-
ভূত-ভবিষ্যৎহীন এই অন্ধকার / আল মাহমুদ
অন্ধকারের মধ্যে আরো অন্ধকার। স্তব্ধতার মধ্যে যেমন আমি আমাকে খুঁজে বেড়াই। তেমনি অন্ধকারেরও একটা ওম আমাকে বোঝাতে চায় যে আমি কেউ নই। আমি কী সত্যিই কেউ নই? আমি কি আমি নই? তাহলে এই অনুভব কোত্থেকে আসে, আমি হাঁটছি। আমি কি করে বুঝি চতুর্দিকে খানাখন্দর, গহ্বর। চলতে হবে আমি জানি পা টিপে টিপে, মৃত্যুকে এড়িয়ে কিংবা…
-
আমার চলা / আল মাহমুদ
দেখো কীভাবে হাঁটে লোকটা। দেখলে মনে হবে দাঁড়িয়েই আছে। কিন্তু আমরা বুঝতে না পারলেও তার চলার মধ্যে একটা এগিয়ে যাওয়া আছে। ধীর লক্ষ্যভেদী যাত্রা। যেনো খরগোশদের কথোপকথন। সে পরিচিত কচ্ছপকে নিয়ে আদি মশকরা। আসলে আমি তো দাঁড়িয়ে নেই। ঘড়ির ঘন্টার কাঁটার মতো অস্থানু। অথচ দেখলে মনে হয় চলছে না। খুব মিহি আওয়াজের নিঃশব্দ হৃদপিন্ডের মতো।…
-
বিপরীত উচ্চারণ / আল মাহমুদ
আমি নিসর্গের ভাষা বুঝি। নৈশব্দও আমার কাছে কখনো কখনো বাঙময়। শৈশবে গাছ, মাছ, পাখি ও পতঙ্গের সাথে কথা বলে আমি অভ্যস্ত কিন্তু অসুবিধে হচ্ছে মানুষকে নিয়ে। আমার ধারণা ছিল আমি যখন মানুষ। মানুষের ঘরেই জন্মেছি। তখন পৃথিবীর তাবৎ মানুষের ভাষা আমি বুঝব। কত অনায়াসে আমি প্লেনের জানালা দিয়ে মেঘের সাথে কথা বলতে বলতে আটলান্টিক পাড়ি…
-
কবিতার কথা / আল মাহমুদ
আমার মেয়ে খাঁচায় একটা ময়না পুষতো। আদরে আব্দারে কিভাবে যেন পাখিটার নাম দাঁড়িয়ে গেল কবিতা। বাইরে থেকে কেউ ঘরে এলেই ‘কবিতা, কবিতা’ বলে পাখিটাকে তোয়াজ করতো। এমন কি আমিও যে কিনা জন্তু-জানোয়ার পোষার ঘোর বিরোধী। মাঝে মধ্যে পাখিটার চকচকে কালো পালক ও হলদে ঝুটি দেখে হঠাৎ বলে ফেলেছি, কি রে কবিতা? আমার ডাকে পাখিটা সহসা…
-
শতাব্দীর শেষ রশ্মি / আল মাহমুদ
অস্তমিত শতব্দীর শেষ রশ্মি তোমার চিবুকে ছায়া ও কায়ার মতো স্পর্শ দিয়ে নামে অন্ধকার; লাফায় নুনের ঢেউ। রক্তাম্বর জলধির বুকে আবার নামের ধ্বনি, কার নাম? সেও কি তোমার? ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নই। কিন্তু জেনো কবির নয়ন ভেদ করে গ্রহান্তর, পার হয় সমস্ত উদ্যম, কেন এত রক্ত তবে, কেন এত মৃত্যুর বয়ন তাঁত বুনে ব্যর্থতার? নক্সাি তোলে…
-
জাহরা ভাদুগড়ী / আল মাহমুদ
মাঝে মাঝে মেয়েটার কথা মনে পড়ে। এসেই বলতো, আমি জাহরা বানু। তিতাস পাড়ে বাড়ি। ঘন ঘন কলিংবেল চেপে সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত। কেউ দরজা খুলে দিলে হাসত, আমি জাহরা। স্যারকে কবিতা শোনাতে এসেছি। আমি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। হাসতাম। মৃদু হাসতাম। হাতের ইঙ্গিতে বলতাম, ভেতরে এসো। লম্বায় তালগাছের মতো সটান। এলো খোঁপা বাঁধা। দেখতে শীর্ণকায়…
-
মৎস্যগন্ধ্যা ঋতুর উপলব্ধি / আল মাহমুদ
বিপর্যস্ত উন্দ্রিয়গুলোর উপর মাদুর বিছিয়ে সূর্যাস্ত দেখছি। অন্ধকার ছুটে আসছে পশ্চিম থেকে। আর ইবলিশের হাসির মতো গুমগুমিয়ে উঠছে বিদ্রুপ। কে এই হারামজাদাকে জানিয়ে দেবে এটা শরৎকাল। ওর কানে আমি পরগাছা গজিয়ে তুলেছি। ওর চোখে শেয়ালেরা হিসি করছে। ওকি জানে আমিই পুঁজির রাজা! ওকে কে বলে দেবে আমার নামই নতুন বিশ্ব নিয়ম? আমি ওর মগজে উঁইপোকা…
