-
আগমনি / কাজী নজরুল ইসলাম
এ কী রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন – ঝন রনরনরন ঝনঝন! সে কী দমকি দমকি ধমকি ধমকি দামা দ্রিমি দ্রিমি গমকি গমকি ওঠে চোটে, চোটে, ছোটে লোটে ফোটে! বহ্নি ফিনিক চমকি চমকি ঢাল-তলোয়ারে খনখন! সদা গদা ঘোরে বোঁও বনবন শোঁও শনশন! হই হই রব ওই ভৈরব হাঁকে লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল গৈরিক-গায় সৈনিক ধায়…
-
বিবেকের প্রতিনিধি / ফজলুল হক তুহিন
পিচের সড়কে হেঁটে চলি, চলে কবির শরীর। লাইট পোস্টের আলো রাস্তার মসৃণ পিঠে পড়ে কাঁদে আর কাঁদে। টিপটিপ বৃষ্টির পালক ঝরে নিসর্গে, সড়কে, জোনাকীর নীল ডানায়, কবির জমার জমিনে আর চায়ের স্টলের ফুঁটো চালে। রিকসার টুংটাং শব্দে ও নৈশব্দে ওড়ে পাখি। সন্ধ্যের নরম অন্ধকার দেহে করে মাখামাখি আর নক্ষত্রের মুখ চলে যায় দৃষ্টির আড়ালে। হেঁটে…
-
পুরোনো বাড়ি / সায়ীদ আবুবকর
পুরোনো এই বাড়ি, বুনো লতায় ঘেরা, দাঁড়িয়ে নির্জনে; পড়ছে খসে ছাদ, পলেস্তারা আর নকশা করা ইট; কে ছিলো এই বাড়ি-জানে না কেউ আজ, কারো তা নেই মনে; সেখানে বাস করে এখন ভূতপ্রেত, সর্প আর কীট। সিংহমূর্তিটা দাঁড়িয়ে তিন পায়ে সদর দরোজায়, গিয়েছে ভেঙে মুখ, রেখেছে ধরে তবু প্রাচীন প্রাচূর্য; এখানে একদিন উঠতো রাতে চাঁদ জমাট…
-
তবুও তো জানি / আবুল হাসান
তবুও তো জানি সুরেসা তোমার নীহার পালকে ঠোঁট গুঁজে একা একটি ময়ূর কেঁদেছিল সেই রাতে! ব্যথার তীরের ফলায় বিদ্ধ আর্ত হৃদয় অধীর আকাশ, অবুঝ তারার রংছুট যত ছিন্ন গোলাপ ঝরেছিল তাঁর সাথে। তীক্ষ্ন পাঁজরে মৌ নেশা আর উষ্ণ রক্ত ফুটিয়ে কেবলি দুরু যাতনার দলিত প্রহরে তারা ভীরু নির্বীজ অশ্রুর মতো সুরেসা তবুও ঝড়ের হাওয়ায় তোমার…
-
হযরত উসমান (রা.) : অজস্র প্রস্রবণ / আবদুল মান্নান সৈয়দ
আমি হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘উসমান! যদি আল্লাহতালা তোমাকে খিলাফতের পোশাক পরিয়ে দেন, তবে স্বেচ্ছায় কখনো তা খুলে ফেলো না।’ -আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ইতিহাসে জ্যামিতি কি কাজ করে যায় শব্দহীন? উমর এবং আলী বজ্রাদপি কঠোর; কোমল আবুবকর, উসমান। উসমান লাজুক, নির্বল, সত্তরেও সসংকোচ। একমাত্র আল্লাহর অধীন। এমনই দরদী তিনি, খুললেস অজস্র প্রস্রবণ মরুবালুকার…
-
গন্তব্যের কাছাকাছি এসে / আল মাহমুদ
নদীটা পেরিয়েই মনে হল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সব শব্দ আমাকে ছেড়ে গেছে। ঢেউ, বৈঠা আর পানির ছলছলানির সাথে এতক্ষণ নিরুদ্দেশ যাত্রার যে প্রতিবাদ উঠেছিল। আশ্চর্য নৈশব্দের মধ্যে কখন সব তলিয়ে গেল। শত্রুতাও কি এখন এমন সবুজ মাঠ? যতদূর চোখ যায় বিদ্বেষ হয়ে গেছে পাকা ধানের দুলুনি? আমার পরিশ্রম দেখে যারা একদা বলত, আর একটি মাত্র নদী আর…
-
যখন বিরতি / আহসান হাবীব
নিখুঁত সংলাপে আর অভিনয়ে দু’বেলার কড়ি কুড়িয়ে, পেছনে রেখে মঞ্চের আলোকসজ্জা আর সাজঘরের সীমানা পেরিয়ে পোড়া ইট সাজানো বাগান দূরে রেখেে এখানে বিশ্রাম করি একা বসে অকৃত্রিম মাটির আসন পেতে। সব সাজ খুলে ফেলি রাজা কিম্বা উজীরের অথবা ভাঁড়ের বিচিত্র টুপিটি খুলে দূরে রাখি। ঘাসের শিশিরে মুখের সমস্ত রঙ তুলে ফেল নিপুণ দু’হাতে। অতঃপর সামনের…
