সন্ধ্যা / সায়ীদ আবুবকর

অন্ধকার আর শান্তি ঝরে পড়ে এ ভরা সন্ধ্যায়
যেভাবে ঝরে পড়ে গোলাপফুল হতে নরম পাপড়িরা;
জমিন দেয় ভরে সুবাসে কামিনী ও রজনীগন্ধায়
জলধি দেয় ভরে যেভাবে তটিনীর শিরা ও উপশিরা।

পাখিরা ফিরে গেছে দিনের রোদ নিয়ে ক্লান্ত পাখনায়,
গিয়েছে থেমে সব শব্দসংগীত, সুরের ঝংকার;
জেগেছে নিরবতা, ফেলেছে ঢেকে তার জাদুর ঢাকনায়
বিশ্বচরাচর; অন্ধকার যেন বোবা অলংকার।

শান্তি ঝরে পড়ে শরীরে-আত্মায়, তুমুল বৃষ্টিতে
যেভাবে ভিজে যায় প্রতিটা রোমকূপ এবং অন্তর;
আহা-কি শীতলতা নেমেছে নিখিলের তাবৎ সৃষ্টিতে!
ভিজছে শান্তিতে আকাশে চাঁদ-তারা, মর্ত্যে বাড়িঘর।

২৭.৯.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

Advertisements

তর্পণ / কাজী নজরুল ইসলাম

(স্বর্গীয় দেশবন্ধুর চতুর্থ বার্ষিক শ্রাদ্ধ উপলক্ষে)

− আজিও তেমনই করি
আষাঢ়ের মেঘ ঘনায়ে এসেছে
ভারত-ভাগ্য ভরি।
আকাশ ভাঙিয়া তেমনই বাদল
ঝরে সারা দিনমান,
দিন না ফুরাতে দিনের সূর্য
মেঘে হল অবসান!
আকাশে খুঁজিছে বিজলি প্রদীপ,
খোঁজে চিতা নদী-কূলে,
কার বয়নের মণি হরায়েছে
হেথা অঞ্চল খুলে।
বজ্রে বজ্রে হাহাকার ওঠে,
খেয়ে বিদ্যুৎ-কশা
স্বর্গে ছুটেছে সিন্ধু –
ঐরাবত দীর্ঘশ্বসা।
ধরায় যে ছিল দেবতা, তাহারে
স্বর্গ করেছে চুরি;
অভিযানে চলে ধরণির সেনা,
অশনিতে বাজে তূরী।
ধরণির শ্বাস ধূমায়িত হল
পুঞ্জিত কালো মেঘে,
চিতাচুল্লিতে শোকের পাবক
নিভে না বাতাস লেগে।
শ্মশানের চিতা যদি নেভে, তবু
জ্বলে স্মরণের চিতা,
এ-পারের প্রাণ-স্নেহরসে হল
ও-পার দীপান্বিতা।

− হতভাগ্যের জাতি,
উৎসব নাই, শ্রাদ্ধ করিয়া
কাটাই দিবস রাতি!
কেবলই বাদল, চোখের বরষা,
যদি বা বাদল থামে –
ওঠে না সূর্য আকাশে ভুলিয়া
রামধনুও না নামে!
ত্রিশ জনে করে প্রায়শ্চিত্ত
ত্রিশ কোটির সে পাপ,
স্বর্গ হইতে বর আনি, আসে
রসাতল হতে শাপ!
হে দেশবন্ধু, হয়তো স্বর্গে
দেবেন্দ্র হয়ে তুমি
জানি না কী চোখে দেখিছ
পাপের ভীরুর ভারতভূমি!
মোদের ভাগ্যে ভাস্কর-সম
উঠেছিলে তুমি তবু,
বাহির আঁধার ঘুচালে,
ঘুচিল মনের তম কি কভু?
সূর্য-আলোকে মনের আঁধার
ঘোচে না, অশনি-ঘাতে
ঘুচাও ঘুচাও জাতের লজ্জা
মরণ-চরণ-পাতে!
অমৃতে বাঁচাতে পারনি এ দেশ,
ওগো মৃত্যুঞ্জয়,
স্বর্গ হইতে পাঠাও এবার
মৃত্যুর বরাভয়!
ক্ষূণ শ্রদ্ধার শ্রাদ্ধ-বাসরে
কী মন্ত্র উচ্চারি
তোমারে তুষিব, আমরা তো নহি
শ্রাদ্ধের অধিকারী!
শ্রদ্ধা দানিবে শ্রাদ্ধ করিবে
বীর অনাগত তারা
স্বাধীন দেশের প্রভাত-সূর্যে
বন্দিবে তোমা যারা!

