-
ভুলে গেছি / আবুল হাসান
ভুলে গেছি, কাকে যেনো ভুলে গেছি উদাস সুরে আর ডেকোনা ঘুঘু পাখী! দুপুর গড়ায়, মনের পারে যাকে যাচি তার অভাবে তোমার ডাকও চরম ফাঁকি! জেনে গেছি সবই যেনো জেনে গেছি কেউ এখানে বুঝবেনা সেই ধুমল স্বর! ঝরা পাতার কান্না নিয়ে মধুর মাছি পুড়ে গেছে, হায়রে জাগে ক্ষোভের ঝড়! আঁচড় দিয়ে ঘুঘু পাখী রক্ত খুড়ি প্রশ্বাসে…
-
তবুও তো জানি / আবুল হাসান
তবুও তো জানি সুরেসা তোমার নীহার পালকে ঠোঁট গুঁজে একা একটি ময়ূর কেঁদেছিল সেই রাতে! ব্যথার তীরের ফলায় বিদ্ধ আর্ত হৃদয় অধীর আকাশ, অবুঝ তারার রংছুট যত ছিন্ন গোলাপ ঝরেছিল তাঁর সাথে। তীক্ষ্ন পাঁজরে মৌ নেশা আর উষ্ণ রক্ত ফুটিয়ে কেবলি দুরু যাতনার দলিত প্রহরে তারা ভীরু নির্বীজ অশ্রুর মতো সুরেসা তবুও ঝড়ের হাওয়ায় তোমার…
-
সমর্পণ / আবুল হাসান
১ সেই তো আমি দাঁড়িয়েছিলাম প্রভু ঘুমের বেশে শয্যা আমার চরম আলুথালু তোমার পদপাতে আবার চাই যে সংসার, ঈশ্বর হে শর্ত কোরে বোলতে হবে আরো? রক্তস্রোতে সম্মোহনী ভয়ের দারূন জরা পুষ্পায়িত হতাম আমি, হতেও পারি তবু, পুষ্পশাখে ঈশ্বর হে তোমার সাথে যদি নাই-ই ফোটাই সমর্পিত পুষ্পরেনুটিরে? হো হো করে হাসতে গিয়ে দুঃখ কাঁপে যার রে…
-
প্রাগৈতিহাসিক / আবুল হাসান
লোলুপ শকুন তবু আজও অমর এই পৃথিবীর সমস্ত চুঁড়ায় আজো চারিদিক লোলজিহ্বা হানা দেয় পিশাচের সুখে ভেঙ্গে দেয় নৈমত্তিক স্নেহ প্রীতি কিংবা কোন সুললিত কথার ঝঙ্কার যেন বন্ধ ঘন্টা বাজানোর পর সেই সাংকেতিক মানুষের মুখ বাদুড়ের চোখে ফেরে, সূর্যের চাকায় অতঃপর উদ্ধৃত রিপুর টংকার, অতিলোভী রক্তের শিরায় গেঁথে দেয় লোভস্পর্শ, উথাল পাথাল। নির্মম পুরুষ হাতে…
-
সব থেমে গেলেও / আবুল হাসান
শব্দের তরঙ্গে সব কাব্য লেখা হয়ে গেলে সব কাব্য অবসান হলে যদি অতিষ্ঠ আঙ্গুলে বাজে তোমার কবিতা, প্রপাতের ধ্বনি যদি থেমে গিয়ে শুধু থাকে তোমার চোখের তলে অতলান্ত জলের উচ্ছাস আর রাত চাপা তারার আগুনে, পুড়ে গেলে নির্জতের ফিতে ফিরে গেলে সব টিয়া বনের মর্মরে, আমার অস্তিতে জানি কেউ যেন খুঁজে দেয় পথিক চুঁড়ার মত…
-
প্রোস্বর / আবুল হাসান
তুমি তো একটি শব্দ, তবু এত মেদুর সলাজে তোমার মনের ওড়না, লজ্জায়িত ছন্দে কী যে দোলে সুরেলা সন্ধ্যা এলে হাঁসপাখী দু পায়ে আকাশ চিরে চিরে বাসা বাধে তোমার দু’চোখে! উজ্জল চিলকায় কাঁপে, সূর্যের অনুর ত্রিপল, কাঁপা হাতে তুলে নেয় পূরবায়ু নিমজ্জিত ঘাস, বনেলা বিথারে তুমি অপ্রতিভ কী করে যে হাসো সুরেলা সকল শব্দ, রংছুট তোমার…
-
একটি ভাষ্যে / আবুল হাসান
কিংবা একটি মৃত্যু, তবে সে বড় ভয়ংকর তার নিষাদ নয়তো অতৃপ্ত কাঞ্চন প্রিয়তমা! আমি বড় পিতামহে বিশ্বাসী, এই তো উত্তর; যষ্টি অন্ধকারে কেউ কাঁদে, তাকে করো ক্ষমা। জানি ললিত শরীর, তবু নিটোল গ্রীবায় উন্মুখ যত সপ্তপদীর ভীড়, -নীড় লোভী সঞ্চয় তার দূরত্বে শুধু সাড়া, প্রাত্যহিকে বুক ঝরে না রং ছুটে, বয়সে হায়রে জরা ভয়!!
