• অনামাঙ্কিত হৃদয় / আল মাহমুদ

    আমার জীবনতরী দুলছে। যাকে বলি মরণপয়োধি এখন তার উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে পাল নামিয়ে ফেলেছি। গন্তব্যে পৌছার আগেই খসে যাচ্ছে মেধা, মনন, যৌবন ও স্মৃতি। এমনকি তোমার মুখও মনে পড়ে না। কেবল ভাঙাচোরা কিছু বিষয় মঝেমধ্যে আকাশ ফাটা বিদ্যুতের চমকে আমি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দেখতে পাই। ভাসছে আমার দুটি চোখ, ভাসছে আমার মগজের কিছু অংশ। আর ঘাউড়া…


  • তখন হে দেশবাসী / সায়ীদ আবুবকর

    হৃদয়ে ভারত যার, বাংলাদেশ মুখে আর যারা পাকিস্তান পুষে রাখে বুকে এদেশ তাদের নয়, তারা পরগাছা; এদেশের রক্ত চুষে তাদের এ বাঁচা নরকে বাঁচার মতো, তবু অহঙ্কারে চামচিকার পায়ে তারা জোড়া লাথি মারে এদেশবাসীর বুকে, আর কুটজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে দেশ। যখন জঞ্জালে ভরে গেছে পথঘাট, থেমে গেছে গতি, তখন হে দেশবাসী, শোনো এ মিনতি আমার,…


  • মহান সম্রাট, আপনাকে / ফজলুল হক তুহিন

    সম্প্রতি আমি একটি চরিতাভিধান রচনা করেছি পৃথিবীতে যারা সুমহান শুধু তাদেরকে নিয়ে। এই ধরুন চেঙ্গিস খান, হালাকু খান, হিটলার মিলোসভিচ প্রমুখ। আর আপনি তো আছেনই। একদম শুরুতেই- কেননা আপনি আমাদের যুগের প্রধান অধিপতি আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্ত কি চলে পৃথিবীর গতি? আপনার মহানুভবতা পৃথিবীতে প্রশান্তির সুবাতাস এনেছে দারুণ। দেখুন না আপনার অলৌকিক হাতের মায়ায় খরার…


  • তামসিক একটি মুহূর্ত / আহসান হাবীব

    একদা হঠাৎ এক অপরাহ্নে মনে হলো মৃত্যুও কঠিন হতে পারে। যেহেতু অনন্তকাল বাঁচবে না জানি মৃত্যুর দর্শনে বহু কবিতার শরীরে স্বাস্থের অতীন্দ্রিয় উজ্জ্বলতা রেখেছি; ভেবেছি জীবন এবং এই জগৎকে দুদিনের পান্থশালা; সহজে পেয়েছি নির্মল আনন্দ যার ব্যাখ্যা নেই পৃথিবীর ফুলের পাপড়িতে কিম্বা হীরকে পান্নায়। আহারে-বিহারে শুধু কালক্ষেপ, প্রতীক্ষায় হৃদয় রেখেছি উম্মুখ, কখন কবে অনাদি অনন্তকাল…


  • নগদ কথা / কাজী নজরুল ইসলাম

    দুন্দুভি তোর বাজল অনেক অনেক শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর, মুখস্থ তোর মন্ত্ররোলে মুখর আজি পূজার আসর,− কুম্ভকর্ণ দেবতা ঠাকুর জাগবে কখন সেই ভরসায় যুদ্ধভূমি ত্যাগ করে সব ধন্না দিলি দেব-দরজায়। দেবতা-ঠাকুর স্বর্গবাসী নাক ডাকিয়া ঘুমান সুখে, সুখের মালিক শোনে কি – কে কাঁদছে নীচে গভীর দুখে। হত্যা দিয়ে রইলি পড়ে শত্রু-হাতে হত্যা-ভয়ে, করবি কী তুই ঠুঁটো…


