-রোদনে
পড়ে গেল আহাজারি সারা বাড়ি। কেউ
কাঁদে উচ্চৈঃস্বরে, কেউ চাপড়ায় বুক,
যেন কারবালায় ফের ইমাম হোসেন
হয়েছেন খুন, স্বজনেরা তাঁর ‘হায়,
খোদা! হায় খোদা!’ বলে করছে ক্রন্দন;
যেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব
সিরাজউদ্দৌলা ফের হয়েছে শহীদ
মহম্মদ আলী বেগের ক্রুর ছুরির
আঘাতে, লুৎফা বেগম তার কন্যাকে
বুকে নিয়ে জুড়েছে ক্রন্দন হা-হা রবে
বাংলার বাতাসে। সে-ক্রন্দনে থরথর
কাঁপছে আকাশ, কাঁপছে জগতময়
কোটি মানুষের আহত বিবেক; আর
মেঘনা-যমুনা-পদ্মা ও মধুমতীর
মিষ্টি পানি হঠাৎ রক্তিম হয়ে, স্থির
হয়ে গেল, পেলো না কখনো আর যারা
ফিরে খরস্রোত, প্রিয় মুজিবের শোকে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘মহাশোক পর্ব’; নাম ‘দ্বাদশ সর্গ’।

—–সমাপ্ত——

Advertisements

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

একাদশ সর্গ

পনেরো আগস্ট শেষ রাতে, নেমে এলো
আসমান থেকে ফেরেস্তা আজরাইল
সৌম্যমূর্তি ধরে। হাতে ফুল, শুভ্র কেশ;
এসে কি-বিনম্র পায়ে করতে লাগলো
হাঁটাহাঁটি ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে,
২৭ মিন্টো রোডে আর শেখ ফজলুল
হক মনির ধানমন্ডির বাসস্থানে;
তিন জায়গায় একসাথে এক রূপে
হাঁটতে লাগলো তাঁর অলৌকিক পায়ে।
চিন্তামগ্ন হাঁটছে সে একা, ঘুরে ঘুরে;
হাতে বাঁধা সোনার ঘড়ির দিকে তীক্ষ্ন
চোখে তাকাচ্ছে বারংবার; থেকে থেকে
ঘুমন্ত বাড়ির সবগুলো জানলা দিয়ে
মারছে কৌতূহলে ঊঁকি-ঝুঁকি। তাই দেখে
থরথর করে, যেন বাতাসে বটের
পাতা, কাঁপছে বঙ্গমাতা বেগম মুজিব।
কাঁপছে হাত-পা তাঁর। ঘামছে কপাল।
শুকিয়ে আসছে গলা। ভীষণ তৃষ্ণায়
এক গ্লাস পানির উদ্দেশে ছুটলেন
তিনি হাজেরার মতো, ডাইনিং রুমে।
জগগুলো পড়ে আছে খালি। কলসিতে
পানি নেই। ট্যাপগুলো শুকিয়ে আমড়া-
কাঠ। এক ফোঁটা পানি নেই কোনোখানে,
যেন কারবালা হঠাৎ এ বাড়ি। তিনি
ডাকলেন উচ্চৈঃস্বরে “কামাল! কামাল!”
বলে কতবার, এলো না উত্তর। সব
ঘুমাচ্ছে মড়ার মতো সারা বাড়ি। নেই
সাড়াশব্দ কারো, কোনোখানে। উবে গেল
তৃষ্ণা তাঁর আস্তে আস্তে, কর্পূরের মতো।

ধীর পায়ে তিনি, অসীম সাহস বুকে
নিয়ে, দাঁড়ালেন এসে জানলার কাছে;
“এই যে, শোনেন” বলে ডাকলেন, একা
পায়চারি করা লোকটাকে। তাঁকে দেখে
লুকালো সে অন্ধকারে, কারো উপস্থিতি
টের পেয়ে যেভাবে লুকায় তস্কর। ‘হা-
খোদা, সর্বশক্তিমান; শ্রেষ্ঠ রক্ষাকারী!’
ঘামতে ঘামতে তিনি ফিরলেন বেডে;
এক নজর দেখলেন চেয়ে-মহামান্য
প্রেসিডেন্ট বাংলার, বঙ্গবন্ধু, তাঁর
স্বামী, শুয়ে আছে কি-শান্তিতে, তাঁর পাশে!
‘লা-হাওলা অলা কুয়াতা’ বলে মারলেন
ছুঁড়ে থুঁতু শয়তানের উদ্দেশে তাঁর
শিয়রের বাম দিকে; তিন বার করে
কলেমা তৈয়েবা ও কলেমা শাহাদাত
করলেন পাঠ মনে মনে; অতঃপর
বুজলেন চোখ কেবলার দিকে ফিরে।

গভীর নিদ্রায় ডুবে আছে লোকজন
তিন বাড়ি। ছিলো মেতে আনন্দ-আহ্লাদে
সারা সন্ধ্যা শেখ মুজিবের সাথে। তিনি
মহান বিপ্লবী নেতা বাংলার; সেই
সাথে প্রিয় পিতাও যে তিনি তিন পুত্র
শেখ কামাল, জামাল আর রাসেলের;
শেখ নাসেরের প্রিয় ভ্রাতা; ফজলুল
হক মনির দরদী মামা; আবদুর
রব সেরনাবিয়াতের প্রিয় ভগ্নিপতি;
সুলতানা কামাল ও রোজি জামালের
স্নেহার্দ্র শ্বশুর। কত দাবি সকলের,
আর কত শত আবদার! কি-গভীর
ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালবাসা নিয়ে তারা সব
ঘোরে তাঁর চারদিকে। কি-স্বর্গীয় সুখ
এইসবে! প্রিয় পত্নী ফজিলাতুন্নেছা;
আকাশের মতো তাঁর বিশাল হৃদয়;
সে-হৃদয় দিয়ে তিনি মাতিয়ে রাখেন
সারা বাড়ি, যত্ন আত্তিতে। যে-আসে তাঁর
কাছে, সে আর চায় না যেতে দূরে, পর
কি আপন। খানাপিনা, গল্প-আড্ডা শেষে
কি-শান্তিতে শুয়ে আছে সব! চোখ জুড়ে
শুধু সুখ, শুধু স্বপ্ন। এপাশ ওপাশ
করছেন শুয়ে শেখ নাসের। অনেক
দিন হলো, এসেছেন তিনি। খুব ভোরে
হয়েছিলেন রওনা খুলনার উদ্দেশে
ভাইকে না বলে। লোক দিয়ে রাস্তা থেকে
ফিরিয়ে আনেন বঙ্গবন্ধু। হেসে দিয়ে
বলেন, “আমাকে ফাঁকি দিয়ে, চেয়েছিলি
পালাতে তো? পারলি না। ধরা পড়ে গেলি।”
বাংলার শাসক তিনি; তবু একবারও
ভোলেন না ডুবিয়ে রাখতে স্নেহাদরে
প্রাণের এ ভাইটিকে। জানে না এখনো
তাঁরা, অদৃষ্ট তাঁদের বেঁধেছে কি শক্ত
অমর বন্ধনে। খানাপিনা শেষে ফিরে
গেছে সেরনিয়াবত ২৭ মিন্টো রোডে
নিজের নিবাস আর ধানমন্ডি শেখ
মনি তাঁর শান্তি-নীড়ে। স্ত্রী আরজু মনি
অন্তঃসত্বা। পেটের সন্তান রাত্রিদিন
নিচ্ছে পৃথিবীর মুখ দেখার প্রস্তুতি;
যখন সয় না তর, তুলতুলে পায়ে
জোড়ে লাথি; বার বার জাগে তার মাতা
মধুর ব্যথায় সারা রাত। আজও রাতে
যথারীতি জেগে উঠে, শিশুর পিতার
পাশে বসে কল্পনায় দেখতে দেখতে
অনাগত সন্তানের কচি মুখ, ফের
ঢলে পড়ে পরম শান্তিতে মহাঘুমে।
শেষ রাতে মারামারি, কাটাকাটি আর
গোলাগুলির দুঃস্বপ্ন দেখে, ধড়পড়
করে উঠলো সে জেগে ফের। উঠে “মা! মা!”
বলে কাতরালো একবার, দুইবার।
তারপর পুনরায় ঢলে পড়লো অথৈ
ঘুমের ভেতর। আজরাইল এসে ফের
করতে লাগলো হাঁটাহাঁটি। তার ভারী
পায়ের আওয়াজে ভেঙে গেলে কাঁচা ঘুম,
আতঁকে উঠলো বেবি সেরনাবিয়াত;
ঠোঁট ফুলিয়ে সে কাঁদলো কয়েকবার;
তারপর ঘুমিয়ে পড়লো একা একা।
দুধ দেয়া অবলা গাভীটা হাম্বা হাম্বা
রবে ডেকে উঠলো তিনবার; তার ডাক
ভাঙাতে পারলো না কারো ঘুম; অতঃপর
সে নিশ্চুপ হয়ে গেল। প্রহরী অবাক
হলো হাম্বা হাম্বা ডাক শুনে এত রাতে।
হয়তো সৌখিন গাভী মশার কামড়ে
হয়েছে উত্যক্ত, ভাবলো সে। তারপর
কান খাড়া করে শুনতে লাগলো চুপচাপ
মহাকাল-তরঙ্গের কলকল ধ্বনি।

উঠলো গর্জন করে বাইরে বন্দুক।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই, পড়ে গেল
সশস্ত্র প্রহরী-একজন-দুইজন-
এক এক করে সকলেই। ঘাতকেরা
ছুঁড়ছে বৃষ্টির মতো গুলি; ছুঁড়তে ছুঁড়তে
এগিয়ে আসছে তারা, যেন ঘূর্ণিঝড়।
ধুলাতে গড়িয়ে পড়ার আগে, কে যেন
শেষ-উচ্চারণ রেখে গেল কেঁপে ওঠা
বঙ্গজ বাতাসে-“পারলাম না রুখতে,
হে রজনী, তীক্ষ্ন তোর খড়গের আঘাত।
জীবনের আলো শেষে সরে যাচ্ছে দূরে,
বহু দূরে। রক্তচক্ষু সীমারের দল
জারজ আঁধার চিরে, পড়ছে ক্রমশ
ঢুকে বত্রিশ নম্বরে। ধিক, হে প্রহরী,
ব্যর্থ হয়ে গেল তোর মানবজীবন!”
কে শুনলো তার কথা আড়ষ্ট বাতাসে,
জানতে পারলো না সে। সাক্ষী তার রয়ে
গেল, শুধু কয় ফুট রক্তরাঙা পথ।
তারপর আরও রক্ত। আলতা-রঙ সেই
রক্তের উপর উজান রক্তের স্রোত।
কৃষ্ণ সেই স্রোতে পা ডুবিয়ে, সীমারেরা
উদ্ধত এগিয়ে গেল প্রাসাদের দিকে।

খুনীরা হয়েছে একত্রিত। সাফল্যের
দ্যুতি করতেছে চিকচিক সব মুখে।
মেজর রশিদ এসে বললো সোল্লাসে,
“মিন্টো রোড ও ধানমন্ডির অপারেশন
সাকসেসফুল। সেরনিয়াবত আর
ফজলুল হক মণি হয়েছে খতম
সপরিবারে। এখন শুধু বাকি শেখ
মুজিবুর রহমান। যত দ্রুত পারো,
পাঠাও পালের গোদাটাকে জাহান্নামে।
নেই হাতে সময় মোটেই। জলদি করো।”
“জয় খন্দকার মোস্তাকের জয়!” বলে
ছুটে গেল বিদ্রোহীরা গেটের ভেতর।

উঠলেন জেগে শেষে বাংলার বীর।
হৃদয়ে স্বদেশ নিয়ে, বেশিক্ষণ নয়,
গিয়েছিলেন ঘুমিয়ে। কুসুমপ্রেয়সী
ফজিলাতুন্নেসা তাঁর পাশে। স্বপ্ন দেখে
বারবার জেগে উঠে, পড়ছিলেন ঢলে
আবার নিদ্রার কোলে। তিনিও সত্রাসে
উঠলেন জেগে, বাইরে শুনতে পেয়ে
গুলির আওয়াজ। ধরলেন ত্রস্ত হাতে
এঁটে স্বামীর দুহাত।- “দুঃস্বপ্নে আমার
ভেঙে গেল ঘুম। দেখলাম এইমাত্র
স্বপ্নে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব
সিরাজুদ্দৌলাকে। দেখলাম মহম্মদী
বেগ কি-নির্মম হাতে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে
বাংলার হৃৎপিন্ড। আমার যে করতেছে
খালি ভয়! বাইরে শুনতে পাচ্ছি ওই
কিসের আওয়াজ? আবার কি পলাশীর
আমবনে ফেলছে লর্ড ক্লাইভ তার
কামানের গোলা আর সেনাপতি মীর
জাফর দেখছে তামাশা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?”

বললেন মহাবীর, “শান্ত হও, রেনু।”
বলে তিনি উঠালেন হাতে টেলিফোন-
সেট। শেষ এই রাত্রি যেন পড়ে গেছে
ঝড়ের কবলে আচানক। মহুর্মুহু
গর্জন বাতাসে। তখনও পায়নি টের
৩২ নম্বরের বাসিন্দারা, ক্ষুব্ধ অথৈ
দরিয়ায় খাচ্ছে হাবুডুবু জীবনের
তরণী তাদের। রিসিভার তুলে তিনি
করলেন ডায়াল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে।
বেজেই চলেছে ফোন। ধরছে না কেউ।
কার এত বুকের পাটা এ বাংলায়-
শেখ মুজিবুর রহমান করে ফোন
কিন্তু করে না রিসিভ! থমকে গেলেন
মহাবীর। চোখের পর্দায় তাঁর ভেসে
উঠলো মুহূর্তে, উত্তাল সাতই মার্চ,
পঁচিশে মার্চের কালো রাত্রি আর রক্ত-
ক্ষয়ী একাত্তর। বাংলার মানুষ যাঁর
একটা হুঙ্কারে লাফিয়ে পড়তে পারে
লাখে লাখে মৃত্যুর গহ্বরে, ভয়হীন;
আর যাঁর ডাকে পতঙ্গের মতো নীল
অগ্নিচুল্লিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দিতে পারে
আত্মাহুতি ত্রিশ লক্ষ বীর নির্দ্বিধায়-
সে-ই মুজিব করছে ডায়াল অথচ
করছে না রিসিভ, কে এমন নরাধম
আছে এ বাংলায়? শত্রুরা ফেলেছে ঘিরে
তাঁর বাড়ি, চতুর্দিক থেকে; পারলেন
বুঝতে তিনি। হায়! এখন উপায়? এরা
কারা? আর্মি জোয়ানেরা? বাংলার আর্মি
কেন মুজিবের বত্রিশ নম্বরে, কার
ইশারায়, কার নির্দেশে? কোথায় তবে
রক্ষিবাহিনী তাঁর? কাটছে কি ঘাস তারা,
যখন ফেলেছে ঘিরে হায়েনার মতো
বাংলার স্থপতি শেখ মুজিবের গৃহ?
চলছে তুমুল গোলাগুলি- “হায়, রেনু,
খুলে দাও দোর, দেখি কোন্ শৃগালের
বাচ্চারা পড়েছে হামলে বাঘের বাড়ি!”
পথরুদ্ধ করে আছে পত্নী তাঁর, “না, না!
আপনি যাবেন না কোথাও; আপনাকে
মেরে ফেলবে ওরা। কোথাও দেবো না যেতে
আপনাকে আমি।” বলে স্বামীকে জড়িয়ে
ধরে কাঁদতে লাগলেন বেগম মুজিব।
চলেছেন ডায়ালের পর ডায়াল করে
বিভিন্ন নম্বরে; করে না রেসপন্স কেউ।
বহু কষ্টে একটা নম্বরে অবশেষে
মিললো জবাব, তিনি তাঁর মিলিটারি-
সেক্রেটারি কর্নেল জামিল উদদীন।
ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। উঠলেন লাফিয়ে,
ঢুকলো কর্ণকুহরে যেই মুজিবের
আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর-“কর্নেল জামিল,
শেখ মুজিব বলছি। আর্মি-জোয়ানরা
হামলা করেছে আমার বাসায়। দ্রুত
পদক্ষেপ নাও। তা নইলে সবাইকে
শেষ করে ফেলবে। কোথায় আমার রক্ষি-
বাহিনী, পাঠাও এক্ষুণি। খতম করে
ফ্যালো মীর জাফরের প্রেতাত্মাগুলোকে।”
“আমি দেখছি, স্যার।” বলে ছুটলেন তিনি
সেই অবস্থায়, রুদ্ধশ্বাসে প্রেসিডেন্ট
শেখ মুজিবুর রহমানের বাসাবাড়ি
বত্রিশ নম্বরে। পথিমধ্যে হলো দেখা
প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড রেজিমেন্টের
সাথে। তাদেরকে ঘুরতে বললেন তিনি
শেখ মুজিবের বাসভবনের দিকে:
“আক্রান্ত প্রেসিডেন্টের বাড়ি! দ্রুত চলো।”
অস্বীকার করলো তারা। হায়, কি-ঔদ্ধত্য!
শত্রুরা প্রেসিডেন্টের গৃহে। তবু তারা
করছে অস্বীকার যেতে উদ্ধারাভিযানে।
হায় খোদা! পেতেছে মীর জাফর বুঝি
ষড়যন্ত্রজাল ফের সোনার বাংলায়!
শান্তস্বরে, আবেগ ও যুক্তি দিয়ে, গোটা
পরিস্থিতি বুঝালেন তিনি। তবু তারা
করলো না কর্ণপাত। অগত্যা কর্নেল
জামিল সশস্ত্র ছুটলেন একা একা।
কী পেয়েছে কাপুরুষের বাচ্চারা, করে
গুলি শত বছরের সাধনায় পাওয়া
মহামানব, বাংলার বিপ্লবী পুরুষ,
স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবের
বাসস্থানে? এসে দেখলেন তিনি, করছে
গুলি বেপরোয়া, বিদ্রোহী সৈন্যরা। গেট
ভেঙে অন্দরমহলে প্রবেশের করছে
চেষ্টা। নিয়েছে সিঁড়ির নিচে অবস্থান;
কিছু আছে বাড়ির প্রবেশপথে। কিছু
বুঝে ওঠার আগেই, রয়েল বেঙ্গল
টাইগার যেন, পড়লো ঝাঁপিয়ে বুনো
শূকরের ’পরে অকস্মাৎ। ছুঁড়লেন
গুলি অব্যর্থ নিরিখে কর্নেল জামিল;
পড়লো লুটিয়ে ধুলোয়, সৈনিক এক।
বাকিরা দাঁড়ালো ঘুরে, হতবিহ্বল;
দেখা গেল মুখ মেজর ডালিম, নূর
চৌধুরী, মেজর হুদা, মেজর রশিদ,
মেজর ফারুক, মহিউদ্দিন আহমেদ
প্রমুখ পাপিষ্ঠ বিদ্রোহীর। ছাড়লেন
হুঙ্কার ব্যাঘ্রের কণ্ঠে বিক্ষুব্ধ জামিল,
“ফিরে যাও সব ব্যারাকে। সময় আছে।
কী চাও তোমরা, শুনবো আমরা সব।
তা নইলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।
রেহাই পাবে না কেউ। কী হলো, উত্তর
দাও।” “তবে রে, পা চাটা কুত্তা মুজিবের!”
বলে টেনে দিলো ব্রাশ উদ্ধত মেজর
ডালিম, সরোষে। “হায়, খোদা!” বলে ঢলে
পড়লেন মুজিবপ্রেমিক মহাবীর
রাতের আঁধারে; হা-হা রবে হেসে উঠলো
ক্রুর শয়তানী হাসি ঘৃণ্য পাতকেরা।
গৌরবের মৃত্যুর আগে, অস্ফুটস্বরে
বললেন মহাবীর: “বদলা নেবেই
জাতি একদিন এ-হত্যার। শুনে রাখ,
পাপিষ্ঠেরা, ক্ষমা তোরা পাবি না কখনো
বাংলার মানুষ ও খোদার দরবারে।”

ঘাতকের দল বিজয়উল্লাসে মেতে
উঠলো ধ্বংসযজ্ঞে। খই ফোটার মতো
ফুটছে গুলি। সে-গুলিতে পড়লো লুটিয়ে
বঙ্গবন্ধু-তনয় শেখ জামাল। তাঁর
ক্রন্দনে থমকে গেল রাতের বাতাস।
পদ্মামেঘনায় উঠলো তুফান মহা-
শোকের। ব্যথার শিশির ঝরিয়ে দিলো
আকাশ, বাংলার ঘাসে ঘাসে। শুধু ঘৃণ্য
ঘাতকেরা হাসতে লাগলো প্রাণখোলা
হাসি আর ঝাঁপিয়ে পড়লো পূর্ণোদ্যমে
অকাতর হত্যা-অভিযানে। বলছেন
ক্রুদ্ধস্বরে বঙ্গবন্ধু : “সব বেইমান!
কি-স্পর্ধা দ্যাখো, মুজিব ফোন করে, তবু
ধরে না কে এম শফিউল্লাহ, চিফ
অব আর্মি স্টাফ; ডিজিএফআই-এর
এয়ার ভাইস মার্শাল আমিনুল খান
ধরে না আমার ফোন। স্বাধীন করেছি
এই দেশ এইসব বিশ্বাসঘাতক
বাঙালীর জন্যে? হায়, রেনু, ছাড়ো পথ,
দেখে নিতে চাই আমি কুলাঙ্গারগুলো;
কী-সাহসে ঢোকে তারা শেখ মুজিবের
বাড়ি শেষ রাতে! বাইরে কেবলি ভারি
বুটের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি কেন? কই
গেল আমার কামাল জামাল রাসেল?
তাঁদের আওয়াজ কেন শুনতে পাচ্ছি না,
হায়? কর্নেল জামিল-সেই বা কোথায়!
বললো আসছি; কতক্ষণ লাগে আসতে
এখানে! আমি কি বসে চুষবো আঙুল
যখন দস্যুরা করতেছে তছনছ
আমার নিবাস; খুলে দাও তুমি দোর;
ফজিলা, আমাকে আটকে রেখো না আর।”

বুটের আওয়াজ ছাড়া ঘরের বাইরে
আর কোনো শব্দ নেই। সিঁড়ি দিয়ে কারা
সব ভারী পায়ে করতেছে ওঠানামা।
বেগম মুজিব, বর্ষার আকাশ যেন,
কাঁদছেন ঝরঝর আর কাঁপছেন
ভয়ে; স্বামীর দুহাত ধরে কি-করুণ
চেয়ে আছেন মুখের দিকে তাঁর, আর
বলছেন উচ্চৈঃস্বরে, “আমার জামাল-
কামালকে ওরা মেরে ফেলবে; শিগগির
করুন একটা কিছু । ইন্দিরা গান্ধীকে
ফোন দেন। আপনার বিশ্বস্ত বন্ধু তিনি।
তিনি নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবেন কোনো।”

বললেন বঙ্গপতি, “দিয়েছে বিচ্ছিন্ন
করে আগে থেকে সমস্ত লাইন মীর-
জাফরেরা, বিদেশের সাথে। চেষ্টা আমি
করেছি অনেক, কাজ হয় নাই। রেনু,
বৃথা আর কালক্ষেপণ। আমাকে যেতে
দাও। দেখি কী-সাহসে অমানুষগুলো
ঢুকেছে আমার বাড়ি আর কী উদ্দেশ্যে!”
বলেই হেঁচকা টানে ফেললেন খুলে
স্ত্রীর দুর্বল বাঁধন। ক্ষিপ্র হাতে তিনি
দরোজা খুলেই ছাড়লেন বজ্রনাদ,
যা শুনে পালালো দৌড়ে ইঁদুরের মতো
সৈনিকেরা, সিঁড়ি দিয়ে। এসেছেন ছুটে
পাছপাছ বেগম মুজিব; -“আপনার
সাথে আমি যাবো। বাঁচতে চাই না আমি
আপনাকে ছাড়া।” বলে কাঁদছেন অঝোরে।
এগিয়ে গেলেন মহানেতা মহাক্রোধে
সিঁড়ির নিকট। পড়ছে ঠিকরে ঠিকরে
ক্রোধাগ্নি চাহনি থেকে তাঁর। চালিয়েছে
হত্যাযজ্ঞ যারা এতক্ষণ ধরে সারা
বাড়ি, ফাঁটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে
তারা ভয়ে। রুমে রুমে করছিল তল্লাশি
মেজর মহিউদ্দিন, বজলুল হুদা
ও মেজর নূর চৌধুরী। খুঁজছিল তারা
হন্যে হয়ে শেখ মুজিবকে। সিঁড়ি দিয়ে
উপরে ওঠার পথে মুজিবকে দেখে
ঘাবড়ে যায় মেজর মহিউদ্দিন; সে
দ্যাখে যেন সর্ষেফুল চারদিকে। দ্যাখে,
এক সৌম্যপুরুষ, পাইপ হাতে, সাদা
পাঞ্জাবি গায়ে, ধুসর চেক লুঙ্গি পরা,
নির্ভীক দাঁড়িয়ে আছে, যেন হিমালয়।
ভাষা হারিয়ে সে শুধু বলে, “স্যার! স্যার!
আপনি আসেন।” গর্জে ওঠেন মুজিব,
“কী চাস তোরা? এসেছিস হত্যা করতে
আমাকে? ভুলে যা। পারবি না। পারেনি যা
পাক-আর্মিরা, করতে চেয়েছিস তোরা
তাই? সাহস থাকে তো গুলি র্ক।” চেয়ে
রইলেন বীর নির্ভীক নয়নে। ফোন
করেছেন তিনি কয়েক জায়গায়। কাল-
ক্ষেপণ করছিলেন শুধু, যাতে কোনো
সাহায্য পৌঁছায় এসে এর ফাঁকে। আশা
কর্নেল জামিল। বহু ভরসার সেই
বিশ্বস্ত জামিল তাঁর হয়েছে শহীদ
পাপীদের হাতে ইতোমধ্যে, জানা নেই
তাঁর। নিস্তব্ধতা চারদিকে। ধূর্ত নূর
চৌধুরীর ইশারায় সরে গেল এক
পাশে মেজর মহিউদ্দিন। সাথে সাথে
মহাপাপী নূর টেনে দিলো স্টেনগান
তাক করে বাংলার সিজার, মেঘনাদ
মহাবঙ্গের, নবাব সিরাজুদ্দৌলার
সুযোগ্য উত্তরসূরী, বাঙালীর স্বপ্ন-
পুরুষ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা,
মহান রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবের
সুসবুজ বুক। সাথে সাথে প্রাণঘাতী
আটটি বুলেট করে দিলো ঝাঁঝরা তাঁর
শুভ্র বক্ষদেশ। পড়লেন হুমড়ি খেয়ে
সিঁড়ির উপর স্বাধীনতার স্থপতি,
বাংলার রাখালরাজা শেখ মুজিবুর
রহমান। ফিনকি দিয়ে পড়ছে গড়িয়ে
রক্ত নয়, যেন বাংলার হৃৎপিন্ড চিরে
বহু শতাব্দীর জমাট ক্রন্দন। “হায়,
খোদা! আনলে ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে তাঁকে
বাঁচিয়ে বাংলায়, এভাবে মরবে বলে
ভীরু কাপুরুষ ভ্রষ্টা বাঙালীর হাতে?
কী দেখালে, প্রভু! না, না, দেখতে চাই না
আমি! দেখতে চাই না-” বলে চোখ বুজে
জুড়লেন আর্তনাদ বঙ্গমাতা হা-হা-
রবে। হন্যে শেয়ালের মতো বজলুল
হুদা টানতে টানতে তাঁকে নিয়ে গেল
একপাশে। ছাড়লো হুঙ্কার অতঃপর:
“জলদি খতম করে ফ্যালো সব। কেউ
যেন বাঁচতে না পারে। চালাও তল্লাশি।
সব ঘর। সব টয়লেট। কে কোথায়
লুকিয়েছে দ্যাখো। তন্ব তন্ব করে দ্যাখো।
কাউকেই দেবে না রেহাই। কেউটের
বাচ্চাও কেউটে সাপ-একথা যেয়ো না
ভুলে।” পড়ে গেল ছুটোছুটি দোতলায়,
যেন চার পায়ে দাঁতাল শূকর ছুটছে
মত্ত হয়ে; প্রাণহীন বুটের আওয়াজে
হয়ে গেল মুহূর্তেই জ্বলন্ত হাবিয়া
মহান নেতার বাড়ি বত্রিশ নম্বর।

কাঁদছেন বেগম মুজিব পতিশোকে;
করছেন ছটফট, যেন কোনো গলা-
কাটা কবুতর; আর ঘাতকের কাছে
বারবার করছেন করুণ মিনতি:
“আমাকে মারতে চাস? বেশ, মেরে ফ্যাল্
এখানেই। মুজিবের লাশের পাশেই
রেখে যা রে তাঁর বেগমের লাশও।” কার
কথা কে বা শোনে, যখন চড়েছে খুন
মস্তকে! মেজর হুদা ঠেলতে ঠেলতে
নিয়ে গেল তাঁকে বেডরুমের দরজার
কাছে। এক হাতে ঠেসে ধরে দেয়ালের
সাথে, করে দিলো এক গুলিতেই স্তব্ধ
চিরতরে নারীশ্রেষ্ঠ, বাঙালীর মাতা,
ফজিলাতুন্নেছাকে। একটিবারও, হায়,
কাঁপলো না জাহান্নামী সীমারের হাত
জননীসদৃশ, পূত রমণীনিধনে।
পড়লেন ঢলে তিনি মেঝের উপর;
ভাসতে লাগলো যেন বেহেস্তের ফুল
লাল টকটকে শোণিতের স্রোতে। হন্যে
হুদা লাথি মেরে তাঁর পবিত্র শরীরে
ছুটলো নতুন কোনো শিকারের খোঁজে।

হরিণের বনে যেন পড়েছে হঠাৎ
হামলে, বুভুক্ষু বাঘ এক পাল; যাকে
পায়, তাকে ধরে; ভাঙে তার ঘাড়। খুনী
সৈন্যরা নির্মমভাবে করলো হত্যা একে-
একে জামাল, কামাল, অতঃপর দুই
পুত্রবধূ রোজি জামাল ও সুলতানা
কামালকে। মৃত্যুর ভয়ে শেখ নাসের
লুকিয়ে ছিলেন টয়লেটে। ঘাতকেরা
আনলো দরজা ভেঙে তাঁকে ধরে। তিনি
ব্যবসায়ী খুলনার। সরল মানুষ।
সারা বাড়ি এত মৃত্য আর রক্ত দেখে
কাঁপছেন থরথর। মরতে কে চায়
এ জগতে! হাতজোড় করে বললেন
তিনি, “আমাকে মেরো না। আমি তো করি না
রাজনীতি কোনো। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে
আমি আছি।” তাঁর কথা শুনে ঘাতকেরা
হায়েনার হাসি হেসে বললো উল্লাসে;
“ঠিক আছে। মারবো না। চল তবে নিচে
যাই।” অতঃপর দাঁড় করিয়ে পশ্চিম
দিকে, তার পশ্চাতে ছুঁড়লো তারা গুলি।
হায়, মৃত্যু, বর্বর এমন মৃত্যু, কবে
দেখেছে কোথায় কেবা! দুই ভাবী রোজি
ও সুলতানার মৃত্যু দেখেছে রাসেল
লুকিয়ে খাটের তলে। দশ বছরের
শিশু মৃত্যুভয়ে যেন জড়োসড়ো এক
খরগোশছানা। জল্লাদেরা খুঁজে খুঁজে
তাকেও আনলো ধরে। কাঁদতে লাগলো
ভয় পাওয়া শিশু ‘মা! মা!’ করে। কাঁপে
আসমান সে-শিশুর নির্মল ক্রন্দনে।
তবু ঘাতকের দল কি-পুলকে হেসে
যায় গড়াগড়ি! বললো সে, “মার কাছে
যাবো আমি। আমাকে আমার মার কাছে
নিয়ে যাও।” বেচারার আর্তনাদে কেঁপে
উঠলো বক্ষ এক সহযোগী সৈনিকের;
বাঙালী সে, তার উপর এক পিতা; দীর্ণ
তার পিতৃহৃদয় সোনালি শিশু শেখ
রাসেলের সকরুণ মুখ দেখে ভেসে
গেল করুণ মায়ায় শেওলার মতো;
অশ্রুছলোছল চোখে মেজর পাশার
হাত ধরে করলো সে অনুনয়: “স্যার,
ছেড়ে দিন ওকে।” একথার বিনিময়ে
দিতে হলো প্রাণ তাকে তৎক্ষণাৎ, শেখ
রাসেলের আগে। যেন আজরাইল এরা,
মৃত্যু ছাড়া দেওয়ার কিছু নেই; দয়া-
অনুকম্পা, ভালবাসা, স্নেহ কোনোদিন
দ্যাখেনি হৃদয়ে ছুঁয়ে। ‘সাপের বাচ্চাও
সাপ’- এ প্রবাদে বিশ্বাসীরা ‘মার কাছে
চলো’ বলে নিয়ে গেল শেখ রাসেলকে
তুলে। যখন বাঁধলো তারা তার হাত,
“আমাকে মেরো না! আমাকে মেরো না!” বলে
করতে লাগলো আহাজারি। হায়, পিতা,
মহান মুজিব, ভাগ্যবান আপনি, এই
দৃশ্য দেখার আগেই বুজেছেন চোখ
চিরতরে। হায়, মাতা, ফজিলাতুন্নেছা,
আপনার প্রাণের ধন রাসেলের কান্না
শোনার আগেই অনন্ত ঘুমের দেশে
গেছেন আপনি চলে, ভাগ্যবতী আপনি!
দেখতে হলো না আপনাকে, বুলেটের
আঘাতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া রাসেলের
বুক। হায় রে, ঘাতক, রাসেলের বক্ষ
নয়, দিয়েছিস বুলেটে ঝাঁজরা করে
তুই বাংলার হৃৎপি-; ধিক তোকে!

সারি সারি পড়ে আছে লাশ, যাঁরা কোনো
প্রতিরোধ ছাড়া পড়েছে মৃত্যুর কোলে
ঢলে। পুরাকালে কোষবদ্ধ তরবারি
নিয়ে ঘুরতো রাজারা; রাজপুত্রগণ
পেতো উপহার রত্ন-খচিত সুতীক্ষ্ন
তলোয়ার, রাজাদের কাছ থেকে; তাই
দিয়ে সাজিয়ে রাখতো তারা রাজবাড়ি;
কি-সাহস দুর্বৃত্তের, ফ্যালে এক পা-ও
সে-বাড়ির দেউড়িতে! সাম্রাজ্যের চেয়ে
বড় সম্রাট; থাকেনি সাম্রাজ্য কোথাও
টিকে, তাঁর কিংবা তাঁর সুযোগ্য উত্তরা-
ধিকারীর অবর্তমানে। গড়েছে দুর্গ
তাই রাজাবাদশারা যুগে যুগে। নেই
সেই লালবাগ কেল্লা; তাই অরক্ষিত
বড্ড আজ রাজার জীবন। এ কেমন
রাজ্যশাসন, অন্যের হাতে তুলে দিয়ে
নাঙ্গা তলোয়ার, চেয়ে থাকে রাজা তার
অনুকম্পার দিকে-অস্ত্রহীন, ভিখারীর
মতো। আসুক আবার ফিরে ঈশা খাঁর
খাপখোলা খড়গের সভ্যতা; বাঙালীর
বীরত্ব আবার দেখুক জগত। দাও
অস্ত্র তুলে ফের মহাবীর মুজিবের
হাতে; তারপর, হে ঘাতক, কাপুরুষ,
ভেড়ার শাবক নূর, দেখাও তোমার
বাহাদুরি জগতবাসীকে। ধিক তারে,
নিরস্ত্র জনে যে হর্ষে হানে তলোয়ার
আর বীর বলে করে বাহাদুরি! কাকে
বলে বীর? বীর অর্থ কি রাত্রির বোবা
অন্ধকারে নিরস্ত্র পুরুষ-নারী-শিশু
হত্যা করা নি্ির্বচারে? সমান শক্তিতে
মুখোমুখি হয়ে যে-দেয় গুড়িয়ে মহা-
রোষে মানসিংহের শাণিত কৃপাণ
এক ঘায়ে, বীর তাঁকে বলে ইতিহাসে।
কি-উল্লাসে তবু সব জারজ চন্ডাল
করতে লাগলো নাচানাচি জনকের
লাশ ঘিরে-“স্বৈরাচার নিপাত যাক!
মুজিব নিপাত যাক! বাকশাল নিপাত
যাক! খন্দকার মোশতাক-জিন্দাবাদ!
বাংলাদেশ- জিন্দাবাদ!” বলে বলে। হায়,
বর্বর মূর্খেরা, কী দিয়ে মুছবি বল্
বাংলার বক্ষ থেকে ‘জয় বাংলা’ আর
জনকের নাম, যখন হৃদয়ে লেখা
কোটি বাঙালীর ‘স্বাধীনতার স্থপতি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’,
জন্ম যাঁর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া,
ঊনিশ শ বিশ সালে, তারিখ সতেরো
মার্চ, পিতা শেখ লুৎফর রহমান,
মাতা সায়েরা খাতুন; পনেরো আগস্ট
ঊনিশ শ পঁচাত্তরে বরণ করেন যিনি
শাহাদত, কতিপয় উচ্চ-অভিলাষী
পথভ্রষ্ট কাপুরুষ সৈনিকের হাতে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘ম্যাসাকার পর্ব’; নাম ‘একাদশ সর্গ’।

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

দশম সর্গ

চলেছে বাংলাদেশ কেশরের পিঠে,
সারা পৃথিবীর মহাবিস্ময়; যে দ্যাখে,
হয়ে যায় হতবাক সে-ই এর রূপে,
খ্যাতি আর গুণগানে। কে জানতো, এত
শক্তি নিয়ে এশিয়ার এক কোণে শুয়ে
আছে এক জাতি, সুউন্নত, সুপ্রাচীন,
নুহের প্রপৌত্র বঙের বংশধর!
সে-জাতি মহান নেতা শেখ মুজিবের
বলিষ্ঠ নেতৃত্বে, চিরোন্নত শির তার
ধরেছে জগতে তুলে, যেন হিমালয়।
মহাসমরের ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে,
সদর্পে গা ঝাড়া দিয়ে, ছুটেছে কেবলি
বিদ্যুদ্বেগে, অংশ নিতে বিশ্বসভ্যতার
মহাযজ্ঞে; নেতা তার দক্ষ দূরদর্শী
মহান মুজিব। পেয়েছে স্বাধীনতার
স্বাদ, বিপুল মৃত্যুর বিনিময়ে; গতি
তাই এত ক্ষিপ্র, এত দীপ্র চিত্তবল;
বাঙালীর প্রাণোচ্ছ্বাসে জগতে হঠাৎ
উজ্জীবিত কত জাতি! হয়েছে সদস্য
জাতিসংঘের। কত বড় বড় দেশ
দিয়েছে বাড়িয়ে বন্ধুত্বের হাত, পাশে
এসে দাঁড়িয়েছে বিপুল সাহায্য নিয়ে
সাগ্রহে। বাংলার কৃষক শস্যের মন্ত্রে
ভীষণ উদ্দীপ্ত; কৃষিবিপ্লব ঘটাচ্ছে
গ্রামে গ্রামে। শ্রমিকেরা হচ্ছে স্বাবলম্বী।
থাকবে না ভুখানাঙা কেউ ত্রিশ লক্ষ
শহীদের বাংলাদেশে। শেখ মুজিবের
বাংলাদেশ মানে শোষণ-বঞ্চনামুক্ত
সুফলা সাম্যের দেশ। এই ব্রত নিয়ে
স্বদেশ-নির্মাণে নিমগ্ন বঙ্গের নেতা।
বিপুল সাফল্য তাঁর, দেখে, জ্বলে মরে
গোপন শত্রুরা, আর তলে তলে পাতে
ফাঁদ, যেন বিষাক্ত কাঁকলাস। বঙ্গবন্ধু,
দয়ার সমুদ্র তিনি; কত রাজাকার
হস্তপদ ধরে, পেয়ে গেছে ক্ষমা; মিশে
গেছে অতঃপর বাঙালীর মাঝে। হায়,
কবে কালনাগ ময়ুরের দলে ভিড়ে
হয়েছে ময়ুর? কবে কোথা বিষবৃক্ষ
দ্রাক্ষাবনে জন্মে দেছে দ্রাক্ষা উপহার?
অচিরেই মহানেতা পেয়ে যান টের,
তাঁর স্বপ্ন ধুলায় মিশিয়ে দিতে বহু
জনে বুনছে বিষ-জাল, দেশে ও বিদেশে।

শাস্ত্র বলে: ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে
রক্ষা করা কঠিন অধিক।’ মহারণে
কোনো দেশ জয়ের চেয়েও, দেশ গড়া
তেমনি কঠিন; জটিল যুদ্ধ এ, ওঁৎ
পেতে রয়েছে যখন বিষধর ফণী
অগণিত, নিজ গৃহে। ভাবেন স্থপতি
নির্জনে: ‘কেবলি চায় তারা, ছিলো যারা
আরাম-আয়েশে মাচার উপর, ঝুঁকি-
হীন, যুদ্ধহীন। অথচ বিপ্লবী মুক্তি-
যোদ্ধারা, স্বর্ণসন্তান যারা বাংলার,
যারা তুচ্ছ করে প্রাণ নির্ভয়ে ঝাঁপিযে
পড়েছিল রণাঙ্গনে, চাকরিবিহীন
নিরন্ন নির্জীব অসহায় ঘুরতেছে
পথে পথে! এ দেশ-স্বাধীন, সার্বভৌম-
তাঁদেরই অর্জন; কিন্তু কী পেয়েছে তাঁরা
স্বদেশের কাছে? রাজ-কোষাগার হতে
বেতন তোলে না শেখ; কী করে বেতন
তুলে কেনাকাটা ফুর্তি করবে মুজিব
যখন বাংলার সূর্য-সন্তানেরা সব
নিঃস্ব, বেকার! করে না বাজারঘাট;
স্ত্রী-ই চালায় সংসার, যেভাবে চালাতো
রক্তাক্ত যুদ্ধের আগে। আবুল ফজল,
ভাইস-চ্যান্সেলর চট্টগ্রাম ভার্সিটির,
এসেছিলেন বাসায় একদিন; তাঁকে
নিয়ে বসলেন খেতে দুপুরের খানা।
মোটা চাউলের ভাত আর ছোট মাছ
সাজানো টেবিলে। যেন হোঁচট খেলেন
তিনি। বললেন শেখ, “প্রফেসর সা’ব,
আমি নিঃস্ব; আপনার ভাবীই আমাকে
খেতে দেয় তিনবেলা।” হায়, খোদা, কোন্
মুখে শেখ মুজিব পলান্ন দেবে মুখে,
যখন প্রাণের সূর্য-সন্তানেরা, যুদ্ধে
যাওয়া সবুজ ছেলেরা, নিরন্ন ঘুরে
বেড়ায়, বাংলার পথে পথে! খাই খাই
করছে কেবলি তারা, যারা কোনোদিন
হাতে তুলে নেয়নি বন্দুক, ঝুঁকি নিয়ে
করেনি লড়াই শত্রুর সম্মুখে। ব্যর্থ
করে দিতে চায় তারা শেখ মুজিবের
সোনার বাংলা গড়ার সোনালি স্বপ্ন।
তারাও রাখুক জেনে: কৃষক-শ্রমিক
এই বাংলার, না হচ্ছে দারিদ্র্যমুক্ত
যতদিন, শেখ মুজিবও হবে না শান্ত;
লড়াই চালিয়ে যাবে বাংলার রাখাল-
রাজা, বাঙালীর বন্ধু, বাংলার লেনিন
মেহনতি মানুষের জন্যে আজীবন।

বারবার তাঁর মনে মারে উঁকি বল-
শেভিকদের দুর্জয় বিপ্লবের কথা;
লেনিন পারেন যদি তাদেরকে নিয়ে
গড়তে শ্রমিকসাম্রাজ্য বিশ্বের বিস্ময়,
তিনিই বা কেন নয় বাঙালীকে নিয়ে?
হানাদার পাক-আর্মিদের কাছ থেকে
স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা বীরবাঙালী
রাশানদের চেয়ে কোন্ দিক দিয়ে কম?
এক বুক স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তোলা তাঁর
বাকশাল এনে দেবে বাংলার কৃষক
ও শ্রমিকের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তি,
আর তারা সত্যিকার মানুষের মতো
মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে পৃথিবীতে।
পুঁজিবাদী যারা গরিবের রক্ত চুষে
যাপন করতে চায় জোঁকের জীবন;
খেটে খাওয়া বাঙালীর ঘামঝরা শস্য
যারা লুটেপুটে খেতে চায় বর্গীদের
মতো রঙিন প্রাসাদে বসে, তারা তাঁর
বিরোধিতা করবেই, তারা যেনতেন-
প্রকারেন ধ্বংস চাইবে তাঁর, চাবে মৃত্যু-
অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর তাতে
ডরায় না মুজিব; আল্লাহ ছাড়া এ জগতে,
হে মূর্খেরা, আর কারে ডরায় মুজিব?

যারা ছিলো বন্ধুজন, তাদেরকে বড়
অচেনা অচেনা মনে হয় আজ। বড়
বড় পোস্টে বসে তারা খ্যা খ্যা করে হাসে;
যত বেশি হাসে সজ্জনের হাসি, তত
বেশি মনে হয় দুর্বৃত্ত। কাছের বন্ধু
মোশতাক লেগে আছে আঁঠার মতন
সর্বক্ষণ; ঘেঁষতে দেয় না কাউকেই
আশপাশে। বড্ড বেশি সখ্যের কর্তৃত্ব
খাটাচ্ছে সে অন্য বন্ধুজনে। মহানেতা
বঙ্গবন্ধু যে-কথাই উচ্চারণ করে
মুখে, প্রকাশ্যে সে পূর্ণ সমর্থন দেয়
তাঁর অনুকূলে, উচ্চৈঃস্বরে। এত বেশি
ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনি তার ভালবাসায়,
যা ভাবিয়ে তোলে মাঝেমধ্যে, দূরদর্শী
বাংলার নেতাকে। কিন্তু তখনই তিনি
উড়িয়ে দেন তা, অলীক কল্পনা ভেবে।
সিজারের সিংহাসন ও জীবন নিয়ে
যেভাবে ব্রুটাস কাটছিল নানা ছক
সুগোপনে; সেইভাবে বন্ধু-মোশতাকও
করতে লাগলো খেলা চুপিসারে, ধুলো
দিয়ে শেখ মুজিবের চোখে। লুকিয়ে সে
বসতে লাগলো গোপন বৈঠকে ধূর্ত
ইউ.এস.এ.-র রাষ্ট্রদূত বোস্টারের
সাথে তার নিজের বাসায়, মধ্যরাতে।
হাত-মোজা, পার মোজা আর রোরখা পরে
অভিজাত মুসলিম মহিলার বেশে
আসেন বোস্টার তার বাড়ি; অভিনয়
তার ধরে, সাধ্য কার! বলেন বোস্টার
চাপা স্বরে: ‘মুসলমানের ঘোর শত্রু
শেখ মুজিব। তোমরা জানো, সে নাস্তিক;
অচিরেই বাংলাদেশকে কম্যুনিস্ট-
কান্ট্রি বানিয়ে ফেলবে। ফিডেল ক্যাস্ট্রোর
বন্ধু সে। গণতন্ত্রের নাম্বার ওয়ান
দুশমন। সোভিয়েত ইউনিয়নের
পা চাটা গোলাম। পুরোপুরি বেইমান-
কাফের বানিয়ে ছাড়বে সে বাঙালীকে।
সুতরাং দাঁড়ান আপনি মেরুদ-
খাড়া করে। ভয় নেই; আছে যুক্তরাষ্ট্র
আপনার পাশে। প্রথমে একটা কাজ
করবেন আপনারা; শেখ মুজিবকে
রাষ্ট্রের সমস্ত কাজে অসহযোগিতা
করুন, সে যেন টের না পায়; এবং
সৃষ্টি করুন কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ; মানুষ
না-খেয়ে মরবে আর শেখ মুজিবের
বাকশাল মারা পড়বে মাঝমাঠে।’ বলে
পাতি শেয়ালের মতো হাসলো বোস্টার
খ্যা খ্যা করে। তাই শুনে ‘হ্যাঁ, চমৎকার
আইডিয়া! চমৎকার আইডিয়া!’ বলে
করতে লাগলো মোসাহেবি নপুংসক
মোশতাক, জিন্নাহ-ক্যাপ চাপিয়ে মস্তকে।
বললো বোস্টার হেসে, “আপনার কোনো
কষ্ট করা লাগবে না। কর্নেল তাহের
ও তার গু-ারা মুজিবের চামড়া ছুলে
ডুগডুগি বানাবে; আপনি কেবল কণ্ঠ
ছেড়ে দিয়ে বেশি বেশি জাতীয় সঙ্গীত
গাইতে থাকবেন। স্বাধীন বাঙালি জাতি
আপনাকে মাথায় নিয়ে নাচতে থাকবে।”
বলে হাসলো সে আরেকবার কুত্তার
মতো; ছাগলের মতো হাসলো মোশতাকও।
এ যেন ক্লাইভ আর মীর জাফরের
মধ্যে গুপ্ত আলোচনা ফের। এইভাবে
ক্লাইভও বোরখা পরে যেত মধ্যরাতে
গোপন বৈঠকে মীর জাফরের বাড়ি।
কি-অদ্ভুত মিল ক্লাইভে-বোস্টারে আর
মীর জাফর ও মোশতাকে! হে মুজিব,
যখন নিজের ঘরে বিভীষণ, লঙ্কা
তবে অরক্ষিত ফের, ভীষণ বিপদে!
রক্তাক্ত যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হউন;
কখন না আবার লক্ষণ চোরাপথে
ঢুকে, ছুঁড়ে মারে অন্যায়-শর কুক্ষণে!