পাথেয় / কাজী নজরুল ইসলাম

দরদ দিয়ে দেখল না কেউ যাদের জীবন যাদের হিয়া,
তাদের তরে ঝড়ের রথে আয় রে পাগল দরদিয়া।
শূণ্য তোদের ঝোলা-ঝুলি, তারই তোরা দর্প নিয়ে
দর্পীদের ওই প্রাসাদ-চূড়ে রক্ত-নিশান যা টাঙিয়ে।
মৃত্যু তোদের হাতের মুঠায়, সেই তো তোদের পরশ-মণি,
রবির আলোক ঢের সয়েছি, এবার তোরা আয় রে শনি!

শরৎচন্দ্র / কাজী নজরুল ইসলাম

(চণ্ডবৃষ্টি-প্রপাত ছন্দ)

নব ঋত্বিক নবযুগের!
নমস্কার! নমস্কার!
আলোকে তোমার পেনু আভাস
নওরোজের নব উষার!
তুমি গো বেদনা-সুন্দরের
দর্‌দ্-ই-দিল্, নীল মানিক,
তোমার তিক্ত কণ্ঠে গো
ধ্বনিল সাম বেদনা-ঋক।

হে উদীচী উষা চির-রাতের,
নরলোকের হে নারায়ণ!
মানুষ পারায়ে দেখিলে দিল্ –
মন্দিরের দেব-আসন।
শিল্পী ও কবি আজ দেদার
ফুলবনের গাইছে গান,
আশমানি-মউ স্বপনে গো
সাথে তাদের করনি পান।
নিঙারিয়া ধুলা মাটির রস
পিইলে শিব নীল আসব,
দুঃখ কাঁটায় ক্ষত হিয়ার
তুমি তাপস শোনাও স্তব।
স্বর্গভ্রষ্ট প্রাণধারায়
তব জটায় দিলে গো ঠাঁই,
মৃত সাগরের এই সে দেশ
পেয়েছে প্রাণ আজিকে তাই।
পায়ে দলি পাপ সংস্কার
খুলিলে বীর স্বর্গদ্বার,
শুনাইলে বাণী, ‘নহে মানব –
গাহি গো গান মানবতার।
মনুষ্যত্ব পাপী তাপীর
হয় না লয়, রয় গোপন,
প্রেমের জাদু-স্পর্শে সে
লভে অমর নব জীবন!’
নির্মমতায় নর-পশুর
হায় গো যার চোখের জল
বুকে জমে হল হিম-পাষাণ,
হল হৃদয় নীল গরল ;
প্রখর তোমার তপ-প্রভায়
বুকের হিম গিরি-তুষার –
গলিয়া নামিল প্রাণের ঢল,
হল নিখিল মুক্ত-দ্বার।
শুভ্র হল গো পাপ-মলিন
শুচি তোমার সমব্যথায়,
পাঁকের ঊর্ধ্বে ফুটিল ফুল
শঙ্কাহীন নগ্নতায়!

শাস্ত্র-শকুন নীতি-ন্যাকার
রুচি-শিবার হট্টরোল
ভাগাড়ে শ্মশানে উঠিল ঘোর,
কাঁদে সমাজ চর্মলোল!
ঊর্ধ্বে যতই কাদা ছিটায়
হিংসুকের নোংরা কর
সে কাদা আসিয়া পড়ে সদাই
তাদেরই হীন মুখের পর!
চাঁদে কলঙ্ক দেখে যারা
জ্যোৎস্না তার দেখেনি, হায়!
ক্ষমা করিয়াছ তুমি, তাদের
লজ্জাহীন বিজ্ঞতায়!
আজ যবে সেই পেচক-দল
শুনি তোমার করে স্তব,
সেই তো তোমার শ্রেষ্ঠ জয়,
নিন্দুকের শঙ্খ-রব!
ধর্মের নামে যুধিষ্ঠির
‘ইতি গজের’ করুক ভান!
সব্যসাচী গো, ধরো ধনুক –
হানো প্রখর অগ্নিবাণ!
‘পথের দাবি’র অসম্মান
হে দুর্জয়, করো গো ক্ষয়!
দেখাও স্বর্গ তব বিভায়
এই ধুলার ঊর্ধ্বে নয়!

