-
না–আসা দিনের কবির প্রতি / কাজী নজরুল ইসলাম
জবা-কুসুম-সংকাশ রাঙা অরুণ রবি তোমরা উঠিছ; না-আসা দিনের তোমরা কবি। যে-রাঙা প্রভাত দেখিবার আশে আমরা জাগি তোমরা জাগিছ দলে দলে পাখি তারই-র লাগি। স্তব-গান গাই আমি তোমাদেরই আসার আশে, তোমরা উদিবে আমার রচিত নীল আকাশে। আমি রেখে যাই আমার নমস্কারের স্মৃতি – আমার বীণায় গাহিয়ো নতুন দিনের গীতি!
-
দাড়ি-বিলাপ / কাজী নজরুল ইসলাম
হে আমার দাড়ি! একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি আমারে কাঙাল করি, শূন্য করি বুক! শূন্য এ চোয়াল আজি শূন্য এ চিবুক! তোমার বিরহে বন্ধু, তোমার প্রেয়সী ঝুরিছে শ্যামলী গুম্ফ ওষ্ঠকূলে বসি! কপোল কপাল ঠুকি করে হাহাকার – ‘রে কপটি, রে সেফটি (safety) গিলেট রেজার!’…. একে একে মনে পড়ে অতীতের কথা – তখনও ফোটেনি মুখে…
-
অন্ধ স্বদেশ-দেবতা / কাজী নজরুল ইসলাম
অন্ধ স্বদেশ-দেবতা ফাঁসির রশ্মি ধরি আসিছে অন্ধ স্বদেশ-দেবতা, পলে পলে অনুসরি মৃত্যু-গহন-যাত্রীদলের লাল পদাঙ্ক-রেখা। যুগযুগান্ত-নির্জিত-ভালে নীল কলঙ্ক-লেখা! নীরন্ধ্র মেঘে অন্ধ আকাশ, অন্ধ তিমির রাতি, কুহেলি-অন্ধ দিগন্তিকার হস্তে নিভেছে বাতি, − চলে পথহারা অন্ধ দেবতা ধীরে ধীরে এরই মাঝে, সেই পথে ফেলে চরণ – যে পথে কঙ্কাল পায়ে বাজে! নির্যাতনের যে যষ্টি দিয়া শত্রু আঘাত হানে…
-
বাংলার “আজীজ” / কাজী নজরুল ইসলাম
পোহয়নি রাত, আজান তখনও দেয়নি মুয়াজ্জিন, মুসলমানের রাত্রি তখন আর-সকলের দিন। অঘোর ঘুমে ঘুমায় যখন বঙ্গ-মুসলমান, সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান! ফজর বেলার নজর ওগো উঠলে মিনার পর, ঘুম-টুটানো আজান দিলে – ‘আল্লাহো আকবর!’ কোরান শুধু পড়ল সবাই বুঝলে তুমি একা, লেখার যত ইসলামি জোশ তোমায় দিল দেখা। খাপে রেখে অসি যখন খাচ্ছিল…
-
যৌবনজলতরঙ্গ / কাজী নজরুল ইসলাম
এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ? যে সিন্ধু-জলে ডাকিয়াছে বান – তাহারই তরে এ চন্দ্রোদয়, বাঁধ বেঁধে থির আছে নালা ডোবা, চাঁদের উদয় তাদের নয়! যে বান ডেকেছে প্রাণ-দরিয়ায়, মাঠে-ঘাটে-বাটে নেচেছে ঢল, জীর্ণ শাখায় বসিয়া শকুনি শাপ দিক তারে অনর্গল। সারস মরাল ছুটে আয় তোরা!…
-
জীবন / কাজী নজরুল ইসলাম
জাগরণের লাগল ছোঁয়া মাঠে মাঠে তেপান্তরে, এমন বাদল ব্যর্থ হবে তন্দ্রাকাতর কাহার ঘরে? তড়িৎ ত্বরা দেয় ইশারা, বজ্র হেঁকে যায় দরজায়, জাগে আকাশ, জাগে ধরা−ধরার মানুষ কে সে ঘুমায়? মাটির নীচে পায়ের তলায় সেদিন যারা ছিল মরি, শ্যামল তৃণাঙ্কুরে তারা উঠল বেঁচে নতুন করি; সবুজ ধরা দেখছে স্বপন আসবে কখন ফাগুন-হোলি, বজ্রাঘাতে ফুটল না যে,…
-
নগদ কথা / কাজী নজরুল ইসলাম
দুন্দুভি তোর বাজল অনেক অনেক শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর, মুখস্থ তোর মন্ত্ররোলে মুখর আজি পূজার আসর,− কুম্ভকর্ণ দেবতা ঠাকুর জাগবে কখন সেই ভরসায় যুদ্ধভূমি ত্যাগ করে সব ধন্না দিলি দেব-দরজায়। দেবতা-ঠাকুর স্বর্গবাসী নাক ডাকিয়া ঘুমান সুখে, সুখের মালিক শোনে কি – কে কাঁদছে নীচে গভীর দুখে। হত্যা দিয়ে রইলি পড়ে শত্রু-হাতে হত্যা-ভয়ে, করবি কী তুই ঠুঁটো…
-
ভোরের পাখি / কাজী নজরুল ইসলাম