-
যদি কবিতা না পারো / আবুল হাসান
যদি কবিতা না পারো, তবে ছবি এঁকো উচ্ছল রাত্রির চোখে, চোরাহাসি রং দিয়ে ঢেকো! ইজেলে রং-এর হাত তারার প্রতিভা স্মৃতিখোড়া পলিমাটি আচানক বিভা এক ঝাঁক বুনোহাঁস, মেদুর আকাশ প্রতিমারে মুখচোখ, দীর্ঘ নিঃশ্বাস! ছবি ভাল লাগে, যাতে নিবিড় ফসলী গানে উদ্বেল মাঠ অনঙ্গ নিষ্ঠার নিবি, নিটোল শরীর একটি সুহৃদ নীড়, মমতার দ্বীপ। এবং সবজি ক্ষেত, শীতল…
-
একটি অমূলক ধ্রুপদী / আবুল হাসান
যদি পারো এই ব্যাকুল বিথারে সোঁদালো স্নেহের পরশ দিও যদি নাহি পারো স্মৃতির অতলে ঢেকে রেখ সব কাকতালীয় যা কিছু আমার ছিল বহিবার সেও তো অনেক বেদনাদায়ক সেই পাখী আর আসবে না, হায় বিঁধেছে যে তার মৃত্যু শায়ক! গান রচে যাওয়া অনেক বিলাপ, গান কিসে জানে সুখ? দু’মুঠো প্রাণের হাওয়ায় যে তবু ফুলগুলো উন্মুখ! অনেক…
-
বাতুলতা এবং / আবুল হাসান
বাতুলতা তোমাকে চাই না আর! ঢের ঢের শিখেছি নায়ক বুলি, কী কোরে প্রেমিক সেজে সারারাত কাঁদতে হয় তাও জানি। আর কড়ে আঙ্গুলের ছোঁয়া কী কোরে লাগতে হয় প্রতিজ্ঞার ঘাড়ে তাও বেশ জানে এ অধম! ভাঙ্গা মন্দিরে হে বাতুলতা, শুধুই অতীত কাঁদে পুরোনো মন্ত্রের স্বরে। আর প্রবীণ মসজিদে সেই ব্যাকুল শব্দে জানে তোমার করুণ হেরফের। ফুঁ…
-
রবীন্দ্রনাথকে / আবুল হাসান
আমার রক্তকে বলি তোমার গানের মত পরম্পর গভীরে ছড়াতে স্বাস্থ্যের শিরায় তোমার ভাষ্যের শীষে কলিক নীবিতে রেখে বিদেহী বিলাপ বুঝিনা অমৃত কার, বুঝিনা কেননা এই প্রতিম বিকাশ তোমার সকল গানে মিশে নিয়ে হারায় নিজেকে। কৃতজ্ঞতা ভুলে গেছি, কৃতজ্ঞ কখনো নই; কাঙাল মুখের ছাপে মেখে দেই তবুও তো তোমার প্রাণের ভাষা, মুঠে পুরে প্রশান্তির কড়ি! পৃথিবীকে…
-
কল্পনা / আবুল হাসান
কল্পনা তোর নাগাল পেলেই আকাশে বেলুন ছুড়ি। ফুঁ দিয়ে সেখানে ইথারে আয়নে বাজাই অলীক চুড়ি। বস্তুত; এই নিষ্ক্রিয় পথে, ছায়ারোদ কারবারে, কল্পনা তোর হাত ধরে শেষে চলে যাই পারাপারে। মিথ্যে যেখানে মুখোশ সবার রক্তের উৎপাতে কল্পনা তোর ভাড়ার মূল্য কমে নাকি উৎখাতে? স্বপ্নকে নিয়ে হাত ধরে ধরে এগিয়ে যেখানে যাই ছায়াপথ নয়, বিলাস চেতনা, সঞ্চয়…
-
আত্মার ফোঁকর থেকে / আবুল হাসান
না, না ওকে জাগাবোনা! এই অন্ধকারে যখন সূর্যের তালা বন্ধ করে ফিরেছেন রাগী ঈশ্বর যখন সেগুন ডালে দু’একটা বোবা পাখী চিৎকারে ফাটায় আকাশ ব্যঙ্গ করে তৈলহীন দীপাধার আমার টেবিলে, তখন, কী কোরে জাগাবো তাকে? ঈশ্বর বড় অকরুণ! ও বরং একতোড়া যন্ত্রণা নিয়ে শীতল ঘুমের মোহে শুয়ে থাক! ওর ঐ রং গলা আলাপ সালাপ উচ্ছলিত হাসি…
-
একটি দেয়াল / আবুল হাসান
জীবনে অনেক দেব বলে আমি দেইনিতো কিছু স্মৃতি, শোক, সঞ্চয় আকাঙ্খায় নামে, অকালে তোমার ব্যথা ঘনকাপে মুখের উপর দেয়াল, তবুও বলি, কেঁদোনা অমন! বিপণ্ন ঝড়ের হাওয়া উৎখাত করে যে আমাকে মগ্ন হৃদয়ে আর ঐশ্বর্যের হাসি শুনবোনা; ধুলোর আচ্ছাদনে ভীরুজাল আবদ্ধ, মলিন সমুদ্র, তোমাকে বলি, ঐ গান আর শোনায়োনা; কবিতা হবেনা আর, হে কবিতা সময় এবার…