দেখিছ কঠোর বর্তমান,
নয় তোমার ভাব-বিলাস,
তুমি মানুষের বেদনা-ঘায়
পাওনি গো ফুল-সুবাস।
তোমার সৃষ্টি মৃত্যুহীন
নব ধরার জীবন-বেদ,
করনি মানুষে অবিশ্বাস
দেখিয়া পাপ পঙ্ক ক্লেদ।
পুষ্পবিলাস নয় তোমার
পাওনি তাই পুষ্প-হার,
বেদনা-আসনে বসায়ে আজ
করে নিখিল পূজা তোমার!
অসীম আকাশে বাঁধনি ঘর
হে ধরণির নীল দুলাল!
তব সাম-গান ধুলামাটির
রবে অমর নিত্যকাল!
হয়তো আসিবে মহাপ্রলয়
এ দুনিয়ার দুঃখ-দিন
সব যাবে শুধু রবে তোমার
অশ্রুজল অন্তহীন।
অথবা যেদিন পূর্ণতায়
সুন্দরের হবে বিকাশ,
সেদিনও কাঁদিয়া ফিরিবে এই
তব দুখের দীর্ঘশ্বাস।
মানুষের কবি! যদি মাটির
এই মানুষ বাঁচিয়া রয় –
রবে প্রিয় হয়ে হৃদি-ব্যাথায়,
সর্বলোক গাহিবে জয়!

সুরের দুলাল / কাজী নজরুল ইসলাম

পাকা ধানের গন্ধ-বিধুর হেমন্তের এই দিন-শেষে,
সুরের দুলাল, আসলে ফিরে দিগ্‌বিজয়ীর বর-বেশে!
আজও মালা হয়নি গাঁথা হয়নি আজও গান-রচন,
কুহেলিকার পর্দা-ঢাকা আজও ফুলের সিংহাসন।
অলস বেলায় হেলাফেলায় ঝিমায় রূপের রংমহল,
হয়নিকো সাজ রূপকুমারীর, নিদ টুটেছে এই কেবল।
আয়োজনের অনেক বাকি – শুননু হঠাৎ খোশখবর,
ওরে অলস, রাখ আয়োজন, সুর-শাজাদা আসল ঘর।
ওঠ রে সাকি, থাক না বাকি ভরতে রে তোর লাল গেলাস,
শূন্য গেলাস ভরব – দিয়ে চোখের পানি মুখের হাস।

দম্ভ ভরে আসল না যে ধ্বজায় বেঁধে ঝড়-তুফান,
যাহার আসার খবর শুনে গর্জাল না তোপ-কামান,
কুসুম দলি উড়িয়ে ধূলি আসল না যে রাজপথে –
আয়োজনের আড়াল তারে করব গো আজ কোনোমতে।
সে এল গো যে-পথ দিয়ে স্বর্গে বহে সুরধুনী,
যে-পথ দিয়ে ফেরে ধেনু মাঠের বেণুর রব শুনি।
যেমন সহজ পথ দিয়ে গো ফসল আসে আঙিনায়,
যেমন বিনা সমারোহে সাঁঝের পাখি যায় কুলায়।
সে এল যে আমন-ধানের নবান্ন উৎসব-দিনে,
হিমেল হাওয়ায় অঘ্রানের এই সুঘ্রাণেরই পথ চিনে।

আনেনি সে হরণ করে রত্ন-মানিক সাত-রাজার
সে এনেছে রূপকুমারীর আঁখির প্রসাদ, কণ্ঠহার।

সুরের সেতু বাঁধল সে গো, ঊর্ধ্বে তাহার শুনি স্তব,
আসছে ভারত-তীর্থ লাগি শ্বেত-দ্বীপের ময়দানব।
পশ্চিমে আজ ডঙ্কা বাজে পুবের দেশের বন্দিদের,
বীণার গানে আমরা জয়ী, লাজ মুছেছি অদৃষ্টের।

কন্ঠ তোমার জাদু জানে, বন্ধু ওগো দোসর মোর!
আসলে ভেসে গানের ভেলায় বৃন্দাবনের বংশী-চোর।

