তার কোনো নাম লেখা নেই / সাইফ আলি

সদ্য খোড়া কবরটার দেয়ালের কিছু জায়গা দাদরোখাদরো হয়ে আছে। যিনি কবরটা খুড়ছেন তিনি বহুবার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি, আলগা মাটি; খসতে কারো উসকে দেওয়া লাগে না। গোরখোদক চাচা একবার শুয়ে পড়ে দেখলেন লম্বায় ঠিক হবে কিনা। ছয় ফিট লম্বা মানুষটার ঘার কিছুটা কাত হয়ে থাকলো। তবে যার জন্য কবরটা খোড়া হয়েছে সে সর্বোচ্চ পাঁচ ফিট হতে পারে।

খোড়াখুড়ির কাজ শেষ হলে আমার উপর কোদাল পাহারা দেওয়ার মহান দায়িত্ব অর্পণ করে তিনি চলে গেছেন। সারি সারি কবরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেমন যেনো অস্বস্তি বোধ করছি। সদ্য খোড়া কবরটার পাশেই একটা ছোট্ট কবর। এক সপ্তাও হয়নি। জন্মের কয়েক ঘন্টা পরেই মারা গিয়েছিল। চাচা বলছিলেন- কবরটা ভালো যায়গায় হয়েছে, নিষ্পাপ শিশুর কবরের পাশে। আহা! নিষ্পাপ; কত বড় সার্টিফিকেট শিশুটার!

ঘুরে ঘুরে কবর দেখছি। কোনো কোনোটায় নাম পরিচয় দেওয়া আছে। গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ছিলেন হয়তো; নামের প্রয়োজন ফুরোয়নি এখনো! একটু এগিয়ে গেলাম,  প্রবেশপথের পাশেই; একটা কবর। নাম লেখা আছে তবে তা আগের জনের। কিছুদিন আগেই এখানে নতুন একজনকে শুয়ানো হয়েছে। নাম আগেরটাই আছে। পরের জনের নামটা জানি আমি। কাছের বড় ভাই ছিলেন। স্বপ্নবাজ মানুষ, বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর চোখদুটো এখনো তাকিয়ে আছে। সামনের দুটো দাঁত উঁচু ছিলো। হাসলে অদ্ভুত সুন্দর দেখাতো ভাইকে। শেষ যখন দেখা হয়েছিলো তখন আমার অনেক অভিযোগ। কান্না চেপে হাসতে হাসতে বলেছিলাম- ভাই, এভাবে আর কতোদিন? তার মুখে হাসি!

কবরটার পাশে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে। দিনটা কি বার ছিলো মনে নেই। ঢাকা থেকে বাড়িতে এসেছিলাম ছুটিতে। হঠাৎ শুনলাম তিনি আর নেই। লাশ রাখা ছিলো, সাহস নিয়ে দেখতে পারিনি। নখগুলো তোলা, চোখগুলো তোলা… কিভাবে দেখতাম। বৃষ্টির দিন। কান্না লুকানোর চেষ্টা করিনি। বৃষ্টিভেজা জানাজার পর এই কবরেই শোয়ানো হয়েছিলো। এখানে তার কোনো নাম লেখা নেই।

কুঁড়ি টাকা কেজি / সাইফ আলি

: চাচামিয়া শাঁক যদি ভালো না হয় টাকা ফেরত দিতে হবে কিন্তু…
: ঠিক আছে বাপু নিয়ে যাও…টাকা দিয়া লাগবে না, খায়ে যদি তিতে লাগে তালি আর টাকা দিয়া লাগবে না; নিয়ে যাও।
: তালি দেন হাফ কেজি, টাকা দিয়েই দিলাম… আপনার কথায়
: না না বাপু তুমি নিয়ে যাও তো… গরিবির টাকা না দিলিউ হয়।
: না রাখেন।
চাচামিয়া দশ টাকার নোটটা পকেটে ঢুকিয়ে ঘাম মুছলেন। বাজারের রাস্তার উপরের ঝুড়ি ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন চাচামিয়া। রোদে তার তেলতেলে মাথাটা চক চক করছে। ঝুড়িতে পালং আর মটরের শাঁক।
: শাঁক কত করে কাকা?
: কুঁড়ি টাকা কেজি। দেবো… খুব ভালো হবেনে…
: দেন এক কেজি। আর পালং..?
: নেও তিন আটি দশ টাকা দিয়েনে… পাঁচ টাকা আটি বেচছি…
: দেন। কিন্তু চাচা আটি তো ব্যগে ধরবে না, আরো কিছু বাজার করতি হবে। আপনার কাছেই রাখেন আমি ঘুরে এসে নিচ্ছি।
: ঠিক আছে যাও।
এরপর কিছুক্ষণ এটা ওটা কেনাকাটা করে যখন চাচামিয়ার কাছে পালঙের আটি নেওয়ার জন্য ফিরে এলাম তখন তার পাশে এক যুবক। যুবকের কথায় কান পেতে যা জানতে পারলাম তা হচ্ছে বাড়িতে চাচি বেশ অসুস্থ। টিউমারটা কাটতে না পারলে ক্যান্সার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাচামিয়া মাথা ঘাম আর চোখের পানি এক করতে করতে বললেন… দেখি আল্লায় কি করে।
: চাচা, শাঁক কত করে…
: কুড়ি টাকা কেজি… নেও বাপু ভালো হবেনে… খুব কচি শাঁক… ইটটুউ তিতে হবে না…

