-
বাতুলতা এবং / আবুল হাসান
বাতুলতা তোমাকে চাই না আর! ঢের ঢের শিখেছি নায়ক বুলি, কী কোরে প্রেমিক সেজে সারারাত কাঁদতে হয় তাও জানি। আর কড়ে আঙ্গুলের ছোঁয়া কী কোরে লাগতে হয় প্রতিজ্ঞার ঘাড়ে তাও বেশ জানে এ অধম! ভাঙ্গা মন্দিরে হে বাতুলতা, শুধুই অতীত কাঁদে পুরোনো মন্ত্রের স্বরে। আর প্রবীণ মসজিদে সেই ব্যাকুল শব্দে জানে তোমার করুণ হেরফের। ফুঁ…
-
রবীন্দ্রনাথকে / আবুল হাসান
আমার রক্তকে বলি তোমার গানের মত পরম্পর গভীরে ছড়াতে স্বাস্থ্যের শিরায় তোমার ভাষ্যের শীষে কলিক নীবিতে রেখে বিদেহী বিলাপ বুঝিনা অমৃত কার, বুঝিনা কেননা এই প্রতিম বিকাশ তোমার সকল গানে মিশে নিয়ে হারায় নিজেকে। কৃতজ্ঞতা ভুলে গেছি, কৃতজ্ঞ কখনো নই; কাঙাল মুখের ছাপে মেখে দেই তবুও তো তোমার প্রাণের ভাষা, মুঠে পুরে প্রশান্তির কড়ি! পৃথিবীকে…
-
কল্পনা / আবুল হাসান
কল্পনা তোর নাগাল পেলেই আকাশে বেলুন ছুড়ি। ফুঁ দিয়ে সেখানে ইথারে আয়নে বাজাই অলীক চুড়ি। বস্তুত; এই নিষ্ক্রিয় পথে, ছায়ারোদ কারবারে, কল্পনা তোর হাত ধরে শেষে চলে যাই পারাপারে। মিথ্যে যেখানে মুখোশ সবার রক্তের উৎপাতে কল্পনা তোর ভাড়ার মূল্য কমে নাকি উৎখাতে? স্বপ্নকে নিয়ে হাত ধরে ধরে এগিয়ে যেখানে যাই ছায়াপথ নয়, বিলাস চেতনা, সঞ্চয়…
-
আত্মার ফোঁকর থেকে / আবুল হাসান
না, না ওকে জাগাবোনা! এই অন্ধকারে যখন সূর্যের তালা বন্ধ করে ফিরেছেন রাগী ঈশ্বর যখন সেগুন ডালে দু’একটা বোবা পাখী চিৎকারে ফাটায় আকাশ ব্যঙ্গ করে তৈলহীন দীপাধার আমার টেবিলে, তখন, কী কোরে জাগাবো তাকে? ঈশ্বর বড় অকরুণ! ও বরং একতোড়া যন্ত্রণা নিয়ে শীতল ঘুমের মোহে শুয়ে থাক! ওর ঐ রং গলা আলাপ সালাপ উচ্ছলিত হাসি…
-
একটি দেয়াল / আবুল হাসান
জীবনে অনেক দেব বলে আমি দেইনিতো কিছু স্মৃতি, শোক, সঞ্চয় আকাঙ্খায় নামে, অকালে তোমার ব্যথা ঘনকাপে মুখের উপর দেয়াল, তবুও বলি, কেঁদোনা অমন! বিপণ্ন ঝড়ের হাওয়া উৎখাত করে যে আমাকে মগ্ন হৃদয়ে আর ঐশ্বর্যের হাসি শুনবোনা; ধুলোর আচ্ছাদনে ভীরুজাল আবদ্ধ, মলিন সমুদ্র, তোমাকে বলি, ঐ গান আর শোনায়োনা; কবিতা হবেনা আর, হে কবিতা সময় এবার…
-
কবিতার ভাঁড় আর / আবুল হাসান
এইবার খুব কষে ডুগডুগি বাজাবো বাঁদর নাচো তো দেখি, ভাল্লুক তুমিও রামছাগলটা সঙ্গে থাকলে খুব মজা হতো চামড়া খুলে তবে তাকে বাজারে ছাড়তাম। একলাফে মগডালে যেতে কষ্ট হয় না একেবারে কেবল পায়রাগুলো যদি পাকা হতো, তাই বা কি কোরে হয়, নগ্ন দেহ ঢাকবো কী দিয়ে? নতশিরে স্বপ্নের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলে যাবো? আটখানা ঘরশুদ্ধ বিরাট…
