অন্বেষণ / মুসা আল হাফিজ

মুসা আল হাফিজকে দেখেছেন কোথাও?
না কোনো মহাজাগতিক উৎসবে যায়নি যে হারিয়ে ফেলবে প্রত্যাবর্তনের ব্যাকরণ

না কোনো আকাশ তাকে ডেকে বলেনি ‘আয় গল্প করি’
নদীগুলো শুকনো দড়ির মতো রুদ্ধবাক, এমন তো নয় যে, তরঙ্গেরা
ঝাঁক বেধে স্বাগত জানাচ্ছে তাকে!

যেখানে সবগুলো মাঠে সাপ, সেখানে আনন্দের বালিকারাও
নেই শতাব্দীর মাঠে। কোথাও কি বাঁশির কান্না শুনা যায়?
না যন্ত্রের সন্ত্রাসে সে আওয়াজও শুনছি না!

তাহলে কোথায় গেলেন সেই জ্বলন্ত খুদি?
মুসা আল হাফিজ, তুমি কোথায়?

তোমার জন্য অশুস্থ চাঁদ বার বার বেহুঁশ হচ্ছে মেঘের ভেতর
তোমার অনুপস্থিতির মর্সিয়া নক্ষত্রের গাঁঢ় কণ্ঠস্বরে
শোকগ্রস্থ জননীর মতো উঠানে পায়চারি করছে নির্ঘুম পঙক্তিমালা
অক্ষরের চারুচোখে বিষাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে তুমিহীন শূন্যতা
দুঃসহ শোক থেকে উল্থিত ঘণ্ঠাধ্বনি বয়ে চলছে রাত্রির বাতাসে
সময়ের গ্রন্থে গ্রথিত হচ্ছে বিত্তহীন সংলাপ

তুমি নিখোঁজ হবার পর থেকে লালপাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে
পৃথিবীর নবজন্মকে অভিনন্দন জানিয়ে
সূর্য আর আবৃত্তি করেনি আলোর কবিতা!

শৌর্যের পাগড়িপরা সেই বোধের দরবেশ
বন্দরের জাহাজের মতো তিনিও চলে গেছেন দরিয়ার ওপারে!

তুমি যেখানেই থাকো, মাঠে-ঘাঠে, ঘাসে – গাছে কান পাতলে
শুনতে পাবে অথৈ দীর্ঘশ্বাস!

সেদিন দীর্ঘশ্বাসের মাতাল তরঙ্গে দাফন করে এসেছি
নিজের একাংশকে।এখন আমার বাকি অংশ
কেবলই ইশক-অন্তরঙ্গ ব্যাকুল পিপাসা

দিগন্তের বুক পেরিয়ে সে ছুটছে হাতে নিয়ে গণগণে ইশতেহার
‘যেখানে্ে সে আছে, তারারা রটিয়ে দিয়ো তার কথা
বাতাস খবর দিয়ো গুপ্তচরের মতো’

হাজার হাজার যাতনাদগ্ধ নির্ঘুম প্রহর মুসা আল হাফিজকে
ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত দা্উ দাউ দীর্ঘশ্বাসে গলাতে থাকবে আকাশ আর
আগুন লাগিয়ে দেবে আত্মগোপনের সকল আস্তানায়!

তোমায় ভালোবাসি / সাইফ আলি

রাখতো এলোমেলো শব্দ পাশাপাশি
সহজে বলো, আমি তোমায় ভালোবাসি
না হয় ঘৃণা করি তবুও পায়ে ধরি
মাথাটা খেয়ো না তো করো না কাশাকাশি।

ওসব তোতলামি থাকে না বেশিদিন
বুকের বামপাশে হঠাৎ চিনচিন
ব্যথাটা বেশিদিন থাকে না চুপ করে
ক্রমেই যায় বেড়ে। তুখোড় প্রেমচাষী

হারায় আগ্রহ; হয়না বিশ্বাস?
মানিয়ে চলতেই ওঠে নাভিশ্বাস,
তায়চে ভালো হয় নীরবে কেটে পড়ো
খামাখা বাড়িও না লোকের হাসাহাসি।

তবুও দমবে না? এ প্রেম কমবে না?
তাহলে কাছে আসো, না হলে জমবে না;
তিন কবুল বলে জানাও স্বীকৃতি
বুক ফুলিয়ে বলো, তোমায় ভালোবাসি,

তোমায় ভালোবাসি, তোমায় ভালোবাসি;
খোদার রহমত ঝরুক রাশিরাশি।

মদকাব্য / মুসা আল হাফিজ

আমি তো পেয়ালা দেখিনি
শুধু তার সুবাস পেয়ে হয়েছি বেহুঁশ

যে সেই পেয়ালা পেলো
সুমধুর আগুনে সে ভস্ম হলো চিরতরে

নিজেকে খনন করে ভেতরে একটি উনুন আবিষ্কার করেছি
হাজার বছর ধরে সে তৈরি হচ্ছে
তোমার আগুনে তপ্ত হবে বলে

এসো, দগ্ধ করো, জানাও নিজেকে

তুমি ছাড়া কে তোমাকে দেবে হে প্রকাশ ?

আমি শব্দ দিয়ে তোমাকে প্রকাশ করছি
প্রকৃত তোমাকে প্রকাশ না করার জন্যে

তোমার পেয়ালার মদ পান করবো বলে
পৃথিবীর মদ্যকে মেনেছি হারাম

নিবেদনের কবিতা / মুসা আল হাফিজ

এভাবে না হয়, ওভাবেই হোক
দূরে ঠেলেও ভালোবাসো অন্তত

তুমি যখন প্রত্যাখান দিয়ে স্মরণ করো, আমি খুশি
তুমি যখন যন্ত্রণা দিয়ে খুশি হও, আমি খুশি

তুমি যখন তিলে তিলে পিষে ফেলো
তখন আমার আনন্দকে বিকাশের বিভূতি দাও

হত্যা করো যেভাবেই চাও

শুধু অমার চিৎকারকে করো শুদ্ধ
শুধু আমার রোদনকে করো প্রেম

তোমার আচরণ / মুসা আল হাফিজ

তোমার দেয়া বিষই আমার বিষনাশক
তোমার তীব্রআঘাতগুলো আমাকে আগুন বানালো বলে
কোনো আগুন আমাকে আর পুড়াতে পারছে না!

নেকড়ের অরণ্যে আমাকে ফেলে দিলে বলেই
নেকড়েরা হয়ে গেলো আমার খাবার!

তুমি আমার সাথে কোনোদিন মন্দ আচরণ করোনি

অসুখে মরতে মরতে মরি না
কতো নিপুণ কুদাল আমার কবর খুড়ে চলছে!
কিন্তু বেলা শেষে দেখা গেলো অসুখই করে দিলো
আমাকে অজেয়!

এই যে আমাকে ফেলে দিলে বোয়াল মাছের যুগে
নিশ্চয় আনবে বলে বোয়াল শিকারের দিন!

তখনও লিখব প্রেমের কবিতা? / মুসা আল হাফিজ

অস্তমিত সূর্য আমার থালায়
মাথার ওপর দিগন্তের ছেড়া ছেড়া মেঘ
আমার ডানে বর্ণহীন দিন বামে ভয়াল কালোবিবর
দূরে,সভ্যতার গোলাঘরে ডাকাতি চলছে প্রহরব্যাপী
বেলাশেষের হু হু হাওয়া সেই সংবাদ জানিয়ে গেলো যখন
তখনও লিখবো প্রেমের কবিতা?

বধির সাপের মতো দিবসের ঘরে নেমে এসেছে প্রলয়
ফসল তোলার স্বপ্নকে ঘিরে ধেই ধেই করে নাচছে বিনাশি প্লাবন
উঠানে প্রত্যাশার পায়চারী আর নেই,সেখানে অগ্নিবৃষ্টি নিয়ে যখন ধেয়ে আসছে কাপালিক ড্রোন,
তখনও লিখবো প্রেমের কবিতা?

বসন্তের সংবিধান সংশোধন করছে
কাকের সংসদ
স্বার্থের দাঁত দিয়ে ইদুঁরেরা কেটে ফেলছে হৃদয়ের অভিধান
বিবেকের পুণ্যপাত্রে প্রস্রাব করছে Bostor পুরোহিত
নারী ও নিসর্গ নিয়ে তুমুল জমেছে যখন প্রগতির দাবা,
তখনও লিখবো প্রেমের কবিতা?

