• এই পতাকার সূর্য সাক্ষী / আল মাহমুদ

    দ্যাখো আজ পতাকা দেখারই দিন। কলরব করে ওঠো, উচ্চারণ কর মুক্তির ভাষা। আমিও তোমাদের সাথে দেখতে থাকি। তোমাদের সাথে আমার অপরিচ্ছন্ন দৃষ্টির অশ্রুসজল চোখ দু’টি মেলে দাঁড়িয়ে থাকি। কী লাল, সবুজ পতাকার মধ্যে গোল হয়ে বসে আছে, মনে হয় যেন পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের রক্তের লোহিত কণায় অঙ্কিত হয়েছে এ সূর্য। আমার ভেতরে কলরব করে ওঠে…


  • চরিতাখ্যান : নববর্ষ / আহসান হাবীব

    মৃত্যুর মতন তার সারা দেহ শীতল এবং কুৎসিত কর্কশ তার নগ্ন হাত মুখে তার মরিচিকা-রঙ কোনো এক মায়াবিনী নারীর মুখের, বুকে তার মরুতৃষ্ণা। আর সেই তৃষ্ণার আগুন বারবার হেমন্তের হেমলতা বসন্তের নিবিড় বিথার গ্রাস করে। টলোমলো শিশিরের স্নান পাখিদের কলকণ্ঠ জীবনের যৌবনের গান সে আগুনে আর সেই মরীচিকা রঙের সে-মুখে নির্বোধ কৌতুকে খেলা করে। কবে…


  • দাঁড়াও, পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে / সায়ীদ আবুবকর

    দাঁড়াও, পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে; দু’দণ্ড দাঁড়াও স্থির এ সমাধিস্থলে- যেভাবে দাঁড়ায় বৃক্ষ মৃত্তিকার সঙ্গে; মানুষ কি বাঁচে, হায়, শূন্যে কিংবা জলে! যে-আকাশে থাক পাখি, ফিরে আসে নীড়ে; কিন্তু সেই পাখি শ্রেষ্ঠ, যে-পাখি ছড়ায় স্বদেশের গান মহা মানুষের ভিড়ে- সারা দেশ নুয়ে পড়ে তার পদ্মপায়! পিতা নূর মহম্মদ আর মা আমেনা, সায়ীদ আবুবকর বঙ্গজের নাম…


  • দুঃস্বপ্নের কাকফেরি / ফজলুল হক তুহিন

    ভাবতেই পারিনি আমরা সকালের সুবাতাস এভাবে শোকের বিষে নষ্ট হবে আজ। পাখিদের আর্তনাদে, বিলাপে বিদীর্ণ হবে নিজের নিশ্বাস! কেউ কী জানতো কখনও পাখির কান্নার ভারে ভেঙে পড়বে মায়ের বুক। প্রথম যেদিন নীড় বুননের খড়কুটো নিয়ে ছায়ার উঠোনে, পাতাবাহারের সবুজ আড়ালে দুটো বুলবুলি এসে আশ্রয়ের নিচ্ছিল প্রস্তুতি; সেদিন মা বললেন, দেখ্ দেখ্ পাখি দুটো বাসা বানাচ্ছে,…


  • অগ্রহায়ণ / আল মাহমুদ

    আমি এই মধ্য অগ্রহায়ণের আকাশে মেঘের গম্বুজ ভেঙ্গে পড়তে দেখেছি কেউ তো আমার মতো অকাজের কারিগর নয় যে মাটির উপর বিছানো মানবিক শত সমস্যা মেলে রেখে আকাশের দিকে তাকাবে? ও অগ্রহায়ণের আকাশ ঝরাও বৃষ্টি, এখন ঘরে ঘরে নবান্ন চলছে মাঠগুলোতে উদগমের কাজ অবসন্ন কিন্তু আমার এখন বৃষ্টি দরকার উদ্ভেদ ও উদগম দরকার। যে নারী আমাকে…


  • বুনো কৈতর / সাইফ আলি

    কই তোর কৈতর কই বুনো কৈতর বুঝি উড়ে গেছে বনে, তাই বুঝি নির্জনে একাকি গোপণে কাঁদছিস? বোকা! নিজেকে নিজেই তুই দিয়েছিস ধোকা। ডানাদুটো প্রিয় ছিলো কাটিসনি তাই? তাহলে তো উড়বেই, মিছে অভিমানে কাঁদছিস বোকা, শোন- প্রিয় কৈতর, সারাক্ষণ বাস করে বুকের ভেতর।


  • পোড়ামাটির টব / সাইফ আলি

    আজকাল ছোট এই পোড়ামাটির টবেই কোনোমতে টিকে আছে কবিতার চাষাবাদ, প্রত্যাক্ষাণের জৈব আর অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাদের নোনতা জলবায়ু চারাগুলোকে এমন পরিপুষ্ট করে তুলবে ভাবতে পারিনি। তুমি তো ভেবেছিলে, অধিকারের আবাদি জমিটুকু কেড়ে নিলেই নিস্ব হয়ে যাবো; তোমার পায়ে পড়ে বলবো- আর একটা মৌসুম, মাত্র আর একটা; তারপর সব তোমার! শেষ যেবার মেঘ ফেটে বৃষ্টি নামলো, উঠোন…


  • একান্ত বাক্যেরা-১১ / সাইফ আলি

    মুঠো খুলতেই হাওয়া হয়ে যায় রাতের আবেগ শূন্যে মিলায়!


  • ইতিহাস-বিন্যাসের পথে / আহসান হাবীব

    এখন হৃদয়ে ডাক বসন্তের- স্তব্ধবাক্ পাখিরা মুখর। সময়ের ক্লান্তি ঝেড়ে অনায়াসে এখানে এখন অশেষ তৃষ্ণার ঢেউ পাখা মেলে। ভাঙা হাটে নগরে বন্দরে রাত্রির পাহারা আর মৃত্যুকে এড়িয়ে সেই ঢেউ এতদিন এখানে এখন বিশাল সমুদ্র এক- এখন জোয়ার। এখন জোয়ার আর ঘাটে বাঁধা সাম্পানের মাঝি তুলেছে নতুন পাল পালে তার মৃদঙ্গের সুর হাওয়ায় হাওয়ায় সুর বসন্তবাহার-…


  • বাংলার “আজীজ” / কাজী নজরুল ইসলাম

    পোহয়নি রাত, আজান তখনও দেয়নি মুয়াজ্জিন, মুসলমানের রাত্রি তখন আর-সকলের দিন। অঘোর ঘুমে ঘুমায় যখন বঙ্গ-মুসলমান, সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান! ফজর বেলার নজর ওগো উঠলে মিনার পর, ঘুম-টুটানো আজান দিলে – ‘আল্লাহো আকবর!’ কোরান শুধু পড়ল সবাই বুঝলে তুমি একা, লেখার যত ইসলামি জোশ তোমায় দিল দেখা। খাপে রেখে অসি যখন খাচ্ছিল…


  • গান্ধীজীর প্রতি / ফজলুল হক তুহিন

    দু হাজার দুই সাল। ঠিক এই সময়ে গান্ধিজী, আপনার জন্মভূমে আগুনের স্বাদু খাদ্য হলো জীবন্ত মানুষ! মানুষের কয়লায় হিংস্রতার পেট এখন ভরাট দাউদাউ আগুনের চমৎকার জাহান্নাম আজ গুজরাট! আপনার ‘সত্যাগ্রহ’ আপনার ভস্মের সাথেই উধাও। সত্যের মতো নীতির মতো কবেই আভিধানিক শব্দাবলী। সে জন্যেই বুঝি আপনার সুসন্তানেরা সব কী নিপুণভাবে চিরে ফেলছে গর্ভবতীর পেট অতঃপর কী…


  • এপিটাফ / সায়ীদ আবুবকর

    দাঁড়াও, পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে; দুদণ্ড দাঁড়াও স্থির এ সমাধিস্থলে- যেভাবে দাঁড়ায় বৃক্ষ মৃত্তিকার সঙ্গে; মানুষ কি বাঁচে, হায়, শূন্যে কিংবা জলে! যে-আকাশে থাক পাখি, ফিরে আসে নীড়ে; কিন্তু সেই পাখি শ্রেষ্ঠ, যে-পাখি ছড়ায় স্বদেশের গান মহা মানুষের ভিড়ে- সারা দেশ নুয়ে পড়ে তার পদ্মপায়! পিতা নূর মহম্মদ আর মা আমেনা, সায়ীদ আবুবকর বঙ্গজের নাম…


  • আর কি নেবে শব্দ ছাড়া / সাইফ আলি

    একটা কবির সব কবিতা অন্য কারো হাতের মুঠোয় শূন্য খাতা, বিষন্নতা বুকের মধ্যে কি জল উঠোয়!? কি ফুল ফুটোয় শুকনো ডালের মুমূর্ষুতার বাকল পেটে এক জীবনের প্রেম কাহিনী ঝুলতে থাকে আকাশ ফেটে! আর কি নেবে শব্দ ছাড়া- আর কি আছে কবির কাছে? গোলাপ ছাড়া আর কি ফোটে একটা পুরোন গোলাপ গাছে? হয়তো কিছু বৃষ্টি আছে-…


  • আজকে কেমন বৃষ্টি / সাইফ আলি

    আজকে কেমন বৃষ্টি এলো এলোমেলো ঝরলো ভীষণ সারা বিকেল-সন্ধ্যা-সারা রাত্রি জুড়ে আকাশ ফুড়ে ! রাস্তা জুড়ে বৃষ্টি ফোটা বেলুন ফোলায় ওড়ায় ছাতা মাতাল হাওয়া, একটু আলো একটু আঁধার সুখের এবং বিষন্নতার হঠাৎ হঠাৎ আসা-যাওয়া; গুনগুনিয়ে একটু গাওয়া একটু ঝরা পাতার পিঠে টাপুর টুপুর শব্দ-তালে। কদম ডালে ভিজতে থাকা একটা পাখি- জানলা খুলে বাড়িয়ে রাখা হাতের…


  • বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো / সায়ীদ আবুবকর

    এত মৃত্যু, এত লাশ এত ধ্বংসযজ্ঞ, এত সর্বনাশ আর ছোপ ছোপ এত রক্তের উপর দিয়ে হেঁটে হয়তো বা স্বপ্নের সে গেটে পৌঁছে যাবো ঠিকঠিকই, যে রহস্যময় গেট খুললেই সাফল্যের সাজঘর- তারপর? বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো? ধু-ধু নীল আকাশে কেবলি ওড়ে আজ বাজপাখি, শকুন ও চিল। জীবনের রাজপথে ক্ষুধার্ত শেয়াল ডাকে। সেই ডাক টেনে আনে…


  • দুঃসময়ের প্রার্থনা / ফজলুল হক তুহিন

    এইসব দিন এইসব রাত কিভাবে গড়ায় আমাদের প্রভু তুমি তো জানোই- রাতগুলো আর দিনগুলো সব খুন হয়ে যায়! আমরা তো প্রভু ত্রিকালদর্শী নই- সাধারণ আমরা সবাই অতীত-আগামী দেখি না, বুঝি না কুটিল পাঁকের বর্তমানও। বুঝি ইউনুস নবীর মতন আটকা পড়েছি ঘাতক মাছের পেটে বিষাক্ত দাঁতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় এই প্রাণের সীমানা! হায়, আমাদের বাঁচাবে…


  • আমি ইচ্ছে পুরণের মাটি নই / আল মাহমুদ

    যারা আমাকে পরামর্শ দিতো মানুষ একা থাকতে পারে না। তারা হয়তো সত্যিই বলতো। কিন্তু আমি ছিলাম অনমনীয়। ছিলাম একটা পোড়ামাটির পাত্রের মতো। কারো ক্রোধ হলে পাত্রটিকে পাথরে আছড়িয়ে চূর্ণ করতে পারবে। কিন্তু দুমড়ে মুচড়ে আবার কাদার মতো ইচ্ছে পুরণের মাটিতে পরিবর্তন করতে পারবে না। প্রকৃত পক্ষে আমি অর্ধেক মানুষ আর বাকি অর্ধেক তো কবিতা। সম্পূর্ণ…


  • যৌবনজলতরঙ্গ / কাজী নজরুল ইসলাম

    এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ? যে সিন্ধু-জলে ডাকিয়াছে বান – তাহারই তরে এ চন্দ্রোদয়, বাঁধ বেঁধে থির আছে নালা ডোবা, চাঁদের উদয় তাদের নয়! যে বান ডেকেছে প্রাণ-দরিয়ায়, মাঠে-ঘাটে-বাটে নেচেছে ঢল, জীর্ণ শাখায় বসিয়া শকুনি শাপ দিক তারে অনর্গল। সারস মরাল ছুটে আয় তোরা!…


  • শীতের সকাল / আহসান হাবীব

    রাত্রিশেষ! কুয়াশায় ক্লান্তমুখ শীতের সকাল- পাতার ঝরোকা খুলে ডানা ঝাড়ে ক্লান্ত হরিয়াল। শিশির সন্নত ঘাসে মুখ রেখে শেষের কান্নায় দু’চোখ ঝরেছে কার, পরিচিত পাখিদের পায় চিহ্ন তার মোছেনি এখনো, আছে এখনো উজ্জ্বল- কান্নায় মাধুরীটুকু ঘাসে ঘাসে করে টলোমল। মলিন চাঁদের টিপ আকাশের পাণ্ডুর কপালে। প্রাত্যহিক পৃথিবীর পরিচিত সাতডিঙার পালে হাওয়া নেই। স্তব্ধ মূক এ অরণ্য…


  • হেমন্তের ঘর / সায়ীদ আবুবকর

    সেজেছে বাংলাদেশ চাটগাঁয় মাটির পাহাড়ে, ধানসিঁড়ি-পুনর্ভবা-কপোতাক্ষ পাড়ে; নতুন শিশিরে ভিজে-নেয়ে সারা সিলেটের ঘাস আর নওগাঁর গাছের পাতারা; বসিয়েছে শুভ্রমেলা সিরাজগঞ্জের কাশ যমুনার দুই পাড়ে; পায়রার চোখ যেন সাতক্ষীরার আকাশ; মানিকগঞ্জের মাঠগুলো, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ি পরেছে সরিষাশাড়ি; সেজেছে বাংলাদেশ জামালপুর-ঠাকুরগাঁয়ে, যে হাঁটে কবির বুকে ঊর্বশীর পায়ে। প্রিয়তমা, ফিরে যাই চলো ফের পুনড্র নগরে,- মসলিন শাড়ি পরে…