তোমার গলার বিজয়-মালা বন্ধু একা নয় তোমার,
ওই মালাতে রইল গাঁথা মোদের সবার পুরস্কার।
কখন আঁখির অগোচরে বসলে জুড়ে হৃদয়-মন,
সেই হৃদয়ের লহো প্রীতি, সজল আঁখির জল-লিখন।

রীফ–সর্দার / কাজী নজরুল ইসলাম

তোমারে আমরা ভুলেছি আজ,
হে নবযুগের নেপোলিয়ন,
কোন সাগরের কোন সে পার
নিবু-নিবু আজ তব জীবন।

তোমার পরশে হল মলিন
কোন সে দ্বীপের দীপালি-রাত,
বন্দিছে পদ সিন্ধুজল,
ঊর্ধ্বে শ্বসিছে ঝঞ্ঝাবাত।

তব অপমানে, বন্দি-রাজ,
লজ্জিত সারা নর-সমাজ,
কৃতঘ্নতা ও অবিশ্বাস
আজি বীরত্বে হানিছে লাজ।

মোরা জানি আর জানি জগৎ
শত্রু তোমারে করেনি জয়,
পাপ অন্যায় কপট ছল
হইয়াছে জয়ী, শত্রু নয়!

সম্মুখে রাখি মায়া-মৃগ
পশ্চাৎ হতে হানে শায়ক –
বীর নহে তারা ঘৃণ্য ব্যাধ
বর্বর তারা নর-ঘাতক।

হে মরু-কেশরী আফ্রিকার!
কেশরীর সাথে হয়নি রণ,
তোমারে বন্দি করেছে আজ
সভ্য ব্যাধের ফাঁদ গোপন।

কামানের চাকা যথা অচল
রৌপ্যের চাকি ঢালে সেথায়,
এরাই য়ুরোপি বীরের জাত
শুনে লজ্জাও লজ্জা পায়!

তুমি দেখাইলে, আজও ধরায়
শুধু খ্রিস্টের রাসভ নাই,
আজও আসে হেথা বীর মানব,
ইবনে – করিম কামাল -ভাই।

আজও আসে হেথা ইবনে-সৌদ,
আমানুল্লাহ্ , পহ্‌লবী ,
আজও আসে হেথা আলতরাশ ,
আসে সনৌসী – লাখ রবি।

তুমি দেখাইলে, পাহাড়ি গাঁয়
থাকে নাকো শুধু পাহাড়ি মেষ,
পাহাড়েও হাসে তরুলতা
পাহাড়ের মতো অটল দেশ।

থাকে নাকো সেথা শুধু পাথর,
সেথা থাকে বীর-শ্রেষ্ঠ নর,
সেথা বন্দরে বানিয়া নাই
সেথা বন্দরে নাই বাঁদর!

শির-দার তুমি ছিলে রীফের,
পরনিকো শিরে শরিফি তাজ,
মামুলি সেনার সাথে সমান
করেছ সেনানী, কুচকাওয়াজ!

শুধু বীর নহ, তুমি মানুষ,
শাহি তখ্‌ত্ ছিল গিরি-পাষাণ,
রণভূমে ছিলে রণোন্মাদ,
দেশে ছিলে দোস্ত্ মেহেরবান।

রীফেতে যেদিন সভ্য ভূত
নাচিতে লাগিল তাথই থই,
আশমান হতে রীফ-বাসীর
শিরে ছড়াইল আগুন-খই,

কচি বাচ্চারে নারীদেরে
মারিল বক্ষে বিঁধে সঙিন,
যুদ্ধে আহত বন্দিরে
খুন করে যার হাত রঙিন,

হয়েছে বন্দি তাহারা যখন –
(ওদের ভাষায় – হে ‘বর্বর’।)
করিয়াছ ক্ষমা তাহাদেরে,
তাহাদের করে রেখেছ কর।

ওগো বীর! বীর বন্দিদের,
করনিকো তুমি অসম্মান,
তাদের নারী ও শিশুদেরে
দিয়েছ ফিরায়ে – হরনি প্রাণ।

তুমি সভ্যতা-গর্বীদের
মিটাওনি শুধু যুদ্ধ-সাধ,
তাদেরে শিখালে মানবতা,
বীর সে মানুষ, নহে নিষাদ।

বীরেরে আমরা করি সালাম,
শ্রদ্ধায় চুমি দস্ত্ দারাজ,
তোমারে স্মরিয়া কেন যেন
কেবলই অশ্রু ঝরিছে আজ।