  • আমাদের একমাত্র কথা / সায়ীদ আবুবকর

    এইসব ফুল, নদী, নারী- হয়তো বা ভুলে যেতে পারি; ভুলে যেতে পারি বেচাকেনা, গঞ্জের চায়ের স্টল, চেনা রাস্তাঘাট, ব্রিজ, খালবিল; পারি আকাশের গাঢ় নীল যেতে ভুলে, আর ভরা চাঁদ, সর্ষে বাটা ইলিশের স্বাদ; আরো যদি চাও, দাদা, পারি ভুলে যেতে তরিতরকারি- সবজির খেত, ঘর, গোলা, খেজুরের রস, গুড়, ছোলা; এত পথ পার হয়ে এসে ভুলে…


  • রবীন্দ্রনাথের প্রতি / ফজলুল হক তুহিন

    ক দিন ধরেই মেঘে আর বৃষ্টিতে জিম্মি করে রেখেছে এই আমাকে, সবাইকে। মেঘকে নিশ্চয় প্ররোচণা দিয়ে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ। আশ্চর্য তাঁর বর্ষাপ্রীতি অসময়ে এই বাংলাদেশে বৃষ্টি ঝরায় একদিন নয়, দুইদিন নয়, এক সপ্তাহ সবাই বৃষ্টিবন্দি! মৃত্যুর পরও কেন আপনি বাড়িয়েছেন বর্ষাপ্রিয় যাদুকরি সেই হাত? আপনার মতো বর্ষাযাপনের সাধ থাকলেও সাধ্য নেই আমাদের। চায়ের স্টলে প্রাণজ আড্ডায়…


  • জীবন / আহসান হাবীব

    ভাঙাচোরা দেয়ালের স্তুপাকার পুরনো ইটের ইতিহাস-লাবণ্যের কিছু আভা পাওয়া যায় টের মনে মনে! কী আবেগে দু’হাতে সরাই পুরনো ইটের স্তুপ, লিখে রেখে যাই আরো কথা, আরো কিছু গান আর নতুন খেয়াল বানাই নতুন ইট নতুন দেয়াল। পথে পথে সংশয়ের সন্দেহের ধূলি ওড়ে কত, বেদনায় নত দুই চোখ, ঝরে অশ্রু। সেই ধূলি সেই অশ্রু নিয়ে দু’হাতে…


  • ভোরের পাখি / কাজী নজরুল ইসলাম

    ওরে ও ভোরের পাখি! আমি চলিলাম তোদের কণ্ঠে আমার কণ্ঠ রাখি। তোদের কিশোর তরুণ গলার সতেজ দৃপ্ত সুরে বাঁধিলাম বীণা, নিলাম সে সুর আমার কণ্ঠে পুরে। উপলে নুড়িতে চুড়ে-কিঙ্কিণি বাজায়ে তোদের নদী যে গান গাহিয়া অকূলে চাহিয়া চলিয়াছে নিরবধি– তারই সে গতির নূপুর বাঁধিয়া লইলাম মম পায়ে, এরই তালে মম ছন্দ-হরিণী নাচিবে তমাল-ছায়ে। যে-গান গাহিলি…


  • ভাষার অমর্ত্যলোক / সায়ীদ আবুবকর

    ভাষা তো হৃদয়ে জন্ম নেওয়া উচ্ছ্বাস- নিশব্দ, নিশ্চুপ; আর ভাষার চিত্রিত রূপ দুচোখের সব ছবি। মানুষ তো চলমান ভাষা, পাহাড় নিশ্চল- আর মহাসমুদ্রের ফেনায়িত জল অফুরন্ত শব্দময় যেন এক বঙ্কিম হৃদয়। অরণ্যের সব ফুল, ভাষা এক- রূপসী, সুগন্ধী; সুরের খাঁচায় বন্দী ডানা ঝাপটানো ভাষা অরণ্যের যত পাখি; আর নিশীথের নক্ষত্ররা যেন নিশব্দ লিরিক, সুরের আলোয়…


