-
বুনো কৈতর / সাইফ আলি
কই তোর কৈতর কই বুনো কৈতর বুঝি উড়ে গেছে বনে, তাই বুঝি নির্জনে একাকি গোপণে কাঁদছিস? বোকা! নিজেকে নিজেই তুই দিয়েছিস ধোকা। ডানাদুটো প্রিয় ছিলো কাটিসনি তাই? তাহলে তো উড়বেই, মিছে অভিমানে কাঁদছিস বোকা, শোন- প্রিয় কৈতর, সারাক্ষণ বাস করে বুকের ভেতর।
-
পোড়ামাটির টব / সাইফ আলি
আজকাল ছোট এই পোড়ামাটির টবেই কোনোমতে টিকে আছে কবিতার চাষাবাদ, প্রত্যাক্ষাণের জৈব আর অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাদের নোনতা জলবায়ু চারাগুলোকে এমন পরিপুষ্ট করে তুলবে ভাবতে পারিনি। তুমি তো ভেবেছিলে, অধিকারের আবাদি জমিটুকু কেড়ে নিলেই নিস্ব হয়ে যাবো; তোমার পায়ে পড়ে বলবো- আর একটা মৌসুম, মাত্র আর একটা; তারপর সব তোমার! শেষ যেবার মেঘ ফেটে বৃষ্টি নামলো, উঠোন…
-
-
ইতিহাস-বিন্যাসের পথে / আহসান হাবীব
এখন হৃদয়ে ডাক বসন্তের- স্তব্ধবাক্ পাখিরা মুখর। সময়ের ক্লান্তি ঝেড়ে অনায়াসে এখানে এখন অশেষ তৃষ্ণার ঢেউ পাখা মেলে। ভাঙা হাটে নগরে বন্দরে রাত্রির পাহারা আর মৃত্যুকে এড়িয়ে সেই ঢেউ এতদিন এখানে এখন বিশাল সমুদ্র এক- এখন জোয়ার। এখন জোয়ার আর ঘাটে বাঁধা সাম্পানের মাঝি তুলেছে নতুন পাল পালে তার মৃদঙ্গের সুর হাওয়ায় হাওয়ায় সুর বসন্তবাহার-…
-
বাংলার “আজীজ” / কাজী নজরুল ইসলাম
পোহয়নি রাত, আজান তখনও দেয়নি মুয়াজ্জিন, মুসলমানের রাত্রি তখন আর-সকলের দিন। অঘোর ঘুমে ঘুমায় যখন বঙ্গ-মুসলমান, সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান! ফজর বেলার নজর ওগো উঠলে মিনার পর, ঘুম-টুটানো আজান দিলে – ‘আল্লাহো আকবর!’ কোরান শুধু পড়ল সবাই বুঝলে তুমি একা, লেখার যত ইসলামি জোশ তোমায় দিল দেখা। খাপে রেখে অসি যখন খাচ্ছিল…
-
গান্ধীজীর প্রতি / ফজলুল হক তুহিন
দু হাজার দুই সাল। ঠিক এই সময়ে গান্ধিজী, আপনার জন্মভূমে আগুনের স্বাদু খাদ্য হলো জীবন্ত মানুষ! মানুষের কয়লায় হিংস্রতার পেট এখন ভরাট দাউদাউ আগুনের চমৎকার জাহান্নাম আজ গুজরাট! আপনার ‘সত্যাগ্রহ’ আপনার ভস্মের সাথেই উধাও। সত্যের মতো নীতির মতো কবেই আভিধানিক শব্দাবলী। সে জন্যেই বুঝি আপনার সুসন্তানেরা সব কী নিপুণভাবে চিরে ফেলছে গর্ভবতীর পেট অতঃপর কী…
-
এপিটাফ / সায়ীদ আবুবকর
দাঁড়াও, পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে; দুদণ্ড দাঁড়াও স্থির এ সমাধিস্থলে- যেভাবে দাঁড়ায় বৃক্ষ মৃত্তিকার সঙ্গে; মানুষ কি বাঁচে, হায়, শূন্যে কিংবা জলে! যে-আকাশে থাক পাখি, ফিরে আসে নীড়ে; কিন্তু সেই পাখি শ্রেষ্ঠ, যে-পাখি ছড়ায় স্বদেশের গান মহা মানুষের ভিড়ে- সারা দেশ নুয়ে পড়ে তার পদ্মপায়! পিতা নূর মহম্মদ আর মা আমেনা, সায়ীদ আবুবকর বঙ্গজের নাম…
-
আর কি নেবে শব্দ ছাড়া / সাইফ আলি