তোমার প্রতি / মুসা আল হাফিজ

এই সুহাসিনী চাঁদ তোমার মুখের চেয়ে মোহনীয় নয়
এই অমাবস্যার বন তোমার কেশের চেয়ে অন্ধকার নয়

তোমার আচলের মেঘে জ্বলজ্বল করছে দশটি অঙ্গুলির শূভ্রশিখা
তোমার দৃষ্টিতে আছে পৃথিবীর সেরা মৌচাক
ভ্রুলতার গোপন তরবারি তাকে পাহারা দিচ্ছে!

তোমার হাসির ভেতর তিন লক্ষ গোপন তিরন্দাজ
ধনুক ছাড়াই তারা বিদ্ধ করে বীরের হৃদয়!

তোমার বুকের ভেতর নিখিলের জীবন জমে আছে
তোমার দুগ্ধে আছে অস্তিত্বের সার
তোমার রক্ত থেকে সভ্যতার ভ্রুণ

তোমার কপোলে একটি অনুপম পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে আছে
তার প্রতি পৃষ্ঠায় পরমের নিপুণ শিল্পকলা

তুমিহীন এই ঘর খাঁ খাঁ গোরস্তান
তুমিহীন এই হাওয়া জীবনের অস্থিরতা
তুমিহীন এই প্রহর শূন্যতার দারিদ্রে নীলিমাভর্তি দীর্ঘশ্বাস
তুমিহীন রাত শোকের তরঙ্গশিরে বিপন্ন ভেলা
তুমিহীন দিনে কাঁদেন আদম অবিরত
তুমিহীন পৃথিবী মৃত্যুর চাদরে মোড়া স্বপ্নহীন জন্জাল

হেরে যেতে পারো না নারী!
তুমি যদি হেরে যাও, পৃথিবীটা হয়ে যাবে আইয়ুবের বিলাপ
ফুলের বাগান হবে নিথর শোকসভা
ঘাস হয়ে যাবে হলুদ
পাখিরা মাতম ছাড়া সব গান ভুলে যাবে!

দ্যাখো, শুয়োরের বাচ্চারা তোমার সীমান্তরেখায় জড়ো হচ্ছে …
তোমার পরাজয় ছাড়া কিছুতেই তারা তৃপ্ত নয়

তোমার ঐশ্বর্যকে আগলে রাখা অমীয় পতাকার দিকে
ওদিক থেকে ধেয়ে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর

সামলাও বিজয়িনী, সামলাও!

দার্শনিকের প্রতি / মুসা আল হাফিজ

হে দার্শনিক তোমার কথায়
মর্ম আছে সূক্ষ্ম
কিন্তু জগত এখন ভয়াল
জটিলতায় রুক্ষ

ফুলের চাষে লাগুক সবাই
এটাই তোমার মুখ্য
কিন্তু কীটের বিনাশ সাধন
জানো না হায় , দুঃখ !

এখানে এখন / মুসা আল হাফিজ

বলা হচ্ছে, আমরা বেঁচে আছি
এ গুজবে বিশ্বাস করি না
আপনারা বেঁচে আছেন, এও গুজব
আমাদের কেউ গুরস্তানে দাফন করেনি!
আপনাদের কেউ শববাহকের হাতে তুলে দেয়নি!

কেন দেবে?

এখানে
এখন
আমরা সকলেই যার যার গুরস্তান
আপনারা সকলেই যার যার শববাহক

কেনো সে দিলো ফাঁকি / সাইফ আলি

মাটির ঘর ছেড়ে তুমিও বের হও আবার ঘরে ফেরো
ফেরার কথা ছিলো সেদিন ঘর ছাড়া সুবোধ বালকেরও;
শালিক তুমি এই পদ্মা বালুচরে কি সুখে বাস করো
হঠাৎ ঢেউ ভাঙে তোমার ঘরদোর তবু বিশ্বাস করো
যে নদী ঢেউ বুকে তুমুল বিত্তের বইছে সারাবেলা
মানতে হবে তার আঘাত কিছু কিছু, কিছুটা অবহেলা?
অথচ মা’র মন কেমন দেখো দেখি, কিছুই মানছে না;
নদীর স্রোত কেনো বুকের ধনটাকে ফিরিয়ে আনছে না!
কোথায় গেলো ছেলে, লুকোলো কোন বনে, শালিক জানো নাকি;
মাটির ঘরে ফের আসবে ফিরে বলে কেনো সে দিলো ফাঁকি?

২০/০৮/২২

দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত