ইনসাফের প্রতি খোলা চিঠি / মুসা আল হাফিজ

বহুদিন পর চেতনায় উড়াল দিলো
একটি অশ্রান্ত দোয়েল
তার ডানা থেকে ঝরছে বিষাদের ধুলো
কণ্ঠে হাহাকার করছে কালের মর্সিয়া

প্রশান্তির পিপাসা নিয়ে অরণ্যে পা বাড়াই
সেখানে বৃক্ষের বুকচাপড়ানো আর
কান্নার মতো হু হু হাওয়া
গা ছমছম ঝোঁপঝাড়ে ওঁৎ পেতে আছে আঁধারের তক্ষক
সুরের শরবত নেই , অরণ্যে কেবলই ঝিঁঝিঁর ঝঙ্কার

নদীও তো কোথাও আবৃত্তি করছে না চর্যাপদ
একটি ক্ষুধার্ত ভ্রমর জানিয়ে গেলো
বাগানে একটি ফুলও আর ফুটবে না
রাত্রির নিঝুম প্রহরে সিদ্ধান্ত হয়েছে

হ্যাঁ , তোমার অনুপস্থিতির ব্যথায় উত্তপ্ত দীর্ঘশ্বাসে
নিসর্গকে কাঁপিয়ে দিচ্ছি , শুধু আমি নই
আমার সঙ্গে পাখি ফুল বৃক্ষ নদী
শোকের পোশাক পরে বিষণ্ন নিথর!

সামুদ্রিক প্রতীক্ষাকে করপুটে নিয়ে
তরঙ্গিত চক্রমণে মেঘপুঞ্জে হাত রাখি
মেঘমালা গলে হলো শ্রাবণের ঢল
সেই থেকে তোমার জন্য আকাশের কাজল ঝরে বর্ষার মর্সিয়ায়

তোমার জন্য শতাব্দীর খানাখন্দে কবির শোকাশ্রু
ছুটন্ত হরিণীর শোণিতে শরাহত ব্যথানল
বিনিদ্র চাঁদ আর নক্ষত্রের বিলাপে দিগন্তের বুক হলো দুঃখের স্টেশন
তোমার জন্যে চূর্ণ হলো অন্তর্গত কাচের দেয়াল

তোমার অনুপস্থিতিতে বোধহীন খুলে বসেছে বোধের দোকান
সাম্য ও শান্তির দেহ পেঁচিয়ে প্রেমের সুতনু গিলছে অজগর।
তার বিষাক্ত নিশ্বাসের মাঝে দুর্বিনীত মানবশিশু
মহাচেতনার দর্পণ হাতে সুস্থির চুম্বনের মতো দাঁড়িয়ে আছে

তুমি না এলে পৃথিবীটা তার বেদনার পাণ্ডুলিপি।

আকাশে মার্চপাস্ট করছে ঈদের সকাল / মুসা আল হাফিজ

আকাশে ধুঁয়োর কুণ্ডুলী গোখরো সাপের মতো ছড়াচ্ছে বিষ
তার উপর দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তর্জনী তুলে মাননীয় সাম্রাজ্যবাদ
মুসলিম বিশ্বসংক্রান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করছেন
হোমসের ফসলি উঠানে আকাশ থেকে বমি করুক ‘ সভ্যতার ’ কনকর্ড
অসংখ্য বৃক্ষ পাখি নারী – শিশুর লাশ আর গরম রক্তের ফোয়ারায়
দাউদাউ জ্বলন্ত জনপদ জুড়ে রচিত হোক ‘ প্রগতির ‘ পাণ্ডুলিপি !
পৃথিবীর উর্বরতার জন্যই এ রক্ত , এ লাশ !
আফগান , ইরাক , ফিলিস্তিন …
যিশুর পৃথিবীতে এরা এন্টিক্রাইস্ট !
লাঞ্ছনার পোকামাকড় সব , নিয়তি তাদের গায়ে মেখে দিয়েছে কাদা
তৃতীয়বিশ্বের কেউ কি মানুষ ? ওদের হত্যা করো

বুকে বুকে প্রীতি নিয়ে ঈদগাহে যাচ্ছে দল বেঁধে
ওদের বিশ্বাসে জ্বলছে সাম্যের বিকল্প বিশ্বলোক
আমাদের বিশ্ব এটি , এখানে না কোনো বিকল্প , না কোনো চ্যালেঞ্জ
মুসলমানরা কি মানুষ ? ওদের হত্যা করো

কমপক্ষে একটি করে গণকবর সৃষ্টির কৃতিত্বে
উজ্জীবিত সৈনিকেরা দাঁড়াও !
ঈদের প্রত্যুষে তোমাদের দেয়া হলো গণহত্যার অধিকার !
স্ফুলিঙ্গের মতো ঈদগাহে ছোটা এই কিশোরদের ধরো আগে
ওদের চোখে লকলক করছে স্বাধীনতার শিখা , উপড়ে ফেলো চোখ
ওদের বুকে শাঁ শাঁ করছে বিজয়ের স্লোগান , গুড়িয়ে দেও বুক
নিরাশার নদীতে জায়নামাজ বিছিয়ে ভোরের বন্দরে
ওরা যাত্রা চায় , পুড়াও জায়নামাজ

হৃদয়ে ওদের প্রেম আর বিশ্বাসী অনল , হৃদপিণ্ড কুকুরকে দিয়ে এসে
এদের মাথায় ছাউনি ফেলছে বিপ্লবের রোদ , পিষে ফেলো মাথা
ওদের মুখে জ্বলজ্বল করছে প্রত্যয়ী বিদ্যুৎ , বুলডোজাৱে দলিত করো মুখ
বায়ুমণ্ডলে সন্ত্রাসের হুমকি কমাতে হলে গণহত্যা চাই

চিন্তা নেই , এতে যদি ঝড় উঠে কোথাও ,
আমরা তাকে রজ্জুতে লটকাৰো
হত্যা করবো স্বয়ং স্বাধীনতাকে
দ্রিম দ্রিম করে এ নিয়ে বাজিয়ে যাবো ভীতির দামামা
অতঃপর কোন ধৃষ্ট আত্মার পতাকা নিয়ে রোরুদ্য সময়কে ছিড়ে
মুমূর্খ হাওয়ায় দ্রোহের ছড়াবে তুফান ?

গোলার্ধে গোলার্ধে মাননীয় সাম্রাজ্যবাদ পাঠ করবেন
নতুন পৃথিবীর বিধিলিপি !

সেই পৃথিবীর সব শস্যের রঙ হবে নীল
সব পাখিকে বাধ্যতামূলকভাবে গাইতে হবে একই গান
অনুমোদিত হাসি – কাশি – ভালোবাসাবাসি ছাড়া
আর কোনো দৃশ্য রচিত হবে না কোথাও
একটিমাত্র ঋতু পূর্ব – পশ্চিম – উত্তর – দক্ষিণে
দ্বিপদ যন্ত্রপাতির মাথার উপর দিয়ে ধেই ধেই নাচতে থাকবে একটানা
সর্বত্র গীর্জার ঘন্টা , গণতন্ত্র , লিভটুগেদার …

তছনছ পরিবার ছেড়ে বারে – পার্কে মত্ত রবে আত্মারিক্ত পুরুষ
ঘরহারা নারী হবে
চৌকস পণ্য কিংবা লাওয়ারিশ বার্গার
তবেই তো ব্যক্তির মুক্তি , পৃথিবীর পূর্ণ স্বাধীনতা

সেই পৃথিবীর পক্ষে অন্তরীক্ষে পরাশক্তির যৌবন গর্জায়
সময়ের বাদামী চামড়ায় মড়কের প্রচ্ছদ আঁকে বহুজাতিক হাত
খেতখামারে আহত স্বপ্নের হাড়গোড় পেঁচিয়ে
বিষাক্ত হাই তুলছে মত্ত অজগর

জগতের সমস্ত ন্যায় ও সুন্দরকে ধারণ করে বন্দিশিবিরে
পোকামাকড়দের বেয়াদব ঈদকে চুবানো হচ্ছে তপ্ত পানিতে !

এভাবে আর কতো ? এই চিত্র অনিঃশেষ ?
সাপের উদরেই থামলো ইতিহাসের নদীস্রোত?
পশুর কারাগারে আর্তনাদ করতে থাকবে মানুষের ঈদ?

না না বলে স্থুল নৈঃশব্দকে ভস্ম করে মাটির ভেতর থেকে
উঠে এলো শত শত শহীদ কিশোর ।
সৌরভের গ্রেনেড যেনো , পৃথিবীতে ঘটাবেই ওরা
প্রেম আর স্বাধীনতার মহাবিস্ফোরণ
মৃত্যুই এদেরকে দিলো এই অধিকার।

শহীদ আত্মাদের সামুদ্রিক অভ্যুত্থানে
ঝলসে উঠছে আগামীর ঈদগাহ – জায়নামাজ ।
সেখানে নামাজ পড়তে আলোর লেবাস পরে
আকাশে মার্চপাস্ট করছে ঈদের সকাল।

পাগল লোকটি / মুসা আল হাফিজ

লোকটি মানুষের ভিড়ে নিবিড় নিরবে নিখোঁজ নিজেকে খোঁজছে
ভগ্নলোকালয়, মগ্নসুখালয় নগ্নভোগালয় কিংবা
বহুজাতিক ডুবন্ত জাহাজ, উড়ন্ত রাজনীতি, থৈ থৈ হাহুতাশ
এবং মাতাল দুতাবাসে খুঁজছে মানুষ!

চন্দ্র-সূর্যগলা গোলাকার ঘরখানা মানুষের চাপে
চ্যাপ্টা হয়ে যায় আর লোকটি
মানুষ কোথায়?
মানুষ কোথায়?
বলে দিন-রাত জলে-স্থলে নিজেকে ঝরায়!

লোকটি / মুসা আল হাফিজ

লোকটি আকাশের হাত হাতে নিয়ে ভাগ্যরেখা দেখে আর
ধমকে সরে না এমন মেঘকে
ধমক দিয়ে বলে,
সরে যাও কুণ্ডুলিপাঁকানো কালো সাপ!

লোকটি প্রদীপ নিয়ে সারা দিন আলো খুঁজে দিনের আলোয়!
লোকটি সারাবেলা
ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট
শূন্যের মধ্যে হিসেব করছে-
জিরো প্লাস জিরো জিরো প্লাস জিরো…

লোকটি কার কথা বলছে?
লোকটি কীসের ভাষ্যকার?

গণতন্ত্র / মুসা আল হাফিজ

অন্ধকার অন্ধকারকে লাথি মারছে
অন্ধকার অন্ধকারকে চুমো দিলো

অন্ধকার অন্ধকারের প্রতিদ্বন্দ্বী
নির্বাচনে বাছাই করতে হবে
কোনো এক অন্ধকারকে

বাছাই করবে যারা , একটি গাধা আর
একটি সিংহ সমান এখানে

নাটক / মুসা আল হাফিজ

বাতাসের যে জগতে মৌনতার বাস
সে অতলে শব্দহীন এ কোন কোরাস?

আমাতে মুখর হয়ে আমাকে জাগায়
সকল প্রদীপে জ্বলে, নিজেকে জ্বালায়

গানের গহীনে বসে হেসেছে যে সুখ
কে দেখেছো কে দেখেছো সে প্রেমের মুখ

যত ধ্যান নিগূঢ় এই রাত্রির মনে
তার ভার ছড়ালাম বনে – উপবনে

বন হলো নিখিলের সবুজ সাধক
এভাবেই জমে গেলো দারুণ নাটক

ধরার নাটকগুলো জমবে বলে
আমার দিবস-রাত কেন যাবে গলে?

এখন আমায় দাও লিখতে নাটক
আমাতে প্রদীপ বন পাহাড় পাবক

সত্ত্বার সংগীত / মুসা আল হাফিজ

একটি মোহন হাসি জেগে আছে
উত্তরে, দক্ষিণে, পূর্বে, পশ্চিমে উপরে, নিচে
ডানে, বামে, আগুন-পানি, আলো- অন্ধকারের পাহারায়
সমস্ত স্রোতধারায়

কী নাম এ হাসির বলবে কবি?
আমি জানি তার নাম সব ভালো নাম

এ নামের মায়া থেকে তৃণের সংসারে এলো নন্দনের ঘ্রাণ
পৃথিবীতে নেমে এলো দুধের ফেনার মতো প্রত্যুষের প্রাণ

আত্মীয় বাতাস এসে দু’ মেরু সজাগ করে
ছড়ালো সে হাসির সুরে সবার সুরধারা!

অফুরান স্নেহের সুর চরাচরে ডেকে ফিরে – কোথায় তাতিরা!

প্রেমের সুতোয় করো হৃদয় বয়ন
নির্ভার মুক্তি তবে খুলবে নয়ন

আমি সেই হাসি দিয়ে সাজালাম আমাকে

তার সৌন্দর্যের বাঁকাদৃষ্টির নাম শিল্প
তার চাহনির ঝলকের নাম আলো
চোখের পলকের নাম ছন্দ এবং
এই মাত্র তার ডানা মেলার কোমল  মূদ্রাগুলো
আকাশের জানালা খুলে ছুটে গেলো!!

শুনো, তারা আত্মার প্রথম প্রদেশে প্রবেশ করেছে মাত্র!

শুরু হলো আমাদের সুরেলা জাগরণ
সকলেই ছুটে চললো অলৌকিক এয়ারপোর্টে
পথ জুড়ে পুষ্পের গান মাতোয়ারা নির্যাস
হরিৎ ফোয়ারাগুলো সুন্দরের ঘাসে-ঘামে মন মেখে দেয়
অনন্তের মোতিমালা সবুজের মস্তকে পাগড়ি হয়ে ঝলসায়

কোন এক মমতা-আওয়াজ যাত্রীদের ডাক দিলো আসমানী জলসায়!