তব পতনের কথা করুণ
পড়িতেছে মনে একে একে,
তব মহত্ত্ব তুমি নিজে
মানুষের বুকে গেলে লেখে।

মাসতুতো ভাই চোরে চোরে –
ফ্রান্স স্পেন করি আঁতাত
হয়ে লাঞ্ছিত বারংবার
হায়ওয়ান সাথে মিলাল হাত।

শয়তানি ছল ফেরেব-বাজ
ভুলাল দেশদ্রোহীর মন,
অর্থ তাদের করিল জয়
অস্ত্রে যাহারা জিনিল রণ।

স্বদেশবাসীরে কহো ডাকে
অশ্রু-সিক্ত নয়নে, হায় –
‘ভাঙে নাই বাহু, ভেঙেছে মন,
বিদায় বন্ধু, চির-বিদায়!’

বলিলে, ‘স্বদেশ! রীফ-শরিফ!’
পরানের চেয়ে প্রিয় আমার!
তুমি চেয়েছিলে মা আমায়,
সন্তান তব চাহে না আর!

‘মাগো তোরে আমি ভালোবাসি,
ভালোবাসি মা তারও চেয়ে –
মোর চেয়ে প্রিয় রীফ-বাসী
তোর এ পাহাড়ি ছেলেমেয়ে!

‘মাগো আজ তারা বোঝে যদি,
করিতেছি ক্ষতি আমি তাদের,
আমি চলিলাম, দেখিস তুই,
তারা যেন হয় আজাদ ফের!’

দেশবাসী-তরে, মহাপ্রেমিক,
আপনারে বলি দেলে তুমি,
ধন্য হইল বেড়ি-শিকল
তোমার দস্ত্-পদ চুমি!

আজিকে তোমায় বুকে ধরি
ধন্য হইল সাগর-দ্বীপ,
ধন্য হইল কারা-প্রাচীর,
ধন্য হইনু বদ-নসিব।

কাঠ-মোল্লার মউলবির
যুজদানে ইসলাম কয়েদ,
আজও ইসলাম আছে বেঁচে
তোমাদেরই বরে, মোজাদ্দেদ!

বদ-কিসমত শুধু রীফের
নহে বীর, ইসলাম-জাহান
তোমারে স্মরিয়া কাঁদিছে আজ,
নিখিল গাহিছে তোমার গান।

হে শাহানশাহ্ বন্দিদের!
লাঞ্ছিত যুগে যুগাবতার!
তোমার পুণ্যে তীর্থ আজ
হল গো কারার অন্ধকার!

তোমার পুণ্যে ধন্য আজ
মরু-আফ্রিকা মূর-আরব,
ধন্য হইল মুসলমান,
অধীন বিশ্ব করে স্তব।

জানি না আজিকে কোথা তুমি
নয়ি দুনিয়ার মুসা তারিক !
আছে ‘দীন’, নাই সিপা-সালার ,
আছে শাহি তখ্‌ত্, নাই মালিক।

মোরা যে ভুলেছি, ভুলিয়ো বীর,
নাই স্মরণের সে অধিকার,
কাঁদিছে কাফেলা কারবালায়,
কে গাহিবে গান বন্দনার!

আজিকে জীবন-‘ফোরাত’ -তীর
এজিদের সেনা ঘিরিয়া ওই,
শিরে দুর্দিন-রবি প্রখর,
পদতলে বালু ফোটায় খই।

জয়নালসম মোরা সবাই
শুইয়া বিমারি খিমার মাঝ,
আপশোশ করি কাঁদি শুধু,
দুশমন করে লুটতরাজ!

আব্বাস-সম তুমি হে বীর
গেন্ডুয়া খেলি অরি-শিরে
পঁহুছিলে একা ফোরাত-তীর,
ভরিলে মশক প্রাণ-নীরে।

তুমি এলে, সাথে এল না দস্ত্,
করিল শত্রু বাজু শহিদ,
তব হাত হতে আব-হায়াত
লুটে নিল ইউরোপ-এজিদ।

কাঁদিতেছি মোরা তাই শুধুই
দুর্ভাগ্যের তীরে বসি,
আকাশে মোদের ওঠে কেবল
মোহররমের লাল শশী!

