এক দিঘি হাঁস / সায়ীদ আবুবকর

ফুটে থাকা শাপলার মতো এক দিঘি হাঁস
করছিল উল্লাস
পড়ন্ত বিকেলে। বীণার তারের মতো তারা
বলছিল কথা ঠোঁটে ঠোঁটে, আর ঝড়ো বাতাসের মতো দিশেহারা
হয়ে করছিল ছুটোছুটি পানির উপর। মারছিল ডুব, কখনও বা,
অথৈ পানিতে নুড়ির মতো। বোবা
গাছগুলো, দিঘির পাড়ের, দেখছিল সেই খেলা
হাঁ-করে, বিকেলবেলা।

সুন্দর এ হাঁসগুলো কোনোদিন হিংসা দ্যাখেনি ছুঁয়ে। দ্যাখেনি কখনও
স্পর্শ করে তারা ঘৃণার আগুন। অসুস্থ প্রতিযোগিতা কোনো,
বাড়ির, গাড়ির, খ্যাতির ও ক্ষমতার, তাদের জীবনে
ছড়ায়নি অসুখ। পুষ্পিত মনে
তাই তারা খেলতে পারে এরকম। তাই তারা এরকম করে পারে
তুলতে বেহেস্তি সুর জগতসংসারে।

চলো আজ, প্রিয়তমা, বিপুল মানুষে মিশে যাই।
অন্তহীন জনতার স্রোতে মিশে গেলে, আমরা প্রকৃতি খুঁজে পাই
আর হয়ে যায় আমাদের মন
দিঘিটির হাঁসেরা যেমন।

২২.৯.২০১৪ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

Advertisements

হে হৃদয়হীনা / সায়ীদ আবুবকর

যতই সাজো না কেন, ধরবে না মরাগাছে বসন্তের রঙ
ভরবে না ডালপালা পুষ্পে পুষ্পে, ডালে বসে গাইবে না পিক;
যতই ঘষো না কেন, মুছবে না কিছুতেই সর্বাঙ্গের জং,
ব্যর্থ হয়ে যাবে সব সোনা-রূপা, লেহেঙ্গা ও রক লিপস্টিক।

তোমার শরীরজুড়ে জগতের কামনারা করে কিলবিল,
ক্লিওপেট্রা, হেলেন ও মেরিলিন মনরোর নেশা জাগে চোখে;
তাই বলে মৃত ডালে উঠবে না গর্জে ফের ফুলের মিছিল,
ফিরবে না সেই স্রোত, আলিঙ্গন করেছে যে মহাসমুদ্রকে।

শরীর তো কোন্ ছার, কালগ্রাসে পাথরের পাহাড়ও হারায়
কঠিন যৌবন তার, ধসে পড়ে মুখ থুবড়ে লোহার প্রাচীর;
জগতে কী টেকে বলো পবিত্র হৃদয় ছাড়া? সবই ক্ষয়ে যায়
পড়েনি যে সৃষ্টি’পরে প্রণয়ের বৃষ্টি আর দুচোখের নীর।

উঠবে না সুর তারে, যতই বাজাও তুমি শরীরের বীণা;
তবু তুমি ফিরলে না পুণ্য হৃদয়ের কাছে, হে হৃদয়হীনা।

৩.৭.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

ম্যানটিস প্রিয়তমা / সায়ীদ আবুবকর

কি জাদুমন্ত্রে করেছিলে মন চুরি,
অতঃপর তুমি দিয়েছিলে কাছে ডাক;
নিঃশ্বাসে ছিলো কামনার কস্তুরি
কাছে যেতে যেতে হয়ে যাই নির্বাক

সম্ভোগসুখ কেড়ে নেয় শেষে হুঁশ,
বৃষ্টির মতো ঝরছিল তবু কিস;
মনে হয়েছিল নিজেকে অরফিয়ুস
আর তোমাকে যে সোনালি ইউরিডিস

তারপর, হায়, কিছু আর মনে নেই
খুঁজে পেলো লোকে নিথর একটি লাশ
জগত জানলো দুঃসংবাদ এই:
বিষ ছিলো ঠোঁটে এবং সর্বনাশ

হেমলকই ছিলো তোমার তাবৎ কিস-
কে বা জানতো হে, ছিলে তুমি ম্যানটিস!

১৪.৩.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

গাছীর গান / সায়ীদ আবুবকর

জিড়ন রসের মতো তোমার যৌবন, যুথিমালা;
তোমার খেজুরগাছে আজ আমি দিনান্তের গাছী,
কাটবো পৌরুষ দিয়ে তোমার দুচোখে যত জ্বালা,
তারপর রস দিও, বসতে দেবো না কোনো মাছি

ছ-কুড়োর মাঠে আজও ছোলার কি-চমৎকার চাষ,
সেই ছোলাগাছ তুলে পুড়াবো উঠানে মাঝরাতে;
তারপর তোমার ঘরে হালাকুর চলবে সন্ত্রাস,
পৌষের পবন আর স্তব্ধ রাত্রি কেঁপে উঠবে তাতে

জিড়ন রসের মতো, যুথিমালা, তোমার যৌবন-
আমার কী চাই আর, আমি এক বুভুক্ষু বাঙ্গাল;
চাইনিজে থাইসুপে মজে না আমার গেঁয়ো মন,
অমৃত আহার মানি যৌবনের ক্ষীর এক থাল

বাপদাদা ছিলো গাছী, অধমেরও একই পরিচয়
জানা আছে কোন্ গাছে কয় পোচে রস আনতে হয়

১০.১০.২০১৪ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

সতত এ নদ / সায়ীদ আবুবকর

শরীর শীতল করে, ভিতর শীতল করে এই ঘোলাপানি,
এ পানিতে স্নান করে ভোরের দোয়েল আর আমার হৃদয়;
পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ এখনও আগের মতো করে কানাকানি
তখন এ নদ দেখে কত মধু মধুদেশে মহাকবি হয়!
অন্য কোনোখানে গিয়ে বাঁচবো কি একদিনও এ জমিন থুয়ে?
বিদেশবিভুঁই গিয়ে কী করে মানুষ বাঁচে, আমি ভেবে মরি;
আমার কেশবপুর জননীর মতো থাকে অস্থিমজ্জা ছুঁয়ে,
আমার এ কপোতাক্ষ আমাকে প্রশান্তি দেয়া মর্ত্যের অপ্সরী।

আমার হৃদয় রোজ খরসুলা মাছ হয়ে বুজকুড়ি তোলে
ঘোলা এ পানিতে আর ঘুমায় নিশ্চিন্তে এর সবুজ দু’পাড়ে,
যেভাবে ঘুমায় শিশু দুগ্ধ পান করতে করতে জননীর কোলে;
কোন্ রূপ করতে পারে ধরাশায়ী, দেশ যার অস্থিমজ্জাহাড়ে?
আমাকে টানে না পরদেশ, পরনারী কিংবা যক্ষের সম্পদ
যেমন শীতল সুখে চুম্বকের মতো টানে সতত এ নদ।

৪.১০.২০১৪ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

ঘুরে ঘুরে খেলা করে / সায়ীদ আবুবকর

কেবলি কোকিল আর কেবলি কুসুম
যে-বনে; যে-মাঠে
কেবলি শস্যের মেলা;

যে-আকাশে কেবলি ষোড়শী চাঁদ আর তার নিজঝুম
রূপের ঔজ্জ্বল্য; যে-জলে সাঁতার কাটে
কেবলি চিতল মাছ; সেখানে আমার হৃদয়ের হোলি খেলা।

আমার হৃদয় জোছনার মতো ঘুরে ঘুরে খেলা করে
পৃথিবীর সব সুন্দরে সুন্দরে।

১১.৯.২০১৪ মিলন মোড়, সিরাজগঞ্জ

তোমার সুঘ্রাণ / সায়ীদ আবুবকর

হৃদয় ভরে আছে তোমার সুঘ্রাণে,
কী হবে বলো আর ফুল দিয়ে;
মিষ্টি মধুমতী বয়েছে দুই প্রাণে,
কী হবে হেঁটে আর কূল দিয়ে!

কী হবে চৈতালি চকোর পাখি দিয়ে
যখন বুকে তুমি জুড়েছো গান;
রেখেছো বুঁদ করে সজল আঁখি দিয়ে-
কী হবে করে আর অমিয় পান!

কিসের বসন্ত, কিসের মধুমাস
যখন আছো তুমি বুক জুড়ে;
মিথ্যে ফুল আর পাখির উল্লাস
যখন আছো সব সুখ জুড়ে!

২৭.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