এত শত্রু চারদিকে, এত দুশমন;
যুক্তরাষ্ট্র-চীন, ঠিক আগের মতোই,
ভিতরে-বাইরে করে যাচ্ছে ষড়যন্ত্র;
মুসলিম রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে জোর প্রপাগা-া
চালাচ্ছে শত্রুরা: হয়ে গেছে বাংলাদেশ
নাস্তিকের আখড়া, মুছে ফেলা হচ্ছে সব
ইসলামি নামধাম রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে।
ধর্মপ্রাণ বাংলার মুসলমানকে
করছে বিভ্রান্ত দেশি ও বিদেশি যত
কুচক্রী মহল। বাংলার মাটিতে বসে
লর্ড ক্লাইভের মতো পেতে যাচ্ছে জাল
ডেভিস ইউজিন বোস্টার, যুক্তরাষ্ট্রের
রাষ্ট্রদূত, সরকারের বিরুদ্ধে। তাঁর
স্পর্ধা অতিক্রম করে যাচ্ছে সব সীমা,
ডিপ্লোমেসির ও সৌজন্যের। বিভীষণ
ঘরের ভেতরে বসে মিলিয়েছে হাত
পরদেশআগ্রাসী রাম ও লক্ষণের
সাথে। মেঘনাদ তবে বুঝি অধর্মের
মৃত্যুফাঁদে পড়েছে আবার? “হায়, রেনু,
তুমি কও, কোন্ দিকে আমি যাবো; যেন
কারবালা চারদিকে, ইমাম হোসেন
বক্ষে নিয়ে তাঁর তৃষ্ণার্ত শিশুকে, বৃথা
‘পানি! পানি!’ বলে করছে চীৎকার বৈরি-
বাতাসে; শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে, যেন
নির্ভীক হোসেন বারবার দুলদুল
নিয়ে, যেতে চাচ্ছে সম্মুখে, ভাগ্যের দোষে
তলিয়ে যাচ্ছে পা তাঁর অশ্বের, বালির
ভেতর; আমার সোনার বাংলাদেশ,
ত্রিশ লক্ষ শহীদের অমূল্য প্রাণের
বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ, নয়
মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর দুই লক্ষ
মাতা ও ভগ্নির ইজ্জতের বিনিময়ে
অর্জিত বাংলাদেশ-এদেশের সব
স্বপ্ন-সম্ভাবনা করে দিতে চায় ওরা
ধূলিসাৎ; আর কষ্টার্জিত আমাদের
স্বাধীনতা দিতে চায় অর্থহীন করে;
থাকতে শরীরে এক বিন্দু রক্ত-জল,
আমি তা দেবো না হতে। মুজিবকে ওরা
কাপুরুষ মনে করে? আমি বন্দুকের
সামনে দিয়েছি বক্ষ পেতে, পাকিস্তানী
জান্তারা সাহস করে নাই করে গুলি।
আমার জন্যে কবর খোঁড়া হয়েছিল;
কিন্তু করে নাই ওরা মারতে সাহস।
কী ভেবেছে আমলারা? রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে ঘুরে
ভুখানাঙা মানুষের জন্যে বাংলার,
ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে আনি আমি;
ওরা তা অফিসে বন্দী করে রাখে; পেতে
দেয় না তা এদেশের দুঃখী মানুষকে;
আমি খবর পেয়েছি, কেউ কেউ আছে,
সেসব ত্রাণসামগ্রী রাতের আঁধারে
ফেলে দিচ্ছে নদীতে ও সাগরে; উদ্দেশ্য,
আমাকে বেকায়দায় ফেলানো।” বিক্ষুব্ধ
নেতা, প্রিয় পতি তাঁর, মহান মুজিব,
বলে চলেছেন এক মনে, শুনছেন
কান পেতে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা
অশ্রুসিক্ত চোখে; হায়, কী দিয়ে দেবেন
সান্ত¡না, কী কয়ে করবেন ঠান্ডা তাঁকে,
যাচ্ছেন অস্থির হয়ে তিনি, ভেবে ভেবে।

“হাসিনার বাপ, শান্ত হোন!” এই বলে
মুছতে লাগলেন শাড়ির আঁচলে তাঁর,
ক্ষুব্ধ পতির কপাল।-“দেশে ও বিদেশে
কত না বন্ধুবান্ধব আপনার! কথা
বলুন তাদের সঙ্গে; বুদ্ধি-পরামর্শ
নেন। বাংলার মানুষকে সাথে নিয়ে
এগিয়ে চলুন। আওয়ামী লীগের ত্যাগী
নেতাদের নিকটে রাখুন। জানি, কেউ
কিছুই করতে পারবে না আপনার।”

স্ত্রীর কথা শেখ শুনলো কি শুনলো না,
গেল না তা বুঝা। গভীর ভাবনায় ডুবে
গেছে তাঁর মন। দেশি ও আন্তর্জাতিক
সুগভীর ষড়যন্ত্রে ভীষণ উদ্বিগ্ন
তিনি। প্রিয় স্ত্রীকে সে-উদ্বিগ্নতার কথা
প্রাণ খুলে বলে চলেছেন অকপটে:
“মাঝে মাঝে মনে হয়, বুঝি ভুলই করে
ফেললাম; লোকে আসে, ফেরাতে পারি না
আমি; যা চায়, দিয়ে দি। কিন্তু সবাই যে
ঠকায় আমার বাংলার মানুষকে।
ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না; সব
কর্মচারী ঘুষ খায়, সব কর্মকর্তা
ঘুষ খায়। শিক্ষিত, মেধাবী, বংশীয়-
সব শ্রেণির লোককে বসিয়ে দেখেছি
বড় বড় পদে; তারাও দুর্নীতি করে।
সাত কোটি মানুষের জন্যে আমি সাড়ে
সাত কোটি কম্বল দিলাম; আমারটা
পেলাম না খুঁজে। কী করবো বলো। সৎ-
মানুষের বড়ই অভাব সারা দেশে।
দেশের উন্নতি করতে কিছুই লাগে না,
রেনু; সততা ও দেশপ্রেমই শুধু লাগে।
উনিশ শ তিয়াত্তরের আলজিয়ার্স
নন-এলাইন্ড সম্মেলনে পৃথিবীর
কত বড় বড় নেতাদের সাথে দেখা
হয়েছিল। কথা হয়েছিল কিউবার
নেতা ফিডেল ক্যাস্ট্রোর সাথে। হায়, কত
বড় নেতা, নিজেই এসেছিলেন, কথা
বলতে একান্তে। মনে পড়ে তাঁর কথা।
তিনি বললেন, ‘হে মুজিব, হিমালয়
দেখতে চাই না আর; আমি আপনাকে
দেখেই বুঝেছি হিমালয় কী রকম।’ ”
বলতে বলতে হয়ে পড়লেন গম্ভীর
বঙ্গের বাদশা, যেন অকস্মাৎ কোনো
গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেছেন তিনি
ভারী পাথরের মতো। ফজিলাতুন্নেছা
তাকিয়ে আছেন নির্বাক, সেদিকে। ফের
বলে উঠলেন বঙ্গবন্ধু: “হাত ধরে,
বসলেন তিনি মুখোমুখি। বললেন
বসে, ‘কিন্তু মুজিব, আপনি তো খতম;
আপনার নাম দিয়েছি আমরা কেটে
জীবিতদের তালিকা থেকে। আপনি শেষ,
যেভাবে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভেদর
গিলেরমো আলেন্দে গসেন্স শেষ হয়ে
গেছে।’ হতভম্ব হয়ে যাই আমি, শুনে।
আমি বললাম, “মহামান্য প্রেসিডেন্ট,
কী বলতে চান আপনি?” তিনি দিলেন না
উত্তর। বরং পাল্টা প্রশ্ন চাবুকের
মতো মারলেন তিনি ছুঁড়ে: “কাদেরকে
দিয়ে দেশ চালাচ্ছেন, মুজিব? অফিসে-
আদালতে সব বসে আছে কারা? ছিলো
সব পরাজিত পাকিস্তানের সার্ভেন্ট।”
আমি বললাম, “কী করে চালাবো আমি
দেশ দক্ষ অফিসার ছাড়া?” বললেন
তিনি, “আমাকে বুঝান, হে মুজিব, তারা
দক্ষ হলো কিভাবে? আপনি কাদেরকে
দিয়ে শত্রুমুক্ত করেছেন বাংলাকে?
কাদের সাহায্যে পেয়েছেন স্বাধীনতা?”

“আমার অকুতোভয় মুক্তিবাহিনীর
সাহায্যে।” “বলুন এ-বাহিনীর সদস্য
ছিলো কারা?” “বাংলার কৃষক-শ্রমিক-
ছাত্র-জনতা।” “তাহলে বলুন, মুজিব,
যে-অফিসাররা বুদ্ধি দিয়ে, প্রজ্ঞা দিয়ে
বাঁচাতে পারলো না পাকিস্তানকে, হেরে
বসলো অশিক্ষিত ও আধা-শিক্ষিত সব
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, কী করে হলেন
দক্ষ কর্মকর্তা তারা? ভিতরে ভিতরে
তারা ক্ষুব্ধ, লজ্জিত এবং ঈর্ষান্বিত;
ঘা খাওয়া কেউটের মতো খুঁজতেছে
ছোবল মারার সুবর্ণ সুযোগ; শেখ,
সাবধান! পরাজিত শক্তিরাই কিন্তু
পেতে যাচ্ছে চুপিসারে ষড়যন্ত্রজাল
আপনার বিরুদ্ধে। আপনি চোখ-কান
খোলা রাখুন। আমাকে দেখুন, আমার
সৈন্যরা আমাকে আগলে রেখেছে কিভাবে;
আমেরিকা আমাকে মারতে চায়; কিন্তু
ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। সব ব্যর্থতার
রহস্য আমার বিশ্বস্ত সৈন্যরা। এরা
আমার এমনই সৈনিক, জীবন দেবে,
তবু মরতে দেবে না আমাকে। খাবারে
বিষ দিয়ে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা
করে আমেরিকা। তাও ব্যর্থ হয়ে যায়;
রহস্য আমার বিশ্বস্ত সৈন্যরা। এরা
নিজেরা না খেয়ে কোনো খাদ্যকণা ছুঁতে
দেয় না আমাকে। টেস্ট না করে, টানতে
দেয় না চুরুট। কী করে আমাকে হত্যা
করবে আমেরিকা? আমার সৈন্যকে কেউ
টাকা দিয়ে কিনতে পারবে না। এরা হলো
তারা, করেছি যাদের সাথে একসাথে
যুদ্ধ রণাঙ্গনে; এরা মরে যাবে, তবু
মারতে দেবে না আমাকে। মুজিব, মনে
রাখবেন চিরদিন একথা, জগতে
যুদ্ধের বন্ধুই শ্রেষ্ঠ বন্ধু মানুষের।’ ”
বলে থামলেন বঙ্গবন্ধু। কাঁপছেন
ভয়ে বঙ্গমাতা। জাপটে ধরলেন প্রিয়
জীবনসঙ্গীকে। মনে হলো তাঁর, বুঝি
হন্তারক ওঁৎ পেতে আছে আশপাশে।
বললেন কেঁদে, “চলুন পালিয়ে যাই;
কামাল জামাল হাসিনা রেহানা আর
রাসেলকে নিয়ে চলে যাই দূর দেশে;
রাষ্ট্রশাসনে আমার কাজ নেই আর।
চলুন পালিয়ে যাই, হাসিনার বাপ!”

স্ত্রীর কা- দেখে ফেটে পড়লেন অট্ট-
হাসিতে বঙ্গের অধিপতি। বললেন,
“রেনু, তুমিই না জুগিয়ে এসেছো শক্তি-
সাহস আমাকে সারাটা জীবন; ঠেলে
দিয়েছো আমাকে তুমিই না হাসিমুখে
বাংলার মুক্তিসংগ্রামে; কই, সেই
ভয়াবহ পঁচিশে মার্চের কালোরাত্রি
আসার পূর্বে তো এতটা ভড়কে যাওনি
তুমি; মহাযুদ্ধের আভাস পেয়েও তো
পর্বতের মতো অবিচল হয়ে ছিলে;
আজ তো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার
একচ্ছত্র অধিপতি তোমার মুজিব;
তবু কেন ভয়ে এত কুঁকড়ে যাচ্ছো তুমি-
এই ভয় তোমাকে কি মানায়, হে রেনু?”

আর্দ্রস্বরে বললেন বঙ্গমাতা, “ভয়,
শুধু ভয় রাত্রিদিন আমাকে সাপের
মতো খালি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ধরে। আমি
খুব ভয়ে ভয়ে থাকি সারাক্ষণ। সেই
দুর্বার সাহস আসে না হৃদয়ে আর।
তখন প্রচ- শক্তি ছিলো মনে; মনে
হতো, কুমিরের মুখে পড়লেও আপনি
ফিরে আসবেন ঠিকঠিকই নিরাপদে
আমার নিকট। আজ শুধু ভয় করে;
সত্যি বলতে কি, আপনি রাষ্ট্রের কাজে
যতক্ষণ বাইরে থাকেন, আল্লাহ আল্লাহ
করতে থাকি আমি; ঘরে না ফেরা পর্যন্ত
টেনশন কাটে না আমার। আগে মনে
হতো, সকলেই আপনার বন্ধু; আজ
মনে হয়, চারদিকে খালি দুশমন।
বলে না আমার মন ভালো কিছুতেই-”
বলে হাউমাউ করে উঠলেন কেঁদে
বঙ্গমাতা।

‘কী হয়েছে’ বলে ছুটে এলো
হাসিনা-রেহানা একসাথে। অপ্রস্তুত
মহানেতা। সামলিয়ে নিয়ে, বললেন
তবু হেসে, “তোমার মা খালি টেনশন
করে-আমার কী হবে আর তোমাদের
কী হবে-এসব ছাইভস্ম নিয়ে রোজ!
তা, হাসিনা, তোমার তো জার্মানি যাওয়ার
হয়ে এলো সময়-প্রস্তুতিপর্ব শেষ?”

আঁচলে দুচোখ মুছে বলে উঠলেন
বঙ্গমাতা ঝাঁঝালো কণ্ঠে, “এ বাড়ি ছেড়ে
সবাই যেখানে খুশি চলে যাক, আমি
একা একা শ্মশান চৌকি দি।” বলে তিনি
বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। পাছ পাছ
ছুটে গেলেন রেহেনা। পিতার মুখের
দিকে চেয়ে রইলেন অপলক শেখ
হাসিনা পরম কৌতূহলে। বললেন
পিতাশ্রেষ্ঠ, “ইদানীং তোমার মা যেন
ভেঙে পড়ছে মনের দিক থেকে। ছোট-
খাটো বিষয় নিয়েও টেনশন করছে।
তুমি জার্মাানিতে যাচ্ছো। রেহেনাও যাচ্ছে
সাথে। এসব তোমার মাকে বিচলিত
করে তুলছে। অনর্থক টেনশন। তবু
মার মন তো। তোমারও এরকমই হবে
একদিন। তবে যেখানেই থাকো, মনে
রেখো, তুমি মুজিবের মেয়ে, কাপুরুষ
ছিলো না তোমার পিতা, ঘাড় উঁচু করে
বীরঙ্গনা হয়ে বেড়াবে এ পৃথিবীতে।”

বললো দুহিতা তাঁর, শান্তস্বরে, “বাবা,
জার্মানিতে যাই, দিচ্ছেনা আমার মনও
সায় কিছুতেই। আপনি বললে যেতে,
যাবো; নইলে থেকেই যাবো এইবার;
যাবো না কোথাও আপাতত।” বললেন
বঙ্গবন্ধু শুনে, “ আমারও কি মন চায়
তোমাকে ছাড়তে, মাগো? তবু তুমি যাও;
থেকে আসো কিছু দিন ওয়াজেদ মিয়ার
সাথে। তারপরই না হয় ফিরে এসো
সব। ফিরে এসে বাংলাদেশ গড়ার
মহাসংগ্রামে নিয়োজিত রেখো তুমি
নিজেকেও। কত না স্বপ্ন আমার, হাসু,
এ দেশকে নিয়ে। আমি যদি না-ও থাকি,
সোনার বাংলাদেশ নিয়ে ছুটে যেও
উন্নতির চরম শিখরে; পৃথিবীকে
দেখিয়ে দিও-হ্যা, আমরাও পারি; পারি
আমরাও বাড়িয়ে দিতে সাহায্যের হাত
বিশ্বের দুর্দিনে।”

“এমন অশুভ কথা
কবেন না, পিতা, মুখে। আপনি না থাকলে
কী হবে বলুন এদেশের গতি! জাতি,
দেশ এবং আমরা কী নিয়ে থাকবো
আপনি না থাকলে! ” বলে উঠলেন কেঁদে
দুলালী হাসিনা হুঁ-হুঁ করে। এক নদী
জল ঢেউ খেলে গেল মহান নেতার
ব্যথিত দুচোখে। কে জানতো, এই যাওয়া
টেনে দেবে অনন্ত বিচ্ছেদ জনক ও
আত্মজার মাঝখানে! হায়, কে জানতো
ফিরে এসে দেখতে আর পারবে না প্রিয়
জনকের মুখ তাঁর, কোনোদিন; ধু-ধু
গোরস্থান হয়ে যাবে বিশাল মানুষ,
বাংলার হিমালয়, বিস্ময় বিশ্বের,
শেখ মুজিবুর রহমান, কে জানতো!

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘সংকট পর্ব’; নাম ‘দশম সর্গ’।

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

নবম সর্গ

রাওয়ালপিন্ডি থেকে পৌঁছলেন তিনি
হিথ্রো বিমানবন্দরে। এডোয়ার্ড হিথ,
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, জানালেন ঊষ্ণ
অভ্যর্থনা। বাংলার নেতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবকে নিয়ে পৌঁছোলো যখন
১০ ডাউনিং স্ট্রিটে, দিলেন নিজের
হাতে খুলে গাড়ির দরোজা তাঁর; হায়,
যার পদতলে সভয়ে নুয়ায়েছিল
শির সমগ্র পৃথিবী একদিন; আজও
যে সদম্ভে বেড়ায় সিংহের মতো সারা
বিশ্বে, পরাশক্তি অন্যতম, জাতিসংঘে
স্থায়ী পদাধিকারী, ভেটোর নটরাজ;
তারই প্রধানমন্ত্রী স্বহস্তে দিলো খুলে
গাড়ির দরোজা তাঁর- বিস্ময়ে মুজিব
হারিয়ে ফ্যালেন ভাষা; নিরব ভাষায়
বলে যান যেন হিথ, ‘হে মহান নেতা,
ইংল্যান্ডবাসীর পক্ষ থেকে এ সম্মান
স্বাধীন বাংলার মহানায়কের প্রতি।’
সঙ্গে কামাল হোসেন; তিনিও নয়টি
মাস ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী;
তাঁর চোখও ছানাবড়া প্রাণের নেতার
এ হেন সম্মানে। দেখতে এক নজর
স্বাধীনতার জাদুকর শেখ মুজিবকে,
পড়েছে হুমড়ি খেয়ে গোটা ইউরোপ;
তুলতেছে কেউ ছবি, বলতেছে কেউ
কথা, যে-ছবি যে-কথা মুহূর্তে ছড়িয়ে
পড়ছে সারা বিশ্বে। মহানায়ক মুজিব
ঘোরে ফেরে মানুষের মুখে মুখে এক
প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৃথিবীর, যেন
বাতাসের আগে আগে কস্তুরির ঘ্রাণ।

আইঢাই করে তাঁর বুক, বাংলার
মুখ কখন দেখতে পাবে! কত হলো
দেখা, কত হলো ঘোরা, পড়ে না বাংলার
মতো কিছু আর দুই চোখে। কোন্ দেশ,
আছে সে কোথায়, সুন্দর, বাংলার চেয়ে?
জননীর চেয়ে হয় শ্রেষ্ঠ কোন্ নারী?
সেরা কোন্ ভূমি জন্মভূমির অধিক?
ভাবেন ব্যাকুল হয়ে তিনি। স্বদেশের
কথা ভেবে চক্ষু তাঁর ভরে যায় জলে।
যেভাবে ঘুমন্ত শিশু ঘুম ভেঙে গেলে
খোঁজে তার মাকে, সেইভাবে খোঁজে তাঁর
চক্ষু দুটি, চারদিকে, কেবলি বাংলাকে।
সয় না যে তর, দেখবেন প্রাণ ভরে
প্রিয় তাঁর বাংলার মুখ একবার;
তবু তিনি বহু ভেবে নিলেন সিদ্ধান্ত,
যাবেন দিল্লিতে আগে, তারপর তাঁর
প্রাণের বাংলায়। অস্ত্র দিয়ে, সৈন্য দিয়ে,
খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে কঠিন দুর্দিনে
যে-সাহায্য করেছে ভারত, তার কথা
পারবে না কোনোদিন ভুলতে বাঙালী।
আর তাঁর মুক্তিহেতু ভারতসম্রাজ্ঞী
শ্রীমতি ইন্দিরা করেছেন যে-লড়াই
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পৃথিবীর দ্বারে-
দ্বারে, করবেন শোধ সে-ঋণ কী দিয়ে
এ-জীবনে! সাত কোটি বাঙালীর পক্ষ
থেকে, জানাতে দিল্লিকে চির-কৃতজ্ঞতা,
বাঙালীর প্রতিনিধি তিনি, সশরীরে
যাবেন ভারত সংক্ষিপ্ত সফরে। দশ
জানুয়ারি, সাল ঊনিশ শ বাহাত্তর,
সোমবার ভোর বেলা বৃটিশ বিমান
রয়্যাল ইয়ার ফোর্সে দিলেন উড়াল
বঙ্গের সম্রাট মুজিবুর রহমান
নয়াদিল্লির উদ্দেশে। ভারতাধিপতি
ভি ভি গিরি আর শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী
জানালেন তাঁকে রাজকীয় সংবর্ধনা।
দেওয়া হলো তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে
গার্ড অব অনার রাষ্ট্রীয় মর্য়াদায়।
সৃষ্টি হলো এক আবেগঘন মুহূর্ত
মহামিলনের, ভারত ও বাংলার;
মহাকাল গেল যেন থেমে, অনন্তের
মাঝে আছড়ে পড়লো দিল্লির সময়
মহানায়কের আগমনে। ইন্দিরার
স্মিতানন হয়ে উঠলো স্বর্গের বাগান;
মুজিবের কণ্ঠ আর ইন্দিরার হাসি
মাতালো জগত এক মহামায়াজালে।