এরই মাঝে কভু হেরি স্বপন –
ওই বুঝি আসে খুশির ঈদ,
শহিদ হতে তো পারি না কেউ –
দেখি কে কোথায় হল শহিদ।

ক্ষমিয়ো বন্ধু, তব জাতের
অক্ষমতার এ অপরাধ,
তোমারে দেখিয়া হাঁকি সালাত
ওগো মগ্‌রেবী ঈদের চাঁদ!

এ গ্লানি লজ্জা পরাজয়ের
নহে বীর, নহে তব তরে!
তিলে তিলে মরে ভীরু য়ুরোপ
তব সাথে তব কারা-ঘরে।

বন্দি আজিকে নহ তুমি,
বন্দি – দেশের অবিশ্বাস!
আসিছে ভাঙিয়া কারা-দুয়ার
সর্বগ্রাসীর সর্বনাশ!

যৌবন / কাজী নজরুল ইসলাম

− ওরে ও শীর্ণা নদী,
দু-তীরে নিরাশা-বালুচর লয়ে জাগিবি কি নিরবধি?
নব-যৌবনজলতরঙ্গ-জোয়ারে কি দুলিবি না?
নাচিবে জোয়ারে পদ্মা গঙ্গা, তুই রবি চির-ক্ষীণা?
ভরা ভাদরের বরিষন এসে বারে বারে তোর কূলে
জানাবে রে তোরে সজল মিনতি, তুই চাহিবি না ভুলে?
দুই কূলে বাঁধি প্রস্তর-বাঁধ কূল ভাঙিবার ভয়ে
আকাশের পানে চেয়ে রবি তুই শুধু আপনারে লয়ে?
ভেঙে ফেল বাঁধ, আশেপাশে তোর বহে যে জীবন-ঢল
তারে বুকে লয়ে দুলে ওঠ তুই যৌবন-টলমল।
প্রস্তর-ভরা দুই কূল তোর ভেসে যাক বন্যায়,
হোক উর্বর, হাসিয়া উঠুক ফুলে ফলে সুষমায়।
− একবার পথ ভোল,
দূর সিন্ধুর লাগি বুকে জাগুক মরণ-দোল!

জাগরণ / কাজী নজরুল ইসলাম

জেগে যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের দ্বারে আসি
ওরে পাগল, আর কতদিন বাজাবি তোর বাঁশি!
ঘুমায় যারা মখমলের ওই কোমল শয়ন পাতি
অনেক আগেই ভোর হয়েছে তাদের দুখের রাতি।
আরাম-সুখের নিদ্রা তাদের; তোর এ জাগার গান
ছোঁবে নাকো প্রাণ রে তাদের, যদিই বা ছোঁয় কান!

নির্ভয়ের ওই সুখের কূলে বাঁধলযারা বাড়ি,
আবার তারা দেবে না রে ভয়ের সাগর পাড়ি।
ভিতর হতে যাদের আগল শক্ত করে আঁটা
‘দ্বার খোলো গো’ বলে তাদের দ্বারে মিথ্যা হাঁটা।
ভোল রে এ পথ ভোল,
শান্তিপুরে শুনবে কে তোর জাগর-ডঙ্কা-রোল!
ব্যাথাতুরের কান্না পাছে শান্তি ভাঙে এসে
তাইতে যারা খাইয়ে ঘুমের আফিম সর্বনেশে
ঘুম পাড়িয়ে রাখছে নিতুই, সে ঘুম-পুরে আসি
নতুন করে বাজা রে তোর নতুন সুরের বাঁশি!
নেশার ঘোরে জানে না হায়, এরা কোথায় পড়ে,
গলায় তাদের চালায় ছুরি কেই বা বুকে চড়ে,
এদের কানে মন্ত্র দে রে, এদের তোরা বোঝা,
এরাই আবার করতে পারে বাঁকা কপাল সোজা।
কর্ষণে যার পাতাল হতে অনুর্বর এই ধরা
ফুল-ফসলের অর্ঘ্য নিয়ে আসে আঁচল-ভরা,
কোন সে দানব হরণ করে সে দেব-পূজার ফুল –
জানিয়ে দে তুই মন্ত্র-ঋষি, ভাঙ রে তাদের ভুল!

