-
সমুদ্রের গান / সায়ীদ আবুবকর
ওই নীল সমুদ্রশয্যায় শুয়ে আছে সহস্র মানুষ। শুয়ে আছে, নাকি ডলফিন হয়ে মৎস্যকন্যাদের সাথে নেচে নেচে গান গায় সোনালি রুপালি জলের গহিনে, যখন ক্রীড়ায় মত্ত সব বসন্তের পাখি ঝাঁক বেঁধে চঞ্চল চঞ্চুতে নিয়ে যায় তুলে ধবধবে সমুদ্রের ফেনা? যেখানে উত্তাল জলের মিছিল আজ ফণা তুলে নাচে, ওখানে, লরেনা, গিয়েছিল আকস্মিক জাহাজটি ডুবে। কি করুণ আর্তনাদে…
-
সচিবালয় / সায়ীদ আবুবকর
এতদিন কেবল মানুষই উঠতো এ সিঁড়ি দিয়ে উপর তলায়। কিছু গরু আজকে হঠাৎ উঠে গেল মানুষের সাথে পাশাপাশি। মানুষের সাথে কি-চমৎকার খোশগল্প করতে করতে উঠছিল তারা! দেখে বলাবলি করছিল লোকে, এখনই বরং সুন্দর লাগছে সব; এখনই বরং আদর্শ সচিবালয় বলে মনে হচ্ছে এ সচিবালয়টাকে। ২৬.৫.২০১৩ মিলন মোড়, সিরাজগঞ্জ
-
মধ্যযুগীয় খেলা / সায়ীদ আবুবকর
বাড়িগুলো ধসে পড়ার আগেই যদি লোকগুলো বের হয়ে যেত, ফোনে কেউ আগাম জানিয়ে দিতো তাদেরকে, টিভি চ্যানেলগুলো সতর্ক করে দিতো আগেভাগে কিংবা যদি ঘুমের ভেতর ভূমিকম্প দেখে ‘ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!’ বলে তারা চীৎকার করে উঠতো, তারপর খান জাহান আলির দরগায় গিয়ে লুটিয়ে পড়তো সিজদায়! তারা ধরেই নিয়েছিল, তাদের সুরম্য প্রাসাদগুলোতে কোনোদিন অসুখবিসুখ, অভাবঅনটন, ঝড়ঝন্ঝা, মৃত্যু ও…
-
রেত / সায়ীদ আবুবকর
করাতে কাটে না, গুঁড়িগুলো তাই পড়ে আছে অনাদরে; নস্যি টেনে টেনে মিস্তিরির কাটে দিন; তক্তা নেই, ফার্নিচারও নেই তাই। রেতের অভাবে পড়েছে অচল হয়ে সৌখিন কাঠের শিল্প তার। ১৭.১১.২০১২ মিলনমোড়. সিরাজগঞ্জ
-
লজ্জা / সায়ীদ আবুবকর
কেমন লজ্জার ব্যাপার না? আমি বললাম। কিসের লজ্জা, বৎস? এইভাবে বারবার তওবা করে করে তওবা ভঙ্গ করা, তারপর আবারও তওবা করা! একটা কুকুরও তো দশবার ভুল করে দশবার লাথি খাওয়ার পর ফিরে যায় না আর তার মনিবের বাড়ি। লজ্জায় আমরাও যেতাম না ফিরে, যদি থেকে যাওয়ার মতো থাকতো কোনো ঠাঁই। হায়, মানুষ কোথায় লুকায় মুখ,…
-
ফকির / সায়ীদ আবুবকর
ছেঁড়া আলখেল্লা পরে একটি ফকির হো হো করে হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছিল রাস্তা দিয়ে। আমি হাত ঊঁচু করে তাকে থামিয়ে দিলাম: কী ব্যাপার, এত হাসি কিসের? ভিক্ষেটিক্ষে কিছু চাই নাকি? তওবা তওবা বলে সে দৌড়াতে লাগলো চোখবুজে। পশ্চাতে ফিরেও তাকালো না একটিবার। কিছুদিন পর শহরের মাঝখানে তার সাথে ফের দেখা। অনেক দিনের পরিচিত কোনো মানুষের মতো…
-
মা / সায়ীদ আবুবকর
সে প্রথম চুম্বনের পর কেঁপে উঠেছিল থরথর করে, যেন ঝড়ে কাঁপা কোনো অশ্বত্থের কচি ডাল। অতঃপর অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো সে সুপ্রিয় তার প্রেমিক পুরুষের দিকে, যেন কোনো অবাক হরিণী। সে প্রথম মিলনের পর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠে নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মুগ্ধচোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল সুঠাম তার প্রেমিক পুরুষের বুজে থাকা প্রশান্ত চোখের পাপড়িগুলো।…
-
ভয় / সায়ীদ আবুবকর
ভয় কোথায় গেল হে, বলতে বলতে লোকটা দৌড়াচ্ছিল ঊর্ধ্বশ্বাসে। আমি ছুটে গিয়ে বললাম, ভাই, কী খুঁজছেন এইভাবে? সে থমকে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো, ভয়! ভয়কে এ ফেরাউনের শহরে আমি পাচ্ছি না কোথাও খুঁজে। হায়, এ শহরে ভয় ছাড়া কিছুই তো পড়ে না আমার চোখে- আমি বললাম, যেদিকে তাকাই, শুধু ভয়; বন্দুকের ভয়, কিরিচের ভয়, গলা…
-
নাটকের মতো / সায়ীদ আবুবকর
কেমন স্বপ্নের মতো লাগলো সব। মুসলমানির ভয়ে যে-ছেলেটি বুনোগাছের মতো গজে ওঠা পাটখেতের ভেতর পালিয়ে থাকতো একদিন, সে কেমন মৃত্যুকে তুচ্ছ করে বক্ষ উদোম করে দাঁড়িয়ে রইলো নির্ভীক, সীমারের ছুরির সামনে। কোনো সুন্দরীর চোখে চোখ পড়লে ভীতু হরিণের মতো যে কেমন আড়ষ্ট হয়ে যেত লজ্জায়, সমস্ত সুন্দরীর কলিজাগুলো কেটে বস্তায় পুরে সে ডুবিয়ে দিলো কি-নির্বিঘ্নে…
-
এ এমন এক জীবনকাহিনী / সায়ীদ আবুবকর
বাহির দেখলে মনে হয় পাকা, ভেতরটা খেয়ে গেছে পোকায়, এমনই একটি পেয়ারার মতো আমার দুর্দশা। চমৎকার বাঁশের খুঁটির উপর যেন দাঁড়ানো একটি আটচালা ঘর, সবগুলো খুঁটির পোতাই যার খেয়ে গেছে ঘুণে, ঝড় এসে ধাক্কা দিলেই যা উল্টে পড়বে ধুলোয়। অথবা একটি চোরাবালি যেন আমি, যার বুকে পা দিলে মানুষ তো ডোবেই, আমিও আমাকে নিয়েই ডেবে…
-
ভাঙা কলস / সায়ীদ আবুবকর
অতীতের কতক অংশ মুছে ফেলা যেত যদি, হৃদয়ের পুরোনো প্রাচীরগুলো ভেঙে ফেলা যেতো; যদি গা ঘিনঘিন করা লজ্জা ও অনুশোচনার দিবস ও রাত্রিগুলো কোঁদাল দিয়ে উপড়ে ফেলা যেত জীবনজমিন থেকে, জীবনের ঘড়ি থেকে ভালবাসাহীন সেকেণ্ড, মিনিট ও ঘন্টাগুলো ভস্ম করে দেওয়া যেত, মোবাইলের অস্বস্তিকর কোনো নম্বরের মতো মুহূর্তে ডিলিট করে দেওয়া যেত বিবেককে কেউটে সাপের…
-
কী গেলাম তন্ময় হয়ে লিখে / সায়ীদ আবুবকর
কী দেখলাম এ চোখে, কী শুনলাম এ কানে, কী ভাবলাম এখানে এই কদম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অস্থির মনে একা, আর কী সমস্ত ছাইভস্ম গেলাম তন্ময় হয়ে লিখে কালের পৃষ্ঠায়! রেক্টর স্কেলের ন মাত্রার ভূমিকম্পের পর কী কাব্য অবশিষ্ট থাকে পৃথিবীতে? যখন ধ্বংসের স্তুপ থেকে অঙ্কুরিত হয়ে ফের জেগে ওঠবে হুরের সভ্যতা, যখন রাষ্ট্র ও ভাষার…
-
অমরত্বে নেই, সুখে ও সফলতায় নেই / সায়ীদ আবুবকর
মরে গিয়ে মর্ত্যরে মানুষগুলো কত দিন বেঁচে আছে? কত দিন বেঁচে আছে সফোক্লিস, হোমার, এরিস্টোটল, প্লেটো, দান্তে ও মিল্টন? কত দিন হলো ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে আওরঙ্গজেব, জুলিয়াস সিজার, অশোক, আকবর, চেঙ্গিজ খান, মাও সেতুং ও আব্রাহাম লিংকন? কোন্ অমরত্বের অহংকার করে মানুষ নশ্বর পৃথিবীতে, যখন রহস্যময় অনন্তের একদিন = দুনিয়ার এক হাজার বছর? আমার…
-
বিকেলের সব কথা / সায়ীদ আবুবকর
জানাযায় দাঁড়িয়ে তাদের আত্মাগুলো বটের পাতার মতো কাঁপছিল। তাদের চোখের মণির উপর শেওলার মতো ভাসছিল গোরস্থানের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। পাপদগ্ধ দেহকারাগার থেকে লাফিয়ে পড়তে চাচ্ছিল তাদের বন্দী আত্মাগুলো বিকেলের রুপোলি রোদ্দুরে। মুনকার নাকিরের ভয়ে তারা যেন তাদের স্কন্ধের দু’পাশে তাকাতে পারবে না কোনোদিন, এরকমই ভাবছিল তারা। আর তাদের মনে হচ্ছিল, এরপর থেকে তারা ধোওয়া তুলশিপাতা হয়ে…
-
মূর্তির শহর / সায়ীদ আবুবকর
এত মূর্তি চারদিকে-ঘরের ভেতর, অন্তরের ভেতর, নগরদ্বারে, সিংদরোজায়, অফিসে অফিসে, দেয়ালে দেয়ালে, টেবিলে ও বুকসেলফে, উত্তরে-দক্ষিণে, পূর্ব ও পশ্চিমে, মাটিতে ও শূন্যের উপর-যেন মূর্তির বন্যায় ডুবে গেছে সারা দেশ। নমরুদের উপাসনালয়ের যে-মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন হজরত ইব্রাহিম, কারা যেন মেরামত করে তা বসিয়ে রেখে গেছে এই শহরের অলিতে গলিতে। কাবাশরিফের ভেঙে ফেলা মূর্তিগুলো বুকের ভেতরে নিয়ে…
-
চোখ / সায়ীদ আবুবকর
রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে হায়েনার চোখ জ্বলে; বাঘ তার চোখের আলোয় পথ দেখে দেখে চলে অন্ধকারে মোড়া রাতের অরণ্যে চুপচাপ; সাপ ও বৃশ্চিক হারায় না পথ, অন্ধকার মাড়িয়ে মাড়িয়ে পৌঁছে যায় ঠিকঠিকই লক্ষ্যস্থলে; কেবল মানুষই চলতে পারে না এক পাও ধার করা আলো ছাড়া; বিদ্যুতের ব্যবহার, টর্চ লাইটের ব্যবহার মানুষই কেবল করে। হায়, এই চোখ যদি…
-
এক দেশ এক পৃথিবী / সায়ীদ আবুবকর
মানুষ আমাকে বিপ্লবের কথা বলে। আমি বলি মানুষের প্রথম বিপ্লব হোক দেশের দেয়াল ভেঙে ফেলা। সীমান্তের সব কাঁটাতার ছিঁড়ে ফ্যালো। অতঃপর বিহঙ্গের মতো পাসপোর্ট ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ো পৃথিবীর দিগ্বিদিকে। মানুষকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে বলো, আমি মানুষের ভাই। যারা দেয়ালের কথা বলে, যারা সীমান্তে সীমান্তে কাঁটাতারের উপকারিতার কথা বলে, যারা নদীদের বুকের উপর সীসার বাঁধের প্রয়োজনীয়তার…
-
তাদের ভূতুড়ে চোখগুলো / সায়ীদ আবুবকর
যেন গোরস্থান থেকে উঠে এসে হাটাহাটি করছে তারা অফিসে অফিসে, রাস্তায় রাস্তায়। তাদের ভূতুড়ে চোখগুলো দেখে রাস্তার কুকুরগুলো থ হয়ে গেছে, বিদ্যুতের তারের উপর বসা রঙচটা কাকগুলো কা-কা ডাক ভুলে দার্শনিক হয়ে গিয়ে কী যেন ভাবছে একমনে। আমি ভয় পেয়ে ছুটে গেলাম গোরস্থানের দিকে। মনে হচ্ছিল কবর থেকে উঠে গিয়ে মৃত মানুষেরা হাঁটাহাঁটি করছে এভাবে…
-
সত্য / সায়ীদ আবুবকর
যখন ফিরিয়ে দেয় আদালত, শূন্যহাতে; যখন মুখের উপর ডাক্তার বলে দেয় সারবে না, তাতে কাঁচের গ্লাসের মতো ভেঙে খানখান হয়ে যায় বুক; যখন কেবলি স্বাস্থ্য ভাঙে খাদ্য, পূর্ব ও পশ্চিম তাবৎ মুলুক চলে যায় সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে; যখন একের পর এক পরাজয় নেমে আসে যুদ্ধে- যখন বিষণ্ন দুলদুল, দিশেহারা, ইমাম হোসেন ছাড়া ফিরে চলে ঘরে; তখন…
-
একটি পাতার কাহিনী / সায়ীদ আবুবকর
পাতাটি গাছের মগডালে জন্মেছিল। যখন সে কচি শিশুটি ছিলো, তাকে দেখলেই যে-কারোর দুচোখ জুড়িয়ে যেতো। যখন সে যৌবনে পা দিলো, বাতাসরা এসে তাকে প্রণয় নিবেদন করতো। সে বাতাসদের মৃদুস্পর্শে থরথর করে কাঁপতো সারাদিন। একটি কোকিল এসে তার পাশে চুপটি করে বসে থাকতো; তারপর কণ্ঠ ছেড়ে একসময় জুড়ে দিতো বসন্তের গান। প্রকৃতির নিয়মে পাতাটি একদিন হলুদ…