ওরে ও ভোরের পাখি! আমি চলিলাম তোদের কণ্ঠে আমার কণ্ঠ রাখি। তোদের কিশোর তরুণ গলার সতেজ দৃপ্ত সুরে বাঁধিলাম বীণা, নিলাম সে সুর আমার কণ্ঠে পুরে। উপলে নুড়িতে চুড়ে-কিঙ্কিণি বাজায়ে তোদের নদী যে গান গাহিয়া অকূলে চাহিয়া চলিয়াছে নিরবধি– তারই সে গতির নূপুর বাঁধিয়া লইলাম মম পায়ে, এরই তালে মম ছন্দ-হরিণী নাচিবে তমাল-ছায়ে। যে-গান গাহিলি…
-
আমি গাই তারই গান / কাজী নজরুল ইসলাম
আমি গাই তারই গান – দৃপ্ত-দম্ভে যে-যৌবন আজ ধরি অসি খরশান হইল বাহির অসম্ভবের অভিযানে দিকে দিকে। লক্ষ যুগের প্রাচীন মমির পিরামিডে গেল লিখে তাদের ভাঙার ইতিহাস-লেখা। যাহাদের নিশ্বাসে জীর্ণ পুথির শুষ্ক পত্র উড়ে গেল এক পাশে। যারা ভেঙে চলে অপদেবতার মন্দির আস্তানা, বকধার্মিক-নীতিবৃদ্ধের সনাতন তাড়িখানা। যাহাদের প্রাণ-স্রোতে ভেসে গেল পুরাতন জঞ্জাল, সংস্কারের জগদল-শিলা, শাস্ত্রের…
-
সন্ধ্যা / কাজী নজরুল ইসলাম
− সাতশো বছর ধরি পূর্ব-তোরণ-দুয়ারে চাহিয়া জাগিতেছি শর্বরী। লজ্জায় রাঙা ডুবিল যে রবি আমাদের ভীরুতায়, সে মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত করি যুগে যুগে হায়! মোদের রুধিরে রাঙাইয়া তুলি মৃত্যুরে নিশিদিন, শুধিতেছি মোরা পলে পলে ভীরু পিতা-পিতামহ-ঋণ! লক্ষ্মী! ওগো মা ভারত-লক্ষ্মী! বল, কতদিনে, বল,− খুলিবে প্রাচী-র রুদ্ধ-দুয়ার-মন্দির-অর্গল? যে পরাজয়ের গ্লানি মুখে মাখি ডুবিল সন্ধ্যা-রবি, সে গ্লানি মুছিতে শত…
-
কালবৈশাখী / কাজী নজরুল ইসলাম
১ বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হল রে পুব-হাওয়ায়, দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়, কে পাগল সেথা যাস হাঁকি – ‘বৈশাখী কালবৈশাখী!’ হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়। সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারি নে, হায়।। ২ কালবৈশাখী আসিলে হেথায় ভাঙিয়া পড়িত কোন সকাল ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা দেওয়া ওই সনাতন দাওয়া,…
-
মানুষ / কাজী নজরুল ইসলাম
গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান! নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি, সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।–- ‘পূজারী, দুয়ার খোল, ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’ স্বপন দেখিয়ে আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়, দেবতার বরে রাজা-টাজা আজ হয়ে যাবো নিশ্চয়!— জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ ডাকিল…
-
বিদ্রোহী / কাজী নজরুল ইসলাম
বল বীর- বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি, নত – শির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর- বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’ ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া, খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চির – বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর ! মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর! বল বীর- আমি চির-উন্নত শির। আমি…