-
কবিতার ভাঁড় আর / আবুল হাসান
এইবার খুব কষে ডুগডুগি বাজাবো বাঁদর নাচো তো দেখি, ভাল্লুক তুমিও রামছাগলটা সঙ্গে থাকলে খুব মজা হতো চামড়া খুলে তবে তাকে বাজারে ছাড়তাম। একলাফে মগডালে যেতে কষ্ট হয় না একেবারে কেবল পায়রাগুলো যদি পাকা হতো, তাই বা কি কোরে হয়, নগ্ন দেহ ঢাকবো কী দিয়ে? নতশিরে স্বপ্নের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলে যাবো? আটখানা ঘরশুদ্ধ বিরাট…
-
স্বপ্নের ব্যাপারে কারো হাত নেই / আবুল হাসান
স্বপ্নের ব্যাপারে কারো হাত নেই। এই আমি যদি দেখি, পরিচিত যত্ত সব অফিসের সিঁড়ি উল্টো মুখের হয়ে গেছে, আমরা ক’জন পিয়নের টুলে বসে অপেক্ষা করছি কখন আসবে ডাকের ছেলেটা! সুউচ্চ নদীর পাড় ভেঙ্গে ঢুকে গেছে লোকালয়ে খাড়ি পুলিশের গাড়ি কয়েদী বোঝাই হয়ে চলে ন্যায়দণ্ড হাতে নিয়ে বিচারক দাঁড়িয়ে আছেন সদলবলে! স্বপ্নের ব্যাপারে কারো হাত নেই…
-
নকল লিচু / আবুল হাসান
বাজার থেকে কিনেছিলাম গোটা কয়েক নকল লিচু সোহাগ করে টাঙ্গিয়ে রাখি নিজের ঘরের দেয়াল জুড়ে । পাশের ঘরের অবোধ শিশু, খাবো বলে বায়না ধরে , মুচকি হেসে ভোলাতে হয়, হাতে দিয়ে অন্য কিছু! বান্ধবেরা ঘরে ঢুকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেন ‘বেশ তো দেখি রং-এর বাহার, আবার কাটা সমস্ত গায়! হেসেই বলি, ‘দেখুন দেখি, আপনারা তো কবিতা…
-
প্রবাসী বন্ধুর প্রতি / আবুল হাসান
এই তো এখানে আমি একা বসে আছি বন্ধু, তুমি শুধু দূরে চলে গেছো। গাঢ় অন্ধকার হতে জন্তুগুলো আসছে বেরিয়ে সদম্ভ লাঙুল তুলে অতর্কিত তাদের চীৎকার ভীত ত্রস্ত করে দেয় ব্যস্ত সব সংখ্যা জোড়া দিয়ে এ কথা জানাতে চায় সর্দি, কাশি, গলা বসে গেছে, কেউ এসে জন্তুটার কান ধরলোনা! আমি শুধু একা একা সন্ধ্যা কাটালাম! মনে…
-
হে প্রেম / আবুল হাসান
তাছাড়া নেই তো এই হৃদয়ের শিলামুখে সমুদ্র গর্জন। নেই ভেজা চোখ, ছোঁয়া নক্ষত্রের আলো, কী দারুণ নির্জনতায় শুধু সেই বিষণ্ন আকাশ অপ্রতিভ কী যে কাঁদে, সূর্য জ্বালায়। সে কখন উদ্ধৃত্ত শষ্যে গোলাঘর, সমুদ্রের মত সুলীল আকাশে কেঁপে চলে গেছে অস্থির অভাবে! সব ক্লান্তি অশ্রু আর উম্মথিত পাঁজরের ক্ষোভে, অভ্রের বিষের ছোঁয়া, ছড়ায় বিদীর্ণ ক্লান্তি। উইঢিপি…
-
নিসর্গ / আবুল হাসান
ত্রিকোন চক্ষু এঁটে খণ্ড অবয়বে, যে বোধ বিস্মৃতি খুঁজে, জরাক্রান্ত ধুলো, বস্তি, বিকারগ্রস্থ আড্ডায় কিংবা উৎসবে নেমে উঠে, উঠে নেমে, বিস্রস্থ বার্ধক্য খোঁজে ঘন বরফের মতো শীতল দুর্বাক্যে যার মুকের সেমিজ নিবিষ্ট আনন্দে ফোলা, তার অনাদৃত চোখের আঁধারে অনেক সবাক ছবি বিস্মৃতির পথ পায় জানি। এও হতে পারে, যদি অস্থির মণ্ডলে নিদ্রালু পূজার বর্তে ছেঁড়া-ফাটা…