  • রাত দুটোয় দুচোখ / ফজলুল হক তুহিন

    রাত দুটোয় দু চোখ ঘুম পাথরের মায়াভার এক নিমেষেই ছিন্ন করে জেগে ওঠলো হঠাৎ প্রজাপতির ডানার মতো। চারপাশ অন্ধকার। ঝপঝপ শব্দে ধসে পড়ে রাত- ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের আঘাত- কোন্ উৎস থেকে আসে পৃথিবীর এই মুহূর্ত আবহে? তার চোখে ক্ষয়ের করাত তিমির মতন ভেসে ওঠে। সে কী নিজের গভীর বিশ্বাসের ক্ষতচিহ্ন? দ্বিধার দ্বিমুখী তীক্ষ্ম দাঁত? আতঙ্কে…


  • সমুদ্র অনেক বড় / আহসান হাবীব

    আমাকে বিশাল কোনো সমুদ্রের ঢেউ হতে বলো। হতে পারি, যদি এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারো- সমুদ্রের ঢেউ হারায় না সমুদ্রের গভীরে এবং ফিরে আসে শৈশবের নদীর আশ্রয়ে। সমুদ্রে বিলীন হতে চাই না। কেননা সমুদ্র অনেক বড় আর তার বড় বেশি দম্ভ আছে বলে তাকে ভয়; সে আছে নদীকে গ্রাসের প্রমত্ত লোভে মত্ত হয়ে। আমি তার লোভের…


  • আমি গাই তারই গান / কাজী নজরুল ইসলাম

    আমি গাই তারই গান – দৃপ্ত-দম্ভে যে-যৌবন আজ ধরি অসি খরশান হইল বাহির অসম্ভবের অভিযানে দিকে দিকে। লক্ষ যুগের প্রাচীন মমির পিরামিডে গেল লিখে তাদের ভাঙার ইতিহাস-লেখা। যাহাদের নিশ্বাসে জীর্ণ পুথির শুষ্ক পত্র উড়ে গেল এক পাশে। যারা ভেঙে চলে অপদেবতার মন্দির আস্তানা, বকধার্মিক-নীতিবৃদ্ধের সনাতন তাড়িখানা। যাহাদের প্রাণ-স্রোতে ভেসে গেল পুরাতন জঞ্জাল, সংস্কারের জগদল-শিলা, শাস্ত্রের…


  • বৃষ্টি / সায়ীদ আবুবকর

    বন, নদী, গ্রাম, মাঠ ভিজছে বৃষ্টিতে, ভিজছে মাঠের গরু, শালিকের ঘর; রোমাঞ্চিত কায়া আজ সুখসুখ শীতে, দুধজলে ভিজে যায় বাউলঅন্তর। বাউলঅন্তর যায় ভিজে পুরোপুরি যেভাবে কাকেরা ভেজে দলবেঁধে ছাদে; কোন্ কালে কে অন্তর করেছিল চুরি, সেই শোকে গৃহকোণে কেউ যেন কাঁদে! গৃহকোণে চোখে কারো বয়ে যায় নদী, আকাশ যে কার শোকে কেঁদে জার জার! যত…


  • পদ্মা আমার পদ্মা / ফজলুল হক তুহিন

    ‘নদী দেখব দাদু নদী দেখব দাদু!’ ‘কোথায় নদী ? এখানে কি নদী আছে পাগল?’ ‘কেন, সবাই তো রোজ দেখে আসে- তুমি একটা ছাগল !’ ‘হা হা হা , তো দাদুরা, কি কি দেখে আসে বলো না!’ ‘বিকেল যখন নেমে আসে রঙ বেরঙের নানান মেঘে ছবি আঁকে ওই আকাশে তখন দারুণ দৃশ্য ফোটে চারিদিকে নদীর বুকেই…


  • ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ / আহসান হাবীব

    সোনামুখী নারকেলের শাখায় শাখায় আর দুধ-সুপুরির বনে এখনো কি হাওয়া বয় বঙ্গোপসাগর থেকে বিকেলে? সোনালী রোদ এখনো কি মুখ দেখে জোয়ারের জলে? বিকেলে ঢেঁকির পাড়ে ক্লান্তি এলে ঘুম পেলে পা নামিয়ে- হেলির পাতায় বোনা নরম পাখায় কিছু হাওয়া খেয়ে, তার পরে, পুকুরে ঘাটের শেষে গলাজলে বুক রেখে এখনো কি দুই চোখ ছল ছল করে আর…


  • মন / ফররুখ আহমদ

    মন মোর আসন্ন সন্ধ্যার তিমি মাছ- ডুব দিল রাত্রির সাগরে। তবু শুনি দূর হ’তে ভেসে আসে-যে আওয়াজ অবরুদ্ধ খাকের সিনায়। সূর্য মুছিয়াছে বর্ণ গোধুলি মেঘের ক্লান্ত মিনারের গায়, গতি আজ নাইকো হাওয়ায় নিবিড় সুপ্তির আগে বোঝে না সে শান্তি নাই তমিস্রা পাথারে। তবু পরিশ্রান্ত ম্লান স্নায়ুর বিবশ সঞ্চরণে আতপ্ত গতির স্বপ্ন জমা হয় মনে, বুঝি…


  • সন্ধ্যা / কাজী নজরুল ইসলাম

    − সাতশো বছর ধরি পূর্ব-তোরণ-দুয়ারে চাহিয়া জাগিতেছি শর্বরী। লজ্জায় রাঙা ডুবিল যে রবি আমাদের ভীরুতায়, সে মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত করি যুগে যুগে হায়! মোদের রুধিরে রাঙাইয়া তুলি মৃত্যুরে নিশিদিন, শুধিতেছি মোরা পলে পলে ভীরু পিতা-পিতামহ-ঋণ! লক্ষ্মী! ওগো মা ভারত-লক্ষ্মী! বল, কতদিনে, বল,− খুলিবে প্রাচী-র রুদ্ধ-দুয়ার-মন্দির-অর্গল? যে পরাজয়ের গ্লানি মুখে মাখি ডুবিল সন্ধ্যা-রবি, সে গ্লানি মুছিতে শত…


  • তোমাতে অমর আমি / আহসান হাবীব

    মায়ের দু’চোখে শুধু তৃষ্ণা আর সারা মুখে তার কি গভীর ব্যাকুলতা বুঝিনি ! আমার শিশু চোখ নিষ্পাপ মূঢ়তা; কেবল অনন্যমনে শুদ্ধতার সমুদ্র-সাঁতার। মাকে চিনি, খেলার পুতুল, লাল ফুল, সাদা দেয়ালের সব ছবি চিনি; তবু জানি না কোথায় নামের মাধুরী আছে লুকিয়ে; মাকেও মা বলে ডাকার সেই কথা আর সুরের সুন্দর মিশ্রিত মহিমা আছে কোথায় লুকিয়ে…


  • বৈশাখী / ফররুখ আহমদ

    বৈশাখের মরা মাঠ পড়ে থাকে নিস্পন্দ যখন নিষ্প্রাণ, যখন ঘাস বিবর্ণ, নিষ্প্রভ ময়দান, যোজন যোজন পথ ধূলি-রুক্ষ, প্রান্তর, বিরান; শুকনো খড়কুটো নিয়ে ঘূর্ণী ওঠে মৃত্যুর মতন; সে আসে তখনি। তখনি তো ঘিরে ফেলে উপবন, বন;-চোখের পলকে, মুছে ফেলে ঘুমন্ত নিখিল সে আসে বিপুল বেগে। কণ্ঠে তার সুরে ইস্রাফিল বজ্রস্বরে কথা কয়, জানে না সে গম্ভীর…