বর্বরদের অনুর্বর ওই হৃদয়-মরু চষে
ফল ফলাতে পারে এরাই আবার ঘরে বসে।
বাঘ-ভালুকের বাথান তেড়ে নগর বসায় যারা
রসাতলে পশবে মানুষ-পশুর ভয়ে তারা?
তাদেরই ওই বিতাড়িত বন্যপশু আজি
মানুষ-মুখো হয়েছে রে সভ্যসাজে সাজি।
টান মেরে ফেল মুখোশ তাদের, নখর কন্ত লয়ে
বেরিয়ে আসুক মনের পশু বনের পশু হয়ে!

তারাই দানব অত্যাচারী – যারা মানুষ মারে,
সভ্যবেশী ভণ্ড পশু মারতে ডরাস কারে?
এতদিন যে হাজার পাপের বীজ হয়েছে বোনা
আজ তা কাটার এল সময়, এই সে বাণী শোনা!
নতুন যুগের নতুন নকিব, বাজা নতুন বাঁশি,
স্বর্গ-রানি হবে এবার মাটির মায়ের দাসী!

জীবন-বন্দনা / কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি তাহাদের গান –
ধরণির হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান।
শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে
ত্রস্তা ধরণি নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে।
বন্য-শ্বাপদ-সংকুল জরা-মৃত্যু-ভীষণা ধরা
যাদের শাসনে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহরা।
যারা বর্বর হেথা বাঁধে ঘর পরম অকুতোভয়ে
বনের ব্যাঘ্র মরুর সিংহ বিবরের ফণী লয়ে।
এল দুর্জয় গতিবেগ সম যারা যাযাবর-শিশু
– তারাই গাহিল নব প্রেমগান ধরণি-মেরির জিশু –
যাহাদের চলা লেগে
উল্কার মতো ঘুরিছে ধরণি শূন্যে অমিত বেগে !

খেয়াল খুশিতে কাটি অরণ্য রচিয়া অমরাবতী
যাহারা করিল ধ্বংসসাধন পুন চঞ্চলমতি,
জীবন-আবেগ রুধিতে না পারি যারা উদ্ধত-শির
লঙ্ঘিতে গেল হিমালয়, গেল শুষিতে সিন্ধু-নীর।
নবীন জগৎ সন্ধানে যারা ছুটে মেরু-অভিযানে,
পক্ষ বাঁধিয়া উড়িয়া চলেছে যাহারা ঊর্ধ্বপানে।
তবুও থামে না যৌবন-বেগ, জীবনের উল্লাসে
চলেছে চন্দ্র-মঙ্গল-গ্রহে স্বর্গে অসীমাকাশে।
যারা জীবনের পসরা বহিয়া মৃত্যুর দ্বারে দ্বারে
করিতেছে ফিরি, ভীম রণভূমে প্রাণ বাজি রেখে হারে।
আমি মর-কবি – গাহি সেই বেদে-বেদুইনদের গান,
যুগে যুগে যারা করে অকারণ বিপ্লব-অভিযান।
জীবনের আতিশয্যে যাহারা দারুণ উগ্রসুখে
সাধ করে নিল গরল-পিয়ালা, বর্শা হানিল বুকে !
আষাঢ়ের গিরি-নিঃস্রাবসম কোনো বাধা মানিল না,
বর্বর বলি যাহাদের গালি পাড়িল ক্ষুদ্রমনা,
কূপমণ্ডূক ‘অসংযমী’র আখ্যা দিয়াছে যারে,
তারই তরে ভাই গান রচে যাই, বন্দনা করি তারে !

তরুণ তাপস / কাজী নজরুল ইসলাম

রাঙা পথের ভাঙন-ব্রতী অগ্রপথিক দল!
নাম রে ধুলায়−বর্তমানের মর্তপানে চল।।
ভবিষ্যতের স্বর্গ লাগি
শূন্যে চেয়ে আছিস জাগি
অতীতকালের রত্ন মাগি
নামলি রসাতল।
অন্ধ মাতাল! শূন্য পাতাল, হাতালি নিষ্ফল।।
ভোল রে চির-পুরাতনের সনাতনের বোল।
তরুণ তাপস! নতুন জগৎ সৃষ্টি করে তোল।
আদিম যুগের পুথির বাণী
আজও কি তুই চলবি মানি?
কালের বুড়ো টানছে ঘানি
তুই সে বাঁধন খোল।
অভিজাতের পানসে বিলাস–দুখের তাপস! ভোল।।