• জাগরণ / কাজী নজরুল ইসলাম

    জেগে যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের দ্বারে আসি ওরে পাগল, আর কতদিন বাজাবি তোর বাঁশি! ঘুমায় যারা মখমলের ওই কোমল শয়ন পাতি অনেক আগেই ভোর হয়েছে তাদের দুখের রাতি। আরাম-সুখের নিদ্রা তাদের; তোর এ জাগার গান ছোঁবে নাকো প্রাণ রে তাদের, যদিই বা ছোঁয় কান! নির্ভয়ের ওই সুখের কূলে বাঁধলযারা বাড়ি, আবার তারা দেবে না রে…


  • জীবন-বন্দনা / কাজী নজরুল ইসলাম

    গাহি তাহাদের গান – ধরণির হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান। শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে ত্রস্তা ধরণি নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে। বন্য-শ্বাপদ-সংকুল জরা-মৃত্যু-ভীষণা ধরা যাদের শাসনে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহরা। যারা বর্বর হেথা বাঁধে ঘর পরম অকুতোভয়ে বনের ব্যাঘ্র মরুর সিংহ বিবরের ফণী লয়ে। এল দুর্জয় গতিবেগ সম যারা যাযাবর-শিশু – তারাই গাহিল…


  • তরুণ তাপস / কাজী নজরুল ইসলাম

    রাঙা পথের ভাঙন-ব্রতী অগ্রপথিক দল! নাম রে ধুলায়−বর্তমানের মর্তপানে চল।। ভবিষ্যতের স্বর্গ লাগি শূন্যে চেয়ে আছিস জাগি অতীতকালের রত্ন মাগি নামলি রসাতল। অন্ধ মাতাল! শূন্য পাতাল, হাতালি নিষ্ফল।। ভোল রে চির-পুরাতনের সনাতনের বোল। তরুণ তাপস! নতুন জগৎ সৃষ্টি করে তোল। আদিম যুগের পুথির বাণী আজও কি তুই চলবি মানি? কালের বুড়ো টানছে ঘানি তুই সে…


  • না–আসা দিনের কবির প্রতি / কাজী নজরুল ইসলাম

    জবা-কুসুম-সংকাশ রাঙা অরুণ রবি তোমরা উঠিছ; না-আসা দিনের তোমরা কবি। যে-রাঙা প্রভাত দেখিবার আশে আমরা জাগি তোমরা জাগিছ দলে দলে পাখি তারই-র লাগি। স্তব-গান গাই আমি তোমাদেরই আসার আশে, তোমরা উদিবে আমার রচিত নীল আকাশে। আমি রেখে যাই আমার নমস্কারের স্মৃতি – আমার বীণায় গাহিয়ো নতুন দিনের গীতি!


  • দাড়ি-বিলাপ / কাজী নজরুল ইসলাম

    হে আমার দাড়ি! একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি আমারে কাঙাল করি, শূন্য করি বুক! শূন্য এ চোয়াল আজি শূন্য এ চিবুক! তোমার বিরহে বন্ধু, তোমার প্রেয়সী ঝুরিছে শ্যামলী গুম্ফ ওষ্ঠকূলে বসি! কপোল কপাল ঠুকি করে হাহাকার – ‘রে কপটি, রে সেফটি (safety) গিলেট রেজার!’…. একে একে মনে পড়ে অতীতের কথা – তখনও ফোটেনি মুখে…


  • অন্ধ স্বদেশ-দেবতা / কাজী নজরুল ইসলাম

    অন্ধ স্বদেশ-দেবতা ফাঁসির রশ্মি ধরি আসিছে অন্ধ স্বদেশ-দেবতা, পলে পলে অনুসরি মৃত্যু-গহন-যাত্রীদলের লাল পদাঙ্ক-রেখা। যুগযুগান্ত-নির্জিত-ভালে নীল কলঙ্ক-লেখা! নীরন্ধ্র মেঘে অন্ধ আকাশ, অন্ধ তিমির রাতি, কুহেলি-অন্ধ দিগন্তিকার হস্তে নিভেছে বাতি, − চলে পথহারা অন্ধ দেবতা ধীরে ধীরে এরই মাঝে, সেই পথে ফেলে চরণ – যে পথে কঙ্কাল পায়ে বাজে! নির্যাতনের যে যষ্টি দিয়া শত্রু আঘাত হানে…


  • নিশীথ অন্ধকারে / কাজী নজরুল ইসলাম

    এ কী বেদনার উঠিয়াছে ঢেউ দূর সিন্ধুর পারে, নিশীথ-অন্ধকারে। পুরবের রবি ডুবিল গভীর বাদল-অশ্রু-ধারে, নিশীথ-অন্ধকারে।। ঘিরিয়াছে দিক ঘন ঘোর মেঘে, পুবালি বাতাস বহিতেছে বেগে, বন্দিনি মাতা একাকিনী জেগে কাঁদিতেছে কারাগারে, শিয়রের দীপ যত সে জ্বালায় নিভে যায় বারে বারে। নিশীথ-অন্ধকারে।। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ নীরব আজিকে মিনার-চূড়ে, বহে না শিরাজ-বাগের নহর , বুলবুল গেছে উড়ে। ছিল শুধু…


  • বাংলার “আজীজ” / কাজী নজরুল ইসলাম

    পোহয়নি রাত, আজান তখনও দেয়নি মুয়াজ্জিন, মুসলমানের রাত্রি তখন আর-সকলের দিন। অঘোর ঘুমে ঘুমায় যখন বঙ্গ-মুসলমান, সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান! ফজর বেলার নজর ওগো উঠলে মিনার পর, ঘুম-টুটানো আজান দিলে – ‘আল্লাহো আকবর!’ কোরান শুধু পড়ল সবাই বুঝলে তুমি একা, লেখার যত ইসলামি জোশ তোমায় দিল দেখা। খাপে রেখে অসি যখন খাচ্ছিল…


  • যৌবনজলতরঙ্গ / কাজী নজরুল ইসলাম

    এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ? যে সিন্ধু-জলে ডাকিয়াছে বান – তাহারই তরে এ চন্দ্রোদয়, বাঁধ বেঁধে থির আছে নালা ডোবা, চাঁদের উদয় তাদের নয়! যে বান ডেকেছে প্রাণ-দরিয়ায়, মাঠে-ঘাটে-বাটে নেচেছে ঢল, জীর্ণ শাখায় বসিয়া শকুনি শাপ দিক তারে অনর্গল। সারস মরাল ছুটে আয় তোরা!…


  • জীবন / কাজী নজরুল ইসলাম

    জাগরণের লাগল ছোঁয়া মাঠে মাঠে তেপান্তরে, এমন বাদল ব্যর্থ হবে তন্দ্রাকাতর কাহার ঘরে? তড়িৎ ত্বরা দেয় ইশারা, বজ্র হেঁকে যায় দরজায়, জাগে আকাশ, জাগে ধরা−ধরার মানুষ কে সে ঘুমায়? মাটির নীচে পায়ের তলায় সেদিন যারা ছিল মরি, শ্যামল তৃণাঙ্কুরে তারা উঠল বেঁচে নতুন করি; সবুজ ধরা দেখছে স্বপন আসবে কখন ফাগুন-হোলি, বজ্রাঘাতে ফুটল না যে,…


  • নগদ কথা / কাজী নজরুল ইসলাম

    দুন্দুভি তোর বাজল অনেক অনেক শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর, মুখস্থ তোর মন্ত্ররোলে মুখর আজি পূজার আসর,− কুম্ভকর্ণ দেবতা ঠাকুর জাগবে কখন সেই ভরসায় যুদ্ধভূমি ত্যাগ করে সব ধন্না দিলি দেব-দরজায়। দেবতা-ঠাকুর স্বর্গবাসী নাক ডাকিয়া ঘুমান সুখে, সুখের মালিক শোনে কি – কে কাঁদছে নীচে গভীর দুখে। হত্যা দিয়ে রইলি পড়ে শত্রু-হাতে হত্যা-ভয়ে, করবি কী তুই ঠুঁটো…


  • ভোরের পাখি / কাজী নজরুল ইসলাম

    ওরে ও ভোরের পাখি! আমি চলিলাম তোদের কণ্ঠে আমার কণ্ঠ রাখি। তোদের কিশোর তরুণ গলার সতেজ দৃপ্ত সুরে বাঁধিলাম বীণা, নিলাম সে সুর আমার কণ্ঠে পুরে। উপলে নুড়িতে চুড়ে-কিঙ্কিণি বাজায়ে তোদের নদী যে গান গাহিয়া অকূলে চাহিয়া চলিয়াছে নিরবধি– তারই সে গতির নূপুর বাঁধিয়া লইলাম মম পায়ে, এরই তালে মম ছন্দ-হরিণী নাচিবে তমাল-ছায়ে। যে-গান গাহিলি…


  • আমি গাই তারই গান / কাজী নজরুল ইসলাম

    আমি গাই তারই গান – দৃপ্ত-দম্ভে যে-যৌবন আজ ধরি অসি খরশান হইল বাহির অসম্ভবের অভিযানে দিকে দিকে। লক্ষ যুগের প্রাচীন মমির পিরামিডে গেল লিখে তাদের ভাঙার ইতিহাস-লেখা। যাহাদের নিশ্বাসে জীর্ণ পুথির শুষ্ক পত্র উড়ে গেল এক পাশে। যারা ভেঙে চলে অপদেবতার মন্দির আস্তানা, বকধার্মিক-নীতিবৃদ্ধের সনাতন তাড়িখানা। যাহাদের প্রাণ-স্রোতে ভেসে গেল পুরাতন জঞ্জাল, সংস্কারের জগদল-শিলা, শাস্ত্রের…


  • সন্ধ্যা / কাজী নজরুল ইসলাম

    − সাতশো বছর ধরি পূর্ব-তোরণ-দুয়ারে চাহিয়া জাগিতেছি শর্বরী। লজ্জায় রাঙা ডুবিল যে রবি আমাদের ভীরুতায়, সে মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত করি যুগে যুগে হায়! মোদের রুধিরে রাঙাইয়া তুলি মৃত্যুরে নিশিদিন, শুধিতেছি মোরা পলে পলে ভীরু পিতা-পিতামহ-ঋণ! লক্ষ্মী! ওগো মা ভারত-লক্ষ্মী! বল, কতদিনে, বল,− খুলিবে প্রাচী-র রুদ্ধ-দুয়ার-মন্দির-অর্গল? যে পরাজয়ের গ্লানি মুখে মাখি ডুবিল সন্ধ্যা-রবি, সে গ্লানি মুছিতে শত…


  • কালবৈশাখী / কাজী নজরুল ইসলাম

    ১ বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হল রে পুব-হাওয়ায়, দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়, কে পাগল সেথা যাস হাঁকি – ‘বৈশাখী কালবৈশাখী!’ হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়। সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারি নে, হায়।। ২ কালবৈশাখী আসিলে হেথায় ভাঙিয়া পড়িত কোন সকাল ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা দেওয়া ওই সনাতন দাওয়া,…