হালুম / সাইফ আলি

হালুম রাজা হওয়ার পর থেকে বনের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কেউ শান্তিতে ঘুরতে পারছে না। ভয়ে গোটা বন কেমন যেনো চুপসে আছে। হালুমের বাবা রাজা থাকতে অন্যরকম ছিলো। দিনে একটা শিকার করে শান্ত থাকতো। বাঘের পেট তো আর ঘাস দিয়ে ভরবে না, তার জন্য খাবার তো হতেই হবে কাউকে। কিন্তু হালুম রাজা হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন কম করে হলেও পাঁচটা শিকার সে করবেই। সুযোগ পেলে তারও বেশি। বনের মধ্যে হরীণেরা ঘুরতে পারে না, খরগোশগুলো লাফিয়ে বেড়ানো বন্ধ করেছে। বানরেরা গাছের উপরে কিছুটা নিরাপদ থাকলেও শান্তিতে নেই। ফলে হালুমের অগোচরে একদিন বনের সবাই সভা ডাকলো। সভায় অনেকে অনেক কথা বললেও মূল কথা একটাই… আর তা হলো হালুমের এই অত্যাচারের একটা সমাধান করতে হবে। কেউ বললো পাশেই মানুষে গ্রাম আছে, কোনোভাবে ওদিকটাতে নিয়ে যেতে পারলে বেটাকে ধরে ওরা দেয়ালে টাঙাবে। কেউ বললো অন্য বন থেকে আরো বড় বাঘ এনে সায়েস্তা করতে হবে। কিন্তু পরে যদি সেই জেকে বসে ঘাড়ের উপর! তাহলে তো আর সমাধান হবে না। শেষমেশ কিছুই যখন করা সম্ভব না বলে সবাই হাল ছেড়ে দিলো তখন খরগোশ বললো, ঠিক আছে সমস্যার যদি সমাধান নাই হয় তাহলে আমরা হালুমের সাথে একটা চুক্তি করতে পারি। সবাই উৎসাহি হয়ে তাকালো তার দিকে। সে তখন ভারাক্রান্ত মনে বললো, আমাদের যখন তার খাবার হতেই হবে তখন আমরাই নিধারণ করবো যে আজ কে তার খাবার হবে। সবাই শুনে আৎকে উঠলো। াকভাবে সম্ভব!? কেউ কি আর ইচ্ছে করে হালুমের খাবার হতে চাবে। খরবো বললো, তা চাবে না তবে আমরা লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করবো যে আজ কে কে হালুমের শিকার হবে। তারা না যেতে চাইলেও আমরা জোর করে পাঠাবো, ফলে তারা ছাড়া অন্যরা সারাদিন নিরাপদে ঘুরতে পারবে, খেতে পারবে। হয়তো প্রথম দিনে লটারিতে আমার নামও আসতে পারে। আমি তাতে প্রস্তুত আছি। সবাই খরগোশের কথা অপছন্দ করলেও মেনে নিলো… কারণ এছাড়া কেউ ভালো কোনো সমাধান দিতে পারেনি।
সভা থেকে একদল সোজা হালুমের কাছে গেলো। গিয়ে তাদের কথা জানালো। হালুম দেখলো- এর চেয়ে ভালো কি হতে পারে। ঘরে বসেই খাবার পাওয়া যাবে। তাহলে আর কষ্ট করে শিকার করা কেনো? তবে তাই হোক।
পরদিন থেকে শুরু হলো লটারি। প্রতিদিন দশজনকে মৃত্যুদন্ড মাথায় নিয়ে হালুমের দরবারে হাজির হতে হয়। হালুমের তো সুখ ধরে না। এভাবে এক মাস, দুই মাস, তিন মাস… বছর পার হয়ে গেলো। বনের ভেতর সবকিছু ঠিকঠাক চলছিলো কথাটা সত্য কিন্তু কারো মনে সুখ ছিলো না। কারণ, নিজেদের প্রিয় বন্ধুদের তারা নিজেরাই জোর করে হালুমের নিকট ছেড়ে আসতো আর বুকে পাথর বেঁধে চলে আসতো। তাদের আর আনন্দে ঘুরে ঘুরে ঘাস খাওয়া হতো না। কারও মনে সুখ ছিলো না। ফলে তারা আবার একটা সভার আয়োজন করলো। এবারের সভায় তারা সবাই এই পদ্ধতির বিরোধিতা করলো। ফলে সভার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলো। কাল থেকে আর কেউ হালুমের কাছে যাবে না। খেতে হলে ওকেও কষ্ট করেই খাওয়া লাগবে। ঘরে বসিয়ে বসিয়ে আমরা তাকে খাওয়াতে পারি না। সবাই সবার ঘরে ফিরে গেলো।
হালুমের কানে সংবাদটা যেতেই হালুম রেগে উঠলো- আমি বনের রাজা, এটা তো আমার এমনিতেই প্রাপ্য। ঠিক আছে, আমিও সবকটাকে দেখে ছাড়বো।
পরদিন সকালে হালুম তার ঘর থেকে বের হলো শিকারের জন্য। কিন্তু সে দেখলো তার পায়ে আর আগের মতো গতি নেই। সে যেনো শিকারের কৌশলগুলো ভুলে গেছে। শরীরে চর্বি জমে গেছে; ফলে সে আর দৌড়াতে পারছে না। সারাদিন অনেক চেষ্টা করেও সে কোনো শিকার পেলো না। আবার সারাদিন না খেয়ে শরীরটাও নেতিয়ে পড়েছে। সে নিজের ভুল বুঝতে পারলো। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। কাল সকালে সে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন সে কাউকেই শিকার করতে পারবে না। খরগোশ, হরীন তো দূরের কথা একটা মুরগীও সে ধরতে পারবে না। তাহলে এখন কি করা যায়? হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো… কাল সকালে সে সবাইকে ডাকবে… তারপর এই বলে ভয় দেখাবে যে ইচ্ছা করলে সে সবাইকে শিকার করতে পারে কিন্তু সে তা চায় না। সবাই ভালোভাবে শান্তিতে থাকুক এটা সেও চায়। তারপর তাদের লোভ দেখানো হবে এই বলে যে এখন আর তাদের দশজনকে পাঠাতে হবে না। তারা পাঁচ জনকে পাঠালেই চলবে। তারা যদি এই কথায় রাজি হয়ে যায় তাহলে তো…. মনে মনে এইসব ভাবতে ভাবতে সে তার সারাদিনের ক্ষুধার জ্বালা ভুলে থাকার চেষ্টা করতে লাগলো। একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো হালুম…

