মানুষের দীর্ঘশ্বাস / আল মাহমুদ

দেখত দেখতে বহুদূর চলে এসেছি। পথে পথে ধসে পড়েছে
ইন্দ্রিয়ের ছলাকলা। এক নদীর পাড়ে খুলে পড়ে গিয়েছিল
আমার চোখের আলো। কত খুঁজলাম, কিন্তু সন্ধ্যার
আবছা একটা চশমার মতবসে গেল আমার নয়নে।
তারপর প্রান্তর পেরুতে গিয়ে ধসে পড়েছে আমার
শ্রবণ ইন্দ্রিয়। এখন কলরবমুখর কত নগর পেরিয়ে যাই
শুনতে পাই না। মানুষের কান্না না শুনতে পারা কত যে
দুঃখের সেটা আমি গুলির শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে বুঝতে
চেষ্টা করলাম। বোমা ফাটছে, ক্ষেপনাস্ত্র এসে আঘাত
করছে মুহ্যমান মহানগরীর মাঝখানে। আমি কানে
আঙুল না দিয়ে হেঁটে যেতে পারি। কিন্তু কেউ প্রশ্ন
করে না আমি কোথায় যাব। আমারও জানা নেই।
আমার কানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে গুল্মলতা।
আর অন্ধদৃষ্টির ভেতরে ডুবে যাচ্ছে সূর্য। সমুদ্রের
লবণাক্ত পানি ঢুকে যাচ্ছে আমার মগজের ভেতর।
আমি কবি বলে গালি দিলেও, যেমন অতীতে কারো
দিকে ফিরে তাকাইনি, আজও তেমনি কুৎসার মেঘ
কুন্ডলী পাকাচ্ছে আমার শত্রুর ভেতর। দাড়ি বেয়ে রক্ত
গড়িয়ে পড়ছে। বল, আমি কী না বলেছি? আমিও তো
মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম, এক নারী আমাকে হাঁটতে
বলেছিল বলে আমি একজন দিগন্তচারী সর্বভেদী স্বপ্নের মতো
শান্তির অন্বেষণ করেছি। আসলে সবাই ভাবে কবরের
নিঃস্তব্ধতাই হলো শান্তি, আমি তা ভাবিনি।
কলরবমুখর নগরগুলোই ছিল আমার গন্তব্য। বেবিলন
থেকে আমার শুরু, তারপর ক্রমাগত ধ্বংসের মধ্যে এখন
আমি যে শহরে এসে দাঁড়িয়েছি, তার নাম ঢাকা মহানগরী
আমি এখানে আর কোনো শব্দ শুনতে পাই না। কত বোমা ছিন্ন-ভিন্ন
করে দিচ্ছে মানুষের রক্ত-মাংস। কিন্তু আমার কানে
গজিয়ে উঠেছে লতাপাতা। যেন সাচী পানের লতা আমার
কানকে এক সুরভিযুক্ত পানের বরজ করে রেখেছে। যুদ্ধ, ধ্বংস,
বোমার স্প্লিন্টার গ্রেনেড সবকিছু আমার নিরাসক্তির অরণ্যে তলিয়ে
যাচ্ছে। আমি সবসময় ভাবতাম নৈঃশব্দই হলো কবির
শেষ ঠিকানা। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে আমি ফুঁ দিলে
বিনাশপ্রাপ্ত। ও অবলুপ্ত মহানগরীগুলোর ভেতর থেকে মানুষের
হা-হুতাশ বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শান্তি ছাড়া
আমরা কি আর কোথাও মনুষ্য জীবনের জন্য আক্ষেপ করার চাতাল
খুঁজে পাবো?

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান