• পৃথিবী ২০০৩ / সায়ীদ আবুবকর

    এখানে অন্ধকার বৈদ্যুতিক আলোয় মশা ধরে ধরে খাওয়া টিকটিকির মতো আলো ধরে ধরে খায়। এখানে সন্ত্রাস মানুষের হাড়গোড় কটমট করে খাওয়া রূপকথার রাক্ষসের মতো জীবন ধরে ধরে খায়। এখানে অবিশ্বাস শ্মশানের আপোড়া লাশ চেটেপুটে খেয়ে ফেলা শেয়ালের মতো হৃদয় ধরে ধরে খায়। এখানে মহেঞ্জোদারো আর ব্যবিলনি সভ্যতার সমস্ত কবর ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে, এ্যাটোমের দীপ জ্বেলে জ্বেলে…


  • শান্তিবাদ / সায়ীদ আবুবকর

    বলো, ভালবাসা ছাড়া মুক্তি নেই আজ কারো। বলো, প্রণয়শরাব ছাড়া শান্তি কারো নেই পৃথিবীর। দেশ নয়, জাতি নয়, অর্থ বিত্ত বীরত্বও নয়, বলো, আজ মুক্তি শুধু, শান্তি শুধু ফুলেল নারীর বুকে আর ঠোঁটে। বলো, যুদ্ধের খিচুড়ি নয় আর, নারীর হৃদয়ে আজ রাঁধাবাড়া হবে প্রেমক্ষীর। বলো, যুদ্ধে জেতা নয়, প্রেমাঙ্গনে নারীর হৃদয় জয় করে নেবে যে-ই,…


  • মধ্য রাতে / সায়ীদ আবুবকর

    মধ্য রাতে যাই ঘুমাতে ঘুম আসে না ঘুম পাই বাতাসে শুনতে, কোথাও কাঁদতেছে মজলুম। কাঁদতেছে কেউ বোমা হামলায় কাঁদতেছে কেউ খিদেয় কী করি, হায়, তাদের জন্যে, কী দেই তাদের কী দেই? কলম বললো, আমায় ধরো লেখো এমন লেখা যে-লেখাতে হয় জালিমের উচিত শিক্ষা শেখা। অস্ত্র বললো, আমায় ধরো যুদ্ধ শুরু হোক বাঁচতে হলে মরতে হবে,…


  • ঘৃণার কবিতা / সায়ীদ আবুবকর

    বিলকিস বললো, ‘হে পারিষদবর্গ, আমাকে একটি সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে। সেই পত্র সুলায়মানের পক্ষ থেকে এবং তা এই – অসীম দাতা, দয়ালু আল্লার নামে শুরু; আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন কোরো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও।’ বিলকিস বললো, ‘হে পরিষদবর্গ, আমাকে আমার কাজে পরামর্শ দাও। তোমাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোনো কাজে সিদ্ধান্ত…


  • হে হুজুর / সায়ীদ আবুবকর

    তুমি বুঝি ভেবেছিলে, পৃথিবীর সমস্ত আরাম জালি দিয়ে পেড়ে পেড়ে, ভরে দেয়া হবে তোমার নফসের ঝুড়ি। অতঃপর ভীতির সাথেই গোলামের মতো এসে বলবেন কেউ- ‘শান্তিগাছটার সবগুলো আম এক বারে পেড়ে এনে, দিয়ে যাওয়া হলো এই ঝুড়ির ভেতর। হুজুর এখন জাগ দিয়ে মজা করে খান একা একা, পাকিয়ে পাকিয়ে।’ তুমি বুঝি ভেবেছিলে, যদি এই মন্ত্র পড়ো…


  • তেলঅলাদের গান / সায়ীদ আবুবকর

    তেলা মাথায় তেল মাখাতে শুধুই আমরা চাই ভাই আতেলাদের তেল মাখানোর তেল আমাদের নাই ভাই। তোমরা যারা তেলমহাজন করো তেলের কারবার আমরা তাদের আত্মীয় হই, বলতে চাই তা বারবার। কিন্তু যারা দীনভিখিরি মৃত্যু যাদের সামনেই আমরা তাদের আত্মীয় নই, তাদের কোনো দাম নেই। খুলনা ২২.০৮.১৯৮৭


  • শুধু নষ্টকথা শুনে / সায়ীদ আবুবকর

    শুধু নষ্টকথা শুনে, নষ্টকথা বলে- শুনে শুনে- বলে বলে আমাদের জীবন তাহলে কেটে যাবে এভাবেই ধ্বজভঙ্গ পদ্মামেঘনার মতো? জীবন কী তাহলে মূলত প্রতিদিন অবিরাম শেয়ালশকুনদের ইতরবক্তৃতা শুনে শুনে কি-সুন্দর কি-সুন্দর বলে বলে ইতরামি করে উঠবার নাম? বিদ্রোহে বিক্ষোভে আমাদের হৃদয় দাঁড়ায় ঘুরে, আমরা তা পাই টের; আর তাই নতুন শপথে অসহ্য রাত্রির শেষে প্রতিদিন আমাদের…


  • মুখর মূর্খেরা / সায়ীদ আবুবকর

    মুখর মূর্খেরা বুনো পায়রার মতো আজ বাকবাকুম বাকুম করে পৃথিবীর নাচঘরে। যত কথা উড়ে ফেরে বিরুদ্ধ বাতাসে, কেবলই নষ্টকথা; সে-কথার তোড়ে সভ্যতার সমুদয় সত্য ও সুন্দর চুরুটের ধোঁয়ার মতন ওড়ে; ওড়ে স্বপ্ন, ওড়ে স্মৃতি, ওড়ে কবিতাকুসুম, ওড়ে শিল্প ও শুদ্ধতা- আর তত বানের পানির মতো বেড়ে চলে কথা, বাড়ে মহামূর্খদের মহাপ্রগল্ভতা। আজ আমাদের স্কন্ধের উপর…


  • নরক নিবাস / সায়ীদ আবুবকর

    এ এক উচ্ছন্ন নরক নিবাস- নির্জীব নিস্পন্দ- শিশিরের মতো- লাশের উপর লাশ জমে জমে, বালির ঢিবির মতো হতে থাকে স্তূপ; আশপাশে কাঁদবার কেউ নেই- অসুস্থ সন্ধ্যায় কারো ঘরে মাঙ্গলিক ধূপ জ্বালবারও কেউ নেই; শুধু অফুরন্ত বীভৎস মৃত্যুর ‘পর ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসে নির্হৃদয় অন্ধ অন্ধকার, বরাহ উল্লাসে। এ যেন ক্যান্সারাক্রান্ত এক জীবন্ত কবর, ধসে পড়া…


  • দেশ / সায়ীদ আবুবকর

    পাখির তো কোনো দেশ নেই, মাছের তো কোনো দেশ নদীরা মানে না কোনো সৈন্য ও সীমান্ত উঁচানো বন্দুক আর পরাক্রান্ত রাজাবাদশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নদীরা সমুদয় কাঁটাতার ছিুঁড়েখুঁড়ে নিয়ে, ছুটে চলে বেপরওয়া ভালবাসার মতো ও মানুষ, কোন্খানে পেলে তুমি সীমান্ত ও সীমান্তপ্রহরী? ফকিরেরপুল ২৫.৮.১৯৯৮


  • অদ্ভুত এক জনপদের কাহিনী / সায়ীদ আবুবকর

    অদ্ভুত এক জনপদের মধ্য দিয়ে পথ চলতেছিলাম আমরা, যাকে বীভৎস অন্ধকার এক, আষ্টেপৃষ্ঠে অবরোধ করে রেখেছিল, রোদপোড়া এঁটেল মাটির মতো প্রতিবাদে ফেটে পড়া মারমুখো জনতা যেভাবে স্বৈরাচারের উৎখাতের জন্যে অবরোধ করে রাখে রাজপথ-রেলপথ। আমরা অন্ধের মতো চারদিকে খাঁ খাঁ অন্ধকার ছাড়া দেখতে পাচ্ছিলাম না কিছুই। শুধু শুনতে পাচ্ছিলাম বাতাসে বাতাসে মানুষের শৈল্পিক কথাবার্তা, ঘরে ঘরে…


  • চাল নেই চুলো নেই… / সায়ীদ আবুবকর

    চাল নেই চুলো নেই কড়ি নেই গাঁটে চুরির মুরদ নেই, এমনই মরদ বিশ্বের ভাবনা ভেবে তারই দিন কাটে মানুষের জন্যে তারই অথই দরদ কখনও দৈবাৎ যদি এক ইঞ্চি হাঁটে দুই ইঞ্চি নেয় তবে পিছিয়ে কদম পাছে পা-র তলে পড়ে জান কার ফাটে! কে সেই দুর্ভাগা, স্যার? সে এই অধম।


  • বোধ / সায়ীদ আবুবকর

    আমাদের সুখবোধ দুঃখবোধ ডাইনোসরের মতো অবলুপ্তির নিকটবর্তী প্রায়। কেন যে শুভ্র এ সনাতনী রোদ রুগ্ন বিকেলের মতো ফিকে ফিকে লাগে এই সকাল বেলায়! এক সেকেন্ডের চুম্বনেই, হায়, মিটে যায় আমাদের দু-ঠোঁটের তৃষা! ভুলস্টেশনে তৃপ্তির ট্রেন থেমে যায় মত্ততার মধুনিশা না-হতেই ভোর! কোথায় সে প্রেমিকেরা, প্রেয়সীর পুষ্পঠোঁটে রেখে যারা অতিষ্ঠ মৌমাছি ঠোঁট শান্তিমধু আহরণে চাইতো কাটিয়ে…


  • জুলেখার সেই দুটি চোখ / সায়ীদ আবুবকর

    তখনও শিখিনি আমি কী করে কাটতে হয় জংলী সাঁতার যমুনার জলে; বসন্ত আসার তর সচ্ছিল না তার, চিতার কাঠের মতো জ্বলছিল শুধু নীল নেশার অনলে। এই বলে একদিন দিয়েছিল ম’লে কান, শুনে তা আমার উঠেছিল কেঁপে বুক : ‘এই, কিছু কিছু নষ্ট হতে শেখ্। বীজেরাও নষ্ট হয়; নষ্ট না হলে সুবর্ণ ফসলে ভরে উঠতো কি…


  • কবির হৃদয় / সায়ীদ আবুবকর

    সমুদ্রের চেয়ে হয় নদী কি গভীর, কোন্ গাঙে তার চেয়ে বেশি জল ধরে? কোথায় উপমা তার, প্রেমান্ধ কবির হৃদয়কে যে-যন্ত্রণা তোলপাড় করে? কবি ছাড়া আছে কার আকাশহৃদয়? হৃদয় আকাশে কার  নক্ষত্রের ভিড়? ভালবেসে কার বুক আরণ্যক হয়, প্রণয়ের বৃক্ষে বৃক্ষে হয় সুনিবিড়? ওড়ো পাখি এ আকাশে, বসো এই বনে থাকো এ হদয়দেশে রানীর সমান তারপর…


  • বৃক্ষমানবী / সায়ীদ আবুবকর

    সে যেন মানবী নয় মায়াবি একটি বৃক্ষ মাথাতে ধরেছে মেঘ দুচোখে অন্তরীক্ষ ধরেছে হৃদয়কেন্দ্রে সোনার দুটি দাড়িম্ব জঠরে সূর্যোদয় নাভিতে মোতির ডিম্ব দু-ঊরুর জোড়শাখায় ধরেছে সাত সমুদ্র ধরেছে ভাগাঙ্কুরে একটি বদ্বীপ ক্ষুদ্র বসন্তের এক রাত্রে মাতাল শুক্লপক্ষে স্বর্ণালি তার পা দুটি শিকড় গাড়ে এ বক্ষে ফৌজদারহাট ১০.৮.২০০১


  • শান্তিসর্বনাশ / সায়ীদ আবুবকর

    যারা ফুল বলে তারা ভুল বলে আমি বলি তুমি বিষ যারা শশী বলে তারা বেশি বলে আমি বলি তুমি ছুরি যে-ছুরি হৃদয় তরমুজ কাটে এ-বুকে অহর্নিশ যারা মৃগ বলে তারা যে বাচাল আমি বলি তুমি মশা যে-মশা প্রণয় ম্যালেরিয়া বোনে জীবনের মাঠেঘাটে যার উৎপাতে আমাদেরও হয় মজনুর মতো দশা কবে তুমি ছিলে শান্তিকুসুম, শান্তিহরিণ, নারী?…


  • সোনালি হৃদয় / সায়ীদ আবুবকর

    আমি এক দেখেছি নারীকে, যাকে নিয়ে অজস্র কবিতা কবিরা গিয়েছে লিখে, যুবকেরা দিকে দিকে যার নামে আজও অন্ধ হয়, পাথরের মতো তার সোনালি হৃদয়। ফৌজদারহাট ১০.১১.২০০১


  • সাপ / সায়ীদ আবুবকর

    এক সাপ এই শর্তে ঢুকেছিল ঈপ্সার গর্তে ঢুকেই সে হয়ে যাবে বের; তখন পাইনি টের যেতে যেতে জীবনের তাবৎ আবর্তে ফেলে গেছে বিষ, মরণের। ঢাকা ১৯৯৮


  • ফুল / সায়ীদ আবুবকর

    তোমার সুন্দর হওয়ার জন্যে প্রসাধনী শর্ত নয়, সিল্কের শাড়ি ও স্বর্ণের গহনা শর্ত নয়। ও ফুল, তোমার সুন্দরতা যেভাবেই তুমি থাকো, তোমার সমস্ত শরীরের প্রতি কণা ফুঁড়ে ফুঁড়ে কয় কথা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১৩.৮.১৯৯৭