কেন্দ্র হবে নাকি পরিধি / সাইফ আলি

চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুটা কেমন এক জায়গায় আটকে গেছে। মাথার উপর ফ্যানের তিনটা পাখা বো বো করে ঘুরছে। একই সাথে কথাগুলোও কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। অস্বস্তি বোধ করছে রুমা। পাশ ফিরে শুয়ে সামনের দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে থাকলো । একটা টিকটিকি তরতর করে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। কি আয়েশ করেই না খাড়া দেয়ালটায় হেটে বেড়াচ্ছে ওটা। পাশের জানালা দিয়ে যে সামান্য আলো দেয়ালে এসে পড়েছে তাতেই দেখা যাচ্ছে ওটাকে। কিন্তু এই সামান্য আলোয় ওর লক্ষ্যবস্তু সন্ধান করাটা সমিচিন নয় ভেবে চোখ সরিয়ে নিলো রুমা। গতকাল ক্যাম্পাসে গিয়েছিলো যখন তখন মাথা পরিষ্কার। পড়ালেখার চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তাই ছিলো না। কিন্তু শাফি এমন একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেবে হঠাৎ করেই এটা ওর কল্পনায় আসেনি। শাফি ওর ক্লাসমেট, যদিও বয়সে ওর থেকে একটু বড়ই হবে। কি একটা কারণে শিক্ষাজীবনের কয়েকটা বছর নষ্ট হয়েছে ছেলেটার। পরিষ্কারভাবে জানা না থাকলেও বন্ধুদের কাছে শুনেছে শাফি যখন কলেজে পড়ে তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে ছ’মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে ওকে। যা ই হোক ছেলেটা ভালো এবং বুদ্ধিদীপ্ত। খুব মিশুক না হলেও বন্ধু মহলে যথেষ্ট খোলামেলা।
রুমা সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রী। চতুর্থ বর্ষ। আর কয়েক মাস পরেই পরীক্ষা। এর মধ্যেই অনেক প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু পড়ালেখার কথা বলে এড়িয়ে গেছে এতোদিন। কিন্তু এবার তো ভাবতেই হচ্ছে। আর এই ভাবনার জগতে হঠাৎ করেই শাফির উত্থান। কি উত্তর দেবে ওকে। ছেলেটা সোজা সাপ্টা প্রশ্নটা করলেই পারতো, এতো ঘুরিয়ে বলার দরকার টা কি। বিরক্ত হয় রুমা। কিন্তু ছেলেটার এই বাঁকা প্রশ্নটাই যে সারারাত ওকে জাগিয়ে রেখেছে! এত সিরিয়াসলি ভাবনার খোরাক জোগান দেওয়াটাও কিন্তু সহজ ব্যপার না।
দেয়ালে জানালা গলে আসা আলোটা স্থান পরিবর্তন করেছে। এখন আলোটার বুকে মরা গাছটার ডালপালা একটা লম্বাটে চিত্রকর্মের রূপ দিয়েছে। একটু একটু নড়ছে ছবিটা। ভাবনার জগতে ছেদ পড়ে রুমার। টিকটিকিটা কোথা থেকে যেনো আওয়াজ দিচ্ছে। রাত কতো হলো? একটু পরেই কি আজান দেবে? তাহলে ঘুম? সকালে উঠে ক্লাস আছে। না, সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। ঘুমের কোনো রেশই নেই চোখে। অথচ পাশের বেডে বান্ধবী কেমন আরামে ঘুমাচ্ছে। কাক ডাকছে বাইরে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সকাল হয়ে যাবে। চোখ বন্ধ করলো রুমা। যে করেই হোক একটু ঘুমাতে হবে। তা না হলে ক্লাসে যেয়ে ঘুমানোর বিকল্প থাকবে না।
‘কেন্দ্র হবে নাকি পরিধি?’ শাফি দাঁড়িয়ে আছে সামনে। রুমা জানে কি বলবে ও।
বান্ধবীর চেচামেচিতে ঘুম ভাঙলো রুমার। -কিরে? চেচাচ্ছিস ক্যান…? ঘুম জড়ানো কণ্ঠ রুমার। ‘কতো বাজে দেখেছিস, আজ আর তোর ক্লাসে যাওয়া লাগবে না, আমি গেলাম।’ ‘একটু দাঁড়া, আমিও যাবো…

যদু / সাইফ আলি

সে শুধু ভাবে। আর পাঁচজন লোকের সাথে তার পার্থক্যটাই এখানে। তার একটাই কথা- কাজ যখন করবো, ভেবে চিন্তেই করবো; না জেনেশুনে কাজে নামে বোকালোক। ধরা খাওয়াটাও তাদের নিত্য নৈমেত্যিক ব্যপার। যেমন ধরুন ঐ কলিমের কথাই বলি, গেলো বছর পেয়াজে লাভ দেখে মনে করেছিলো এবারও… কিন্তু হলোটা কি? উল্টা। এবার নির্ঘাত লোকশানে পড়বে বেচারা। আরে বার বার কি আর এক সোনা ফলে। তারপর বকুল মিয়ার কথা ভাবো, মাছের চাষ করে দু’বছর বেশ লাভই করেছিলো, কিন্তু এবার পানিতে যে ঘের শুদ্ধ ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সে কি আর জানতো?? বেচারা। তাই বলি, কাজে নামার আগে বহুৎ চিন্তা ভাবনার দরকার আছে। এমন কাজে নামতে হবে যেনো লাভ ছাড়া ক্ষতির মুখ দেখতে না হয়। তার কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করে মাথা ঝাকানো লোকও আছে। তারা তার আশেপাশেই থাকে। তাদের নিকট সে মুটামুটি আদর্শ বনে গেছে।
গ্রামে ডুকে দশ মিনিটের হাটা রাস্তা, তারপরেই মসজিদ; গ্রামে একটাই। মসজিদে তেমন লোক হয়না। গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি ছাড়া কারোরই ধর্মেকর্মে মনোযোগ নেই। মনের মধ্যে পাকাপক্তভাবে ধারণা জন্মে গেছে, ওটা বুড়ো বয়সের হিসাব। মানুষ যখন বুড়ো হয়, মৃত্যুর ভয় জাগে; তখনই তারা মসজিদে-মন্দিরে যায়। আর জোয়ান বয়সটা হচ্ছে কাজের বয়স। টাকা পয়সা কামানোটাই এখানে মুখ্য বিষয় , তারপর বিয়ে-সংসার ইত্যাদি। মসজিদের পাশেই্ একটা চায়ের দোকান, শুধু চায়ের দোকান বললে অবিচার করা হয়। চানাচুর মুড়ি থেকে শুরু করে সুই-সুতো সবই পাওয়া যায় এখানে। দোকানের সামনে বাশেঁর মাচাং পাতা আছে। এটাই যদুর আড্ডাখানা। সকাল থেকে রাত যখনই তার খোঁজ করা হয় সে এখানেই থাকে। শুধু শুধু বসে থাকলে দোকানির উপর অবিচার করা হয় এ জ্ঞানটুকু তার আছে। আর একারনেই ঘন্টায় ঘন্টায় চায়ে চুমুক পড়ে তার। একা একা চা খাওয়াটা তার ধাতে সয় না। ফলে সর্বক্ষণ চা খাওয়া লোক তার আশেপাশেই থাকে। আগে বলা লাগতো এখন আর তাও লাগে না। চা খেয়ে যাওয়ার সময় বলে যায়- বিলটা দিয়ে দিও যদু ভাই। যদুর তাতে না নেই। খাবেই তো। গ্রামের ভাই-ভাগার মানুষ, এক কাপ চা খাবে সেটা আবার বলা লাগে! কোনোদিন রোগেশোগে যদু যদি নাও আসতে পারে তাও তার নামে বাকি জমে যায়। কে কি খেয়েছে সেটাও বলা লাগে না, টাকার পরিমানটা বললেই হয়।
যায় হোক, এ বিষয়ে কেউ যদুর সাথে বাজি লাগতে যায় না যে, আশপাশ চৌদ্দ গ্রামে তার মতো কেউ দাবা খেলতে পারে। যত বড় খেলোয়াড়ই আসুক না কেনো, পনের থেকে বিশ দান। অভিজ্ঞতার আলোকে খেলে যদু, প্রতিপক্ষের চাল দেখলেই বুঝে ফেলে মনের কথা। অনেকে বলে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। কিন্তু সে তার পছন্দ না। খেলাধুলা নিছক বিনোদনের বস্তু, ওসবে প্রতিযোগিতা থাকতে নেই। আনন্দ ছাড়া আর কিছুই এখান থেকে আশা করা উচিত নয়। পাশে বসে কেউ যদি রেডিওতে ধারাভাষ্য শোনে তবে মিজাজ গরম হয়ে যায় যদুর- দরকার পড়লে খেল গিয়ে, বসে বসে কি শুনিশ??
এভাবে দিনকাল যদুর ভালোই কাটছিলো, বাপ ছিলো এক সন্তান; জমি জমার অভাব নেই। সংসারে আয় রোজগারের জন্য তিনি কারো মুখাপেক্ষি নন। চার বোনের পর জদুর জ¤œ হয়েছিলো বর্ষা কালে। নিউমনিয়া হয়ে ছেলে বাঁচবে বলে আশা ছিলো না কারো। তারপরও কেমন করে যেন আল্লা হাতে ধরে বাঁচিয়ে দিলো। অতি আদরের যদু তাই ছোটবেলা থেকে হুকুম করে অভ্যস্ত, শুনে নয়। লেখা পড়া করেছে অনার্স পর্যন্ত। মাস্টার্স শেষ করলো না কারণ ভালো লাগে না। এতো লেখাপড়া জেনে কি হবে? চাকরি-বাকরি এখনো দরকার পড়েনি। তবে ইদানিং ভাবছে। আগে মনে করতো ব্যবসা করবে কিন্তু এখন আর সে জোর পায় না। অনেক ভেবে চিন্তে এই তার উপসংহার- শিক্ষা তাকে শিখিয়েছে কিভাবে একজন ভালোমানের চাকর হওয়া যায়। ফলে মালিক হওয়াটা বড়ই কষ্টকর। লাভ ক্ষতির হিসেব সে ঠিকই জানে। কিন্তু ক্ষতিটাকে কিভাবে লাভে পরিনত করা যায় সে হিসেব তার অজানাই থেকে গেছে। এর চেয়ে চাকরি করা অনেক সহজ, মাস গেলে নিয়ম মতো বেতন পাওয়া যায়। কিন্ত সেদিকে তাকিয়েও হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকে না তার। মানুষ কিভাবে পারে এগুলো। রোবটের মতো চলতেই থাকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। একই রুটিন একই কাজ!! ফলে যদু বেকার থাকাটাই ভালো মনে করে। ভবিষ্যতের চিন্তা করে কূল কিনারা পাওয়া মুশকিল। তাই ওটা নিয়ে চিন্তাও করে না আর।
গতকাল রাতের কথা, যদুর কাছে এই প্রথম কোনো আবদার নিয়ে এসেছেন এলাচি বেগম। ছেলের কাছে কিছুই চান না তিনি শুধু একটা মাত্র আবদার তার। ছেলেকে তিনি বিয়ে দিতে চান। যদুরও তাতে কোনো আপত্তি নেই বলে দিয়েছে। কিন্তু এখন বিষয়টা নিয়ে সে চিন্তিত। কিভাবে সম্ভব?? বেকার ছেলের সাথে মেয়ে দেবে কে? আর দিলেও বউয়ের কাছে রাত দিন যে খোটা খেতে হবে না সে গ্যারান্টি কে দেবে? বিষয়টাকে হালকা ভাবার কোনো কারণ নেই। এখন কি করা যায়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে এ কথায় ভাবছে যদু। সঙ্গী-সাথীরা কয়েকজন এসে চা খেয়ে ফিরে গেছে। আজ আর দাবা খেলা জমছে না। মাথায় অন্য চিন্তা নিয়ে দাবা খেলা সম্ভব নয়। দোকানি বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছে কিন্ত যদু উত্তর দেয়নি। বিষয়টা সবাইকে জানানো যাবে না। এটা তার জীবনের দ্বিতীয় গোপনীয় কাজ। প্রথমটা ছিলো খাতনা।
তিন-চার দিন চলে গেছে মায়ের কাছ থেকে আর কোনো তথ্য আসেনি। ফলে আজ একটু নিশ্চিন্তেই ঘর থেকে বের হচ্ছিলো যদু, কিন্তু তা আর হলো না। মায়ের ডাক- এই যদু, আজ আর তোর দোকানে বসে কাজ নেই; আমার সাথে এক জায়গা যেতে হবে।
–    কোথায়?
–    সেটা তোর জেনে কাজ নেই, আমার পিছে পিছে হাটবি; কোনো প্রশ্ন করবি না।
–    বারে, কোথায় যাবো সেটাও জানতে পারবো না!!
–    গেলেই তো জানতে পারবি।
যদু আর কথা বাড়ালো না, লাভ নেই; এলাচি বেগমের পেট থেকে এর বেশি কিছুই সে বের করতে পারবে না যতক্ষণ না তিনি নিজ থেকে কিছু বলেন। ঘরে বসে নিজে নিজেই ভাবতে লাগলো- এমন কি ব্যপার যে, আম্মা আগে থেকে বলছে না??
মায়ের সাথে যদু যেখানে এসেছে সেটা তার মায়ের বান্ধবির বাড়ি। এতোকাল পর বান্ধবীর সাথে মায়ের গল্প করার খায়েস জাগলো কেনো তা যদুর মাথায় ঢুকলো না। কথা সূত্রে জানা গেলো তারা প্রায় ৭-৮ বছর পর পরষ্পর মিলিত হয়েছেন। দু’জনে গল্প জুড়েছেন ভালো মতোই, শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। মা-খালাদের গল্পের মধ্যে নিজেকে কেমন বেমানান লাগতে শুরু করেছে। ওর চোখে মুখে মনে হয় ব্যপারটা প্রকাশ পেয়েছে, কারণ ওর দিকে তাকিয়ে মায়ের বান্ধবী বলেই ফেললেন, তোমার একটু কষ্ট হয়ে যাচ্ছে মনে হয়, কিন্তু কি করবো বলো, তোমার মা যে এই অসময়ে এমন একটা আবদার নিয়ে আসবে তা কে জানতো? ও গেছে খালার বাড়িতে, আর কিছুক্ষনের মধ্যে চলে আসবে।
পুরো ব্যপারটাই যদুর কাছে ধোয়াটে মনে হচ্ছে। কার কথা বলছে খালা? ও কি কারো জন্য অপেক্ষা করছে?? এলাচি বেগম যদুর দিকে আড় চোখে তাকান, আবার বান্ধবীর সাথে গল্প জোড়েন। যদু এদিক সেদিক চিন্তা করে কূল না পেয়ে শেষমেশ থিতু হয়ে বসে আছে। এক কাপ চা খুব টানছে এখন।
–    আপনাদের চা দেবো?
অপ্রত্যাশিত এমন প্রশ্নে, প্রশ্নকর্তীর দিকে না তাকিয়েই যদু বলে ফেললো, জ্বী, হলে ভালো হয়।
–    কিরে, কখন এলি তুই?
–    মাত্রই এলাম। দেখলাম তোমরা খালি মুখে গল্পে মজেছো তাই…
–    এখানে আয়, তোর খালাকে সালাম কর; অনেক আগে দেখেছিলি, মনে থাকার কথা না।
–    আমিও তো চিনতে পারি নি, কতো বড় হয়ে গেছে মেয়েটা…
অপ্রত্যাশিত চায়ের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যার আগমন ঘটলো তার দিকে যদুর প্রথম দৃষ্টি সংকোচমিশ্রিত হলেও সুখকর। এতক্ষনে সে কিছুটা আঁচ করতে পারছে, কেনো তার মা হঠাৎ বান্ধবীর জন্য পাগল হয়ে উঠেছেন। মায়ের অতি আদরে রিনা এখন নিজেই সংকুচিত, দু’একবার যদুর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে সেও। অবশেষে ব্যপারটা যখন দু’জনের কাছেই পরিষ্কার তখন যাবার বেলা। তাড়াতাড়িই আবার আসবে বলে উঠে দাড়িয়েছে এলাচি বেগম। যদুকে তাড়া দিয়ে বললো- কিছুক্ষনের মধ্যেই মাগরীবের আজান দিয়ে দেবে, ওঠ।
আজ আর যদুকে চায়ের দোকানে দেখা যাচ্ছে না। সকাল থেকে বিভিন্ন ছুতায় মায়ের আশপাশে ঘুরঘুর করছে। এলাচি বেগমও সমানে হুকুম করেই যাচ্ছেন। লবনটা দে, তেলটা এগিয়ে দে, তোর বাবাকে বল বাজার করতে হবে না আজ ইত্যাদি।
–    মেয়েটাকে কেমন দেখলি?
–    খারাপ না।
এলাচি বেগম হেসে ফেললো- এবার মনে হয় তোর বাবার কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়া উচিত।
–    মানে?
–    কিছু না করলে তোর হাতে মেয়ে দেবে কে?
–    ও।
বেশ কিছুদিন যাবৎ চায়ের দোকানে বাকি জমেছে, এর মধ্যে যদুর দেখা মেলেনি। কেউ কেউ বলছে, যদু মনে হয় লাইনে আসলো এবার। আবার কারো কাছে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ছাড়া আর কিছুই নয়।


দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা, শুক্রবার 26 August 2016 ১১ ভাদ্র ১৪২৩, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৭ হিজরী  

কবুতরের গল্প / সাইফ আলি

গতবার যখন এসেছিলাম তখনও পায়রাদুটো ছিলো। তবে বাসা ছিলো না। কার্নিশের এক পাশে দেয়ালে অর্ধেকটা ইট না থাকায় সেখানে বাসা বেঁধেছিলো পায়রাদুটো। বেশিরভাগ সময় কার্নিশে ঘুরাঘুরি করতো, ডাকতো আর খুনশুটিতে মেতে থাকতো। কিন্তু যখন ডিম পাড়লো তখন সবসময় একটাকে দেখতাম ডিমে তা দিতে আর একটা বেরিয়ে পড়তো। আর এবার বাড়িতে এসে দেখলাম দুটো বাচ্চা হয়েছে এবং বাচ্চা দুটো কিছুদিনের ভেতরেই ওড়া শিখে যাবে। কার্নিশের উপর এবার একটা নতুন ঘরও চোখে পড়লো, দুটো ডিম নিয়ে তাতে বসে আছে সেই পুরোনো কবুতর।

দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ যাচ্ছে আজকাল। গুলশানে কুটনৈতিক পাড়ায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে বিদেশি নাগরিকদের। জঙ্গীরা নিহত হয়েছে সবাই। উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে ওরা, দেশের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র; এলিট সোসাইটিতে বসবাস ওদের। হঠাৎ করে ওরা এমন নরপশুতে পরিণত হলো কি করে তা ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছেন না বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের একটাই কথা, এদের বেশির ভাগই ইংলিশ মিডিমায়ামে লেখাপড়া করেছে। ধর্মের নাম-গন্ধও যে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নেই সেই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এসকল ধনির দুলালেরা কিসের নেশায় এরকম আত্মঘাতি হয়ে উঠেছে। অথচ কিছুদিন আগেও এদের মধ্যে অনেকেই বন্ধুদের সাথে পার্টিতে গেছে, দেশবরেন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে মিশেছে, কেউ কেউ গিটার বাজিয়ে পার্টি মাতিয়েছে। হঠাৎ তারা কিসের নেশায় আকুল হলো!!? প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে গেছে, ধুয়া উঠেছে চায়ের টেবিলে, মিডিয়াতে জমেছে টকশো। সে যায় হোক, আমাদের ছোট মাথায় এতো বড় ব্যপার ঢোকে না । আমরা শুধু এটুকুই বুঝি- কোনো যন্ত্রের কার্যবীধি সমর্কে যারা জানে আর যারা জানে না তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো যারা জানে তারা ভুল করে কম আর যারা জানে না তারা হর-হামেশাই ভুল করে বসে।