সংবর্ধনা সভায় দাঁড়ালেন উঠে
যেন হিমালয়, সহাস্য বদনে। দীপ্ত
শ্লোগান ও করতালি দিয়ে হৃদয়ের
উচ্ছ্বাস জানালো ভারতবাসী। উল্লাসে
পড়েছে সবাই ফেটে মহানায়কের
আকস্মিক আগমনে। খুললেন তিনি
মুখ এই বলে: “প্রাইম মিনিস্টার
ইন্দিরা গান্ধী, লেডিস এন্ড জেন্টলমেন-”;
বলতে না বলতেই জুড়লো চীৎকার
উন্মত্ত জনতা “বাংলায় বলুন” বলে।
মুজিব মানেই তো সাতই মার্চের সেই
অগ্নিবর্ষী অমর বক্তৃতা, কে শোনেনি
সারা বিশ্বে? মুজিব মানেই বাংলা ভাষা,
অমর কাব্য হয়ে যা বাতাসে ছড়ায়
অরফিয়ুসের সুর; মুজিব মানেই
একটি গানের পাখি, যার ভাষা সব
ভাষার মানুষ বুঝে ফ্যালে একভাবে;
সে-মুজিব যদি ইংলিশে কথা কয়,
মুজিব তাহলে থাকে না মুজিব আর,
যেমন কোকিল মানুষের গান গেলে
থাকে না কোকিল। কী বলে ভারতবাসী!
হিন্দিভাষী দিল্লির মানুষ কী আবদার
জানায় এভাবে “বাংলায় বলুন” বলে!
অবাক মুজিব হাসেন বিস্ময়ে। শেষ-
মেশ উৎফুল্ল জনতার চাপে আর
ভারতসম্রাজ্ঞী ইন্দিরার অনুরোধে
মহামতি মুজিব স্বভাবসিদ্ধ তাঁর
বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলেন বাংলায়:

“আমার ভাই ও বোনেরা, আপনাদের
প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার,
সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ
যে-সাহায্য এবং সহানুভূতি আমার
দুখী মানুষকে দেখিয়েছে, কোনোদিন
বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না।
ব্যক্তিগতভাবে, আপনারা জানেন, আমি
পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার সেলের
মধ্যে বন্দী ছিলাম দুদিন আগেও।
শ্রীমতি গান্ধী আমার জন্য দুনিয়ার
এমন জায়গা নাই যেখানে তিনি চেষ্টা
করেন নাই আমাকে রক্ষা করার জন্য।
আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।
আমার প্রায় সাত কোটি মানুষ তাঁর
কাছে এবং তাঁর সরকারের কাছে
কৃতজ্ঞ। আমার জনসাধারণ ভারত-
বর্ষের জনসাধারণের কাছে কৃতজ্ঞ।
আর যেভাবে এক কোটি লোকের
খাওয়ার বন্দোবস্ত ও জায়গার
বন্দোবস্ত আপনারা করেছেন, আমি
জানি ভারতবর্ষের মানুষও দুঃখে
আছে সেখানে, তারাও কষ্ট পাচ্ছে,
তাদেরও অভাব-অভিযোগ আছে,
তা থাকতেও তারা সর্বস্ব দিয়েছে
আমার লোকদের সাহায্য করার জন্য,
চিরদিন আমরা তা ভুলতে পারবো না।
আপনারা জানেন বাংলাদেশ শেষ
হয়ে গেছে। আমি আশা করি, দুনিয়ার
শান্তিপ্রিয় গণতাস্ত্রিক যে-মানুষ
আছে, তারা এগিয়ে আসবে আমার
মানুষকে সাহায্য করার জন্য। আমি
বিশ্বাস করি সেকুলারিজমে, আমি বিশ্বাস
করি গণতন্ত্রে, আমি বিশ্বাস করি
ফেডারালিজমে। আমাকে প্রশ্ন করা
হয় শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে
আপনার এত মিল কেন? আমি বলি,
এটা আদর্শের মিল, এটা নীতির মিল,
এটা মনুষ্যত্বের মিল, এটা বিশ্বশান্তির
মিল।” হয়ে উঠলো মুখর মুহুর্মুহু
করতালিতে দিল্লির ময়দান; মুখে-
মুখে উঠলো ফুটে যেন কৃষ্ণচূড়া লাল,
প্রেমের সুবাসে। হৃদয়ে রচিত হলো
অনশ্বর মধুস্মৃতি। মহামিলনের
পুষ্প-সাঁকো বেঁধে দিলো ভারতের সাথে
স্বাধীন বাংলাকে। “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ!”
“শেখ মুজিব জিন্দাবাদ!” “বাংলাদেশ
ও ভারতমৈত্রী জিন্দাবাদ!” বলে বলে
মাতালো বাতাস ইন্দিরার দিল্লিবাসী,
বাংলার নেতা দেখলো তা মুগ্ধচোখে।

আসতে লাগলো ঘনিয়ে সময় ঘরে
ফিরবার। নয় মাস পর, দুগ্ধ-শিশু
যেন, আসতেছে ফিরে জননীর কোলে!
ভীষণ উতলা মন, করে ছটফট
খাঁচার বিহঙ্গ যেন নীলাকাশ দেখে।
তিনি আসবেন বলে সমস্ত বাঙালী
মেলে আছে চোখ পশ্চিম আকাশে; উড়ে
আসবেন তিনি আলোর ডানায় এই
বঙ্গে; ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে বুঝি
যায় এইবার, এইবার বুঝি বন্ধ হয়ে
যায় দম, দেখা বুঝি তাঁর জুটলো না
আর এ কপালে, যাঁর ডাকে সবকিছু
ফেলে ছুটে গেছে রণাঙ্গনে সব আর
মৃত্যুপণ করেছে লড়াই! হায় নেতা,
প্রিয় নেতা, প্রাণের মুজিবভাই, দ্যাখো
তোমার সাধের স্বাধীনতা এসে গেছে,
তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ
হয়েছে স্বাধীন, কেমন পত্পত্ করে
উড়ছে আকাশে ত্রিশ লক্ষ জীবনের
বিনিময়ে অর্জিত পতাকা, দেখে যাও!
“জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!” বলে থেকে-
থেকে করছে চীৎকার অতিষ্ঠ জনতা।

হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে তাজউদ্দিন,
সৈয়দ নজরুল, ক্যাপ্টেন মনসুর
আলী অগণিত জনতার সাথে; তীব্র
উৎকণ্ঠার সাথে গুনছেন প্রহর
প্রতীক্ষার: তিনি আসবেন, আসবেন
তিনি, আসবেনই। নয় মাস ধরে চেয়ে
আছে পথ গোটা জাতি: তিনি আসবেন,
স্বপ্নের স্বাধীনতার মতো আসবেন
ফিরে এই বাংলায় চিরোন্নত শির,
যেভাবে ভাটার শেষে কলকল রবে
ফিরে আসে জোয়ারের পানি, আর আসে
প্রচন্ড শীতের শেষে ফুলের বসন্ত।

অবশেষে আসলেন তিনি। ভাসলেন
দুচোখের জলে, পরম শান্তিতে। কত
সুখ তোমার মুখদর্শনে, মাতা; কত
তৃপ্তি তোমার ভাষায়! ফিরেছে মুজিব,
সাতকোটি বাঙালীর দুচোখের মণি,
মুক্তির নায়ক; তাঁকে ঘিরে মেতে ওঠে
বিজয়ী বাঙালী মহোল্লাসে; নাচে তারা,
যেন মেঘনার ঢেউ; হাসে, যেন মাঘি-
পূর্ণিমার চাঁদ; আর কাঁদে, যেন কত-
কাল পর ফিরে পাওয়া পুত্রের জনক
ও জননী; নাচে আর হাসে আর কাঁদে
একসাথে গোটা জাতি স্বাধীনতার
স্থপতির আবির্ভাবে। এই সেই রেস-
কোর্স ময়দান, আজ থেকে নয় মাস
আগে, তারিখ সাতই মার্চ, উঠেছিল
কেঁপে থরথর বজ্রের হুঙ্কারে; সেই
প্রলয় হুঙ্কার দিয়েছে দুহাতে এনে
সতের শ সাতান্নোয় হারিয়ে হাওয়া
বাংলার স্বাধীনতা, গুঁড়িয়ে ধুলায়
ইয়াহিয়ার মসনদ। এই সেই অগ্নি-
গর্ভা ময়দান, যেখানে সাতই মার্চে
জুটেছিল যত সূর্য-সন্তান বাংলার,
বক্ষে নিয়ে স্বাধীনতার দীপ্ত শপথ।
তাঁদের ক’জন আজ এই ময়দানে,
বিজয়মেলায়? কত যে সোনার ছেলে
ফিরবে না আর, গিয়েছে হারিয়ে তারা
চিরতরে, রণাঙ্গনে! কত মার বুক
করতেছে খাঁ খাঁ! হায়, কত যে কৃষক
কৃষিকাজ ভুলে, তুলে নিয়েছিল কাঁধে
অস্ত্র; তারা আর ফিরবে না কোনোদিন!
স্বদেশের স্বাধীনতা খুঁজতে গিয়ে, কত
বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া যুবক হয়ে
গেল নিরুদ্দেশ, তারা আর কোনোদিন
জমাবে না আড্ডা মধুর কেন্টিনে! হায়,
কত লোক, কত নারী- এই বাংলার
হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ- ত্রিশ
লক্ষ নিরীহ বাঙালী হয়েছে শহীদ
হানাদারদের হাতে! সেই কথা মনে
করে, সমবেত লক্ষ লক্ষ জনতার
সামনে, দিলেন দুচোখের পানি ছেড়ে
মহামানব, মহানায়ক যিনি মহা-
যুদ্ধের, বঙ্গের বন্ধু, শেখ মুজিবুর
রহমান। ‘জয় বাংলা!’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু!’
শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হলো ফের
রেসকোর্স ময়দান। তিনি বললেন:

“আমার বাংলাদেশের ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক
বুদ্ধিজীবী-সেপাই-পুলিশ-জনগণকে
হিন্দু-মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে।
তাঁদের আত্মার মঙ্গল কামনা করে
এবং তাদের ’পরে শ্রদ্ধা নিবেদন
করে আমি আপনাদের কাছে কয়েক
কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ
আজ স্বাধীন হয়েছে; আমার জীবনের
সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে; আমার বাংলার
মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ
বক্তৃতা করতে পারবো না। বাংলার
ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক,
বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী
যেভাবে সংগ্রাম করেছে: আমি এখানে
বন্দী ছিলাম, ফাঁসির কাষ্ঠে যাবার জন্য
প্রস্তুত ছিলাম; কিন্তু আমি জানতাম
আমার বাঙালীকে কেউ দমায়ে রাখতে
পারবে না। আমার বাংলার মানুষকে
কেউ দমায়ে রাখতে পারবে না। প্রায়
তিরিশ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলে দেয়া
হয়েছে বাংলার। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও
এবং প্রথম মহাযুদ্ধেও এত লোক, এত
সাধারণ নাগরিক মৃত্যুবরণ করে নাই,
শহীদ হয় নাই, যারা আমার এই
স্বাধীন বাংলাদেশে হয়েছে।

“আমি জানতাম না আপনাদের কাছে
আমি ফিরে আসবো। আমি খালি
একটা কথা বলেছিলাম: তোমরা যদি
আমাকে মেরে ফেলে দাও, আমার
আপত্তি নাই ; মৃত্যুর পরে আমার
লাশটা আমার বাঙালীর কাছে দিয়ে
দিও-এই একটা অনুরোধ তোমাদের
কাছে আমার রইলো।

“তবে বলে রাখা উচিত, বাংলাদেশ
স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; বাংলাদেশ
স্বাধীন থাকবে; বাংলাদেশকে কেউ
দমাতে পারবে না।

“কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন:
‘সাতকোটি বাঙালীরে, হে বঙ্গজননী,
রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।’
কবিগুরু, মিথ্যাকথা প্রমাণ হয়ে
গেছে, আমার বাঙালী আজ মানুষ।

“জানতাম না আমার ফাঁসির হুকুম
হয়ে গেছে। আমার সেলের পাশে
আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল।
আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম:
আমি বাঙালী, আমি মানুষ, আমি
মুসলমান-একবার মরে, দুইবার
মরে না। আমি বলেছিলাম: আমার
মৃত্যু আজ থাকে যদি, আমি হাসতে
হাসতে যাবো, আমার বাঙালী জাতকে
অপমানিত করে যবো না, তোমাদের
কাছে ক্ষমা চাইবো না, এবং যাবার
সময় বলে যাবো-‘জয় বাংলা! স্বাধীন
বাংলা! বাঙালী আমার জাতি, বাংলা
আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার
স্থান।’ ”

এ যেন বক্তৃতা নয়, অবিনাশী কাব্য
কোনো মহান কবির। স্বাধীনতার যে-
মহাকবি বজ্রকণ্ঠে দিয়েছিল ডাক
যুদ্ধের, তারিখ সাতই মার্চ, রেসকোর্স
ময়দানে, আজ দশ জানুয়ারি সেই
পুণ্য ময়দানে তাঁর কণ্ঠ দিয়ে ঝরে
বিজয়ের কান্না, অজর অমিয় বাণী।
মহাসুখে ফিরলো মানুষজন ঘরে
স্বদেশ গড়ার ব্রত নিয়ে; বুকে তৃপ্তি,
চোখে সুখজল, মুখে বেহেস্তের হাসি;
বঙ্গবন্ধু, মহান মুজিব, পরাধীনতার
জাল ছিঁড়ে দেয়া প্রাণপ্রিয় জাদুকর,
ফিরেছে তাদের মাঝে-এর চেয়ে বড়
কী পাওয়ার আছে সাত কোটি বাঙালীর!

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পর্ব’; নাম ‘নবম সর্গ’।

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

অষ্টম সর্গ

যেন ফের সীতাকে রাবণ, নিয়ে গেছে
কুক্ষণে, অপহরণ করে! বিশ্বময়
পড়ে গেছে শোরগোল। রাষ্টনায়কেরা,
পূর্ব ও পশ্চিমে, দিচ্ছেন নিন্দাসূচক
বিবৃতি অনবরত। ভারতসম্রাজ্ঞী
ইন্দিরা বিশ্বের দরবারে বারবার
জানাচ্ছেন দাবি: দিতে হবে অবিলম্বে
মুক্তি এ মহানেতার। ছুটছেন তিনি
ক্লান্তিহীন, মুজিবের মুক্তির তদবিরে
রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে। জানেন ভারতনেত্রী,
দূরদ্রষ্টা তিনি, পন্ডিত জহরলাল
নেহেরুর যোগ্য কন্যা, ধীমান বিদূষী-
বাংলা মানে শেখ মুজিবুর রহমান;
মুজিবকে ছাড়া, স্বাধীন বাংলাদেশ
হয়ে যাবে অর্থহীন; যেমন কান্ডারি
ছাড়া নৌকা অথৈ গাঙে। অনর্গল তিনি
দিচ্ছেন বিবৃতি মিডিয়ায়: কারাগারে
যেন করা হয় এ নেতার নিরাপত্তা
নিশ্চিত; হবে না বরদাস্ত করা, যদি
মুজিবের কিছু হয়; মুজিবের কিছু
হলে, বসে থাকবে না ভারত; বিশ্বের
সব দেশ সাথে নিয়ে, দেয়া হবে দাঁত-
ভাঙা জবাব। ওদিকে অন্যতম পরা-
শক্তি সোভিয়েত ইঊনিয়ন; সোভিয়েত-
প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পডগর্নি, রুদ্র
মূর্তি তিনি ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞে, পাঠালেন
অগ্নি-বার্তা ইয়াহিয়ার উদ্দেশে: সব
সমস্যার সমাধান হতে হবে রাজ-
নৈতিকভাবে, গণহত্যার মধ্য দিয়ে
নয়। কপালে পড়লো ভাঁজ প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়ার। কেবল যুক্তরাষ্ট্র-চীন
দিয়ে যাচ্ছে তাকে অন্ধ-সমর্থন, শক্তি,
সাহস। গায়ে না শক্তি পায় পালোয়ান,
না পায় অন্তরে যদি বল! কোন্ কালে
জিতেছে অন্যায় চিরতরে, পরাজিত
করে জ্বলন্ত সত্যকে? আজ যেন সত্য-
মিথ্যার লড়াই বেঁধে গেছে পাকিস্তানে;
কাঁপে ইয়াহিয়ার আত্মা আবু জেহেলের
মতো বদরপ্রান্তরে। পঁশিচে মার্চের
রাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার
পর, হয়ে উঠলো অপারেশন সার্চ-
লাইটে, এক রাতেই, বীভৎস বিধ্বস্ত
নগরী ঢাকা; এ যেন জ্যান্ত মুত্যুপুরী;
অজ¯্র ক্ষতবিক্ষত লাশ, বাঙালীর,
পড়ে আছে পথেঘাটে। খুশির বন্যায়
ভাসছে ক্যান্টনমেন্ট। যত লাশ তত
খুশী শেয়াল, কুকুর, কাক আর আর্মি
সব দেশে। টিক্কা খান, বাংলার কসাই,
জানালেন মোবারকবাদ টেলিফোনে
জেনারেল রাও ফরমান আলী আর
জেনারেল খাদিম রাজাকে। কি-আনন্দ
লোক মেরে, জানে তা খাদিম রাজা, রাও
ফরমান আলী আর জেনারেল টিক্কা
খান; অর্বাচীন সংবাদকর্মীরা করে
খালি হৈ-চৈ বিশ্ব-মিডিয়ায় হত্যাযজ্ঞ
নিয়ে! দারুণ হত্যার শিল্প কোন্ দিক
দিয়ে কম লিওনার্দোর শিল্পের চেয়ে?
দেখলো না তারা চেয়ে, কসাইয়ের কাটা
কি-নিখুঁত; একচুলও ত্রুটির সন্ধান
পাবে না এ শিল্পে কেউ কোনোদিন। এক
অফিসার এসে বললো স্যালুট দিয়ে,
“স্যার, দারুণ খবর। ধরা পড়ে গেছে।
বিশাল ঈগলটাকে ধরতে পেরেছি
আমরা; কেবল ছোটগুলো গেছে উড়ে।
তাকে কি সচক্ষে দেখবেন একবার?”
গর্জে উঠলেন টিক্কা খান মহারোষে,
“আমি তার দেখতে চাইনে মুখ। মহা-
পাপিষ্ঠ সে, ইসলামের দুশমন, বেটা
মালাউন, নয় তো কাফের। পাকিস্তান
ভাঙতে চায়- কি-স্পর্ধা! মোনাফেকটার
জিহ্বা কেটে নেবো, বক্তৃতা করার সাধ
মিটাবো জন্মের তরে। দূর হও সব!
আমার সীমানা থেকে সরাও ও নোংবা
জঞ্জাল এক্ষুণি।” বলে হাঁফাতে লাগলো
টিক্কা, যেন ক্ষিপ্ত কোনো শিকারী কুকুর।

রাওয়ালপিন্ডিতে পৌঁছেই প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়া ছাব্বিশে মার্চ সন্ধ্যায় তুলে
ধরলেন জাতির সামনে, তাঁর টেলি-
ভিশনে দেওয়া বক্তৃতায়, চলমান
পরিস্থিতি; তার জন্যে দায়ী করলেন
তিনি শেখ মুজিবকে; বললেন তাঁকে,
বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী। অতঃপর
মহাক্রোধে আওয়ামীলীগকে করলেন
নিষিদ্ধ ঘোষণা। জাতির উদ্দেশে ফের
বললেন, “ধৃষ্টকে ধরে ফেলেছি আমরা;
এইবার আর সে বাঁচতে পারবে না।”

বাংলার রাখালরাজা, গণমানুষের
মুক্তিদূত শেখ মুজিবকে ততক্ষণে
নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় নির্দেশে
যমপুরী রাওয়ালপিন্ডিতে। নিয়ে, পুরে
দেওয়া হলো তাঁকে জেলের ভেতর। “ঘুঘু,
কত আর ফাঁকি দিয়ে খাবি তুই ধান;
কসাইয়ের হাতে তোর যাবে আজ জান!”
বলে ফেটে পড়লেন কদর্য হাসিতে
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। ওদিকে ভুট্টোকে
আর্মি-প্রহরায় ঢাকা শহরের মহা-
ধ্বংসযজ্ঞের উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া
হলো ঢাকা বিমান বন্দরে। করাচিতে
পৌঁছেই এ ভীরু-কাপুরুষ ছাড়লেন
স্বস্তির নিঃশ্বাস। ঘিরে ধরা সাংবাদিক-
দের উদ্দেশে বললেন, “সব প্রশংসা
আল্লাহর! পাাকিস্তান আজ নিরাপদ।
দুষ্টেরা খতম হয়ে গেছে। বেঁচে গেছে
পাকিস্তান সব ফাঁড়া থেকে। শুকরিয়া।”

