-
ভয় / সায়ীদ আবুবকর
ভয় কোথায় গেল হে, বলতে বলতে লোকটা দৌড়াচ্ছিল ঊর্ধ্বশ্বাসে। আমি ছুটে গিয়ে বললাম, ভাই, কী খুঁজছেন এইভাবে? সে থমকে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো, ভয়! ভয়কে এ ফেরাউনের শহরে আমি পাচ্ছি না কোথাও খুঁজে। হায়, এ শহরে ভয় ছাড়া কিছুই তো পড়ে না আমার চোখে- আমি বললাম, যেদিকে তাকাই, শুধু ভয়; বন্দুকের ভয়, কিরিচের ভয়, গলা…
-
নাটকের মতো / সায়ীদ আবুবকর
কেমন স্বপ্নের মতো লাগলো সব। মুসলমানির ভয়ে যে-ছেলেটি বুনোগাছের মতো গজে ওঠা পাটখেতের ভেতর পালিয়ে থাকতো একদিন, সে কেমন মৃত্যুকে তুচ্ছ করে বক্ষ উদোম করে দাঁড়িয়ে রইলো নির্ভীক, সীমারের ছুরির সামনে। কোনো সুন্দরীর চোখে চোখ পড়লে ভীতু হরিণের মতো যে কেমন আড়ষ্ট হয়ে যেত লজ্জায়, সমস্ত সুন্দরীর কলিজাগুলো কেটে বস্তায় পুরে সে ডুবিয়ে দিলো কি-নির্বিঘ্নে…
-
এ এমন এক জীবনকাহিনী / সায়ীদ আবুবকর
বাহির দেখলে মনে হয় পাকা, ভেতরটা খেয়ে গেছে পোকায়, এমনই একটি পেয়ারার মতো আমার দুর্দশা। চমৎকার বাঁশের খুঁটির উপর যেন দাঁড়ানো একটি আটচালা ঘর, সবগুলো খুঁটির পোতাই যার খেয়ে গেছে ঘুণে, ঝড় এসে ধাক্কা দিলেই যা উল্টে পড়বে ধুলোয়। অথবা একটি চোরাবালি যেন আমি, যার বুকে পা দিলে মানুষ তো ডোবেই, আমিও আমাকে নিয়েই ডেবে…
-
ভাঙা কলস / সায়ীদ আবুবকর
অতীতের কতক অংশ মুছে ফেলা যেত যদি, হৃদয়ের পুরোনো প্রাচীরগুলো ভেঙে ফেলা যেতো; যদি গা ঘিনঘিন করা লজ্জা ও অনুশোচনার দিবস ও রাত্রিগুলো কোঁদাল দিয়ে উপড়ে ফেলা যেত জীবনজমিন থেকে, জীবনের ঘড়ি থেকে ভালবাসাহীন সেকেণ্ড, মিনিট ও ঘন্টাগুলো ভস্ম করে দেওয়া যেত, মোবাইলের অস্বস্তিকর কোনো নম্বরের মতো মুহূর্তে ডিলিট করে দেওয়া যেত বিবেককে কেউটে সাপের…
-
কী গেলাম তন্ময় হয়ে লিখে / সায়ীদ আবুবকর
কী দেখলাম এ চোখে, কী শুনলাম এ কানে, কী ভাবলাম এখানে এই কদম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অস্থির মনে একা, আর কী সমস্ত ছাইভস্ম গেলাম তন্ময় হয়ে লিখে কালের পৃষ্ঠায়! রেক্টর স্কেলের ন মাত্রার ভূমিকম্পের পর কী কাব্য অবশিষ্ট থাকে পৃথিবীতে? যখন ধ্বংসের স্তুপ থেকে অঙ্কুরিত হয়ে ফের জেগে ওঠবে হুরের সভ্যতা, যখন রাষ্ট্র ও ভাষার…
-
অমরত্বে নেই, সুখে ও সফলতায় নেই / সায়ীদ আবুবকর
মরে গিয়ে মর্ত্যরে মানুষগুলো কত দিন বেঁচে আছে? কত দিন বেঁচে আছে সফোক্লিস, হোমার, এরিস্টোটল, প্লেটো, দান্তে ও মিল্টন? কত দিন হলো ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে আওরঙ্গজেব, জুলিয়াস সিজার, অশোক, আকবর, চেঙ্গিজ খান, মাও সেতুং ও আব্রাহাম লিংকন? কোন্ অমরত্বের অহংকার করে মানুষ নশ্বর পৃথিবীতে, যখন রহস্যময় অনন্তের একদিন = দুনিয়ার এক হাজার বছর? আমার…
-
বিকেলের সব কথা / সায়ীদ আবুবকর
জানাযায় দাঁড়িয়ে তাদের আত্মাগুলো বটের পাতার মতো কাঁপছিল। তাদের চোখের মণির উপর শেওলার মতো ভাসছিল গোরস্থানের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। পাপদগ্ধ দেহকারাগার থেকে লাফিয়ে পড়তে চাচ্ছিল তাদের বন্দী আত্মাগুলো বিকেলের রুপোলি রোদ্দুরে। মুনকার নাকিরের ভয়ে তারা যেন তাদের স্কন্ধের দু’পাশে তাকাতে পারবে না কোনোদিন, এরকমই ভাবছিল তারা। আর তাদের মনে হচ্ছিল, এরপর থেকে তারা ধোওয়া তুলশিপাতা হয়ে…
