-
মন / ফররুখ আহমদ
মন মোর আসন্ন সন্ধ্যার তিমি মাছ- ডুব দিল রাত্রির সাগরে। তবু শুনি দূর হ’তে ভেসে আসে-যে আওয়াজ অবরুদ্ধ খাকের সিনায়। সূর্য মুছিয়াছে বর্ণ গোধুলি মেঘের ক্লান্ত মিনারের গায়, গতি আজ নাইকো হাওয়ায় নিবিড় সুপ্তির আগে বোঝে না সে শান্তি নাই তমিস্রা পাথারে। তবু পরিশ্রান্ত ম্লান স্নায়ুর বিবশ সঞ্চরণে আতপ্ত গতির স্বপ্ন জমা হয় মনে, বুঝি…
-
বৈশাখী / ফররুখ আহমদ
বৈশাখের মরা মাঠ পড়ে থাকে নিস্পন্দ যখন নিষ্প্রাণ, যখন ঘাস বিবর্ণ, নিষ্প্রভ ময়দান, যোজন যোজন পথ ধূলি-রুক্ষ, প্রান্তর, বিরান; শুকনো খড়কুটো নিয়ে ঘূর্ণী ওঠে মৃত্যুর মতন; সে আসে তখনি। তখনি তো ঘিরে ফেলে উপবন, বন;-চোখের পলকে, মুছে ফেলে ঘুমন্ত নিখিল সে আসে বিপুল বেগে। কণ্ঠে তার সুরে ইস্রাফিল বজ্রস্বরে কথা কয়, জানে না সে গম্ভীর…
-
বৈশাখের কালো ঘোড়া / ফররুখ আহমদ
বৈশাখের কালো ঘোড়া উঠে এলো। বন্দর, শহর পার হয়ে সেই ঘোড়া যাবে দূর কোকাফ মুলুকে, অথবা চলার তালে ছুটে যাবে কেবলি সম্মুখে প্রচন্ড আঘাতে পায়ে পিষে যাবে অরণ্য, প্রান্তর। দূর সমুদ্রের বুকে নির্বাসিত যুগ যুগান্তর শুনেছে ঘরের ডাক দূর দিগন্তের পার থেকে, বাঁকায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বজ্রের আওয়াজে উঠে ডেকে শূন্যে ওড়ে বুকে নিয়ে সুলেমান নবীর…
-
আউলাদ / ফররুখ আহমদ
অনেক ঝড়ের দোলা পার হ’য়ে এল সে নাবিক। অনেক ক্ষুধিত রাত্রি, আর বহু সামুদ্রিক চঞ্চল করেছে তারে, অন্ধকারে হারায়েছে দিক, কালা-পানি ঘিরে ঘিরে ডাকিয়াছে মৃত্যুর দূতীরা, ভেঙে-পড়া জাহাজের বেঁকে যাওয়া খোল ভ’রে তার উঠিয়াছে ব্যর্থতার স্বেদসিক্ত চরম নিরাশা, সম্মুখে ডেকেছে তারে হিংস্র-নীল তিমির পাথার; অচেনা জগতে তবু সে নাবিক খুঁজে পেল বাসা। যদিও দু’চোখ তার…
-
নিশান-বরদার / ফররুখ আহমদ
দিন রাত্রির বোঝা হ’ল আজ দুঃসহ গুরুভার, স্খলিত পথীর আয়োজন চলে পশ্চাৎ যাত্রার, চারদিকে বন মরণ শর্তে জীবনের অধিকার- এখানে তোমার নিশান ওড়াও হে নিশান বরদার। ঘন হ’য়ে এল দুঃখের রাত তিমির নিবিড়তর এবার তোমার আলেঅর নিশান এ-পথে প্রকাশ ক’রো, সূর্যের ঝড়ে এই আঁধারের মরাপাতা ফেলো ছিঁড়ে মৃত্যুর তীরে তীরে ওড়াও তোমার প্রথম ঊষার দীপ্ত…
-
নিশান / ফররুখ আহমদ
আধো চাঁদ আঁকা নিশান আমার! নিশান আমার! তুমি একদিন এনেছিলে বান-জীবন তুফান! জুলফিকারের, খালেদী বাজুর তুমি সওয়ার, উমরের পথে বিশ্বের দ্বারে হে অম্লান, পার হয়ে গেছ বিয়াবান আর খাড়া পাহাড় সবল হাতের কবজায় যবে ছিলে সওয়ার। কমজোর বাজু পারে না বইতে ও গুরুভার, সঙ্গ দিলে আজ ওড়ে না নিশান মানবতার; চারদিকে আজ দেখছে সে তাই…
-
হে নিশান-বাহী / ফররুখ আহমদ
নিশান কি ঝড়ে প’ড়ে গেছে আজ মাটির ‘পরে? আধো চাঁদ-আঁকা সেই শাশ্বত জয়-নিশান? বহু মৃত্যুর প্রলয়-আঘাতে, প্রবল ঝড়ে নুয়ে গেছে সেই প্রথম দিনের জয়-নিশান? হামাগুড়ি দিয়ে কারা চলে ঐ পতাকীদল? কার ক্রন্দনে ভরছে শূন্য জলস্থল? নিশান কি আজ প’ড়ে গেছে ভূঁয়ে, নিশান-বাহী কি চলে মাটি ছুঁয়ে শিয়রে কি তার কঠিন বাধার জগদ্দল? বুক চাপা দেওয়া…
-
স্বর্ণ ঈগল / ফররুখ আহমদ
আল-বোরজের চূড়া পার হ’ল যে স্বর্ণ-ঈগল গতির বিদ্যুৎ নিয়ে, উদ্দাম ঝড়ের পাখা মেলে, ডানা-ভাঙা আজ সে ধুলায় যায় তারে পায় ঠেলে কঠিন হেলার কোটি গর্বোদ্ধত পিশাচের দল। মাটিতে লুটানো আজ সেই স্বর্ণপক্ষ, তনুতল! আলো, বাতাসের সাথী, তুফানের সওয়ার নির্ভীক অস্তিম লগ্নের ছায়া দেখে আজ সে মৃত্যু-যাত্রিক, অতল কূপের তীরে পাষাণ-সমাধি, জগদ্দল। সূর্য আজ ডুব দিল…
-
পাঞ্জেরী / ফররুখ আহমদ
রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী? এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে? সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে? তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে: অসীম কুয়াশা জাগে শুন্যতা ঘেরি। রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী? দীঘল রাতের শ্রান্ত সফর শেষে কোন দরিয়ার কালো দিগন্তে আমরা প’ড়েছি এসে? একী ঘন-সিয়া জিন্দিগানীর বা’ব তোলে মর্সিয়া ব্যথিত দিলের তুফান-শ্রান্ত খা’ব, অস্ফুট হ’য়ে…
-
পুরানো মাজারে / ফররুখ আহমদ
পুরানো মাজারে শুয়ে মানুষের কয়খানা হাড় শোনে এক রাতজাগা পাখীর আওয়াজ। নামে তার ঘনীভূত রাত্রি আরো ঘন হ’য়ে স্মৃতির পাহাড়। এই সব রাত্রি শুধু একমনে কথা কহিবার নিজেদের সাথে। জানি; – মুসাফির-ধূলির অতিথি প্রচুর বিভ্রমে, লাস্যে দেখেছিল যে তন্বী পৃথিবী পুঞ্জীভূত স্মৃতি তার জীবনের ব্যর্থ শোক-গীতি: রাতজাগা পাখীর আওয়াজ: জমা আঁধারের ঢিবি – যেন এক…
-
এই সব রাত্রি / ফররুখ আহমদ
এই সব রাত্রি শুধু এক মনে কথা কহিবার নিজেদের সাথে, পুরানো যাত্রীর দল যারা আজি ধূলির অতিথি দাঁড়ালো পশ্চাতে। কায়খসরুর স্বপ্ন কঙ্কালের ব্যর্থ পরিহাস জীবাণুর তনু পুষ্টি করিয়াছে কবে তার লাশ! শাহরিয়ার দেখে যায় কামনার নিস্ফল ব্যর্থতা, জিঞ্জিরে আবদ্ধ এক জীবনের চরম রিক্ততা। এই সব রাত্রি শুধু এক মনে কথা কহিবার- খরস্রোতা জীবনের কোল ঘেঁষে…
-
ঝরোকা’য় / ফররুখ আহমদ
মুসাফির জনতার মৃদুশব্দ নিম্নমুখ নীল পেয়ালায় মিশে গেল আকাশের স্তব্ধ ঝরোকায়! সুরমা পাহাড়ে লুপ্ত অগ্নিবর্ণ গুলরুখ শিখা। অন্ধ পরিক্রমা-শ্রান্ত সে তীব্র দাহিকা স্মৃতি শুধু দূর বনান্তের। শিরিষের শাখা ছেড়ে আরো দূরে রজনীগন্ধার, হেনার; কিম্বা বাগদাদের হাজার রাত্রির এক রাত এল নেমে! হে প্রিয়া শাহেরজাদী। তুমি আজ কী অজ্ঞাত প্রেমে জেগে ওঠো শঙ্কায়, লজ্জায়? তোমার সকল…
-

বন্দরে সন্ধ্যা
গোধূলি-তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল -অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ, সাত সাগরের বুকে সেই শুধু আলোক-চঞ্চল; অন্ধকার ধনু হাতে তীর ছোড়ে রাত্রির বিষাদ। আরব সমুদ্র-স্রোতে ক্রমাগত দূরের আহ্বান, তরুণীর মুখ থেকে মুছে গেছে দিনের রক্তিমা, এদিকে হরিণ আনে বাঁকা শিঙে চাঁদ: রমজান; ক্ষীণাঙ্গীর প্রতীক্ষায় যৌবনের প্রাচুর্য; পূর্ণিমা। ষোল পাপড়িতে ঘেরা ষোড়শীর সে…
-

ডাহুক
রাত্রিভর ডাহুকের ডাক… এখানে ঘুমের পাড়া, স্তব্ধদীঘি অতল সুপ্তির! দীর্ঘ রাত্রি একা জেগে আছি। ছলনার পাশা খেলা আজ পড়ে থাক, ঘুমাক বিশ্রান্ত শাখে দিনের মৌমাছি, কান পেতে শোনো আজ ডাহুকের ডাক। তারার বন্দর ছেড়ে চাঁদ চলে রাত্রির সাগরে ক্রমাগত ভেসে ভেসে পালক মেঘের অন্তরালে, অশ্রান্ত ডুবুরি যেন ক্রমাগত ডুব দিয়ে তোলে স্বপ্নের প্রবাল। অবিশ্রাম ঝরে…
-

আকাশ নাবিক
আখরোট বনে, বাদাম খুবানি বনে কেটেছে তোমার দিন। হে পাখী শুভ্রতনু, সফেদ পলকে চমকে বিজুরী, চমকে বর্ণধনু, সোনালি, রুপালি রক্তিম রংগিন। হালকা রেখায় আকাশ ফেলেছো চিরে, পার হয়ে গেছ কত আলোকের স্তরে, রৌদ্রে, শিশিরে, নোনা দরিয়ার নীরে, ফিরেছো কখনো আকাশের তীরে তীরে; হে বিহঙ্গ! জানতে না ভয়, কখনো পাওনি ডর। ইরান বাগের বেদানা ওড়ায়ে এনেছো …
-
দরিয়ার শেষ রাত্রি / ফররুখ আহমদ
রাত্রে ঝড় উঠিয়াছিল; সুবেসাদিকের ম্লান রোশনিতে সমুদ্রের বুক এখন শান্ত। কয়েকজন বিমর্ষ মাল্লা সিন্দবাদকে ঘিরিয়া জাহাজের পাটাতনে আসিয়া দাঁড়াইল। ১ম মাল্লা কাল রাত জেগে আওয়াজ পেয়েছ, কোনো? জিঞ্জির আর দাঁড় উঠেছিল দুলে! ২য় মাল্লা বুঝি সী-মোরগ সাথীহারা তার দরিয়ার শেষ রাতে ঝড় বুকে পুরে বসেছিল মাস্তুলে! ৩য় মাল্লা যেন সুলেমান নবীর শিকলে বন্দী বিশাল জিন…
-
বা’র দরিয়ার / ফররুখ আহমদ
সমুদ্র থেকে সমুদ্রে ঘোরে দরিয়ায় সাদা তাজী! খুরের হলকা,- ধারালো দাঁড়ের আঘাতে ফুলকি জ্বলে সমুদ্র থেকে সমুদ্রে ঘোরে দরিয়ায় সাদা তাজী…. কেশর ফোলানো পালে লাগে হাওয়া, মাস্তুলে দোলে চাঁদ, তারার আগুনে পথ বেছে নেয় স্বপ্নেরা সারারাত, তাজী ছুটে চলে দুরন্ত গতি দুর্বার উচ্ছল; সারারাত ভরি তোলপাড় করি দরিয়ার নোনাজল। আদমসুরাত মুছে যায়, জ্বলে দিগন্তে শুকতারা,…
-

সিন্দবাদ / ফররুখ আহমদ
কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ, শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক, ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ, পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ বয়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক; নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দবাদ! আহা, সে নিকষ আকীক বিছানো কতদিন পরে ফিরে ডেকেছে আমাকে নীল আকাশের তীরে, ডেকেছে আমাকে জিন্দিগী আর মওতের মাঝখানে এবার সফর টানবে…