দিন যত যায়, তত হয় মুখ কালো
ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর। ঢাকা থেকে শুধু
দুঃসংবাদই আসছে প্রত্যহ। দিশে-
হারা পাক-আর্মি মুক্তিবাহিনীর ক্রুর
আক্রমণে, যে-আর্মিরা কিনা পরিচিত
সারা বিশ্বে দুর্ধর্ষ, উন্নত প্রশিক্ষণ-
প্রাপ্ত সৈনিক হিসেবে। একটা মারে তো
দশটা পড়ে মারা। হায়, কে কবে ভাবতে
পেরেছিল, ভুখানাঙা বাঙালীরা দেবে
এমন পেঁদানি পাঞ্জাবি সিংহকে? যত
ভাবে, তত গোঙরায় শোকে-দুঃখে-ক্ষোভে
ইয়াহিয়া, আর পাতে ফাঁদ মনে মনে
আরো ভয়াবহ, ফাঁসাতে নাটের গুরু
শেখ মুজিবকে। মুজিবের হাতে গড়া
চার তরবারি এম মনসুর আলী,
তাজউদ্দিন আহমদ, কামারুজ্জামান
এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম
ভাঙতে লাগলো বুদ্ধি-প্রজ্ঞা-দেশপ্রেম-
কূটনীতি-কোপানলে একের পর এক
মানসিংহের তলোয়ার। যত ভাঙে,
ঈশা খাঁর বাংলা-আগ্রাসী আকবর
যেন, তত দ্যাখে সর্ষেফুল চোখে
আর করে চীৎকার বাঁচাও বাঁচাও
বলে গ্যাঁড়াকলে পড়া বৈদেশি সিংহ
বঙ্গের বাতাসে। পড়ে গেল হাহাকার-
হাহুতাশ পাকিস্তান-সৈনিক শিবিরে।
মেরেছিল এতকাল মহাসমারোহে
হাজার হাজার নিরীহ বাঙালী যারা
অকাতরে, আজ তারা মার খেয়ে মরে-
মরে ভূত হয়ে ঘোরে বাংলার যত
ষাঁড়াগাছে-বাঁশঝাড়ে। হানাদার পাক-
সেনা যত, শুনলেই সেক্টর কমান্ডার
মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর
খালেদ মোশাররফ, মেজর কে এম
শফিউল্লাহ, মেজর চিত্ত রঞ্জন
দত্ত, মেজর মীর শওকত আলী,
উইং কমান্ডার এম খাদেমুল
বাশার, মেজর নাজমুল হক,
মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর
আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর
আবুল মনজুর, মেজর এম এ
জলিল, মেজর আবু তাহের,
স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ খান
আর কাদেরিয়া বাহিনীর মহাত্রাস
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নাম, পাকা
কাঁঠালের মতো এসে যায় জ্বর সারা
গায়ে আর থরথর করে কাঁপতে থাকে
আতঙ্কে, যেন বা নেকড়ের ভয়ে কাঁপতে
থাকা মেষ। দেশে দেশে প্রাণের ঘাতক
পাক-হানাদারদের পাশবিকতা আর
বর্বরতার বিরুদ্ধে, গড়ে উঠছে জন-
মত; বিশ্ববিবেক পড়ছে ফেটে রোষে;
‘গণহত্যা বন্ধ করো!’ বলে বের হচ্ছে
বিক্ষুব্ধ মিছিল লন্ডনে-নিউইয়র্কে।
জর্জ হ্যারিসন, শ্রেষ্ঠ শিল্পী পৃথিবীর,
দাঁড়ালেন এসে বিধ্বস্ত বাংলার পাশে;
জাদুর গিটার নিয়ে হাতে, উঠলেন
গেয়ে অরফিয়ুসের কণ্ঠে-“বাংলাদেশ!
বাংলাদেশ!” কেঁপে উঠলো সপ্ত মহাদেশ
সেই সুরে। শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ-
এই দুই নাম একাকার হয়ে ঘোরে
চক্রাকারে পৃথিবীর আকাশে বাতাসে
আর মুখে মুখে মানুষের। ইয়াহিয়া
পায় টের, স্বপ্নের অখ- পাকিস্তান
তাঁর, যেন তুমুল বন্যার মুখে পড়া
বালির দুর্বল বাঁধ, যে কোনো মুহূর্তে
পড়ে যাবে ধসে। বাংলার স্বাধীনতা
কী দিয়ে ঠেকাবে, হায়, যখন দুর্বার
সিংহের বাচ্চারা ভেড়া হয়ে ভ্যা ভ্যা করে
পূর্ব-পাকিস্তানে! টিক্কা খান যায়, আসে
আবদুল মোতালিব মালিক, ধরতে
যুদ্ধের হাল কঠিন হাতে; কিন্তু হায়,
যে যায় বাঘের বনে সে-ই হয় ভেড়া,
সে-ই দেখি মাংস খাওয়া ভুলে, ভোঁতা দাঁতে
ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে যায় ঘাস। অগ্নিশর্মা
হয়ে কাঁপতে থাকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া
ক্রোধে। পায়চারি করে সারা ঘর আর
আওড়ায় মনে মনে: ‘আগা মোহাম্মদ
ইয়াহিয়া খান, পাঞ্জাবি পাঠান আমি;
ভূ-ভারত কাঁপে যার নাম শুনে থর-
থর; কী করে ডরায় সে ভীরু, নির্জীব
বাঙালীর হুংকারে? ঝুলাবো ফাঁসিতে
তোরে, রে মুজিব; তারপর তোর লাশ
খাওয়াবো কুকুর দিয়ে-বসে বসে আমি
দেখবো তা দুই চোখে। যদি হারাতেই
হয় বাংলাকে, তার আগে বাঙালীর
কেটে দেবো সব শিকড়-বাকড়-মূল
চিরতরে; বানিয়ে শ্মশান ধু-ধু, শুধু
হাড়গোড়-খুলি নিয়ে যেখানে শৃগাল
ফুর্তিতে তাদের জাতীয় সঙ্গীত গায়,
তারপরই ফিরে আসবো রাওয়ালপিন্ডিতে।’
অতঃপর তিনি বললেন কথা ফোনে
পরীক্ষিত বন্ধু পাকিস্তানের, প্রেসিডেন্ট
নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে।
যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় ঈশ্বর পৃথিবীর,
পাশে থাকে যার, তার আর কিসে ভয়!
কথা বলতে বলতে ভাবে আর করে
পুলকিত বোধ ইয়াহিয়া। কী-দুর্ধর্ষ
জটিল বুদ্ধির দুঃসাহসী মহাবীর
এ হেনরি কিসিঞ্জার, যে কিনা প্রকাশ্যে
“কুকুরী” “ডাকিনী” বলে ইন্দিরা গান্ধীর
নিয়েছিল এক হাত, আর কি-প্রাণের
কথাই না দিয়েছিল বলে মিডিয়ায়
“ইন্ডিয়ান মাত্রই বাস্টার্ড।” স্বদেশের
মহাবিপদেও ইয়াহিয়া, সেই কথা
মনে করে হেসে ওঠে সশব্দে উল্লাসে।

কে ধরে যুদ্ধের হাল হারকিউলিসের
হাতে, দেবে যে উল্টিয়ে বাংলার গণেষ
এক ফুঁয়ে; কোথা পাই যোগ্য জেনারেল,
করে দেবে স্তব্ধ চিরতরে বাঙালীর
স্বাধীনতাসংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধ-
না পায় কূলকিনারা খুঁজে ইয়াহিয়া।
অবশেষে মিললো তার খোঁজ; ভাগ্যবান
তিনি; মহাবীর; লেফটেন্যান্ট জেনারেল
আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। তাঁর
কাঁধে তুলে দিয়ে মহারণাঙ্গনের
ভার, নিশ্চিন্ত হলেন যেন ইয়াহিয়া।
তারিখ ৩ ডিসেম্বর। আক্রমণ করে
বসে পকিস্তান অতর্কিতে, ইন্ডিয়াকে।
প্রত্যুত্তরে সর্ব শক্তি নিয়ে স্থলপথে
ও আকাশপথে হামলে পড়লো ইন্ডিয়া
পূর্ব-পাকিস্তানে। তার সাথে দিলো যোগ
মহোল্লাসে মৃত্যুপণ মুক্তিবাহিনীর
সশস্ত্র যোদ্ধারা। চেঙ্গিজ খানের মহা-
বাহিনীর মতো বিনা প্রতিরোধে যৌথ-
বাহিনী দখল করতে করতে সারা দেশ,
এগিয়ে চললো ঢাকা-অভিমুখে। লড়ে
মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে নির্ভীক,
পথে পথে; লেজ গুটিয়ে পালাতে থাকে
বাঙালীর খুনে দুহাত রাঙানো ঘৃণ্য
পাকিস্তানী সৈন্যরা। এদিকে মুহুর্মুহু
বিমান হামলা করে দেছে পর্যুদস্ত
পাক-বাহিনীকে। যৌথ বাহিনীর তীব্র
আক্রমণে অবশেষে হলো কূপোকাত
ইয়াহিয়ার স্বপ্নের পূর্ব-পাকিস্তান
১৬ ডিসেম্বরে। তিরানব্বই হাজার
সৈন্য নিয়ে জেনারেল নিয়াজী করলো
আত্মসমর্পণ ভারতীয় জেনারেল
অরোরা ও বাংলার মুক্তিবাহিনীর
কাছে। ভরে গেল রেসকোর্স ময়দান
ফের ‘জয় বাংলা!’ আর ‘জয় বঙ্গবন্ধু!’
শ্লোগানে শ্লোগানে। কাঁদলো বাঙালী সুখে।

ক্রোধের অনলে দগ্ধ ইয়াহিয়া খান
বসিয়েছিলেন স্পেশাল ট্রাইবুনাল
দেশদ্রোহী মুজিবের বিচারের জন্য;
বিচারক ব্রিগেডিয়ার রহিমুদ্দিন খান।
ইয়াহিয়ার ইশারায় চললো মার্শাল
কোর্টে বিচারের নামে প্রহসন। দিলো
রায় মৃত্যুদ-ের। মেটাবে মনের ঝাল
ঝুলিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে, ভুলবে যন্ত্রণা
রাবণের শিরোচ্ছেদে প্রেসিডেন্ট ইয়া-
হিয়া, যেন লঙ্কারাজ্যআগ্রাসী শ্রীরাম।
বিশ্বজুড়ে চললো নিন্দার ঝড় এই
রায়ে; আর সাথে সাথে বিশ্বনেতৃবৃন্দ
কড়া হুঁশিয়ারি ছুঁড়ে দিলো পাকিস্তান-
সরকারের উদ্দেশে: ‘বাংলার সাত
কোটি মানুষের নেতা শেখ মুজিবকে
দেখতে চায় সারা বিশ্ব জীবিত, অক্ষত;
নইলে কঠিন খেসারত, দিতে হবে
তাকে।’ এদিকে বিক্ষোভে-প্রতিবাদে ফেটে
পড়েছে করাচি-রাওয়ালপিন্ডি; চায়
তারা ইয়াহিয়ার পদত্যাগ। ভুট্টোর
কূটচালে কূপোকাত ইয়াহিয়া। লেজ
গুটিয়ে সে পালালো জীবন নিয়ে, ধসে
পড়া পাকিস্তানের মসনদ থেকে। ধূর্ত
সিন্ধি শেয়াল, ক্ষমতালোভী জুলফিকার
আলী ভুট্টো, হাসলো গোঁফের তলে, আর
তাঁর কদর্য পশ্চাতদেশে মেরে লাথি,
বানরের মতো এক লাফে চড়ে বসলো
মসনদে। এখন ভাবনা একটাই-
কী করে বাঁচানো যায় হাজার হাজার
পরাজিত সৈন্য, মুক্তিবাহিনীর হাত
থেকে। মুজিবকে যদি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে
মারে, মারা পড়বে তাঁর বিপুল সৈনিক
পূর্ব-পাকিস্তানে; নেবে সে এমন ঝুঁকি
কী সাহসে! সুতরাং আর কোনো রাস্তা
নেই, বের হবার। অগত্যা দিতে হলো
মুক্ত করে খাঁচার পাখিকে পৃথিবীর
বিশাল আকাশে; উড়তে উড়তে পাখি
ফিরে যাবে তাঁর বনে, স্বাধীন বাংলায়।

বললেন ভুট্টো, “হে মুজিব, আপনাকে
মুক্ত করে দিলাম আমরা। আপনার
কাছে রইলো মিনতি এই, মুসলিম
ভ্রাতা হিসেবে, সম্ভব যদি হয়, যেন
সম্পর্কের ছোট্ট সুঁতো বাঁধা থাকে দূর
থেকে, ভাইয়ে ভাইয়ে, ভুলে গিয়ে সব
রেষারেষি, সমস্ত বৈরিতা।” হায়,
এতদিন পর বুঝলেন ভুট্টো, ভ্রাতা
ছিলো বাংলার মুসলিম! ভাই হয়ে
কী করে ভাইয়ের বুকে তবে মারা গেল
এত ছুরি? না জানি বাঙালী কত লাখ
হয়ে গেছে শেষ এই রণে! খালি হয়ে
গেছে কত না মায়ের কোল! ছলছল
করে ওঠে দুটি চোখ মহান নেতার,
অশ্রুজলে। ধরা গলায় বললেন তিনি,
“ভুট্টোসাহেব, আমার সাধ্যমতো চেষ্টা
করে যাবো। তবে যাওয়ার আগে বলে
যাই: আপনারা শাস্তিতে থাকেন, এটা
আমার প্রার্থনা মুসলমান হিসেবে।”

তারিখ ৮ জানুয়ারি। সাল ঊনিশ শ
বাহাত্তর। লন্ডনের উদ্দেশে উড়াল
দিলো দুরন্ত ঈগল সোনার ডানায়,
পাকিস্তান থেকে। উড়তে উড়তে পাখি
ভাবে বারবার বাংলার এ লোককথা:
“রাখে আল্লাহ, মারে কে!” পারো না ঝুলাতে
তুমি ফাঁসির কাষ্ঠে হে জল্লাদ, যদি না
ফয়সালা হয় আসমানে। খুঁড়েছিল
কবর উল্লাসে কারাপক্ষ, সমাহিত
করবে ফাঁসির পর, সেলের পাশেই।
জল্লাদ প্রস্তুত। আসলেই পরওয়ানা,
করা হবে কার্যকর তাঁর ফাসি। ভাগ্য-
গুণে আগরতলা ষড়যন্ত্র-মামলায়
সেইবার গিয়েছিল বেঁচে; এবারও যে
বেঁচে যাবে কপালের গুণে, পেরেছিল
ভাবতে কে কবে! আঙুল কামড়ায় ভুট্টো
আর করে আফসোস মসনদে বসে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘মুক্তি পর্ব’; নাম ‘অষ্টম সর্গ’।

মুজিব নামা / সায়ীদ আবুবকর

সপ্তম সর্গ

গেছেন বিচ্ছিন্ন্ হয়ে সব ধরনের
যোগাযোগ থেকে। চলছে তুমুল যুদ্ধ
পাক-আর্মিদের সাথে বাঙালীর, সারা
দেশে। যে ছিলো কৃষক মাঠে, হঠাৎ সে
ভুলে গেল কৃষিকাজ; যে ছিলো নদীতে
হাতে নিয়ে খেওলা জাল, আচমকা সেও
ভুলে গেল মাছ ধরা; যে ছিলো নিমগ্ন
পাঠে, ভুলে গেল বই পড়া সেও; আর
যে ছিলো গঞ্জের হাটে বেচাকেনা নিয়ে
ব্যস্ত খুব, সেও আকস্মিক ভুলে গেল
বেচাকেনা, যখন আর্মিরা মাঝ রাতে
তুলে নিয়ে গেছে বাংলার হৃৎপিন্ড
শেখ মুজিবকে অজ্ঞাত স্থানে। যে-দেশে
মুজিবুর রহমান নেই, মিথ্যে প্রাণ
দেহে নিয়ে অর্থহীন বেঁচে থাকা সেই
দেশে। দলে দলে লোকজন ঘরদোর
ছেড়ে তাই, ফেলে রেখে পশ্চাতে স্ত্রী-পুত্র-
পরিজন, কাঁধে তুলে নিয়ে তরবারি,
ছুটে চললো রণাঙ্গনে। আওয়ামী নেতা
এম এ হান্নান, কালুর ঘাট স্বাধীন
বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে, করলেন
পাঠ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,
তারিখ ছাব্বিশে মার্চ। তারিখ ছাব্বিশে
মার্চ, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে,
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র করলেন
পাঠ বজ্রদীপ্ত কণ্ঠে বাঙালি-মেজর
জিয়াউর রহমান, একই বেতারে।
কালুর ঘাটের সে-ঘোষণা লক্ষ লক্ষ
বাঙালীকে করলো উদ্দীপ্ত মুক্তিযুদ্ধে
আর দুচোখে তাদের ঢেলে দিলো স্বপ্ন
স্বাধীন রাষ্ট্রের। অগ্নিঝরা এ ছাব্বিশে
মার্চে প্লেনে করে নিয়ে যাওয়া হলো বঙ্গ-
বন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে রাষ্ট্রদ্রোহী
আসামী হিসেবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া
ওই দিনই করলেন নিষিদ্ধ ঘোষণা
আওয়ামী লীগকে। আওয়ামী লীগের
নেতৃবৃন্দ নিলো ঠাঁই প্রতিবেশি-রাষ্ট্র
ভারতে। সেখান থেকে গেরিলাযুদ্ধের
নিতে লাগলো প্রস্তুতি। কে কবে দেখেছে
মৃত্যু এমন; মৃত্যুর উপত্যকা যেন
ছোট্ট এই দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে;
শকুনে-শেয়ালে-কাকে পথেঘাটে-হাটে-
খানাখন্দে রাত্রিদিন, করতেছে ফুর্তি
যত্রতত্র পড়ে থাকা লাশের উপর,
সারা বাংলায়। পোষা কুকুরেরা হন্যে
হয়ে পঁচা লাশখেকো প্রাণীদের সাথে
পেতেছে সখ্যতা; বিচ্ছিন্ন পা নিয়ে, কাটা
হাত নিয়ে মানুষের, কুকুরে-কুকুরে
বেঁধে গেছে কাড়াকাড়ি। বাঙালী হওয়ার
অপরাধে কত নিরীহ মানুষ এই
বাংলার, হয়ে গেল লাশ; কত নারী
পাকিস্তানী নরপশুদের কাছে, হায়,
হারালো সতিত্ব; কত শিশু পিতৃহারা
হলো; কত মা হারালো পুত্রকে। যুদ্ধের
দাবানলে পুড়তে লাগলো দাউদাউ
শহরবন্দর গ্রামগঞ্জ। পাক-আর্মিদের
যত্রতত্র হানা, সবখানে; যাকে পায়,
মারে বুভুক্ষু বুলেটে, ঘুঘুর মতন।
গাঁয়ে গাঁয়ে গড়ে তুললো তারা, সেই সাথে,
পিস-কমিটির নামে এদেশি দোসর,
যাঁরা হানাদারদের হয়ে করতে লাগলো
গোয়েন্দাগিরি। আলবদর, আল-শামস,
রাজাকার ইত্যাকার নামে গড়ে উঠলো
কসাইবাহিনী এদেশের; জাহান্নামী
এইসব হন্তারক, বাঙালী হয়েও,
কি-মহা আক্রোশে, যেন ক্ষুধার্ত করাত,
কাটতে লাগলো গলা, মারতে লাগলো
ছুরি বাঙালীর বুকে; জন্ম-কুলাঙ্গার
এ-বঙ্গের, যেন বিভীষণ, করতে লাগলো
সহায়তা হানাদারবাহিনীকে গণ-
হত্যায়, গণধর্ষণে। একদিকে পাক-
হন্তারক, সুসজ্জিত বিপুল উন্নত
মারণাস্ত্রে; অন্যদিকে পাকিস্তানী দেশ-
প্রেম আর ভ্রান্ত ইমানের বলে বলী-
য়ান এদেশি শকুন; মাঝখানে যত
নিরীহ বাঙালী, অসহায়, দিশেহারা-
দ্বিমুখী ত্রিশূল-আক্রমণে। মরে নারী,
মরে নর, মরে শিশু; লাশের দুর্গন্ধে
উঠেছে অসহ্য হয়ে বাংলার বাতাস।
প্রাণের মায়ায় ছুটতে লাগলো তল্পি-
তল্পা নিয়ে, দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশে,
বাঙালীরা। সন্তান-সন্ততি নিয়ে বুকে,
ঠাঁই নিলো তারা খোলা আকাশের নিচে-
আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, জলপাই-
গুড়ি, কুচবিহার, চব্বিশ পরগণা,
পশ্চিম দিনাজপুর, নদীয়া, মালদা
ও কোলকাতার ফুটপাতে ফুটপাতে।
মাছে-ভাতে ছিলো যে-বাঙালী, কপালের
ফেরে সে আজ কুড়ায় পরদেশে অনু-
কম্পা; হায়, গোলা ভরা ছিলো যার ধান,
বাঙালী হওয়ার দোষে সে আজ ভিক্ষার
থালা নিয়ে ঘুরে ফেরে রাস্তায় রাস্তায়
পররাষ্ট্রে! হিন্দু হওয়ার অপরাধে
ভিটেমাটি ছেড়ে লক্ষ লক্ষ নারী-নর
হলো শরণার্থী ত্রাতারূপী ভূ-ভারতে।
এমন দুর্যোগ আসেনি কখনো নেমে
বাঙালীর ভাগ্যে, এর আগে। ‘হায়, খোদা!’
আর ‘হে ঈশ্বর!’ বলে করতে লাগলো
ফরিয়াদ বাঙালি-হিন্দু ও মুসলিম
একসাথে। তাদের এ হেন দুর্দশার
কথা কে জানাবে, হায়, তাদের নেতাকে,
যে-নেতা বঙ্গের বন্ধু, সাত কোটি বাঙা-
লীর দুচোখের মণি, আত্মার আত্মীয়!

মুজিবের নামে ছুটেছে তরুণ যুবা
লাখে লাখে, যোগ দিতে মুক্তি-বাহিনীতে;
গেরিলা ট্রেনিং চলছে পশ্চিম বঙ্গে,
কর্নেল এম এ জি ওসমানী যার
সর্বাধিনায়ক। মুজিববাহিনী, মুক্তি-
বাহিনী, গণবাহিনী, কাদের বাহিনী,
মুক্তি-ফৌজ, জেড ফোর্স, কে ফোর্স এবং
এস ফোর্স নামে মুক্তিযোদ্ধা, লাখে লাখে,
নেমে পড়লো রণাঙ্গনে, হটাতে দখল-
দার পাক-বাহিনীকে। প্রতিষ্ঠিত হলো
বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস, তারিখ ৪
এপ্রিল, কর্নেল এম এ জি ওসমানী
কমান্ডার-ইন-চিফ; চিফ অব স্টাফ:
এম এ রব; ডেপুটি চিফ অব স্টাফ:
এ কে খন্দকার। ঘুরে দাঁড়ালো বাঙালী
বিপুল শক্তিতে, শত্রুর বিরু্েদ্ধ। শেখ
মুজিবের নামে উঠলো জয়ধ্বনি দিকে-
দিকে; বাংলার বাতাসে ফের বেজে উঠলো
তূর্যনাদ-‘জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!’

মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলা; ছিলো
অখ্যাত, শোনেনি নাম যার কোনোদিন
দূরের মানুষ। কী ভাগ্যের গুণে, আহা,
হয়ে উঠলো সে রাতারাতি পুণ্যপীঠ,
জগত-বিখ্যাত! তারিখ ১০ এপ্রিল,
১৯৭১; ছুটে এলো কোলকাতা থেকে
আওয়ামী নেতৃবৃন্দ, গড়তে অস্থায়ী
বাংলাদেশ সবকার এইখানে। বৈদ্য-
নাথ তলার আম্রকাননে বসে গেল
নক্ষত্রের মেলা, দীপ্ত আলোর বাজার।
পলাশীর আম্রকাননে যে-স্বাধীনতা-
সূর্য গিয়েছিল অস্ত একদিন, সেই
সূর্য আজ ফের দুই শ বছর পর
এ কাননে হলো যে উদিত মহোল্লাসে
মহামর্যাদায়। সিরাজের লুট হয়ে
যাওয়া সোনার মুকুট, সশস্ত্র বাঙালী
আনলো ছিনিয়ে যেন দস্যুদের হাত
থেকে; দিলো পরিয়ে গলায়, অতঃপর,
শেখ মুজিবের। গঠিত হলো অস্থায়ী
সরকার যুধ্যমান বাংলায়; দেয়া
হলো নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
অস্থায়ী সরকার’, যার রাষ্ট্রপতি শেখ
মুজিবুর রহমান- বন্দী যে, পশ্চিম
পাকিস্তানে; উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ
নজরুল ইসলাম (বর্তমান ভার-
প্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি); প্রধানমন্ত্রী তাজ-
উদ্দিন আহমদ; প্রতিরক্ষামন্ত্রী
কর্নেল এম এ জি ওসমানী; অর্থ-
মন্ত্রী মনসুর আলী; পররাষ্ট্রমন্ত্রী
খন্দকার মোশতাক আহমদ (পরে
আবদুস সামাদ আজাদ; দেয়া হয়
সরিয়ে মোশতাককে; গোপন আঁতাত
তার, হয়ে যায় জানাজানি ইসলামা-
বাদের সঙ্গে; তখনই যদি, ঊনিশ শ
একাত্তরে, করা যেতো সমূলে বিনাশ
এই পাপিষ্ঠকে, পনেরো আগস্ট তবে
আসতো না বাংলায়!) কৃষক জনতা
হয়েছে হাজির হাজার হাজার; যোদ্ধা
তারা; গায়ে গেঞ্জি, লুঙ্গি পরিধানে, গামছা
শিরস্ত্র্াণ, দোনলা বন্দুক কাঁধে কাঁধে;
মুজিববাহিনী এই, হিন্দু-মুসলিম,
হয়েছে গেরিলা স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে,
বাঁচাতে মানুষ, বাংলার সাত কোটি
বাঙালী, বর্বর পাক-বাহিনীর হাত
থেকে; দুরন্ত এ মুক্তি-ফৌজ; ভয়ঙ্কর,
কেউটের মতো; একটা ছোবলে যার
ধুলায় লুটিয়ে পড়ে দৈত্য কি দানব,
চোখের পলকে; পাক-বাহিনী যা পেয়ে
গেছে টের হাড়ে হাড়ে, ইতোমধ্যে। এই
বীর-জনতার সামনে নিলেন শপথ
অস্থায়ী সরকারের কর্ণধারগণ।
শপথবাক্য তাঁদের, করালেন পাঠ
এম ইউসুফ আলী, বীরমুক্তিযোদ্ধা,
বিশ্বস্ত সৈনিক শেখ মুজিবের। কণ্ঠে-
কণ্ঠে অতঃপর বেজে উঠলো কি-মধুর,
জাতীয় সঙ্গীত-“আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালবাসি।” প্রিয় বঙ্গদেশ,
মাতা জন্মভূমি, চেয়ে দেখ ভালবাসা
আমের মুকুল হয়ে ফুটেছে সুন্দর
তোমার কাননে, ফল হয়ে যা ছড়াবে
মিষ্টতা স্বর্গীয়, দেশে দেশে। খাঁচা ভাঙা
মুক্ত পাখি যেন, ফেটে পড়লো উল্লাসে
বীর-জনতা; মাতালো এ আম্রকানন
বজ্র-স্বরে-“জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!”