আমি কোথায় যাবো?
নিশ্চয় তার একান্ত হাতে- ‘সিঁড়ি নিয়ে চলো’

যারা তার সান্নিধ্যে গিয়ে গলে যেতে চাও, নি:শেষে গলো

আমি তো কিষানের ছেলে
নিজেকে রোপণ করি আকাশে-বাতাসে
মহাকাশে ‘আমিবৃক্ষে’ দুলে তার ডাল
দেখে মহাকাল

কালো-ধলো, শক-হুন সকলের নাম
জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দু:খ আর পরিণাম
আমার পাতায় পাতায় বাজে দিবা-যাম

সাম্প্রতিক পৃথিবী / মুসা আল হাফিজ

দুধের গামলায় ক্লেদাক্ত পা ডুবিয়ে
ঘেউ ঘেউ করছে নেড়ে কুকুর
রক্তাক্ত সবুজ পড়ে আছে মৃত গোলাপদের মাঝখানে

জখমী সূর্য থেকে চুইয়ে পড়ছে লাল পুঁজ আর
সন্ধ্যার লাল প্রস্রাব

প্রতিধ্বনি আর ছায়ামূর্তিরা ইতিহাস থেকে নেমে আসছে
তারা কাউকে উন্মাদ বানাচ্ছে মেরে ফেলবে বলে !

আটলান্টিক পেরুতে কাদছে সভ্যতার যাযাবর

আজ কার জন্ম হয়েছিলো? / মুসা আল হাফিজ

আমার কি জন্ম হয়েছিলো কোনোদিন?
বাতাস কি শুনেছিলো আমার প্রথম চিত্কার?
কখন কোথায়?
মনে পড়ে না

শুধু মনে পড়ে জন্মের আগে আমার জন্ম হয়েছিলো
তারও আগে আমি ছিলাম কোথাও
না , আমি তো ছিলাম
আমার আসলে জন্ম হয়নি কোনো

কিন্তু যদি জন্মের কথা বলো, প্রতিমুহূর্তেই জন্ম নিচ্ছি

এই যে একটু আগে একটি কাক তার মাতৃভাষা শিখিয়ে গেলো
এই যে এক পশলা হাওয়া আমার আস্তিনে চুমু দিয়ে গেলো,
এই যে একটি নতুন ভোর আমাকে পাখায় চড়িয়ে নিলো
আমি এর মধ্যে আবিস্কার করছি অবিশ্বাস্য জন্মের সনদ

আমি জন্ম নিচ্ছি নিসর্গের রহস্যের ভেতর
কিন্তু বন্ধুগণ ! তোমাদের মধ্যে জন্ম নিতে পারছি না একটি বারও
কারণ তোমরা জন্ম বলতে বোঝাও মৃত্যুকে
যখন বলো ‘প্রিয় জনগণ’ তখন আসলে বলো ‘ হে তুচ্ছ তৃণলতা!’
যখন বলো ‘সেবা করতে চাই’,
তখন আসলে বলো ‘পদদলিত করতে চাই ‘
যখন বলো ‘স্বদেশ স্বদেশ’
তখন আসলে বলো ‘ মুরগি মুরগি’
যাকে জবাই বা বিক্রি করা ছাড়া তোমাদের কোনো অভিপ্রায় নেই

বন্ধুগণ! এই মৃত্যুদেশে কোনো জন্ম দেখি না

আগুনের মা / মুসা আল হাফিজ

আলো ও আগুনের মধ্যে অধিক উজ্জ্বল বলে আগুনকে গর্ভে নিয়ে
মেয়েটি হয়ে গেলো আগুনের মা!

আগুনের মা আগুনরে জড়িয়ে ধরে শান্তির বালিশে ঘুমায়
আগুনের ঘুম আসে না
ছটফট করে
আগুনরে বুকে তুলে নেয় আগুনের মা

গান গায় আমার আগুন যেন ‘থাকে দুধে-ভাতে’
দুধে ভাতে থাকতে থাকতে আগুন হলো যুবক

তাকে বলা হলো স্বপ্ন পুরণ করো, ‘জ্বলে উঠো আপন শক্তিতে’
মায়ের স্বপ্ন পুরণ করবে বলে
মায়ের বুকেই আগুন প্রথমবার জ্বলে উঠতে চায়

মায়ের বুকে আগুন যখন জ্বলে উঠলো
মা বলতে কেউ আর রইলো না
আগুনের দেহটাও পুড়তে থাকলো আগুনে!

আমরা আপন তেজে জ্বলে উঠা আগুনকে
অভিনন্দিত করতে করতে আগুনের পাশে বসে শরির শুকালাম!