ও হ্যা, কথা হচ্ছিলো আমার পাশের বাসার কার্নিশের কবুতর নিয়ে। এই একটা সমস্যা আজকাল যাই নিযেই কথা বলতে যাই না কোনো ঐ এক ভুত সবজায়গা দখল করে আছে। দেশ যে কবে এর থেকে মুক্তি পাবে জানি না। আর পাবেই বা কি করে? আমার একটা বন্ধুর গল্প করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে ছেলেটা, দাড়ি রেখেছে তা প্রায় দু’বছর হতে চললো। আর কোথাও দেখা হোক বা না হোক মসজিদে গেলে তাকে পাওয়া যাবে এমনটাই জানতাম। হঠাৎ তার সাথে দেখা, মুখে দাড়ি নেই- মাথায় টুপি নেই; আমিতো অবাক। বললাম- বন্ধু কারণ কি?? বন্ধু আমার উত্তরে বললো বাবা-মা থেকে শুরু করে সমাজের মুরুব্বিদের একটাই কথা- বাবা দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। এখন ওসব না রাখলে হয়না? সবার কথা শুনতে গিয়ে শেষমেশ ওর আসল রূপটাই হারিয়েছে বেচারা।

আবারোও সেই একই কান্ড, যা বলতে যাচ্ছি তা বলা হচ্ছে না। কবুতরের গল্প করছিলাম আমি। কার্নিশে আজ আর কবুতর নেই। সকালে দেখলাম খালি। বাচ্চাগুলো ওড়া শিখে গেছে হয়তো কিন্তু তাদের বাসা পরিবর্তনের কারণ নিশ্চয় অন্য কিছু, ডিম নিয়ে বসে থাকা কবুতরটাও নেই হয়তো ডিমদুটো কাকে খেয়েছে; আর সেই শোকে কবুতর গুলো ঘর ছেড়েছে। কার্নিশে পড়ে আছে শূন্য বাসাটা।

খুন / সাইফ আলি

বালিসের পাশ থেকে মোবাইলটা নিয়ে সময় দেখলো সাইরা- রাত এখন আড়াইটা বাজে। শেয়াল আর কুকুরের শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে। বহুদিন পর আজ একটু শান্তি করে ঘুমোতে চেয়েছিলো, তা আর হলো না। বাইরে কয়েকটা শেয়াল কিছু একটা কাড়াকাড়ি করছে আর পাড়ার নেড়ী কুত্তাটা দূরে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। কাছে ঘেঁসতে সাহসে কুলোচ্ছে না ওর। জানালাটা খোলা ছিলো তাই শব্দটা বেশি আসছে। বিছানা থেকে উঠে জানালা আটকাতে গেলো সাইরা। হঠাৎ কি মনে হতে, টর্চটা হাতে নিলো- কি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে?

বাইরে টর্চের আলো ফেলতেই ডাকাডাকি থামিয়ে দিয়েছে শেয়ালগুলো শুধু দূরে দাঁড়িয়ে কুকুরটা ডেকেই চলেছে। শেয়ালগুলো পিছিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢেুকে যাচ্ছে , শুধু একটা শেয়াল হতভম্বের মতো টর্চের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো টর্চের আলোর কারণে চোখে দেখছে না। মুখে কিছু একটা ঝুলছে যেনো। ভালো করে লক্ষ্য করলো ছাইরা। আঙ্গুলগুলো অপরিণত। একটা মানব শিশুর হাত!! হাত থেকে টর্চ পড়ে গেলো, কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লো সাইরা। মনে হলো আজ যাকে সে নিজের দেহ থেকে আলাদা করেছিলো তাকে নিয়েই যেনো শেয়ালের হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। ডুকরে কেঁদে উঠলো সাইরা। অ্যাবর্শনের পর থেকে এ পর্যন্ত যা কাঁটার মতো বিঁধেছে এখন তা ছুরি হয়ে গলায় বসতে চাচ্ছে।

তনু ওকে বলেছে যে মাস দুয়েকের মধ্যেই বিয়েটা সেরে ফেলবে। বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে ও। চেহারা সুরতে খুবই স্মার্ট। এমন একটা ছেলেকে ও সবসময়ই চেয়েছে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে। ভার্সিটিতে পরিচয়। অন্য ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই ছিলো তনু। ওরই এক বান্ধবীর মাধ্যমে প্রেমের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো। প্রথমে না করতে হয় তাই করেছিলো কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জমে ওঠে প্রেম। ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে শেষমেশ আজকের পরিণতির জন্যে এককভাবে কেউই দায়ী না। কিভবে কি হয়ে গেলো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলো না ওরা। এ অবস্থায় কাউকেই ব্যপারটা জানানো যাচ্ছিলো না। আবার সমস্যা দিন দিন স্পষ্ট হয় উঠছিলো।
শেষ কাজটা করার আগে অনেকবার নিজেকে প্রশ্ন করেছে সাইরা। ‘তুমি কি তোমার সন্তানকে হত্যা করবে??’ মন মানতে চায়নি কখনো, কিন্তু উপায় কি?? ওর ভালোর জন্যই ওকে পৃথিবীর আলো দেখানো যাবে না। মানুষ ওকে দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে, অবৈধ বলবে তা হতে দেবে কেনো সাইরা। মা হয়ে এসব ওর সহ্য হবে না। কিন্তু একটু আগে ও যা দেখলো তার কি হবে…?? আঙ্গুলগুলো অপরিণত হলেওতো ওগুলো ওর সন্তানেরই আঙ্গুল। ঐ আঙ্গুলগুলো হাতের মুঠোই করে পরিণত করে তোলাই তো ওর মাতৃত্বের দাবি ছিলো। কিন্তু আজ অপারেশন থিয়েটারে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে তাকে। তনু ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। অপারেশনের সব ব্যায় ওই বহন করেছে। সবসময় ওকে সাপোর্ট দিয়েছে কিন্তু তারপরও ও মানতে পারছে না। জীবনকে ওরা অন্যভাবে সাজাবে ভেবেছিলো। জেনে বুঝে, একে অপরকে পরিপূর্ণরূপে চিনে তারপর। কিন্তুু এরই মাঝে যে তাদের দুজনের সাক্ষ্য রক্ত মাংশে প্রকাশিত হতে চাবে সেটা তারা ভাবেনি কখনো। এই সাক্ষ্যকে লুকোতেই এতো কিছু। নিজেকে খুনি ছাড়া আর কিইবা ভাবতে পারবে এখন। যেই মা তার গর্ভের সন্তানকে খুন করেছে…!!! এর চেয়ে নিষ্ঠুর খুনি আর পৃথিবীতে আছে কি??