বৈদ্যনাথতলা হয়ে গেল আজ থেকে
মুজিবনগর। প্রাণের নেতার নামে
করলো নামকরণ এ স্থানের, কর্ণ-
ধারগণ বাংলার। হলো বাংলার
রাজধানী মুজিবনগর। প্রকম্পিত
হলো আকাশ বাতাস মুহুর্মুহু “জয়
বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!” শ্লোগানে শ্লোগানে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘মহারণ’ পর্ব; নাম ‘সপ্তম সর্গ’।

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

ষষ্ঠ সর্গ

তারিখ পঁচিশে মার্চ। দিনের প্রথম
ভাগে বসলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া
রুদ্ধদ্বার বৈঠকে। গোপন সে-বৈঠকে
উপস্থিত তিন জেনারেল: লেফটেন্যান্ট
জেনারেল টিক্কা খান, মেজর জেনারেল
রাও ফরমান আলী এবং মেজর
জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজা।
ওপারেশন সার্চলাইটের কর্ণধার
খাদিম হোসাইন রাজা, যিনি বাংলার
কসাই কুখ্যাত টিক্কা খানের নির্দেশে
দেখালেন হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে। অতঃপর
বললেন সমুদয় পরিকল্পনার
কথা তিনি রুদ্ধশ্বাসে। শুনে সে-বৃত্তান্ত,
রইলেন টিক্কা খান চেয়ে কৌতূহলী
চোখে প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে। দেখে
মনে হলো উঠেছে খুশির চিহ্ন ফুটে
সারা মুখে। তবু তাঁকে করতে আশ্বস্ত,
বললেন টিক্কা খান মোসাহেবি স্বরে:
“বাঙালী এবার ঢোঁড়া সাপ হয়ে যাবে;
ছোবল মারার দিন তার শেষ, স্যার।”
বলে হাসলেন মরা গরু খেয়ে তৃপ্ত
কোনো শকুনের হাসি। রাও ফরমান
আলী, পদ্ম-গোখরো যেন, ধরলেন মেলে
ফণা: “আমাকে একটিবার, স্যার, দিন
অনুমতি, কেটে এনে বিশ্বাসঘাতক
শেখ মুজিবের কল্লা, দেই উপহার
আপনাকে।” নিশ্চুপ হাসেন প্রেসিডেন্ট।
কইলো খাদিম হোসাইন রাজা শুনে
শান্ত স্বরে:“হবে না এমন কিছু করা
আমাদের জন্যে হিতকর, শত্রুরাষ্ট্র
ভারত যা নেবে লুফে। আমরা তো জানি,
চলছে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। মাথা
ঠাণ্ডা রেখে, স্যার,অভ্যন্তরীণ সংকট
মিটিয়ে ফেলুন চুপচাপ। দেবেন না
মুজিবের গায়ে হাত; ভারত তা নিয়ে
হৈ চৈ তুলবে সারা বিশ্বে। উস্কে দেবে তারা
আরো জেগে ওঠা স্বাধীনতা আন্দোলন
বাংলার, এ সুযোগে। হিতে বিপরীত
হবে তাতে। মুজিবকে বরং আমরা
কারাগারে পুরে রেখে, স্লো পয়জনিং
করে মেরে যদি ফেলি, লেঠা চুকে যায়!”
“সাবাস! সাবাস!” বলে দিলেন বাহবা
জেনারেল টিক্কা খান। “চমৎকার প্রস্তাব”
বলে, প্রেসিডেন্টও জানালেন সাধুবাদ;
বললেন অতঃপর: “যা কিছু কল্যাণ-
কর, আমরা রাষ্ট্রের জন্যে করে যাবো
সবই। হবেন না বিচলিত আপনারা।
আমরা নিখুঁত ছক কেটে কেটে, খুব
সাবধানে, এগিয়ে চলেছি। সিগন্যাল
পেলেই, সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে আপনারা
ঝাঁপিয়ে পড়বেন শত্রুর উপর। শত্রু
সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত কেউ
গুটিয়ে নেবেন না হাত। ঈমানী বলে
বলীয়ান হোন। টিক্কা খানসাহেব,
আপনি প্রস্তুতি নিন। গোটা জাতি আছে
আপনার সঙ্গে। এ-খেলায় আপনাকে
জিততে হবেই। আপনার জয় হোক।
পাকিস্তান জিন্দাবাদ।” তিন জেনারেল
বলে উঠলেন সমস্বরে: “পাকিস্তান
জিন্দাবাদ।” বলে তারা ডান হাত তুলে
করলেন স্যালুট। প্রসন্ন ইয়াহিয়া।

ওদিকে সকাল থেকে আসতে লাগলো
আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের
নেতৃবৃন্দ বত্রিশ নম্বরে। বঙ্গবন্ধু
দিতে লাগলেন দিক-নির্দেশনা, কী কী
করণীয় জরুরি মুহূর্তে। মধ্যাহ্নের
পূর্বক্ষণে আসলেন কিছু পাকিস্তানি
ও বিদেশি কর্মকর্তা। দেশের বিরাজ-
মান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা করলেন
আলোচনা বাংলার নেতার সাথে। পর-
পরই এলেন বাঙালি পুলিশ-কর্মকর্তা
একজন, আবদুল আওয়াল নামে;
ডিরেক্টর পুর্ব-পাকিস্তানে আনসার
বাহিনীর। জানতে চাইলেন, ক্ষুদ্র তাঁর
বাহিনীর অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করা
যায় কিনা জেলায় জেলায় মুক্তিযুদ্ধে।
সম্মতি জানিয়ে বললেন বঙ্গবন্ধু,
“গোপনে সাক্ষাৎ করো গিয়ে ছাত্রনেতা
সিরাজুল আলম খানের সাথে। যার
কাছে যা আছে, তা নিয়ে তৈরি হয়ে থাকো;
যদি হামলা করে, চুপ করে থাকবে না,
দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে পাঠিয়ে দেবে
জাহান্নামে, দয়ামায়া করবে না কোনো ।
অনেক সয়েছি, আর নয়; পাল্টা প্রতি-
রোধ এইবার, ঘরে-বাইরে, সর্বত্র।”

কমতে লাগলো আস্তে আস্তে মানুষের
আনাগোনা। পাখিরা ঝড়ের পূর্বাভাস
পেয়ে যেন সূর্যাস্তের আগে আগে ফিরে
গেছে নিরাপদ নীড়ে। শুধু বঙ্গবন্ধু
আর প্রহরী মোর্শেদ তীর্থের কাকের
মতো বসে আছে ধানমন্ডির এ খা খা
কবরের মতো স্তব্ধ বাড়িটিতে, বুঝি
কার প্রতীক্ষায়। নামলো ভূতের পায়ে
রাত্রি। গা ছমছম করা রাত। ভয় এসে
বাঁধতে থাকলো বাসা মনের ভেতর।
অতন্দ্র মোর্শেদ গা ঝাড়া দিয়ে করতে
লাগলো হাঁটাহাঁটি বাড়ির চত্বরে। ব্যস্ত
বঙ্গবন্ধু টেলিফোন নিয়ে। বলছেন
কথা এখানে ওখানে। হঠাৎ খবর
এলো, চলে গেছে ইয়াহিয়া খান ঢাকা
ছেড়ে আজ সন্ধ্যায় পশ্চিম পাকিস্তানে
অত্যন্ত গোপনে। গণমানুষের নেতা
ঘোরতর বিপদের আশঙ্কায় হয়ে
উঠলেন বিচলিত। গৃধ্রেরা নিশ্চয়
ভাগাড় বানাতে চায় সোনার বাংলাকে!
কাউকে না বলে, না তাঁকে, না মিডিয়াকে,
কী কারণে লেজ তুলে পালালো পশ্চিমা
শেয়াল, ভাবতে লাগলেন তিনি; যত
ভাবেন, শিউরে ওঠে গা অজানা কোনো
ষড়যন্ত্র কিংবা বিপদের আশঙ্কায়।
রাত্রি দশটা তখন; এলেন ছাত্রনেতা
তবিবর রহমান। করজোড়ে তিনি
করলেন অনুনয়: “প্রিয় নেতা, যান
সত্বর আপনি বত্রিশ নম্বর ছেড়ে।
এসে পড়তে পারে পাক-আর্মিরা যে-কোনো
মুহূর্তে। এখানে এই অবস্থায় পেলে,
মেরে ফেলবে ওরা আপনাকে।” বললেন
হেসে বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালীর নেতা,
প্রত্যুত্তরে: “বাংলার সমস্ত মানুষ
মেরে ফেলবে ওরা আমাকে না পেলে। যদি
আমাকে না পায়, ঢাকা নগরীকে ওরা
ধ্বংস করে দেবে পুরো চোখের পলকে।”
নিজের জীবন নিয়ে মাথাব্যথা কোনো
নেই তাঁর; বাঙালী ও বাংলাকে
নিয়ে তাঁর শয়নে-স্বপনে-জাগরণে
সার্বক্ষণিক ভাবনা। কে আর বেসেছে
ভালো তাঁর চেয়ে অধিক বাংলাকে, এই
বাংলায়? এরপর তাজউদ্দিন এলেন;
এলেন কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার
আমিরুল ইসলাম। তাজউদ্দিনের
কাছে জানতে চাইলেন দেশবিদেশের
খবরাখবর। কখন কী করতে হবে,
কোনটার পর কোনটা, ঠিকঠাক আছে
কিনা সবকিছু, নিলেন তা শুনে। কথা
হলো আরো কত। রটেছে খবর, আজ
রাত্রির মধ্যেই হতে পারে গ্রেফতার
করা তাঁকে। গ্রেফতার হওয়ার আগে
কী কী কাজ ঝটপট করে ফেলতে হবে
তাঁকে, তা সব নিয়েও কথাবার্তা হলো
নেতাদের সাথে। প্রাণের অধিক প্রিয়
নেতার দুহাত ধরে কেঁদে উঠলেন
তাজউদ্দিন শিশুর মতো ভগ্নকণ্ঠে:
“হায় বঙ্গবন্ধু, জীবনমৃত্যুর সঙ্গী
আমাদের, সাত কোটি বাঙালীর মহা-
নেতা, যদি বর্বরেরা করে ফ্যালে কিছু
আপনার! প্রিয় নেতা, আপনিই যদি
না থাকলেন আমাদের মাঝে, কী হবে এ
সংগ্রাম দিয়ে, বাংলার স্বাধীনতা দিয়ে!”
সহযোদ্ধা তাজউদ্দিনের কণ্ঠ ধরে
ফুঁপিয়ে উঠলেন তিনি: “জানি, বড্ড বেশি
ভালবাসো তোমরা আমাকে, তোমাদের
বঙ্গের বন্ধুকে। তাই যদি হয়, তবে
শুনে রাখো আমার নির্দেশ-ফিরে যাও
সব যার যার নির্ধারিত ঠিকানায়,
গিয়ে আপ্রাণ ঝাঁপিয়ে পড় মহাযুদ্ধে।
প্রিয় ভায়েরা আমার, তোমাদের হাতে
আমি আজ এনে দিয়ে গেলাম স্বপ্নের
স্বাধীনতা, হারিয়ে যায় না যেন আর।”
এই বলে তিনি ঠেলে দিলেন সস্নেহে,
বহু কষ্টে, প্রাণের শিষ্যদেরকে। তাঁরা
নিরুপায়, ফিরে চলে অশ্রুসিক্ত চোখে
অজানা গস্তব্যে, ভাষাহীন। ফিরে যায়
সকলেই, শুধু তিনি রয়ে যান হাতে
মৃত্যুর পেয়ালা নিয়ে, বুকে নিয়ে সীমা-
হীন দুঃসাহস, জন্মদুখিনী বাংলার
শিয়রে একাকী, তার স্বাধীনতা আর
সার্বভৌমত্বের প্রাণান্তিক প্রহরায়।

ক্রিং ক্রিং বেজে উঠলো টেলিফোন। তিনি
ধরলেন তুলে কানে। শুনছেন কারো
ভীত কণ্ঠস্বর: “করেছে হামলা আর্মি
রাজারবাগ পুলিশস্টেশন, পিলখানা
পূর্ব-পাকিস্তান বাইফেলস সদর
দফতর আর ঢাকা ভার্সিটিতে। স্যার,
শেষ করে ফেলছে সব। সামনে পাচ্ছে যাকে,
তাকেই করছে গুলি। আর খুঁজে খুঁজে বের
করছে প্রতিটা বাঙালীকে। কোনো চিহ্ন
রাখছে না বাঙালীর।” “হায়, খোদা!” বলে
রইলেন চোখ বুজে বঙ্গের সম্রাট।

ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমেছে রাস্তায়,
অলিতে-গলিতে, ঢাকা শহরের! যেন
রূপকথার পৃষ্ঠা ফুঁড়ে উঠেছে হঠাৎ
কোনো আজদাহা; আসমান ছোঁয়া ফণা
তুলে, করছে সে ফোঁসফোঁস; ভয়ে-ত্রাসে
কাঁপছে কলিজা সব প্রাণীর, মানুষ
কি পশু। ঢাকার হৃৎপিণ্ড বিষ-দাঁতে
ছিড়েখুঁড়ে ফেলছে যেন উন্মত্ত হায়েনা
কোনো, হঠাৎ এ রাতে; মহাদুর্যোগের
রাত, যেন মহাপ্রলয়ের অমানিশা
হঠাৎ এসেছে নেমে বাঙালীর ভাগ্যে।

ঘাতকেরা করেছে টার্গেট সকলের
আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শুয়ে ছিলো
শিক্ষার্থীরা হলে-হলে; কত দূর গ্রাম-
গ্রামান্তর হতে বাংলার, এসেছে তারা
উচ্চ শিক্ষা নিতে প্রাচ্যের এ অক্সফোর্ডে।
মূর্খসুর্খ দীনহীন শান্তশিষ্ট সব
কৃষকের ছেলেপুলে; বিকিয়ে সর্বস্ব,
কত স্বপ্ন নিয়ে চোখে আর বুকে কত
আশা, পাঠিয়েছে পুত্রদের, পিতাগণ
উন্নত এ জ্ঞানপীঠেÑসোনার মানুষ
হয়ে করবে জাতির সেবা, কত স্বপ্ন
সকলের! কিন্তু হায়, ঘাতক বন্দুক
হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো জ্ঞানহীন
বর্বর আর্মিরা তাদেরই উপর! দেশ-
রক্ষার তুমুল মন্ত্রে উজ্জীবিত করে
দিয়েছে লেলিয়ে তাদেরকে পাকিস্তানী
রাষ্ট্রনায়কেরা; তারা জানে, ধূর্ত তারা,
যদি কোনো জাতিকে দমিয়ে রাখতে চাও,
রাখতে চাও ক্রীতদাস করে, তবে তার
শিক্ষিত সন্তানদের হত্যা করে ফ্যালো,
ধুলায় গুঁড়িয়ে দাও যত বিদ্যাপীঠ;
জ্ঞানী হলে, তারা বলবে সাম্যের কথা,
স্বাধীনতা চাবে, চাবে দাঁড়াতে নিজের
পায়ে, নুয়াবে না মাথা কোনোদিন খাকি-
পোশাকের সামনে; অতএব নির্বিচারে
হত্যা করে ফ্যালো সব, টিকিয়ে রাখতে
চাও যদি গদি, চাও ঘুমাতে আরামে।
ঝাঁপিয়ে পড়লো তারা গভীর নিদ্রায়
মগ্ন ছাত্রদের ’পরে সেভাবে, যেভাবে
কত দিন না খাওয়া হন্যে হায়েনারা
হামলে পড়ে হরিণের ’পর। কেউ কেউ
দরজা-জানলা খুলে ছিলো শুয়ে, বাইরের
মুক্ত হাওয়া ঢুকবে ঘরে, এ আশায়। হায়,
পেলোই না তারা টেরÑহলের মেইন
গেট ভেঙে, কখন যে ঢুকেছে ঘাতক,
কারণ সবাই ততক্ষণে হয়ে গেছে
খুন, অব্যর্থ বুলেটে। হৈ-চৈ হট্টগোলে
ধড়পড় করে জেগে ওঠে কিছু ছাত্র;
হাতে প্রাণ নিয়ে ছুটতে থাকে তারা, যদি
ছুটে বাঁচা যায়! হানাদার হায়েনারা
ফেটে পড়ে বীভৎস হাসিতে, আর গুলি
করে মারতে থাকে কি-হরষে, যেন পাতি-
ঘুঘু! মারে, কাটে ও খোঁচায় বেয়োনেটে;
করে কেউ বা জবাই, যেন কুরবানির
পশু। অতঃপর বীভৎস সেইসব
লাশের উপর জোড়ে বিজয়ের নৃত্য
উল্লাসে নির্দয়আর্মি-জওয়ানেরা। রক্তে
ডুবে গেছে সব ছাত্রাবাস। ভিজে গেছে
রাতের বাতাস প্রতিরোধহীন মরে
পড়ে থাকা সব উচ্চ শিক্ষিত বাঙালি-
যুবকের স্তব্ধ ক্রন্দন ও দুচোখের
রক্তঅশ্রুতে। নিন্তব্ধ হৃদয় তাদের
বলে যেন কেঁদে কেঁদে: “মাগো, পারলে না
জানতে, কোন্ সে শয়তান মেরে গেছে
তোমার খোকাকে। হায়, পিতা, ঘাতকেরা
দিলো না পূরণ করতে তোমার স্বপ্ন!”

বাঙালি সেপাই যত, শুয়ে ছিলো পিল-
খানায়, ব্যারাকে; পাকিস্তানী পিশাচেরা
করলো কাপুরুষের মতো অতর্কিত
হামলা তাদের উপর। চোখের পলকে
হয়ে গেল পিলখানা বীভৎস কসাই-
খানা; শত শত সুপ্ত বাঙালি-সৈনিক
কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই, পড়লো ঢলে
অকাল মৃত্যুর হিম কোলে। মাতাপিতা-
স্ত্রী-সন্তান জানতে পারলো না ঘুণাক্ষরে,
কী ঘটেছে কপালে তাদের, এ কুক্ষণে।
হায়, কোন্ অপরাধে জীবন তাদের
করে দিলো বরবাদ ঘাতকেরা? কোন্
সেবা তারা করেনি রাষ্ট্রের? জীবনের
ঝুঁকি নিয়ে দিয়েছে পাহারা রাত্রিদিন
স্বদেশের মানচিত্র; এ মৃত্যুই বুঝি
পুরস্কার তার? কী অপরাধ তাদের?
বাঙালী হওয়াই বুঝি একমাত্র পাপ,
যার খেসারত দিতে হলো এইভাবে
বলীর পাঁঠার মতো? দেখে যাক বিশ্ব-
বিবেক নিরীহ বাঙালীর পরিণতি;
জেনে যাক বিশ্বের মানুষ অমানুষ-
দের ঘৃণ্য বর্বরতা সবুজ বাংলায়।

রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে
একসাথে চালালো তান্ডব ভয়াবহ,
পাক-আর্মিরা। বাঙালি-পুলিশের ’পর,
ডুবে ছিলো যারা গভীর নিদ্রায় নানা
স্বপ্নে, হঠাৎ দস্যুরা ছুড়তে লাগলো
গুলি তুমুল বৃষ্টির মতো। এক পলক
জেগে উঠে ঢলে পড়তে লাগলো ঘুমন্তরা
একে একে ভিজে ওঠা মৃত্যুর কাঁর্পেটে।
পঁচিশে মার্চের কালো রাত হয়ে উঠলো
টকটকে লাল পুণ্য তাদের রুধিরে।
হে স্বাধীনতার প্রথম শহীদগণ,
মরোনি তোমরা, বরং তারাই গেছে
মরে চিরতরে, সীমারের মতো যারা
নির্বিচারে করে গেছে খুন; একবার
মরে গিয়ে হয়ে গেছো অমর তোমরা
কোটি কোটি বাঙালীর হৃদয়সাম্রাজ্যে।

দুখিনী বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ যে-সস্তান
সহস্র বছরে, যাঁর বুক জুড়ে শুধু
বাঙালীর ব্যথা, এ হেন বর্বর হত্যা-
যজ্ঞে জ্বলে উঠলেন তিনি ঈশা খাঁর
মতো, যাঁর প্রলয় হুঙ্কারে কেঁপে উঠলো
মানসিংহের তরবারি। বজ্রকণ্ঠে
তিনি দিলেন ঘোষণা : “এ বার্তাই হতে
পারে শেষ বার্তা আমার। বাংলাদেশ
সম্পূর্ণ স্বাধীন আজ থেকে। বাংলার
মানুষের প্রতি জানাই আহ্বান আমি:
আপনারা যে যেখানে যে-অবস্থাতেই
থাকুন না কেন, দখলদার পাকিস্তানী
হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ান
রুখে, সর্বশক্তি দিয়ে। সংগ্রাম চালিয়ে
যান, যতক্ষণ পর্যন্ত না একজনও
পাকিস্তানী আর্মি থেকে যায় বাংলার
বুকে। জানি, আমাদের বিজয় নিশ্চিত।”
জাতির উদ্দেশ্যে এই ওয়ারলেস-বার্তা
পাঠিয়ে দিলেন তিনি অনতিবিলম্বে।
দাবানলের মতো তা ছড়িয়ে পড়লো
সারা বঙ্গে মহূর্তের মধ্যে, আর বিশ্ব-
মিডিয়ায়। ‘বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন
আজ থেকে’-এ্যাটোম বোমার মতো ভারী
এ বার্তা ঘৃতাগ্নি দিলো জ্বেলে বাঙালীর
রক্তে রক্তে, শিরায় শিরায়। সর্বোপরি,
ঘটে যাওয়া ঢাকার ঘটনা মর্মান্তিক,
ছড়িয়ে পড়লো জেলায় জেলায় আর
বিভাগে বিভাগে সমস্ত ক্যান্টনমেন্টে।
বাঙালি সৈনিক, সেপাই কি কর্মকর্তা
যত, অস্ত্রাগার ভেঙে তুলে নিলো অস্ত্র
হাতে হাতে। যশোর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম-
ক্যান্টনমেন্টে এ বার্তা পৌছার পর,
সে-রাতেই বাঙালি সৈন্যরা অবতীর্ণ
হলো প্রতিরোধযুদ্ধে পাক-সৈন্যদের
সাথে। চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশন থেকে
সম্প্রচার করা হলো বঙ্গবন্ধুর এ
স্বাধীনতার ঘোষণা। সকাল হতে না
হতেই সমস্ত জাতি জেনে গেল, শুরু
হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ; বহু প্রতীক্ষার
স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম শুরু হয়ে
গেছে শেষমেশ; জেনে গেল গোটা বিশ্ব,
পাকিস্তান থেকে অবশেষে হয়ে যাচ্ছে
বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ চিরতরে। হায়,
শুধু লাশ আর লাশ আর ছোপছোপ
রক্তের বন্যায়, মধ্য রাতের আগেই,
ভরে গেল ঢাকা, প্রাচ্যের এ তিলোত্তমা
প্রাচীন শহর! পাক-আর্মিদের রুদ্র
ধ্বংস-অভিযানের বীভৎস বার্তায়
উত্তেজিত মহান মুজিব সারা ঘরে
করতে লাগলেন পায়চারি, একা একা;
বাইরে মোর্শেদ, বিশ্ব্স্ত প্রহরী তাঁর,
কান খাড়া করে শুনতেছে থেকে থেকে
গোলাগুলির আওয়াজ গুমোট বাতাসে।