একটা কবির সব কবিতা অন্য কারো হাতের মুঠোয় শূন্য খাতা, বিষন্নতা বুকের মধ্যে কি জল উঠোয়!? কি ফুল ফুটোয় শুকনো ডালের মুমূর্ষুতার বাকল পেটে এক জীবনের প্রেম কাহিনী ঝুলতে থাকে আকাশ ফেটে! আর কি নেবে শব্দ ছাড়া- আর কি আছে কবির কাছে? গোলাপ ছাড়া আর কি ফোটে একটা পুরোন গোলাপ গাছে? হয়তো কিছু বৃষ্টি আছে-…
-
আজকে কেমন বৃষ্টি / সাইফ আলি
আজকে কেমন বৃষ্টি এলো এলোমেলো ঝরলো ভীষণ সারা বিকেল-সন্ধ্যা-সারা রাত্রি জুড়ে আকাশ ফুড়ে ! রাস্তা জুড়ে বৃষ্টি ফোটা বেলুন ফোলায় ওড়ায় ছাতা মাতাল হাওয়া, একটু আলো একটু আঁধার সুখের এবং বিষন্নতার হঠাৎ হঠাৎ আসা-যাওয়া; গুনগুনিয়ে একটু গাওয়া একটু ঝরা পাতার পিঠে টাপুর টুপুর শব্দ-তালে। কদম ডালে ভিজতে থাকা একটা পাখি- জানলা খুলে বাড়িয়ে রাখা হাতের…
-
বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো / সায়ীদ আবুবকর
এত মৃত্যু, এত লাশ এত ধ্বংসযজ্ঞ, এত সর্বনাশ আর ছোপ ছোপ এত রক্তের উপর দিয়ে হেঁটে হয়তো বা স্বপ্নের সে গেটে পৌঁছে যাবো ঠিকঠিকই, যে রহস্যময় গেট খুললেই সাফল্যের সাজঘর- তারপর? বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো? ধু-ধু নীল আকাশে কেবলি ওড়ে আজ বাজপাখি, শকুন ও চিল। জীবনের রাজপথে ক্ষুধার্ত শেয়াল ডাকে। সেই ডাক টেনে আনে…
-
দুঃসময়ের প্রার্থনা / ফজলুল হক তুহিন
এইসব দিন এইসব রাত কিভাবে গড়ায় আমাদের প্রভু তুমি তো জানোই- রাতগুলো আর দিনগুলো সব খুন হয়ে যায়! আমরা তো প্রভু ত্রিকালদর্শী নই- সাধারণ আমরা সবাই অতীত-আগামী দেখি না, বুঝি না কুটিল পাঁকের বর্তমানও। বুঝি ইউনুস নবীর মতন আটকা পড়েছি ঘাতক মাছের পেটে বিষাক্ত দাঁতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় এই প্রাণের সীমানা! হায়, আমাদের বাঁচাবে…
-
আমি ইচ্ছে পুরণের মাটি নই / আল মাহমুদ
যারা আমাকে পরামর্শ দিতো মানুষ একা থাকতে পারে না। তারা হয়তো সত্যিই বলতো। কিন্তু আমি ছিলাম অনমনীয়। ছিলাম একটা পোড়ামাটির পাত্রের মতো। কারো ক্রোধ হলে পাত্রটিকে পাথরে আছড়িয়ে চূর্ণ করতে পারবে। কিন্তু দুমড়ে মুচড়ে আবার কাদার মতো ইচ্ছে পুরণের মাটিতে পরিবর্তন করতে পারবে না। প্রকৃত পক্ষে আমি অর্ধেক মানুষ আর বাকি অর্ধেক তো কবিতা। সম্পূর্ণ…
-
যৌবনজলতরঙ্গ / কাজী নজরুল ইসলাম
এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ? যে সিন্ধু-জলে ডাকিয়াছে বান – তাহারই তরে এ চন্দ্রোদয়, বাঁধ বেঁধে থির আছে নালা ডোবা, চাঁদের উদয় তাদের নয়! যে বান ডেকেছে প্রাণ-দরিয়ায়, মাঠে-ঘাটে-বাটে নেচেছে ঢল, জীর্ণ শাখায় বসিয়া শকুনি শাপ দিক তারে অনর্গল। সারস মরাল ছুটে আয় তোরা!…
-
শীতের সকাল / আহসান হাবীব
রাত্রিশেষ! কুয়াশায় ক্লান্তমুখ শীতের সকাল- পাতার ঝরোকা খুলে ডানা ঝাড়ে ক্লান্ত হরিয়াল। শিশির সন্নত ঘাসে মুখ রেখে শেষের কান্নায় দু’চোখ ঝরেছে কার, পরিচিত পাখিদের পায় চিহ্ন তার মোছেনি এখনো, আছে এখনো উজ্জ্বল- কান্নায় মাধুরীটুকু ঘাসে ঘাসে করে টলোমল। মলিন চাঁদের টিপ আকাশের পাণ্ডুর কপালে। প্রাত্যহিক পৃথিবীর পরিচিত সাতডিঙার পালে হাওয়া নেই। স্তব্ধ মূক এ অরণ্য…