-
মূর্তির শহর / সায়ীদ আবুবকর
এত মূর্তি চারদিকে-ঘরের ভেতর, অন্তরের ভেতর, নগরদ্বারে, সিংদরোজায়, অফিসে অফিসে, দেয়ালে দেয়ালে, টেবিলে ও বুকসেলফে, উত্তরে-দক্ষিণে, পূর্ব ও পশ্চিমে, মাটিতে ও শূন্যের উপর-যেন মূর্তির বন্যায় ডুবে গেছে সারা দেশ। নমরুদের উপাসনালয়ের যে-মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন হজরত ইব্রাহিম, কারা যেন মেরামত করে তা বসিয়ে রেখে গেছে এই শহরের অলিতে গলিতে। কাবাশরিফের ভেঙে ফেলা মূর্তিগুলো বুকের ভেতরে নিয়ে…
-
নারী / সায়ীদ আবুবকর
যে-নারী সবজির মতো, তাকে পাওয়া যায় পথেঘাটে; যে-নারী মৎসের মতো, সে তুলসি তলা দিয়ে হাঁটে দুলিয়ে কোমর- জেলেরা খেওলা জাল নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখে দ্যাখে ঘোর; যে-নারী বিরিয়ানির মতো, তাকে পাওয়া যায় পাঁচতারা হোটেলের কামরায় কামরায়; শুকরিয়া, আমাদের মৃত্তিকার ঘরে করে সেইসব নারী বসবাস- কুসুমের মতো রূপ আছে, রঙ আছে, আছে তার চেয়ে অধিক সুবাস।…
-
চোখ / সায়ীদ আবুবকর
রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে হায়েনার চোখ জ্বলে; বাঘ তার চোখের আলোয় পথ দেখে দেখে চলে অন্ধকারে মোড়া রাতের অরণ্যে চুপচাপ; সাপ ও বৃশ্চিক হারায় না পথ, অন্ধকার মাড়িয়ে মাড়িয়ে পৌঁছে যায় ঠিকঠিকই লক্ষ্যস্থলে; কেবল মানুষই চলতে পারে না এক পাও ধার করা আলো ছাড়া; বিদ্যুতের ব্যবহার, টর্চ লাইটের ব্যবহার মানুষই কেবল করে। হায়, এই চোখ যদি…
-
এক দেশ এক পৃথিবী / সায়ীদ আবুবকর
মানুষ আমাকে বিপ্লবের কথা বলে। আমি বলি মানুষের প্রথম বিপ্লব হোক দেশের দেয়াল ভেঙে ফেলা। সীমান্তের সব কাঁটাতার ছিঁড়ে ফ্যালো। অতঃপর বিহঙ্গের মতো পাসপোর্ট ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ো পৃথিবীর দিগ্বিদিকে। মানুষকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে বলো, আমি মানুষের ভাই। যারা দেয়ালের কথা বলে, যারা সীমান্তে সীমান্তে কাঁটাতারের উপকারিতার কথা বলে, যারা নদীদের বুকের উপর সীসার বাঁধের প্রয়োজনীয়তার…
-
সত্য / সায়ীদ আবুবকর
যখন ফিরিয়ে দেয় আদালত, শূন্যহাতে; যখন মুখের উপর ডাক্তার বলে দেয় সারবে না, তাতে কাঁচের গ্লাসের মতো ভেঙে খানখান হয়ে যায় বুক; যখন কেবলি স্বাস্থ্য ভাঙে খাদ্য, পূর্ব ও পশ্চিম তাবৎ মুলুক চলে যায় সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে; যখন একের পর এক পরাজয় নেমে আসে যুদ্ধে- যখন বিষণ্ন দুলদুল, দিশেহারা, ইমাম হোসেন ছাড়া ফিরে চলে ঘরে; তখন…
-
একটি পাতার কাহিনী / সায়ীদ আবুবকর
পাতাটি গাছের মগডালে জন্মেছিল। যখন সে কচি শিশুটি ছিলো, তাকে দেখলেই যে-কারোর দুচোখ জুড়িয়ে যেতো। যখন সে যৌবনে পা দিলো, বাতাসরা এসে তাকে প্রণয় নিবেদন করতো। সে বাতাসদের মৃদুস্পর্শে থরথর করে কাঁপতো সারাদিন। একটি কোকিল এসে তার পাশে চুপটি করে বসে থাকতো; তারপর কণ্ঠ ছেড়ে একসময় জুড়ে দিতো বসন্তের গান। প্রকৃতির নিয়মে পাতাটি একদিন হলুদ…
-
নাম তার কারিনা কাপুর / সায়ীদ আবুবকর
দুর্বল একটি কঙ্কালের উপর কিছু মাংস; মাংসের উপর কিছু রঙ; এইসব নিয়ে স্বল্পবসনা সে হাতপা দুলিয়ে টিভির পর্দায় নাচছিল। নাচার সময় তার মনে হচ্ছিল তাকে চমৎকার দেখাচ্ছে। লোকেরা দুনিয়ার কাজ ফেলে রেখে হাঁ-করে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। তাদেরও মনে হচ্ছিল তাকে চমৎকার দেখাচ্ছে। আমি লোকগুলোর দিকে একবার তাকাচ্ছিলাম আর একবার তার দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমি বুঝতে…
-
ছবির মানুষ / সায়ীদ আবুবকর
হাঁটাহাঁটি করে, হাসাহাসি করে, কানাঘুষা করে রাতদিন শুধু ছবির মানুষ ছবির শহরে। খবরে কাগজে ছাপা ছবি যেন এ মানুষগুলো রাস্তা ও ঘাটে ওড়ায় কেবলি ধোয়া আর ধুলো। মানুষগুলোর ঠোঁটে যত কথা বাজে সারাদিন যেন তা পেপারে ছাপা মিছে কথা কাগুজে রঙিন। রাতদিন শুধু ছবির মানুষ ছবির শহরে ভূতদের পায়ে ভিলেনের মতো হাঁটে আর ঘোরে।
-
মানুষ আমাকে গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে / সায়ীদ আবুবকর
মানুষ আমাকে গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে। আমি বুঝিই না গণতন্ত্র বলতে কী বুঝাতে চায় তারা। যা বোঝে না তাই নিয়ে খালি তর্ক করে চলে তারা পথেঘাটে। তারা সাপবিচ্ছুর মতো কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে চায়ের দোকানে বসে চা খায় আর তৃপ্তির হাসি ছড়াতে থাকে চারদিকে। নির্বাচিত সেই লোকগুলো যখন হায়েনার মতো তাদের হাড়মাংস চেটেপুটে খেয়ে…
-
আলেম / সায়ীদ আবুবকর
আমি তাঁকে বললাম, আলেম বলতে কি এমন সব লোককে বুঝায় যারা লম্বা আলখেল্লা পরে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে বুক ফুলিয়ে হাঁটে আর দুয়েকটা আরবি বলে দরাজ গলায়? -বাহির দেখে বিভ্রান্ত হয়ো না, বৎস, যেমন বিভ্রান্ত হয়েছিল মুসা তাঁর হাতের ছড়িটি নিয়ে। ছড়িটি যখন সাপ হয়ে গিয়েছিল তখন তো ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল তাঁর চোখ। আবার স্মরণ করো…
-
বেহেস্তের ফুল / সায়ীদ আবুবকর
মা পবিত্র, প্রিয়া পবিত্র, কন্যা পবিত্র। অপবিত্র শুধু পতিতারা। নারী তো পৃথিবীর কাননে ফোটা বেহেস্তের ফুল। বিবি হাজেরা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মা, ইসমাইলকে বুকে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন দিগ্বিদিক, যাঁর পায়ের আঘাতে খা খা মরুভূমির বুকের উপর একের পর এক জেগে উঠছে মরুদ্যান, বেহেস্ত থেকে ঝর্ণা নামিয়ে এনে পানি পান করাচ্ছেন তাঁর তৃষ্ণার্ত…
-
প্রিয়া ও মা / সায়ীদ আবুবকর
যদি প্রিয়া বলো, তার ঠোঁট মুখ্য হয়ে ওঠে, তার চোখ, চোখের ভুরু, চোখের চাহনি, অমাবশ্যা রাত্রির মতো একমাথা চুল আর বক্ষদেশে দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ডালিম পর্বতমালা মুখ্য হয়ে ওঠে, মুখ্য হয়ে ওঠে রহস্যাবৃত তার সমস্ত শরীর; তখন হরিণকে নাগালে পাওয়া কোনো ক্ষুধার্ত বাঘের মতো জেগে ওঠে দেহ, জেগে উঠে ছুটতে থাকে, ছুটতে ছুটতে তৃপ্তির কিনারে…
-
শিশিরজীবন / সায়ীদ আবুবকর
এক ফোঁটা জীবন অথচ মহাসাগরের পানিবরাবর আশা। ক’বসন্তের ভঙ্গুর যৌবন অথচ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব সুন্দরীকে হাতের মুঠোতে নিয়ে হাজার বছর ভোগ করার অদম্য ঈপ্সা। ঘাসের ডগায় জমা শিশির-জীবন নিয়ে চব্বিশ ঘন্টাই মানুষ বিভোর হয়ে থাকে অমরতার স্বপ্নে। কোনো মানে হয় বলুন? তিনি বললেন, যতই দিন যাবে ততই মানুষ অমরত্বের জন্যে অন্ধ হয়ে যাবে। লম্বা লম্বা…