-
অমরতার আলেয়া / আল মাহমুদ
সবাই বলে পার হয়ে যাও। আমি হন্তদন্ত হয়ে অতিক্রম করেছি নদী। পরামর্শ কিংবা বলা যায় অনুচ্চারিত দৈববাণীর ধমক আমার কর্ণকুহরে ক্রমাগত আছড়ে পড়তে থাকে, পার হয়ে যাও। আমি আমার ক্ষত-বিক্ষত হাঁটুর খটখটানি তুলে উল্লংঘন করি গৌরীশৃংগ। তবু সেই দৈবাদেশ এবার শ্রবণেন্দ্রিয় থেকে সরে গিয়ে হৃৎপিন্ডের দুলুনিতে বাজতে থাকে, পার হও! পার হও! কেন পার হবো?…
-
স্বপ্নের উৎপাত / আল মাহমুদ
সারা জীবন আমি উদ্ভট স্বপ্নের মধ্যেই পাশ ফিরে শুয়েছি। দুঃস্বপ্নের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে বালিশের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে সান্ত¦না খুঁজেছি। ভেবেছি, ওটা ছিল স্বপ্ন। সম্ভবত আমি ঘুমকাতুরে লোক বলে খোয়াবের জ্বীন আমার পিছু ছাড়তে চায় না, ঘুমের শুরুতেই অস্বাভাবিক একটা শিরশিরানি আমার হৃৎপিন্ড থেকে নিঃসৃত হয়ে মস্তিষ্কের সব স্বপ্নের খুপড়িতে ফোকাস ফেলে। আমি দেখি গাছগুলো স্থান…
-
কালঘুম / আল মাহমুদ
এতদিন আমাকে নিয়ে কারো কাছে উদ্বেগই ছিল না। পরিবারের একটা প্রায়ান্ধ মানুষ কোথায় কীভাবে আছে এ-নিয়ে কেউ ভাবত না। কারণ ছেলে-মেয়েদের ধারণা ছিল আব্বা ঘরের যেখানেই খাকুন বই নিয়েই আছেন সজাগ। কেবল আহার-বিহারের সময় স্ত্রী একটু তাগাদা দিতেন বলতেন ওঠ… যেন একটা পাথরকে ঠেলে গড়িয়ে নাইতে নিয়ে যাচ্ছেন। আমার খাওয়া হয়ে গেলে এ-বাড়ির সবাই ঝাঁকবেঁধে…
-
পাথর ও রক্তের বিবাদ / আল মাহমুদ
কী আছে অনাস্বাদিত? ঠোঁট রেখে কঠিন শিলায় পাথরের গন্ধ শুঁকি পেতে চাই সৃষ্টির লবন। গ্রানিটে জিহ্বা লাগে, আলজিভে শ্যাওলার স্বাদ স্বাদ নয়, এ কেবল পাথর ও রক্তের বিবাদ। অভুক্ত কবির মুখে, আলজিভে জমেছে যে পানি এ দিয়ে নরম হয় জগতের প্রকৃতিনিচয়, কেবল অনম্য তুমি। পাথরের চেয়েও পাথর। হাসো বাসো নাশ করো মানুষের সব বরাভয়। ২.…
-
না কোন শূন্যতা মানি না (উৎসর্গ) / আল মাহমুদ
আমি আর ফিরবো না। সময়ের বিপরীত গতি কেন যে আমাকে টানে? টানে নদী টানে চরভূমি, কিংবা চুম্বক সেই, যার নাম কবির নিয়তি, হয়তো বিস্মৃতি টানে। মৃত্যু টানে। টেনে ধরো তুমি স্মৃতির অদৃশ্য বাহু এতদূর বাড়ায় আঙুল বাড়িয়ে দিয়েছে দেখো তুলে নিতে কবির হৃদয় কিন্তু এতো মাংস মাত্র, রক্তরস, যদিও তুমূল আক্ষেপের আলোড়নে জপে চলে প্রেমের…
-
সোনালী কাবিন / আল মাহমুদ
এক. সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিনী যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি, আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি; ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন, ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি; দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি।…