শেয়ালের ডাকাডাকি থেমে গেছে। ফিরে গেছে নেড়ীটাও। তনু হয়তো ঘুমোচ্ছে এখন। সাইরার চোখে ঘুম নেই…

“এভাবেই নয় শুধু, কখনো ছেলে সন্তানের প্রত্যাশায়, কখনো নিজেকে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আবার কখনো নির্লজ্জ লালশার বসে আমরা হয়ে যাই নিকৃষ্ট খুনি।”

না, করিমের বাড়িতে … / সাইফ আলি

আনন্দগড়ের ছোট রেলওয়ে স্টেশন । বিদ্যুৎ পৌছায়নি এখনো । হারিকেনের মৃদূ আলোতে অন্ধকার কিছুটা ফিকে হলেও কেমন যেন চোখে ধাঁধাঁ লাগে । আজ অমাবশ্যা, গাঢ় অন্ধকারে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে আছে । হারিকেনের আলো যতটুকু ছড়াচ্ছে দৃষ্টির সীমা ঠিক ততটুকুই । এই মৃদূ আলোর জন্যই হয়তো বাইরের দিকটা একটু বেশি অন্ধকার দেখাচ্ছে ।
স্টেশন মাস্টারের রুমের দরজাতে নড়বড়ে এক তালা ঝুলছে । দেখেই বোঝা যায় ভেতরে দামী অথবা গোপনীয় কিছু নেই । আর তা না হলে এলাকার মানুষ একটু বেশিই সৎ বলে মনে করতে হবে । যাই হোক, সামনে একটা বেঞ্চ পাতা আছে । আর একপাশে একটা হারিকেন মুমূর্ষু রোগীর মত জ্বলছে ।
স্টেশনের দু’তিন মাইলের মধ্যে তেমন কোন লোকালয় নেই । নতুন কিছু বসতি গড়ে ওঠা শুরু হয়েছে কেবল । সপ্তাহে একটা মাত্র ট্রেন এখানে থামে । আর এদিন লোকের ভীড় একটু বেশিই হয় । এলাকাটা তখনই কেবল গম গম করে । অস্থায়ী কিছু চা-বিড়ির দোকানও বসে এসময় । আজও যথা সময়ে সবাই হাজির হয়েছিল । তবে ট্রেন সময়মত না আসার কারণে সবই ভেস্তে গেছে ।
কি একটা সমস্যার করণে আজকের ট্রেনটা সময় মত আসতে পারেনি । দুপুরের ট্রেন এসেছে রাত দুটোয় । বাইরে থেকে আসা যাত্রীও আজ নেই বললেই চলে কারণ অনেকের ক্ষেত্রে একজনকে উপেক্ষা করা দোষের কিছু নয় । অন্তত এই গনতান্ত্রিক দেশে । যাই হোক, আজ একজনই ট্রেনে চেপে এসেছে । বাড়ি তার এখান থেকে পাঁচ কি ছ’ কিলো ভিতরে । পথ ভালো থাকলে হয়তো এটাও চিন্তার ব্যাপার নয় । কিন্তু বাড়ি যাবার পথে তাকে একটা নদীও পার হতে হবে যা এত রাতে বিনা নৌকায় অসম্ভব; অন্তত মাসুদের জন্য তাই । ট্রেন আসতে দেরি হওয়ায় এবং সঙ্গী হিসেবে কাউকে না পাওয়ায় বাড়ি যাওয়ার চিন্তাটা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয়েছে ।
কিছুটা হতাশায় এবং কিছুটা ঘুমের ঝুলে বড় একটা হাই তুলে পেতে রাখা বেঞ্চটার দিকে এগুলো মাসুদ ।
‘এটাতে বসেই রাত কাটাতে হবে । ’ মনে মনে ভাবল সে । জমে ওঠা ¬ ধূলোর আস্তরণ ঝেড়ে ফেলে তাতে আরাম করে চেপে বসল । আশার বিষয়, কালি ধরা হারিকেনটা টিপ টিপ করে জ্বলছে তখনও । মাসুদ উঠে গিয়ে হারিকেনের জোরটা বাড়িয়ে দিল । তারপর অসংখ্য তারাভরা আকাশটাই তার এ যাত্রার সঙ্গী । এভাবে কতক্ষণ অতিবাহিত হয়েছে তা বোঝার উপায় ছিল না ।
– এত রাতে এখানে বসে কি করেন?
প্রশ্নকর্তার কণ্ঠ অপরিচিত ।
– ঘুমাই
ঘোরের মধ্যে উত্তর দিল মাসুদ ।
– ট্রেন আসতে দেরি হয়েছে বুঝি? বাড়ি কি ভেতরের দিকে?
এত রাতে অপরিচিত একটা লোকের এতগুলো প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত ছিল না মাসুদ । লোকটা কেমন তাও যখন তার অজানা তখন কি করে তার কাছে সব কথা বলা যায় ভেবে পাচ্ছে না সে । যে যুগ যামানা পড়েছে তাতে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে কেউ ক্ষতি ছাড়া ভালো করতে চায় না । অন্য কোন সময় হয়তো লোকটাকে এড়িয়ে যেত মাসুদ । তার উপর গ্রামের অশিক্ষীত লোকদের উপর কিছুটা আস্থা আছে । বলল-
হ্যা, বাড়ি ভিতরের দিকেই । ট্রেনটা আসতে দেরি করল আর সাথেও কেউ ছিল না তাই…..
– বুঝেছি, মাসুদের কথার মাঝখানেই বলে উঠল লোকটা । ‘তা বাড়ি কতদূর ভাইজানের ?’
– সোনাখালের ওপারে, মিয়া বাড়ি ।
– চিনছি, সে তো মেলা পথ । এসময় তো যাওয়াও সম্ভব না ।
– সে জন্যই তো এখানে বসে রাতটা কাটিয়ে দেব ঠিক করেছি ।
– এভাবে কি রাত কাটানো যায়, চলেন; আমার সাথে চলেন ।
– কোথায়?
– আমার বাড়িতে । বেশি দূর না এইতো সামনেই ।
এমন একটা সময়ে অপরিচিত কারো এমন প্রস্তাব গ্রহণ করার মত লোক মাসুদ না, কিন্তু কি কারণে যেন লোকটার কোন কথাই ফেলা সম্ভব হচ্ছে না । ফলে আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল মাসুদ । কিন্তু মনের ভেতর জাগতে লাগল নানা রকম প্রশ্ন ।
হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হল লোকটা? কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে কিনা কে জানে, ইত্যাদি ।
‘আমি স্টেশন দেখাশুনা করি, নাম করিম মিয়া । ’ মাসুদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটানোর জন্যই যেন পরিচয় দিল সে । পিছু পিছু হাটছে মাসুদ । বিস্ময়ের ব্যপার হল লোকটার চেহারা দেখা যাচ্ছেনা । গামছা দিয়ে মুখটা এমন ভাবে ঢাকা যে, ভালো করে দেখার উপায়ও নেই । হারিকেনের আলোর তেজও ছিল কম ফলে আশে-পাশে কোন কিছুই ঠিকমত দেখা যাচ্ছিল না । বেশ কিছু দূর আসার পর একটা কুঁড়ের অবয়ব স্পষ্ট হল । একটাই ঘর ।
– আপনার পরিবার…?
– ‘কেউ নেই । ’ মাসুদের প্রশ্ন শেষ না হতেই বলে উঠল করিম মিয়া । ‘আপনি বসেন আমি আসছি । দেয়াশলাই আর প্রদীপটা বেড়ার পাশেই আছে । ’
মাসুদের কথা বলার সময় না দিয়েই বেরিয়ে গেল করিম । মাসুদ এতে অনেকটাই বিরক্ত হল । কাউকে মেহমান করে ডেকে এনে আলো পর্যন্ত না ধরিয়ে কেউ যে এভাবে চলে যেতে পারে? কি আর করা বিপদে পড়লে অনেক কিছুই সহ্য করতে হয় । হাতড়ে-হাতড়ে প্রদ্বীপ আর দেয়াশলাই বের করে আগুন জ্বালল মাসুদ । তেল খুবই অল্প, তলানির মত জমে আছে । সারা গা ধুলোয় ভরা । বহুদিন যাবৎ পরিত্যক্ত থাকলে যেমনটি হয় । ঘরের মধ্যে আসবাব বলতে একটা পানির কলস কাত হয়ে পড়ে আছে, বেড়ায় এক গোছা পাটের দড়ি আর কিছু ভাঙা পাতিল । বহুকাল ধরে এখানে কেউ থাকে না বলেই মনে হয় ।
‘আপনি কি এখাইে থাকেন?’ পশ্ন করার পর মনে পড়ে সে এখানে নেই । মনে মনে চিন্তিত হয়ে পড়ে মাসুদ । এই নির্জনে একা কাউকে রেখে কেউ যে উধাও হতে পারে তা ওর জানা ছিল না । যেখানেই যাক ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই ।
রাত পার হয়ে যাচ্ছে অথচ লোকটার কোন খোঁজ নেই । বসে থেকে কতক্ষণ কাটানো যায় । মনে মনে ভীষন বিরক্ত হয় মাসুদ ।
গরমের বেলা, পাঁচটা বাজতেই অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে কিন্তু করিম আর আসে না । ‘কি জানি লোকটার কি হল, কিন্তু আর যে থাকা চলে না, এবার বাড়ির পথ ধরতে হবে । ’ উঠে দাড়ায় মাসুদ । পথটা মনে আছে ফলে বের হয়ে আসতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তার । বড় রাস্তায় উঠতেই গাঁয়ের এক পরিচিত লোকের সাথে দেখা । লোকটা অবাক চোখে মাসুদকেই দেখছে । মাসুদদের প্রতিবেশি, কিন্তু ওভাবে তাকিয়ে কেন লোকটা?
– আমাকে চিনতে পারেননি চাচা? আমি মাসুদ ।
– চিনেছি, তা এদিকে কোথা থেকে এলে?
– করিম মিয়ার ওখানে রাত্রে ছিলাম ।
এবার তো লোকটা একেবারে হা হয়ে গেল ।
– বল কি বাপু! করিমের ওখানে ছিলে? সে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল?
– হ্যা, কিন্তু আমাকে রেখে লোকটা যে তখুনি কোথায় উধাও হয়ে গেল বলতে পারব না ।
– উধাও হয়ে গেল? কিন্তু করিম তো প্রায় বছর খানেক আগে রেলের চাকায় কাটা পড়েছিল । আগে ও ই স্টেশন দেখাশুনা করতো এখন আমি করি ।
মাসুদ শিউরে উঠল । তবে সে কার সাথে ওখানে গেল? কার সাথে কথা বলল? কার বাড়িতে রাত কাটাল?
মাসুদ ভুতে বিশ্বাস করে না । কিন্তু এ সব কি করে ঘটতে পারে? তবে কি সত্যই…… কিন্তু তাই বা কি করে সম্ভব? একটা মানুষ এক বছর আগে মারা যাওয়ার পর সে কি করে…… নাহ, কিছুই ভাবতে পারছে না মাসুদ ।

এমন সময় পাশ থেকে কে যেন বলল ‘কি ব্যাপার, ভাইজান কি সারা রাত এইখানেই ছিলেন?’
ধড়ফর করে ওঠে মাসুদ । ঘোর কাটতেই দেখল- সে স্টেশনের সেই নড়বড়ে বেঞ্চে বসে আছে । হারিকেনটা তখনো মিটমিট করে জ্বলছে । সকাল হয়ে গেছে । সারা শরীর ঘামে ভেজা । সামনে প্রশ্নকর্তা উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে । মাসুদ বলল-
না, করিমের বাড়িতে ।