-
পৃথিবী ২০১৪ / সায়ীদ আবুবকর
আমরা ছিলাম বৃষ্টিতে আজ খরায় ছিলাম ভরা যৌবনে আজ জরায় এত বিপুল প্রাণহীনতা দেখে মোটেই হয় না মনে প্রাণ কখনও ছিলো বসুন্ধরায় যেন আমরা ইউরেনাসে আছি চিহ্ন কোনো নেই মশা ও মাছির কি পাথুরে নিরবতা করছে খাঁ খাঁ চারিদিকে- কেমন করে এ নরকে বাঁচি! পাথরেরা ফিসফিসিয়ে কয়, ‘কোনো পাথর এমন পাথর নয় যেমন পাথর হয়ে…
-
আমার এখন ইচ্ছে করে / সায়ীদ আবুবকর
আমার এখন ইচ্ছে করে আগুন হতে- দেই পুড়িয়ে জং ধরা এই বিশ্বটাকে, শুকনো কলার পাতার মতো দেই পুড়িয়ে মেকি মানুষ, মেকি সমাজ, মেকি শহর মানুষগুলোর গায়ে বোঁটকা গন্ধ শুধু, বাতাস যেন পঁচে গেছে, গুলায় শরীর; আমার এখন ইচ্ছে করে কুসুম হতে- সুবাস দিয়ে ডুবিয়ে দিতে এই পৃথিবী আমার এখন ইচ্ছে করে ঝটিকা হই, এক ঝাপটে…
-
লোকটা / সায়ীদ আবুবকর
লোকে বলে, ‘লোকটা মাতাল কারণ সে আকাশপাতাল ভাবে সারাদিন; পৃথিবীর সব দেশই তার দেশ-লিবিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল কি চীন।’ লোকে বলে, ‘লোকটা কপট- লম্বা আলখাল্লা গায়ে, মাথায় সাধুর জট, মানুষের দুঃখ দেখে, সে-মানুষ স্কটিশ, মঙ্গোলিয়ান, ইরাকী, জাপানী, কপট দুচোখে তার খেলে যায় পানি। আসলে এসব আসল ক্রন্দন নয়, ক্রন্দনের অভিনয়।’ লোকে বলে, ‘ফিলিস্তিন, মিয়ানমার, লিবিয়া,…
-
যারা পাথরের মতো বাঁচে / সায়ীদ আবুবকর
যারা পাথরের মতো বাঁচে নিঃসাড় নিশ্চুপ; ন্যায়-অন্যায় যাদের কাছে একই রকম; যারা সত্য ও মিথ্যায় দ্যাখে না বিভেদ; যারা কেবলি বাঁচতে চায় নিরাপদে, দুর্গন্ধে, ছুঁচার মতো নির্ঝঞ্জাট; যারা সবখানে থাকে ভালো কারণ তাদের করায়ত্ত সব জাদু, আর তারা জানে সমস্ত নোংরামি জগতের; তাদের সান্নিধ্য থেকে আমি পানাহ চাই শুধু আজ- আমার অস্তিত্ব থেকে তাদের সংস্পর্শ…
-
কোথায় যেন আটকে গেছি / সায়ীদ আবুবকর
কোথায় যেন আটকে গেছি আমরা সবাই। থমকে আছে ঘড়ির কাঁটা। থেমে গেছে কালের গতি। সীমারেরা করছে জবাই দিনদুপুরে গণতন্ত্র জীবনতন্ত্র। প্রাণপদ্মার শীতল পানি নেমে গেছে কত নিচে! আমরা যেন বিকল যন্ত্র পড়ে আছি বালির চরে। কোথায় যেন আমরা সবাই, হায়, কচুরিপানার মতো আটকে গেছি মরা নদীর সোঁতায় যেন! সভ্যতা আর এগোচ্ছে না, থেমেই আছে, যেমন…
-
ইটালির প্রেসিডেন্টের প্রতি / সায়ীদ আবুবকর
ইটালিতে খাদে পড়ে ৩৮ জনের মৃত্যু: রয়টার, ৩০ জুলাই, ২০১৩ মৃত্যু বড়ই কষ্টের, দুঃখের, অশ্রুর; সব গান, সব সুর থেমে যায় মুহূর্তেই; আর পাথরঅন্তর কাঁচের গ্লাসের মতো ভেঙে হয়ে যায় গুঁড়োগুঁড়ো- বুঝলেন বুঝি এতদিন পর? হে মহান প্রেসিডেন্ট ইটালির, আমাদের এ নরকে প্রতিদিনই লোক মরে অপুষ্টি, অজীর্ণ, অনাহার, এমনকি সর্দি-কাশি-জ্বরে; তার উপর যখন ইউরোপ ও…
-
শেয়াল / সায়ীদ আবুবকর
শেয়ালের মতো হাসছিল সে খ্যা খ্যা করে, হতবাক হয়ে দেখছিল তাকে পথের মানুষ; মাঝে মাঝে তার শুকনো হাসিটা যাচ্ছিল ঝরে, মনে হচ্ছিল ফুটো হয়ে যাওয়া রঙিন ফানুস। বন্ধুরা তার যে-কথাই বলে, হেসে হয় খুন মাঝে মাঝে থামে, যেন ব্রেক কষা মালবাহী ট্রাক আবার সে হাসে, যেন পেট ভরা মাতাল শকুন; রাস্তার লোক দূর থেকে দেখে…
-
পিঁপড়ের বিস্ময় / সায়ীদ আবুবকর
একদিন এক জ্ঞানী পিঁপড়ে চললো ছুটে, ছয় পায়ে, তার কওমের কাছে। গিয়ে সে বললো: ‘মানুষগুলো কি অমানুষ দ্যাখো! যেখানেই পায়, আলোয় কি অন্ধকারে, দানবের মতো দুপায়ে পিষ্টিয়ে তারা মারে আমাদের। মারে আগুনে পুড়িয়ে কিংবা কেরোসিন ঢেলে। শয়ে শয়ে পিঁপড়ারা পড়ি মারা, কখনও বা লাখে লাখে, যেন ভয়াল প্রলয়ে উল্টে যায় মুহূর্তে অদৃষ্ট আমাদের। আমাদের বীভৎস…
-
চোখ, কান, নাক ও হৃদয়বিরোধী কবিতা / সায়ীদ আবুবকর
চোখ না থাকলেই বোধহয় ভালো হতো; কান না থাকলেই, নাক না থাকলেই, এবং হৃদয় না থাকলেই বোধহয় ঝামেলা হতো না এত এই জাহান্নামে। শুধু নষ্ট, নোংরা আর অপবিত্র দেখতে দেখতে সূর্যোদয় হয় এখানে প্রত্যহ; শুধু হত্যা, খুন, রক্তপাত, ভণ্ডামি ও কূপমণ্ডুকতা দেখতে দেখতে সূর্য ডুবে যায়; তবু যদি রাত্রি হতো কবরের রাত! দুচোখ পীড়িত করে…
-
যদি প্রতিদিন ঈদ হতো / সায়ীদ আবুবকর
ল্যাংড়া ফকিরগুলো কত খুশী, অন্ধ ফকিরগুলোও খুশিতে অবাক: একেই তাহলে বলে বুঝি লাক- তারা ভাবে; পড়ছে বৃষ্টির মতো ঝরে দু-টাকার পাঁচ টাকার কয়েন; কেউ কেউ চিল্লিয়ে ‘এই যে চাচা, নেন’ বলে ছুঁড়ে মারছে দশ টাকা বিশ টাকা পঞ্চাশ টাকার নোট; নিজের চোখকেও হতে চায় না বিশ্বাস-এরকম অন্ধ খোঁড়া অচল লোককেও দিতে পারে মানুষেরা এত টাকাকড়ি;…
-
তুমি বলো তুমি বৃষ্টি ভালবাসো / সায়ীদ আবুবকর
তুমি বলো তুমি বৃষ্টি ভালবাসো কিন্তু যেই বৃষ্টি শুরু হয়, তড়িঘড়ি তুমি ছাতা ধরো মেলে। তুমি বলো তুমি সূর্য ভালবাসো কিন্তু সে তাপ দেওয়া শুরু করলেই তুমি খুঁজতে থাকো ছায়া। তুমি বলো তুমি ঝড় ভালবাসো কিন্তু যেই ঝড় শুরু হয়, জানালা দরোজা বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকো তুমি। তুমি বলো তুমি মানুষকে ভালবাসো কিন্তু কেউ…
-
বর্ষামঙ্গল কাব্য / সায়ীদ আবুবকর
যেভাবে জিউস রাজহাঁস হয়ে নেমে এসেছিল লেডার উপর, অতঃপর বন্য সহবাসে তাকে করেছিল দুই আগুনের মাতা,- সেভাবেই জংলি বৃষ্টি আজ রাতে মেতেছে আদিম নিখাঁদ বর্বর সংগমে মহাপৃথিবীর সাথে; আনন্দে কৃষক হিসাবের খাতা খুলে বসে আছে স্বপ্নের ভেতর- নতুন ফসলে ভরবে সে গোলা। ফিসফিস করে কারা কথা কয় প্রণয়ের কথা নিশুতি এ রাতে অথৈ অন্ধকারে, যার…
-
উৎসর্গ কবিতা:তুমি বলো তুমি বৃষ্টি ভালবাসো / সায়ীদ আবুবকর
উৎসর্গ আলমা লোরেনা লোপেজ ভেলাজকুয়েজ এখানে যখন সন্ধ্যা ঘনায় তোমার ওখানে দিনের শুরু; রাত্রি এগোয় সাপের ফণায়, কাঁপে আতঙ্কে হৃদয়, ভুরু! ওখানে যখন রাত নেমে আসে, দোয়েলেরা দেয় এখানে শিস; তরাসে তোমার গা ঘেমে আসে, যেনবা বাতাসে সাপের বিষ
-
সমুদ্রের গান / সায়ীদ আবুবকর
ওই নীল সমুদ্রশয্যায় শুয়ে আছে সহস্র মানুষ। শুয়ে আছে, নাকি ডলফিন হয়ে মৎস্যকন্যাদের সাথে নেচে নেচে গান গায় সোনালি রুপালি জলের গহিনে, যখন ক্রীড়ায় মত্ত সব বসন্তের পাখি ঝাঁক বেঁধে চঞ্চল চঞ্চুতে নিয়ে যায় তুলে ধবধবে সমুদ্রের ফেনা? যেখানে উত্তাল জলের মিছিল আজ ফণা তুলে নাচে, ওখানে, লরেনা, গিয়েছিল আকস্মিক জাহাজটি ডুবে। কি করুণ আর্তনাদে…
-
সচিবালয় / সায়ীদ আবুবকর
এতদিন কেবল মানুষই উঠতো এ সিঁড়ি দিয়ে উপর তলায়। কিছু গরু আজকে হঠাৎ উঠে গেল মানুষের সাথে পাশাপাশি। মানুষের সাথে কি-চমৎকার খোশগল্প করতে করতে উঠছিল তারা! দেখে বলাবলি করছিল লোকে, এখনই বরং সুন্দর লাগছে সব; এখনই বরং আদর্শ সচিবালয় বলে মনে হচ্ছে এ সচিবালয়টাকে। ২৬.৫.২০১৩ মিলন মোড়, সিরাজগঞ্জ
-
মধ্যযুগীয় খেলা / সায়ীদ আবুবকর
বাড়িগুলো ধসে পড়ার আগেই যদি লোকগুলো বের হয়ে যেত, ফোনে কেউ আগাম জানিয়ে দিতো তাদেরকে, টিভি চ্যানেলগুলো সতর্ক করে দিতো আগেভাগে কিংবা যদি ঘুমের ভেতর ভূমিকম্প দেখে ‘ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!’ বলে তারা চীৎকার করে উঠতো, তারপর খান জাহান আলির দরগায় গিয়ে লুটিয়ে পড়তো সিজদায়! তারা ধরেই নিয়েছিল, তাদের সুরম্য প্রাসাদগুলোতে কোনোদিন অসুখবিসুখ, অভাবঅনটন, ঝড়ঝন্ঝা, মৃত্যু ও…
-
রেত / সায়ীদ আবুবকর
করাতে কাটে না, গুঁড়িগুলো তাই পড়ে আছে অনাদরে; নস্যি টেনে টেনে মিস্তিরির কাটে দিন; তক্তা নেই, ফার্নিচারও নেই তাই। রেতের অভাবে পড়েছে অচল হয়ে সৌখিন কাঠের শিল্প তার। ১৭.১১.২০১২ মিলনমোড়. সিরাজগঞ্জ
-
লজ্জা / সায়ীদ আবুবকর
কেমন লজ্জার ব্যাপার না? আমি বললাম। কিসের লজ্জা, বৎস? এইভাবে বারবার তওবা করে করে তওবা ভঙ্গ করা, তারপর আবারও তওবা করা! একটা কুকুরও তো দশবার ভুল করে দশবার লাথি খাওয়ার পর ফিরে যায় না আর তার মনিবের বাড়ি। লজ্জায় আমরাও যেতাম না ফিরে, যদি থেকে যাওয়ার মতো থাকতো কোনো ঠাঁই। হায়, মানুষ কোথায় লুকায় মুখ,…
-
ফকির / সায়ীদ আবুবকর
ছেঁড়া আলখেল্লা পরে একটি ফকির হো হো করে হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছিল রাস্তা দিয়ে। আমি হাত ঊঁচু করে তাকে থামিয়ে দিলাম: কী ব্যাপার, এত হাসি কিসের? ভিক্ষেটিক্ষে কিছু চাই নাকি? তওবা তওবা বলে সে দৌড়াতে লাগলো চোখবুজে। পশ্চাতে ফিরেও তাকালো না একটিবার। কিছুদিন পর শহরের মাঝখানে তার সাথে ফের দেখা। অনেক দিনের পরিচিত কোনো মানুষের মতো…
-
মা / সায়ীদ আবুবকর
সে প্রথম চুম্বনের পর কেঁপে উঠেছিল থরথর করে, যেন ঝড়ে কাঁপা কোনো অশ্বত্থের কচি ডাল। অতঃপর অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো সে সুপ্রিয় তার প্রেমিক পুরুষের দিকে, যেন কোনো অবাক হরিণী। সে প্রথম মিলনের পর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠে নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মুগ্ধচোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল সুঠাম তার প্রেমিক পুরুষের বুজে থাকা প্রশান্ত চোখের পাপড়িগুলো।…