-
বিদ্রোহী / কাজী নজরুল ইসলাম
বল বীর- বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর- বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া খোদার আসন আরশ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর! মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর! বল বীর- আমি চির উন্নত শির! আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, মহা-প্রলয়ের…
-
উৎসর্গ / কাজী নজরুল ইসলাম
বাঙলার অগ্নি-যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু অগ্নি-ঋষি! অগ্নিবীণা তোমায় শুধু সাজে। তাই তো তোমার বহ্নিরাগেও বেদনবেহাগ বাজে। দহনবনের গহনচারী — হায় ঋষি — কোন্ বংশীধারী নিঙড়ে আগুন আনলে বারি অগ্নিমরুর মাঝে। সর্বনাশা কোন্ বাঁশি সে বুঝতে পারি না যে। দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হানছিলে বৈশাখে, হঠাৎ সে কার শুনলে বেণু কদম্বের ওই…
-
অন্ধকারের সান্নিধ্য / সাইফ আলি
বাড়ন্ত কষ্টের ছায়াটাকে মুছে ফেলো; নেভাও প্রদীপ- কে তুমি প্রদীপ জ্বেলে দেখে নিলে সবটুকু ব্যথা? পানপাত্রে অধরের নিংড়ানো বীষ নীল, সমুদ্র অথৈই; আকাশের চিরচেনা নীল নয় লাশের মিছিল আর শূন্য বাড়িটার পড়ে থাকা দরজার খিল। সবকিছু বুঝে নিলে, নাও; তবু প্রদীপ নেভাও। মাঝে মাঝে অন্ধকার বন্ধু হয় ভালো শুষে নেয় দুঃখ আর কষ্টের সমস্ত দাগ;…
-
নারী নদী ও নিসর্গে / ফজলুল হক তুহিন
[কবি আল মাহমুদকে] নারী নদী ও নিসর্গে কিভাবে আপনি পান বিশ্বাসের ঘ্রাণ? কিভাবে দেখতে পান মিথ্যাবাদী রাখালের মতো ভবিষ্যৎ! কী করে সাহসী হন পালক ভাঙার প্রতিবাদে সুবৃহৎ! ভাবতেই এসব হই বিস্মিত, রঞ্জিত- আশাবাদী হয় প্রাণ। বখতিয়ারের সেই দীপ্ত ঘোড়ার ক্ষিপ্র খুরের শব্দ শুনি যখন মায়ের মতো শোনান গল্প, দেখান স্বপ্ন; আকাঙ্ক্ষিত স্বদেশের জন্যে আমি যখন…
-
সন্ধ্যা / সায়ীদ আবুবকর
অন্ধকার আর শান্তি ঝরে পড়ে এ ভরা সন্ধ্যায় যেভাবে ঝরে পড়ে গোলাপফুল হতে নরম পাপড়িরা; জমিন দেয় ভরে সুবাসে কামিনী ও রজনীগন্ধায় জলধি দেয় ভরে যেভাবে তটিনীর শিরা ও উপশিরা। পাখিরা ফিরে গেছে দিনের রোদ নিয়ে ক্লান্ত পাখনায়, গিয়েছে থেমে সব শব্দসংগীত, সুরের ঝংকার; জেগেছে নিরবতা, ফেলেছে ঢেকে তার জাদুর ঢাকনায় বিশ্বচরাচর; অন্ধকার যেন বোবা…
-
সমর্পণ / আবুল হাসান
১ সেই তো আমি দাঁড়িয়েছিলাম প্রভু ঘুমের বেশে শয্যা আমার চরম আলুথালু তোমার পদপাতে আবার চাই যে সংসার, ঈশ্বর হে শর্ত কোরে বোলতে হবে আরো? রক্তস্রোতে সম্মোহনী ভয়ের দারূন জরা পুষ্পায়িত হতাম আমি, হতেও পারি তবু, পুষ্পশাখে ঈশ্বর হে তোমার সাথে যদি নাই-ই ফোটাই সমর্পিত পুষ্পরেনুটিরে? হো হো করে হাসতে গিয়ে দুঃখ কাঁপে যার রে…
-
হযরত উমর (রা.) : গোলাপে-ইস্পাতে / আবদুল মান্নান সৈয়দ
হজরত উমর (রা.) বলেছেন,‘ইমরুল কায়েস অন্ধ ও অজ্ঞাত বিষয়বস্তুকে দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন।’ -আল ফারুক : আল্লামা শিবলী নো’মানী ইমরুল কায়েস ক-টি অন্ধকে করেছে দৃষ্টিদান?- তুমি শিখিয়েছ তার চেয়ে অনেক-অনেক বেশি : তোমার চরিত্র যেন গোলাপে-ইস্পাতে মেশামেশি : পুত্রকে ছাড়োনি; আর দাসকে- মানুষের সম্মান! শিখিয়েছে কোমলতা- গোলাপের অধিক গোলাপ! শিখিয়েছ কঠোরতা- ইস্পাতের চেয়েও ইস্পাত! তলোয়ারে-কবিতায় পরস্পরে…
-
অন্ধের ভূমিকা / আল মাহমুদ
ছিলাম তো মুখ ফিরিয়ে। ভেবেছিলাম উদয়াস্তে আমার কি ভূমিকা? আলোর আভায় ও বিকিরণে আমি স্তস্তিত পাথরের পাথরের জমাটবাঁধা অন্ধকার মাত্র। দায় ও দায়িত্ব থেকে দূরে দিন আর রাতের নিয়মগুলেঅ আবর্তিত হোক। আমি জানবো না কারা পৃথিবীতে এল গেল। আর অন্ধের ধর্ম তো স্থকিরতা। চোখ মেলে আছি অথচ দেখছি না কিছুই। এ ছাড়া আমার অন্ধত্বকে আমি…
-
ছহি জঙ্গেনামা / আহসান হাবীব
[তেসরা বাব] জ্বি হুজুর, আমি সেই হুজ্জত্ সরদার। জান নিযে বেঁচে আছি পাক-পরওয়ার খোদাওন্দ করিমের করম ফজলে। তবে কি না এলাহীর লানতের ফলে হয়েছে এমন হাল। হাড়-মাংসহীন আমি সেই খাকছার হুজ্জত্ কমিন। জ্বি হুজুর একদিন এই দুই হাতে লড়েছি এগারো হাত কুমীরের সাথে, গাঙের কুমীর টেনে তুলেছি ডাঙ্গায় ভেঙ্গেছি বাঘের মাথা এই বাম পায়। এক…
-
কোরবানী / কাজী নজরুল ইসলাম
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন! দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন! ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, – আজিকার এ খুন কোরবানীর! দুম্বা-শির রুম্-বাসীর শহীদের শির সেরা আজি!- রহমান কি রুদ্র নন? ব্যাস! চুপ খামোশ রোদন! আজ শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে, শির দে বৎস” শোন! ওরে হত্যা নয় আজ…
-
স্মৃতির আলো দৌড়ে আসে / ফজলুল হক তুহিন
স্মৃতির আলো দৌড়ে এসে কড়া নাড়ে দুয়ারে জেগে উঠে দু ভাগ হই অতীতে আর বর্তমানে জীবনের এই দু ধারে। স্মৃতি তুমি বড্ড বেশী জ্বালাও পোড়াও মন স্মৃতি তুমি অন্তরে নীল সুখের প্রস্রবণ। পালতোলা এক নাওয়ে চেপে পদ্মা নদীর ঢেউয়ে সে আর আমি আবেগ হাওয়ায় মুহূর্তে হই আপন। স্মৃতি আমার যন্দ্রণাময় নিঃসঙ্গতার মলম স্মৃতি আমার প্রাণ…
-
হজরত আবু বকর (রা.): দৃষ্টিতে-শ্রবণে / আবদুল মান্নান সৈয়দ
নবীগণ ব্যতীত সূর্যের উদয়াস্তের এই পৃথিবীতে আবুবকর (রা.)-এর চেয়ে মহত্তর কোনো ব্যক্তি কখনো জন্মায়নি। -হজরত মুহম্মদ (সা.) সাওর-গুহায় সঙ্গী হয়েছিল কে রসুলুল্লাহর? কে ছিল সত্য গ্রহণে দ্বিধামুক্ত, নিশ্চিন্ত, নির্ভীক? কে ছিল নবীর সঙ্গে যেন আলো, যেন অন্ধকার? কে সর্বস্ব সঁপেছিল? – ত্যাগী আবুবকর সিদ্দিক! ছিলে – উমরের সাথে – রসুলের দৃষ্টি ও শ্রবণ! যে-কোনো ব্যক্তির…
-
ইডেনকাব্য / সায়ীদ আবুবকর
নদীর জল নাচে নদীর বুক জুড়ে জলের ’পরে নাচে রূপসী জোছনারা বনের যত ফুল স্বপ্নে যায় উড়ে যেখানে ঘুরে ঘুরে নাচিছে জলধারা জলের নিচে নাচে মাছেরা দল বেঁধে কিসের উৎসব কে জানে রাতে আজ! মৎস্যকন্যারা আঁচলে জল বেঁধে দোলায় কটিদেশ তাদের সাথে আজ। বহিছে মৃদুবায়ু, গাহিছে বনে পিক অবাক চোখে শুধু চাহিয়া আছে চাঁদ নদীর…