-
হেমন্তের ঘর / সায়ীদ আবুবকর
সেজেছে বাংলাদেশ চাটগাঁয় মাটির পাহাড়ে, ধানসিঁড়ি-পুনর্ভবা-কপোতাক্ষ পাড়ে; নতুন শিশিরে ভিজে-নেয়ে সারা সিলেটের ঘাস আর নওগাঁর গাছের পাতারা; বসিয়েছে শুভ্রমেলা সিরাজগঞ্জের কাশ যমুনার দুই পাড়ে; পায়রার চোখ যেন সাতক্ষীরার আকাশ; মানিকগঞ্জের মাঠগুলো, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ি পরেছে সরিষাশাড়ি; সেজেছে বাংলাদেশ জামালপুর-ঠাকুরগাঁয়ে, যে হাঁটে কবির বুকে ঊর্বশীর পায়ে। প্রিয়তমা, ফিরে যাই চলো ফের পুনড্র নগরে,- মসলিন শাড়ি পরে…
-
ও বেহুলা ও সখিনা / ফজলুল হক তুহিন
ক. কী এক খোয়াবে পোয়াতী মেঘের মতো কেঁদে ফ্যালে বেহুলা সোয়ামি যে ঘরে মেখে দেবে তাকে প্রেমের প্রথম পরাগ সেখানেই তার প্রাণিত স্বপন হয়ে যাবে নীল বিলাপ- সে কথা কী হয় বিশ্বাস? তবু সাহসী বেহুলা। অতঃপর এলো সেই কাল রাত! নাগিনীর বিষে আসমানে জমে বিষমেঘ। জমিনে ঘাসেরা সবুজ হারায়। হাওয়ায় হাওয়ায় রটে অলুক্ষণে কী এক…
-
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি / আল মাহমুদ
কিছুকাল যাবত কিছু একটা পঁচে যাওয়া দুর্গন্ধ আমাকে কেবলি তাড়না করে ফিরছে। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে তা বুঝতে না পারলেও এটা আন্দাজ করতে পারছি কাছেই কী একটা যেন মরে পচে এ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমি প্রতিটি নদীর পানি নাকের কাছে এনে শুঁকে দেখেছি। না, মেঘনা যমুনা পদ্মা এই সব স্রোতস্বিনী মাঝে মাঝে শুকিয়ে তলপেট বের করে…
-
জীবন / কাজী নজরুল ইসলাম
জাগরণের লাগল ছোঁয়া মাঠে মাঠে তেপান্তরে, এমন বাদল ব্যর্থ হবে তন্দ্রাকাতর কাহার ঘরে? তড়িৎ ত্বরা দেয় ইশারা, বজ্র হেঁকে যায় দরজায়, জাগে আকাশ, জাগে ধরা−ধরার মানুষ কে সে ঘুমায়? মাটির নীচে পায়ের তলায় সেদিন যারা ছিল মরি, শ্যামল তৃণাঙ্কুরে তারা উঠল বেঁচে নতুন করি; সবুজ ধরা দেখছে স্বপন আসবে কখন ফাগুন-হোলি, বজ্রাঘাতে ফুটল না যে,…
-
ক্রান্তিকাল / আহসান হাবীব
মধ্যরাতে রাজপথে দেখি এক নরীর শরীর- যে নারী নায়িকা ছিলো কোনোকালে এই পৃথিবীর। সর্বাঙ্গ পুড়েছে তার বণিকের তৃষ্ণার উত্তাপ, হৃদয়ের রক্ত নিয়ে রেখে গেছে নখরের পাপ; দেখে মনে হয় বহুভোগ্য এই নারী, এ হৃদয় সে হৃদয় নয়। একদিন এই নারী ইতিহাস-বিন্যাসের ভার নিয়েছিল নিজ দেহে, পৃথিবীর সঙ্গীত সভার যে নারী সম্রাজ্ঞী ছিলো, অন্ধকার রাত্রির প্রহরে…
-
এপাড়ার চামচিকা ওপাড়ার মাতবর / সাইফ আলি
এপাড়ার চামচিকা ওপাড়ার মাতবর ঢাকা এসে আত্মিয়! বলে- মামা হাত ধর, এই ঢাকা শহরের অলিগলি-রাস্তায় তুবড়ি বাজিয়ে রাজ করে যাবো আস্থায় ভাগেযোগে নেতা আছি আমরা যে সাত ঘর। মাতবর বলে- বাহ, বুদ্ধি চমৎকার; মহৎ এ প্রস্তাবে বলুন অমত কার? সাতঘাড় এককাতে রাজি মতামত দেয় শাহাবাগে জড়ো হয়ে এক স্বরে ঘোঁত দেয়। ভেবাচেকা পাবলিক বলে, বাজিমাত…