-
স্বপ্নের ব্যাপারে কারো হাত নেই / আবুল হাসান
স্বপ্নের ব্যাপারে কারো হাত নেই। এই আমি যদি দেখি, পরিচিত যত্ত সব অফিসের সিঁড়ি উল্টো মুখের হয়ে গেছে, আমরা ক’জন পিয়নের টুলে বসে অপেক্ষা করছি কখন আসবে ডাকের ছেলেটা! সুউচ্চ নদীর পাড় ভেঙ্গে ঢুকে গেছে লোকালয়ে খাড়ি পুলিশের গাড়ি কয়েদী বোঝাই হয়ে চলে ন্যায়দণ্ড হাতে নিয়ে বিচারক দাঁড়িয়ে আছেন সদলবলে! স্বপ্নের ব্যাপারে কারো হাত নেই…
-
নকল লিচু / আবুল হাসান
বাজার থেকে কিনেছিলাম গোটা কয়েক নকল লিচু সোহাগ করে টাঙ্গিয়ে রাখি নিজের ঘরের দেয়াল জুড়ে । পাশের ঘরের অবোধ শিশু, খাবো বলে বায়না ধরে , মুচকি হেসে ভোলাতে হয়, হাতে দিয়ে অন্য কিছু! বান্ধবেরা ঘরে ঢুকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেন ‘বেশ তো দেখি রং-এর বাহার, আবার কাটা সমস্ত গায়! হেসেই বলি, ‘দেখুন দেখি, আপনারা তো কবিতা…
-
প্রবাসী বন্ধুর প্রতি / আবুল হাসান
এই তো এখানে আমি একা বসে আছি বন্ধু, তুমি শুধু দূরে চলে গেছো। গাঢ় অন্ধকার হতে জন্তুগুলো আসছে বেরিয়ে সদম্ভ লাঙুল তুলে অতর্কিত তাদের চীৎকার ভীত ত্রস্ত করে দেয় ব্যস্ত সব সংখ্যা জোড়া দিয়ে এ কথা জানাতে চায় সর্দি, কাশি, গলা বসে গেছে, কেউ এসে জন্তুটার কান ধরলোনা! আমি শুধু একা একা সন্ধ্যা কাটালাম! মনে…
-
হে প্রেম / আবুল হাসান
তাছাড়া নেই তো এই হৃদয়ের শিলামুখে সমুদ্র গর্জন। নেই ভেজা চোখ, ছোঁয়া নক্ষত্রের আলো, কী দারুণ নির্জনতায় শুধু সেই বিষণ্ন আকাশ অপ্রতিভ কী যে কাঁদে, সূর্য জ্বালায়। সে কখন উদ্ধৃত্ত শষ্যে গোলাঘর, সমুদ্রের মত সুলীল আকাশে কেঁপে চলে গেছে অস্থির অভাবে! সব ক্লান্তি অশ্রু আর উম্মথিত পাঁজরের ক্ষোভে, অভ্রের বিষের ছোঁয়া, ছড়ায় বিদীর্ণ ক্লান্তি। উইঢিপি…
-
নিসর্গ / আবুল হাসান
ত্রিকোন চক্ষু এঁটে খণ্ড অবয়বে, যে বোধ বিস্মৃতি খুঁজে, জরাক্রান্ত ধুলো, বস্তি, বিকারগ্রস্থ আড্ডায় কিংবা উৎসবে নেমে উঠে, উঠে নেমে, বিস্রস্থ বার্ধক্য খোঁজে ঘন বরফের মতো শীতল দুর্বাক্যে যার মুকের সেমিজ নিবিষ্ট আনন্দে ফোলা, তার অনাদৃত চোখের আঁধারে অনেক সবাক ছবি বিস্মৃতির পথ পায় জানি। এও হতে পারে, যদি অস্থির মণ্ডলে নিদ্রালু পূজার বর্তে ছেঁড়া-ফাটা…
-
সমস্ত কবিতার শেষে / আবুল হাসান
পৃথিবীর সব কাব্য লেখা হয়ে গেলে, আমার টেবিলে কিছু শব্দ পড়েছিল ”একান্ত মলিন, জীর্ণ!” সংগ্রহ করে রজনীগন্ধার পাশে রেখে দিয়ে ফুৎকার দিলাম, “সমস্ত ছড়িয়ে পড়ে, ক্রমাগত লিখে চলে নক্ষত্রের কবিতা” শুধু এক নাম, সে তোমার নাম!