রাত্রি একটা পনেরো মিনিট। ধানমন্ডির
অন্ধকার-আকাশ হঠাৎ ভরে গেল
উৎকট উজ্জ্বল আলোয়, কোনো জ্বিন
কিংবা অগ্নিপি- যেন আসমান থেকে
এসেছে নেমে। “মোর্শেদ!” বলে বঙ্গবন্ধু
উঠলেন হেঁকে: “দেখ্ তো, কিসের আলো
আসছে কোত্থেকে।” বলে তিনি সিঁড়ি বেয়ে
গেলেন দোতলায় উঠে, দেখতে সচক্ষে
চোখ ধাঁধানো এ আলোর উৎস। এর
কয়েক মুহূর্ত পর গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে,
আতঙ্ক ছড়িয়ে চারদিকে, ঢুকে পড়লো
পাক-আর্মিরা সশব্দে, বত্রিশ নম্বরে।
“হ্যান্ডস আপ!” বলে উঠলো চীৎকার করে
কেউ। প্রহরী মোর্শেদ ঘুরে দাঁড়াতেই,
হঠাৎ পেছন থেকে মাথার পশ্চাত-
দেশে করলো আঘাত কেউ। সাথে সাথে
সংজ্ঞা হারিয়ে সে পড়ে গেল। তীব্রগতি
ঝটিকার মতো বঙ্গবন্ধু, যেন ক্ষুব্ধ
বাঘ, ছুটে এলেন; নিরস্ত্র তিনি, তবু
তাঁর কণ্ঠ যেন কামানের গোলা; “গুলি
বন্ধ র্ক!” বলে করলেন চীৎকার:
“এত বড় স্পর্ধা তোদের, তুলেছিস
হাত আমার লোকের গায়ে। আমি তাকে
জীবিত দেখতে চাই।” হঠাৎ নিস্তব্ধ
চারদিক। মারমুখো আর্মিরা হঠাৎ,
চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো, হয়ে গেছে
চুপ। পাক আর্মি-অফিসার এক, খুব
বিনয়ের সাথে বলে উঠলো, “স্যার, সরি;
ওরা ভুল করে ফেলেছে; ব্যবস্থা নিচ্ছি
আমি তাকে সুস্থ করে তোলার; আপনি
নিশ্চিন্ত থাকুন। তবে আমাদের সঙ্গে,
এই মুহূর্তে, ক্যান্টনমেন্টে যেতে হবে
আপনাকে। আপনি প্রস্তুত হোন।” “আমি
তৈরি” বলে বাংলার মহানেতা ধরা
দিলেন স্বেচ্ছায়, যেন দুরন্ত ঈগল
মুক্ত আকাশের মায়া ভুলে ঢুকে গেল
কি-সহজে সুসজ্জিত খাঁচার ভেতর!

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘কালো রাত্রি’ পর্ব ;নাম ‘ষষ্ঠ সর্গ’।

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

পঞ্চম সর্গ

ইয়াহিয়া নয়, সাতই মার্চের পর,
নিপতিত হলো বঙ্গবন্ধুর হাতেই
রাষ্ট্র-ক্ষমতা কার্যত। রাষ্টযন্ত্র প্রায়
পড়লো অচল হয়ে সারা দেশে। দেশ
চলে মুজিবের কথায়। মুজিব যদি
বলে চলো, লোকে চলে; থামতে বললে
লোকে থামে। সমস্ত অফিস-আদালত
রাষ্টের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি নয়, থাকে
চেয়ে মুজিবেরই হুকুমের দিকে শুধু।
রাষ্ট্রময় আর্মি, পুলিশ ও ইপিআর
হয়ে গেছে ভাগ -বাঙালী ও পাকিস্তানী-
দুই ভাগে। উর্দুভাষী আর বাংলাভাষী
কেউ কারে করে না বিশ্বাস। গেছে বেড়ে
দূরত্ব হঠাৎ করে একই রাষ্ট্রের
দুই ভাষী মানুষে মানুষে। ছিলো ভাই-
ভাই, আজ যেন জীবনের দুশমন;
ছিলো যারা পরস্পর বন্ধু, কী কারণে
শত্রু হঠাৎ, কে জানে! সাবধানে সব
করে তাই চলাফেরা, ঘরে ও বাইরে।

যেসব পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার
ছিলো পরিবার নিয়ে, চুপিচুপি তারা
পাঠাচ্ছে ফেরত তাদের সন্তান-স্ত্রীকে
স্বদেশে। বাতাসে নাক লাগিয়ে শুঁকছে
শকুন; লাশের গন্ধ যেন বারবার
কোত্থেকে আসছে ভেসে, বুঝি বা ভাগাড়
লুকিয়ে কোথাও আশপাশে। তালগাছে
কয়েকটি কাক বসে এদিক-ওদিক
তাকিয়ে কয়েকবার, দিলো তারস্বরে
জুড়ে কা-কা কা-কা! “কাকগুলো তাড়া, তাড়া”
বলে দাওয়ায় বসে করতে লাগলো
চীৎকার হারু মোল্লার বৃদ্ধ অচল মা
পরীবিবি। “গরম খবর!” বলে বৃদ্ধ
পেপারঅলা গঞ্জের হাঁটে হেঁটে হেঁটে
করতে লাগলো বিক্রি ঢাকার পেপার।

এলেন ষোলোই মার্চ ফিরে প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়া খান, ঢাকা; উদ্দেশ্য, ক্ষমতা
হস্তান্তর। চললো বৈঠক বঙ্গবন্ধুর
সাথে, দফায় দফায়। শ্বাসরুদ্ধকর
পরিবেশ সারা দেশে- কী হয়, কী হয়
চলতেছে কানাঘুষা সমস্ত মহলে।
খুলছে না কেউ মুখ ফলাফল নিয়ে
বৈঠকের; না কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রের, না
আওয়ামী নেতারা। নিউজপেপারগুলো
ছাপছে ধোঁয়াটে খবর। আসলে কেউ
বলতে পারে না কিছু। ভুট্টোও এলেন
পাকিস্তান থেকে উড়ে, ঢাকার বৈঠকে
দিতে যোগ। বসলেন একসাথে ভুট্টো,
মুজিব ও ইয়াহিয়া। চললো একটানা
ত্রিমুখী বৈঠক চব্বিশে মার্চ পর্যন্ত;
হলো শেষ, ফলাফল ছাড়াই। এদিকে
গোপনে গোপনে চলছে প্রস্তুতি যেন
যুদ্ধের, বাতাসে কারা রটাচ্ছে গুজব।
যত্রতত্র দিচ্ছে হানা পাকিস্তান-আর্মি
বাঙালীর ঘরে ঘরে। চলছে তল্লাশী
সারা দেশে, আওয়ামী লীগ নেতাদের
বাড়ি বাড়ি। বড় বড় নেতারা দিচ্ছেন
গা ঢাকা নেতার নির্দেশে অথবা পাড়ি
জমাচ্ছেন ভারতে। ঢাকার রাজপথে,
কাউকে সন্দেহ হলেই, করছে গ্রেফতার
যখন তখন, ক্ষেপে ওঠা পাক-আর্মি।
মুজিবের পক্ষ নিয়ে মাওলানা ভাসানী
স্বভাবসুলভ তীক্ষ- চাঁচাছোলা কণ্ঠে
দিলেন ফতুয়া তাঁর জনসমাবেশে:
“লাকুম দীনউকুম ওল ইয়াদীন-
যার যার ধর্ম তার তার কাছে।” বুঝে
নিলো জাতি-বাঙালী ও উর্দুভাষী, দুটি
আলাদা ধর্মের মতো, ভিন্ন হয়ে গেছে।
পাগলেও বুঝি করতে পেরেছে আঁচ,
ভেঙে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে-ভেঙে যাবে বলে
চাপাগুঞ্জন সর্বত্র। ভাঙবে অথচ
আওয়াজ হবে না ইস্রাফিলের শিঙার?
নদী ভাঙে; বিচ্ছিন্ন বিধ্বস্ত তার পাড়
ধসে পড়বার আগে, হুঙ্কার ছেড়েই
তবে হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাঁক খাওয়া বুনো
জলের ভেতর; সেই ধ্বনি বাড়ি খায়
প্রতিধ্বনি হয়ে দূর জনপদে। আজ
পাকিস্তান যেন ধ্বংসোন্মুখ সেই নদী।

প্রতিদিন প্রত্যাখাত হয়ে ফিরছেন
মুজিব স্বগৃহে, আর সক্রোধে হতাশা
মারছেন ছুঁড়ে চার দেয়ালের মাঝে:
শেষ, সব আশা শেষ। জামাল, কামাল,
হাসিনা, রেহেনা আর হাসুর মা বলে
বাড়িতে ঢুকেই তিনি করেন চীৎকার।
তোমরা প্রস্তুত হও বলে হুঁশিয়ারি দেন
রোজ। নেতারা আসেন রাতে, অন্ধকারে;
গোপন আলাপ সেরে ফিরে যান কাজে।
বডিগাড বিশ্বস্ত মোর্শেদ রাত্রিদিন
দেয়ালের মতো ঘিরে রাখে বাংলার
বিপ্লবী নেতাকে।

রাত্রি থমথম। ঢাকা
যেন আজ রাতে, ভূতের শহর। ভয়
আর আতঙ্ক বেড়াচ্ছে যেন পায়চারি
করে সব অলিগলি। বাইরে মোর্শেদ
পাহারায়। বঙ্গবন্ধু অন্দরমহলে
বিবি-কন্যা-পুত্রদের সাথে। কাঁদছেন
ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে বঙ্গমাতা; মুছছেন
দুচোখের পানি শাড়ির আঁচলে ঘন-
ঘন। মন ভারী করে বসে দুই কন্যা
মার পাশে। পুত্রগণ যেন বোবা হয়ে
চেয়ে আছে চিন্তান্বিত পিতার মুখের
দিকে। নিরবতা ভেঙে বলে উঠলেন
বঙ্গবন্ধু, “কাল সকালেই চলে যাবে
সব বত্রিশ নম্বর ছেড়ে। সাবধান,
মুখ খুলবে না কারো কাছে। সবখানে
ওঁৎ পেতে আছে দুশমন।” এতক্ষণে
কইলেন কথা বঙ্গমাতা ভগ্নকণ্ঠে:
“আপনার কী হবে? ওরা যদি আপনার
করে ফ্যালে কিছু!” বললেন হেসে মহা-
নেতা, “কিছুই হবে না। গ্রেফতার করে
রাখবে পুরে জেলে। বেশি কিছু করলে, মেরে
ফেলবে-এই তো? করে না মুজিব ভয়
মৃত্যুর। বাংলাকে এবার স্বাধীন করে
ছাড়বো। জামাল, কামাল, শুনে রাখো মন
দিয়ে-যদি আমি নাও থাকি, সংগ্রাম
চালিয়ে যাবে, কখনো কাপুরষের মতো
আত্মসমর্পণ করবে না। আল্লাহ ছাড়া
কারো কাছে নোয়াবে না শির। মুসলিম
একবারই জন্মে, একবারই মরে। হয়
বাঁচবে বাঁচার মতো, না হয় শহীদ
হয়ে যাবে এদেশের স্বাধীনতার জন্যে;
হাশরের মাঠে দেখা হবে। কী পেয়েছে
আহম্মকেরা- বাংলার জনগণ রায়
দিলো আমাদের পক্ষে; কিন্তু বাধ সাধলো
ভুট্টো আর ইয়াহিয়া। বসতে দিলো না
মসনদে। এমন শিক্ষা দিয়ে দেবো, ওরা
পালাবার জায়গা পাবে না। বাংলার
মানুষ ওদের পুঁতে ফেলবে এদেশের
মাটিতে। ভারত আমাদের পাশে আছে।
রাশিয়াও আছে। আমার মানুষজন
ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে। আমি
সিগনাল দিলেই উঠবে আগুন জ্বলে;
সে-আগুন নেভানোর শক্তি কারো নেই।
আল্লাই জানেন, কী আছে অদৃষ্টে। তবে
জেনে রাখো, স্বাধীন আমরা হবোই। সে-
স্বাধীন-বাংলাদেশে যেন হাসিনার
সন্তানের হাতে, এই দোয়া করি, শোভা
পায় একটি সুন্দর সবুজ পতাকা।”

ফুঁপিয়ে উঠলো এতক্ষণে কন্যা তাঁর,
দুচোখের মণি, শ্রীমতি হাসিনা। অশ্রু-
ছলছল চোখে তাকালেন মহানেতা
পুত্রকন্যাদের দিকে। আঁতকে উঠলো
তাঁর পিতৃহৃদয় আসন্ন বিচ্ছেদের
শোকে।-‘হায়, খোদা, কি মায়ার বন্ধনে
বেঁধেছো জীবন তুমি এ জগতে! পত্নি-
প্রেম, পুত্র-প্রেম, কন্যা-প্রেম; সেই সাথে
দেশপ্রেম দিলে ঢেলে ক্ষুদ্র এই বুকে;
কাকে ফেলে কাকে রাখি! যাকে দেই ঠেলে
দূরে, সেই যে কাঁদায়!’ এদিকে বাইরে
জুড়েছে মোর্শেদ ডাক। এসেছে নিশ্চয়
বার্তা নিয়ে কেউ। অন্দরমহল থেকে
বেরিয়ে এলেন নেতা দ্রুত। ধরেছেন
ঠিকই; স্পাই, সেনাবাহিনীর। এসেছে সে
পাগলের বেশে। বোঝার উপায় নেই।
দিনে সে সৈনিক; পাগল রাত্তিরে। কত
লোক সারা দেশে হয়ে আছে এইভাবে
তৈরি, তোমার জন্যে হে স্বাধীনতা। এই
বার্তা এনেছে সে: ‘হামলা হতে পারে কাল
রাতে, ঢাকাসহ বড় সমস্ত শহরে;
অতর্কিত হামলা, আর্মির।’ বলেই সে
কেটে পড়লো চুপচাপ। বাংলার নেতা
বঙ্গবন্ধু ডুবে রইলেন একা, পাশে
প্রহরী মোর্শেদ, মুক্তির ভাবনায়। ধু-ধু
অন্ধকার চারদিকে, নিকষ ভৌতিক
বিদঘুটে অন্ধকার, আর শুধু খাঁ খাঁ
গা শিউরে ওঠা বিপদের ঘনঘটা!

ওদিকে তখন জমেছে জমেশ আড্ডা
সেনাবাহিনীর অফিসার্স ক্লাবে। মধ্য
রাত্রি চিরে চিরে ফেটে পড়ছে বদ্ধ ঘরে
পানপেয়ালার ঠুংঠাং ধ্বনি আর
ভোদকার গন্ধ; সেইসাথে পৈশাচিক
অট্টহাসি। এ আড্ডার মধ্যমণি, মহা
সন্ত্রাসীর ত্রাস, বিশ্বের আতঙ্ক, সারা
পাকিস্তানের গৌরব জেনারেল টিক্কা
খান, যিনি ইয়াহিয়ার দক্ষিণ হস্ত
আর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চির
অতন্দ্র প্রহরী। ঘিরে আছেন মহান
এ বীরযোদ্ধাকে ব্রিগেডিয়ার আব্দুল
কাদির খান, ব্রিগেডিয়ার আজমাল
হোসেন মালিক, ব্রিগেডিয়ার আরিফ
রাজা, ব্রিগেডিয়ার আত্তা মোহাম্মদ
খান মালিক, ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ
আসলাম, কর্নেল কে কে আফ্রিদিসহ
ডাকসাইটে যত সেনা-কর্মকর্তা। তারা
হয়েছেন সমবেত প্রিয় জন্মভূমি
পাকিস্তাান রক্ষার বৈঠকে। আলোচনা
শেষে উঠেছেন মেতে আনন্দআড্ডায়।
‘দিতে হলে দেবো প্রাণ, তবু স্বদেশের
এক ইঞ্চি জমিন দেবো না ছেড়ে কোনো
দুর্বৃত্তের হাতে;’-এ শপথে দৃঢ় তারা,
মার মার মন্ত্রে উদ্বেলিত একসাথে;
দেবেন না ছাড় এইবার দেশদ্রোহী
কোনো মুজিবপন্থীকে, যারা চুপিচুপি
করে যাচ্ছে পুণ্যভুমি পাকিস্তান ভেঙে
দু-খন্ড করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্র;
এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেবেন ময়লা ও
আবর্জনা যত জমে আছে অস্থির এ
পূর্ব-পাকিস্তানে; মুজিবের চামচিকা
যারা এই বাংলায়, শেষ হয়ে যাবে
এইবার চিরতরে। হয় এসপার,
না হয় ওসপার। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।
রাত্রির নিকষ অন্ধকার চিরে চিরে
বাজতে লাগলো মিষ্টি সঙ্গীতের মতো
‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ!’ দেশপ্রেমে মত্ত
যত পাঞ্জাবি ও সিন্ধী সৈনিকের কানে।
মহাদুর্যোগের আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে
উঠতে লাগলো কলার পাতার মতো
ঢাকার রজনী আর নিষ্পাপ শিশুরা।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘বিপদের ঘনঘটা’ পর্ব ; নাম ‘পঞ্চম সর্গ’।

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

চতুর্থ সর্গ

ব্যাপক প্রচার-প্রপাগাণ্ডা-প্রস্তুতির
পর এলো ৭ই মার্চ, মহাসংগ্রামের
রৌদ্রস্নাত দিন। রেসকোর্স ময়দান
যেন জনতার সমুদ্দুর। ‘জয় বাংলা!’
‘জয় বঙ্গবন্ধু!’ ধ্বনি ও প্রতিধ্বনিতে
কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার উদ্বেলিত
ঢাকার হৃৎপিন্ড। যেন মহাপ্রলয়ের
আশঙ্কায় কাঁপতেছে সারাদেশ। মাঝে
মাঝে উত্তপ্ত বাতাসে ছড়াচ্ছে উত্তাপ
বাঁধভাঙা অগ্নিশ্লোগান-‘বীর বাঙালী
অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
এ যেন বালির বাঁধ, বারবার পড়ছে
ধসে, শত চেষ্টাতেও যাচ্ছে না বাঁচানো
যাকে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতর
আক্রমণ থেকে। গর্জে উঠলো যেন
ঝড়োমেঘ বাংলার আকাশে অকস্মাৎ,
যেন ইস্রাফিলের প্রলয়শিঙা হাতে
রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ ক্রুদ্ধ
যুদ্ধোন্মুখ জনতার সম্মুখে গর্জন
করে উঠলেন এক বীর, বাঙালীর
দুচোখের মণি, বঙ্গের শ্রেষ্ঠ সন্তান,
পাহাড়ের মতো শির, বিক্ষুব্ধ মুজিব:

“ভায়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত
মন নিয়ে,আপনাদের সামনে হাজির
হয়েছি। আপনারা সবই জানেন
এবং বোঝেন। আমরা আমাদের
জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি । কিন্তু
দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম,
খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার
ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত
হয়েছে । আজ বাংলার মানুষ মুক্তি
চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়,
বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। ”

পিনপতন নিস্তব্ধতা চারদিকে। দেখে
নিলেন এক নজর কানায় কানায়
পূর্ণ রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল
জনতার সমুদ্র; সরোষে, অতঃপর,
ঊঠলেন তিনি হেঁকে, যেন তূর্যনাদ:

“কী অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনে
বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে
আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন ।
আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে,
আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি
করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে
তুলবো। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক,
রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের
সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের
করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের,
বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস।
তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু
নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস।
বাংলার ইতিহাস- এদেশের মানুষের
রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার
ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি।
১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও
আমরা গদিতে বসতে পারি নাই।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান
মার্শাল ল জারি করে দশ বছর
পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে
রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা
আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার
ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা
হয়েছে। ১৯৬৯-এর আন্দোলনে
আইয়ুব খানের পতন হওয়ার
পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব
সরকার নিলেন, তিনি বললেন,
দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র
দেবেন; আমরা মেনে নিলাম। তারপরে
অনেক ইতিহাস হয়ে গেলো, নির্বাচন
হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান
সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি,
শুধু বাংলা নয়, পাকিস্তানের
মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে
অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি
তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের
অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা
রাখলেন না। তিনি রাখলেন ভুট্টো
সাহেবের কথা। তিনি বললেন,
প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে সভা হবে।
আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা
এসেম্বলিতে বসবো। আমি বললাম,
এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো।
এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম,
যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা
সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও
যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা
মেনে নেব। জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে
এসেছিলেন। আলোচনা করলেন। বলে
গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ না,
আরো আলোচনা হবে। তারপরে অন্যান্য
নেতৃবৃন্দ, তাদের সঙ্গে আলাপ করলাম:
আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ
করে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো। তিনি
বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা
যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা
হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন,
যে যাবে তাকে মেরে ফেলা হবে;
যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে তাহলে
পেশোয়াার থেকে করাচি পর্যন্ত
দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে।
আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে।
তারপরে হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলি
বন্ধ করে দেওয়া হলো । ইয়াহিয়া
খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসেবে
এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম
যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন,
তিনি যাবেন না। পঁয়ত্রিশ জন সদস্য
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে
আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে
দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো
বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো
আমাকে। বন্ধ করে দেয়ার পরে
এদেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে
উঠলো। আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে
আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি
বললাম, আপনারা কলকারখানা
সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ
সাড়া দিলো। আপন ইচ্ছায় জনগণ
রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, তারা
শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার
জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।”

“জয় বাংলা!” “জয় বাংলা!” শ্লোগানে শ্লোগানে
প্রকম্পিত হলো চারদিক। তারপর
ফের আরণ্যক নিরবতা। যেন ক্ষুব্ধ
জনতা নিশ্চুপ, তৃষ্ণার্ত বাঘের মতো
ছপছপ করে, করে যাচ্ছে পান তপ্ত
অগ্নিবাণী। যেন কোনো সুপ্ত অগ্নিগিরি
ফেটে পড়বার জন্যে করছে উৎসুক
আর কান পেতে শুনতেছে মহানাদ
আকাশে বাতাসে। ঈগলের চোখ দিয়ে
সে-দৃশ্যের দিকে তাকালেন একবার;
তারপর ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন বীর:

“কী পেলাম আমরা? আমরা আমাদের
পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর
আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার
জন্য। আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে
আমার দেশের গরীব-দুঃখী নিরস্ত্র
মানুষের বিরুদ্ধে; তার বুকের ওপরে
হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের
সংখ্যাগুরু; আমরা বাঙালীরা যখনই
ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই
তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
টেলিফোনে আমার সঙ্গে তাঁর কথা হয়।
তাঁকে আমি বলেছিলাম, জেনারেল
ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের
প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার
গরিবের ওপরে, আমার বাংলার মানুষের
বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে।
কী করে আমার মায়ের কোল খালি
করা হয়েছে, কী করে মানুষকে
হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন,
দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন,
আমি নাকি স্বীকার করেছি যে, ১০
তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স
হবে। আমি তো অনেক আগেই বলে
দিয়েছি, কিসের রাউন্ড টেবিল,
কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার
মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের
সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে
পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে
বৈঠক করে যে-বক্তৃতা তিনি
করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি
আমার ওপরে দিয়েছেন, বাংলার
মানুষের ওপরে দিয়েছেন।

ভায়েরা আমার, ২৫ তারিখে
এসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ
শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে
দিয়েছি, ওই শহীদের রক্তের ওপর
পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান
যোগদান করতে পারে না। এসেম্বলি
কল করেছেন, আমার দাবি মানতে
হবে। প্রথম, সামরিক আইন, মার্শাল ল
উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক
বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত
নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে
তার তদন্ত করতে হবে। আর
জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা
হস্তান্তর করতে হবে। তারপর
বিবেচনা করে দেখবো, আমরা
এসেম্বলিতে বসতে পারবো কি
পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে
বসতে আমরা পারি না। আমি
প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা
এদেশের মানুষের অধিকার চাই।
আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার
চাই, আজ থেকে এই বাংলাদেশে
কোর্ট-কাঁচারি, আদালত-ফৌজদারি,
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের
জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে
কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ
কষ্ট না করে সেইজন্য যে-সমস্ত
অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলোর
হরতাল কাল থেকে চলবে না ।
রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি, রেল চলবে,
লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট,
সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট,
সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো,
ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না।
২৮ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে
বেতন নিয়ে আসবেন। এরপরে
যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর
যদি একটা গুলি চলে, আর যদি
আমার লোককে হত্যা করা হয়-
তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ
রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে
তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে
তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা
করতে হবে এবং জীবনের তরে
রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু-
আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি,
তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে
মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা
আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো,
কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু
আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার
চেষ্টা কোরো না। সাত কোটি মানুষকে
দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন
মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের
দাবাতে পারবে না। ”

“বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো! বাংলাদেশ
স্বাধীন করো!” পড়লো রোষানলে ফেটে
উন্মত্ত জনতা, যেন মান্দারের ফল।
টগবগ করে তার ফুটছে রুধির,
সেগুনের কাঠে জ্বাল দেয়া যেন কোনো
তেলের কড়াই। কোথায় শুনেছে কবে
অগ্নিঝরা এমন অমর বাণী, লোকে?
এ যেন বক্তৃতা নয়, অনল বর্ষণ,
ঝরছে যা অনর্গল বঞ্চিত-লাঞ্ছিত,
মুক্তির জন্যে মরিয়া, মারমুখো এক
জাতির উপর। তাদের প্রাণের নেতা,
যাঁর কথায় প্রস্তুত ঝাঁপ দিতে তারা
জ্বলন্ত অগ্নিতে, বললেন অতঃপর:

“আর যে-সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে,
আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী
লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের
সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা
পারেন, আমাদের রিলিফ কমিটিতে
সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন।
আর এই সাত দিন হরতালে যে-সমস্ত
শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে,
প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের
বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারি
কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি
তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার
এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা ট্যাক্স
বন্ধ করে দেওয়া হলো-কেউ দেবে না।
শুনুন, মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী
ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ
সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই
বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালী,
নন-বাঙালী যারা আছে তারা আমাদের
ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব
আপনাদের ওপর। আমাদের যেন
বদনাম না হয়। মনে রাখবেন,
রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা
যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে
তাহলে কোনো বাঙালী রেডিও-স্টেশনে
যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের
নিউজ না দেয়, কোন বাঙালী টেলিভিশনে
যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা
থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনা-পত্র
নেবার পারে। পূর্ব-বাংলা থেকে পশ্চিম-
পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে
পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম
আমাদের এই পূর্ব-বাংলায় চলবে
এবং বিদেশের সাথে দেয়ানেয়া
চলবে না। কিন্তু যদি এদেশের
মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা
হয়, বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন।
প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম
পরিষদ গড়ে তোলো। এবং তোমাদের
যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।
রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো।
এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো
ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের
মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম
স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

এ-কি মহামন্ত্র শোনালেন জাদুকর,
আচ্ছন্ন হঠাৎ জাতি যার ঘোরে; যার
ঝাঁকুনিতে জেগে উঠলো একটি অগ্নিগিরি
যেন অকস্মাৎ, মহাকাল-নিদ্রা থেকে।
আকাশে বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত
হতে থাকলো বারবার-‘মুক্তির সংগ্রাম!’
‘স্বাধীনতার সংগ্রাম!’ লক্ষ জনতার
কণ্ঠ যেন আজ কামানের গোলা হয়ে
ফুটতে লাগলোÑ ‘জয় বাংলা! জয় বাংলা!’

এ যেন বক্তৃতা নয়, রক্ত টগবগ
করা সব উন্মাতাল তরুণ-যুবার
উদ্দেশে উদাত্ত আহ্বান, মৃত্যুর; যেন
হেমিলনের বংশীবাদক ফের, তাঁর
জাদুর বাঁশিতে তুলেছে স্বর্গীয় সুর,
যা শুনে রাস্তায় এসে জুটেছে সমস্ত
মুক্তিপাগল কিশোর-যুবা-বৃদ্ধ-নারী
ঘর ছেড়ে; এ যেন বক্তৃতা নয়, অন্ধ
পাকিস্তানী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠির
বিরুদ্ধে, ইস্রাফিলের শিঙার ফুৎকার,
যার গা কাঁটা দেওয়া প্রলয়-ধ্বনিতে
কাঁপতে লাগলো সারা পূর্ব-পাকিস্তান
তুমুল উত্তেজনায়, যেন ভূমিকম্পে
কেঁপে কেঁপে ওঠা কোনো পুরনো বিল্ডিং।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘৭ই মার্চের মহাভাষণ পর্ব’; নাম ‘চতুর্থ সর্গ’।

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

তৃতীয় সর্গ

ভূমিধস বিজয়ে নাচছে সারা দেশ।
পেয়েছে আওয়ামী লীগ একশত ঊন-
সত্তরটি সিট পূর্ব-পাকিস্তানে; মাত্র
দুটি ক্ষমতাসীনরা; ওদিকে পশ্চিম-
পাকিস্তানে পিপলস পার্টি অষ্টাশিটি,
একশত আটত্রিশটির মধ্যে; ফলে
আওয়ামী লীগই সংখ্যাগরিষ্ট দল
দুই পাকিস্তানে। বাংলার বিপ্লবী নেতা
শেখ মুজিবের ক্ষমতায় যাওয়া আজ
মুহূর্তের ব্যাপার। যে-কোনো মুহূর্তেই
ডাকা হতে পারে তাঁকে শপথ নেওয়ার
জন্যে। দলে দলে আসছে মানুষ ছুটে
বত্রিশ নম্বরে, শুভেচ্ছা জানাতে; শত্রু-
মিত্র সব। বঙ্গমাতা বেগম মুজিব
ব্যস্ত সারাদিন অতিথির আপ্যায়নে।
মিটিংয়ের পর বসছে মিটিং বাঘা-
বাঘা সব আওয়ামী নেতার সাথে ভোট-
যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয়ী নেতার। বৃষ্টি-
স্নাত গোলাপের মতো উৎফুল্ল সবাই।
সর্বত্র খুশির উৎসব। সে-খুশির
মাঝখানে নরকের ঘৃণ্য প্রেতাত্মারা
চুপিসারে কেউটের মতো বিষধর
ফণা তুলে করতেছে ফোঁসফোঁস আর
কানাঘুষা পথেঘাটে; ঈর্ষার অনলে
পুড়ছে পাপিষ্ঠ জন; আর ক্রোধোন্মত্ত
হয়ে তারা রটাচ্ছে গুজব পৃথিবীর
বাতাসে বাতাসে-পাকিস্তান এইবার
হিন্দুস্থান হয়ে যাবে। এবং এদিকে
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ক্ষমতা দেওয়ার
নামে করছে বাহানা কত। আশা আর
আশঙ্কার দোদুল দোলায় রাত্রিদিন
দুলছে হৃদয়, ভোটের বুলেট ছোড়া
সাত কোটি বাঙালীর। পুঁতির মালার
সুতো ছিঁড়ে গেলে, যেভাবে ফড়্ফ্ড়্ করে
খুলে খুলে পড়ে পুঁতি; ঘটনার পর
ঘটনা সেভাবে, ঘটতে লাগলো রোজ
নির্বাচনোত্তর সারা পূর্ব-পাকিস্তানে।

তিন জানুয়ারি; রেসকোর্স ময়দানে
সদ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের
করালেন প্রকাশ্যে শপথবাক্য পাঠ
বঙ্গবন্ধু। মহান নেতার হাতে তাঁরা
দুই হাত রেখে করলেন অঙ্গীকার:
ছয় দফা মেনে তৈরি করবেন দ্রুত
নয়া সংবিধান আর আনুগত্যশীল
হবেন বাংলার মানুষের প্রতি। পাঁচ
জানুয়ারি; পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা
জুলফিকার আলী ভুট্টো দিলেন ঘোষণা:
গঠন করতে হবে যৌথ-সরকার।
২৭ জানুয়ারি ঢাকায় এলেন তিনি
এতোদ্দেশ্যে। বসলো বৈঠক ঠিকই; তবে
সাত কোটি বাঙালীর নেতা অযৌক্তিক
দাবি তাঁর উড়িয়ে দিলেন এক ফুঁয়ে।
সমগ্র পাকিন্তানের সংখ্যাগরিষ্ট
দলের এখন নেতা শেখ মুজিবুর
রহমান। করতে হবে তাঁরই কাছে শুধু
গদি হস্তান্তর; শেখ মুজিব অনড়
সে-দাবিতে। ভ্রু-কুঁচকালেন ধূর্ত সিন্ধী
শেয়াল; প্রচণ্ড ক্ষোভে আর অপমানে
গুটিয়ে নিলেন লেজ। গেলেন পশ্চিম
পাকিস্তানে ফিরে, বুনতে নতুন করে
ষড়যন্ত্রজাল। এদিকে গণবিক্ষোভে
উত্তাল ঢাকার রাজপথ; টগবগ
করে ফুটতে লাগলো অলিগলি, যেন
জ্বলন্ত উনুনে রাখা তেলের কড়াই;
একটাই দাবি- জনতার নির্বাচিত
নেতার নিকট হস্তান্তর করো গদি।

১৩ ফেব্রুয়ারি; প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া
ঘোষণা দিলেন ন্যাশনাল এসেম্বলির;
অনুষ্ঠিত হবে ৩রা মার্চ। ঢাকাতেই।
এসেম্বলি বয়কট করবেন বলে
ঘোষণা দিলেন ভুট্টো। আপাতত তাঁর
একটাই দাবি-ক্ষমতা ছাড়তে হবে
দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট:
আওয়ামী লীগের কাছে পূর্ব-পাকিস্তানে
এবং পশ্চিম পাকিস্তানে, তাঁর দল
পিপলস পার্টির কাছে। বাংলার বাঘ
এ-প্রেক্ষিতে ছাড়লেন পাল্টা হুংকার:
ক্ষমতা ছাড়তে হবে একমাত্র তাঁর
দলের কাছেই; জনগণ ভোট দিয়ে
দিয়েছে ম্যান্ডেট শুধু তাঁর দলকেই,
দেশ শাসনের। গণতান্ত্রিক এ দাবি
লংঘন করার অধিকার কারো নেই
আধুনিক রাষ্ট্রে। তাই ১৬ ফেব্রুয়ারি
বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর দাবির প্রতিবাদে
দিলেন বিবৃতি:‘ভুট্টোর এ হেন দাবি
একেবারে অযৌক্তিক; সকল ক্ষমতা
হস্তান্তর করতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ
দল আওয়ামী লীগের নিকট। পূর্ব-
পাকিস্তানের জনগণই আজ কর্ণধার
সর্ব ক্ষমতার।’ সমগ্র দেশ ও জাতি
গভীর উৎকণ্ঠায়। মিছিলে-শ্লোগানে
তপ্ত সব রাজপথ পূর্ব-পাকিস্তানে-
জেলায় জেলায় আর বিভাগে বিভাগে।
উঠেছে বাঙালী ফুঁসে সারা বাংলায়,
শাসনের অধিকারে। প্রমাদ গণলো
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। ঠান্ডা রক্তে তাঁর
খানখানানের স্রোত, চিত্তে অবিশ্বাস;
মুসলিম-মুসলিম ভাই ভাই বলে
দুই পাকিস্তান হয়েছিল এক দেশ,
ঊনিশ শ সাতচল্লিশে। কিন্তু খান আর
পাঞ্জাবীরা চিরদিন সৎভাইরূপে
এসেছে শাসন করে বাঙালীকে; আর
বাঙালী-মুসলমানকে দেখেছে কেবলি
অবজ্ঞার চোখে; ভাবেনি মুসলমান
কখনো এদের পুরো; বরং করেছে
এ ধারণা: অর্ধ-হিন্দু এরা, ছোট জাত,
মুচি, শুঁড়ি, বেইমান কিংবা কাফের।
যে-মহান ধর্ম এসেছিল পৃথিবীতে
মানুষে মানুষে সব ঘুচাতে বিভেদ;
এসেছিল জাতপাত-বংশমর্যাদার
ভুয়া পরিচয় ধুলায় গুড়িয়ে দিয়ে
সমান করতে সব মানুষের শির;
আজ কতিপয় কপট-কূপমণ্ডুক
স্বৈরাচার ও দুঃশাসনের বেড়াজালে
বন্দী পুর্ব-পাকিস্তানে, সে-ধর্মের নামে
তোলে বিভেদের সুর মানুষে-মানুষে;
মদের পেয়ালা ঠোঁটে নিয়ে গায় তারা
ফেরাউনের কোর্তা পরে ইসলামের গান;
বাঙালী উঠেছে গর্জে তাদেরই বিরুদ্ধে
আজ রাস্তায় রাস্তায়। ভ্রু-কুঁচকালেন
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, আর আয়নায়
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন শ্যেন-চোখে
নিজের চেহারা বারবার। চোখ বুজে
তাকালেন বহু দূর। দেখতে পেলেন-
পতপত করে উড়ছে যেন চারদিকে
চির শত্রু ভারতের পতাকা। কঠিন
হয়ে উঠতে লাগলো তাঁর মুখ। চোখ
খুলে মুষ্টাঘাত করলেন তিনি শূন্যে
ও অস্ফুট ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন:
‘রে মুজিব! বিশ্বাসঘাতক! বুনো ঘুঘু!
এবার দেখবে তুমি ফাঁদ।’ বলে তিনি
ফেটে পড়লেন প্রচ- হাসিতে, যার
ঢেউ শুধু ঘরের ভেতর নয়, যেন
আছড়ে আছড়ে পড়তে লাগলো দূর
লাহোর, করাচি আর রাওয়ালপিণ্ডিতে।

তারিখ পয়লা মার্চ। দিলেন হঠাৎ
বন্ধ করে তিন তারিখের এসেম্বলি
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। রুদ্ধবাক জাতি।
বাঙালী উঠলো ফুঁসে। বাংলার নেতা
আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি নিয়ে
দ্রুত বসলেন এক জরুরি বৈঠকে।
বৈঠকের তড়িৎ সিদ্ধান্ত মোতাবেক
দিলেন হরতালের ডাক তিনি ৩রা
মার্চ গোটা পূর্ব-পাকিস্তানে। জনগণ
ক্ষুব্ধ পানির স্রোতের মতো নেমে এলো
রাস্তায় নেতার আহ্বানে। সফল ও
শান্তিপূর্ণ হরতাল শেষে, জানালেন
সত্বর ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান
বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি।

রাত্রি দ্বিপ্রহর; শায়িত মহান নেতা
প্রিয় স্ত্রীর পাশে; শুধু শুয়ে থাকা, ঘুম
নেই চোখে; ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ-জাতি
আর মানুষের কথা কেবলি মস্তকে।
স্বদেশ ও স্বামীর চিন্তায় ভেঙে পড়া
বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা রুদ্ধশ্বাসে
তাঁর ভয়, উৎকণ্ঠা এবং আসন্ন
বিপদের কথা জানালেন অকপটে
প্রাণের অধিক প্রিয় বঙ্গের বন্ধুকে।
যেন কোনো বটবৃক্ষ, ফেলে দীর্ঘ ছায়া
জীবনের চারপাশে, বলে উঠলেন
শুনিয়ে অভয়বাণী: “শোনো, হাসুর মা,
জয় আমাদের অনিবার্য। কোনো কিছু
দিয়ে আর পারবে না দমিয়ে রাখতে।
আমরা, নিরীহ বাঙালীরা, ক্ষমতায়
যাওয়ার সুযোগ পেলেই, প্রতিবারই
হামলে পড়েছে ওরা হায়েনার মতো।
এবার আমরা কাল কেউটের বিষ-
দাঁত ভেঙে দেবো, আর উপড়ে ফেলবো
সমস্ত আগাছা বাংলার বুক থেকে।
আমরা বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রক্ষা
করে চলেছি; পৃথিবী আমাদের পাশে
আছে; সাথে আছে সাত কোটি মারণাস্ত্র,
আমার বাঙালী ভাইয়েরা। এদেশের
নিরপরাধ-নিরীহ মানুষের ’পরে
মানুষ নামের ওই পশ্চিমা পশুরা
তেইশ বছর ধরে কি-অত্যাচারই না
চালিয়ে আসছে! আমার বাঙালি জাতি
নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত।
আর সইবো না। আমরা সাতই মার্চে
মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছি ঢাকার
রেসকোর্স ময়দানে। সারা দেশ থেকে
মানুষ আসবে। লক্ষ লক্ষ ভুখানাঙা
মানুষ। আমার বাংলার মানুষেরা।
এবার আমরা জিতবোই, তুমি দেখো।”

“হে মহান প্রভু, পরম করুণাময়,
আমরা তাকিয়ে আছি চাতক পাখির
মতো শুধু তোমার দিকেই সাহায্যের
আশায়। অনাথ এ-জাতির প্রতি তুমি
মুখ তুলে চাও, হে পরওয়ার দেগার।”
“আমীন! আমীন!” বললেন মহানেতা।
গভীর সুষুপ্তি নেমে এলো অতঃপর
বত্রিশ নম্বরে।

সন্দেহ, সংশয় আর
অবিশ্বাসে ভরে গেছে সারা দেশ। শুধু
ফিসফিসানি ও কানাঘুষা চারদিকে-
কী হয়, কী হয়! বত্রিশ নম্বর যেন
বঙ্গোপসাগর, লোকেরা নদীর মতো
আসছে আর যাচ্ছে সারা দিন, যেরকম
আসা-যাওয়া করে জল জোয়ার-ভাটায়।
বৈঠকের পর বৈঠকে, বঙ্গের নেতা
বাঙালীর দুচোখের মণি বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান অনর্গল
দিয়ে যাচ্ছেন নির্দেশ-উপদেশ তাঁর
কর্মীবাহিনীকে, যেভাবে যুদ্ধের আগে
সেনাপতি সৈন্যদের করে হুঁশিয়ার
রণকৌশলের নানা গোপন বিষয়ে।
মৌচাকের মতো ঘিরে আছে তাঁকে সব
ছাত্রনেতা, যুবনেতা আর জাদরেল যত
আত্মত্যাগী বয়োজ্যেষ্ঠ আওয়ামী নেতারা।
আছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম,
তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম
মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক
আহমেদ, অধ্যাপক ইউসুফ আলী,
এ এইচ এম কামারুজ্জামান, শেখ
ফজলুল হক মণি, কামাল হোসেন,
নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুর রাজ্জাক,
তোফায়েল আহমদ, আ স ম আব্দুর
রব, শাহজাহান সিরাজ, সাইফুল
আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন,
আবদুস সামাদ আজাদ, তবিবুর
রহমানসহ বিপুল নেতা ও কর্মী।
সকলের একটাই দাবি প্রাণপ্রিয়
নেতার নিকট-আর কোনো পিছুটান
নয়, এবার প্রকাশ্যে চাই বাংলার
স্বাধীনতার ঘোষণা। শোনেন মহান
নেতা সকলের কথা; দোলান উন্নত
শির সগৌরবে; তবু বারবার ভারী
পাথরনুড়ির মতো ডুবে যান যেন
কোন্ অথৈ ভাবনায়; চোখে তাঁর ভেসে
ওঠে কাঁকরবিছানো আঁকাবাঁকা পথ-
দীর্ঘ-দীর্ঘতর- কেবলি যা বিষকাঁটা,
ছোপ ছোপ রক্ত আর বীভৎস মৃত্যু
দিয়ে ঢাকা। আঁতকে ওঠেন তিনি; ঘাম
ঝরে দরদর করে প্রশস্ত কপাল
চুঁয়ে চুঁয়ে; যেন কাঁপতে থাকে সারা গা;
বুঝি কেউ পেয়ে যায় টের, এই ভয়ে
সমুদ্রের চোখ মেলে তাকান চারপাশে
লুকিয়ে লুকিয়ে। তবু কেউ বলে ওঠে,
“ভয় পাবেন না, হে বাংলার মহানেতা;
আমরা জীবন দিয়ে স্বাধীনতা এনে
দেবো আপনার দুহাতে।” এতক্ষণে তিনি
পেলেন প্রবেশপথ বুঝি খুঁজে, স্তব্ধ
শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে; ভগ্ন কণ্ঠে
বলে উঠলেন সবার উদ্দেশে: “আমি
ভাবি না কখনো আমার নিজের কথা।
পায় না মৃত্যুর ভয় কখনো মুজিব।
আমি শুধু ভাবি সাতই মার্চের পরে
কী ঘটবে সেই কথা। এরপরও যদি
ক্ষমতা না ছাড়ে তারা বাঙালীর কাছে;
এরপরও যদি প্রত্যাখ্যান করে তারা
আমাদের ন্যায্য দাবি, তাহলে নিশ্চিত
যুদ্ধ বেঁধে যাবে। আমার বাংলার শান্তি-
প্রিয় মানুষকে ওরা কচুকাটা করবে।
আমার স্বপ্নের সোনার বাংলাকে ওরা
জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে।”
বলতে বলতে দুচোখ উঠলো ভিজে
মহান নেতার। তা দেখে জনৈক কর্মী
তাঁর, বলে উঠলো নির্ভয়ে: “শুনুন, হে
নেতা, বাংলার মানুষ ভীরু-কাপুরুষ
নয়। বাঙালী মরতে জানে, মারতেও
জানে। আমরা জীবন দিতে হলে দেবো,
তবু মানবো না আর দাসত্ব বিদেশি
কোনো দানবের। শপথ করছি আমরা
আপনার হাত ছুঁয়ে: এদেশকে শত্রু-
মুক্ত না করে বাড়িতে ফিরবো না কেউ
আর।” সমবেত সকলেই করে উঠলো
চীৎকার সমস্বরে-“জয় বাংলা! জয়
বঙ্গবন্ধু।” মৃদু হেসে, বাংলার রাখাল-
রাজা বলে উঠলেন শেষমেশ, “আচ্ছা,
তা-ই হবে। ওইদিন স্টেজের উপর
যারা থাকো, যদি ভুলে যাই বলতে কোনো
কথা, পাশ থেকে স্মরণ করিয়ে দিও।”
সবার মস্তিষ্কে-মনে, কণ্ঠে-উচ্চারণে
নদীর পাঁকের মতো ঘুরপাক খেতে
লাগলো, শুধু ৭ই মার্চ আর জয় বাংলা।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘সত্তরের নির্বাচনোত্তর পর্ব’; নাম ‘তৃতীয় সর্গ’।