মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

ষষ্ঠ সর্গ

তারিখ পঁচিশে মার্চ। দিনের প্রথম
ভাগে বসলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া
রুদ্ধদ্বার বৈঠকে। গোপন সে-বৈঠকে
উপস্থিত তিন জেনারেল: লেফটেন্যান্ট
জেনারেল টিক্কা খান, মেজর জেনারেল
রাও ফরমান আলী এবং মেজর
জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজা।
ওপারেশন সার্চলাইটের কর্ণধার
খাদিম হোসাইন রাজা, যিনি বাংলার
কসাই কুখ্যাত টিক্কা খানের নির্দেশে
দেখালেন হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে। অতঃপর
বললেন সমুদয় পরিকল্পনার
কথা তিনি রুদ্ধশ্বাসে। শুনে সে-বৃত্তান্ত,
রইলেন টিক্কা খান চেয়ে কৌতূহলী
চোখে প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে। দেখে
মনে হলো উঠেছে খুশির চিহ্ন ফুটে
সারা মুখে। তবু তাঁকে করতে আশ্বস্ত,
বললেন টিক্কা খান মোসাহেবি স্বরে:
“বাঙালী এবার ঢোঁড়া সাপ হয়ে যাবে;
ছোবল মারার দিন তার শেষ, স্যার।”
বলে হাসলেন মরা গরু খেয়ে তৃপ্ত
কোনো শকুনের হাসি। রাও ফরমান
আলী, পদ্ম-গোখরো যেন, ধরলেন মেলে
ফণা: “আমাকে একটিবার, স্যার, দিন
অনুমতি, কেটে এনে বিশ্বাসঘাতক
শেখ মুজিবের কল্লা, দেই উপহার
আপনাকে।” নিশ্চুপ হাসেন প্রেসিডেন্ট।
কইলো খাদিম হোসাইন রাজা শুনে
শান্ত স্বরে:“হবে না এমন কিছু করা
আমাদের জন্যে হিতকর, শত্রুরাষ্ট্র
ভারত যা নেবে লুফে। আমরা তো জানি,
চলছে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। মাথা
ঠাণ্ডা রেখে, স্যার,অভ্যন্তরীণ সংকট
মিটিয়ে ফেলুন চুপচাপ। দেবেন না
মুজিবের গায়ে হাত; ভারত তা নিয়ে
হৈ চৈ তুলবে সারা বিশ্বে। উস্কে দেবে তারা
আরো জেগে ওঠা স্বাধীনতা আন্দোলন
বাংলার, এ সুযোগে। হিতে বিপরীত
হবে তাতে। মুজিবকে বরং আমরা
কারাগারে পুরে রেখে, স্লো পয়জনিং
করে মেরে যদি ফেলি, লেঠা চুকে যায়!”
“সাবাস! সাবাস!” বলে দিলেন বাহবা
জেনারেল টিক্কা খান। “চমৎকার প্রস্তাব”
বলে, প্রেসিডেন্টও জানালেন সাধুবাদ;
বললেন অতঃপর: “যা কিছু কল্যাণ-
কর, আমরা রাষ্ট্রের জন্যে করে যাবো
সবই। হবেন না বিচলিত আপনারা।
আমরা নিখুঁত ছক কেটে কেটে, খুব
সাবধানে, এগিয়ে চলেছি। সিগন্যাল
পেলেই, সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে আপনারা
ঝাঁপিয়ে পড়বেন শত্রুর উপর। শত্রু
সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত কেউ
গুটিয়ে নেবেন না হাত। ঈমানী বলে
বলীয়ান হোন। টিক্কা খানসাহেব,
আপনি প্রস্তুতি নিন। গোটা জাতি আছে
আপনার সঙ্গে। এ-খেলায় আপনাকে
জিততে হবেই। আপনার জয় হোক।
পাকিস্তান জিন্দাবাদ।” তিন জেনারেল
বলে উঠলেন সমস্বরে: “পাকিস্তান
জিন্দাবাদ।” বলে তারা ডান হাত তুলে
করলেন স্যালুট। প্রসন্ন ইয়াহিয়া।

ওদিকে সকাল থেকে আসতে লাগলো
আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের
নেতৃবৃন্দ বত্রিশ নম্বরে। বঙ্গবন্ধু
দিতে লাগলেন দিক-নির্দেশনা, কী কী
করণীয় জরুরি মুহূর্তে। মধ্যাহ্নের
পূর্বক্ষণে আসলেন কিছু পাকিস্তানি
ও বিদেশি কর্মকর্তা। দেশের বিরাজ-
মান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা করলেন
আলোচনা বাংলার নেতার সাথে। পর-
পরই এলেন বাঙালি পুলিশ-কর্মকর্তা
একজন, আবদুল আওয়াল নামে;
ডিরেক্টর পুর্ব-পাকিস্তানে আনসার
বাহিনীর। জানতে চাইলেন, ক্ষুদ্র তাঁর
বাহিনীর অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করা
যায় কিনা জেলায় জেলায় মুক্তিযুদ্ধে।
সম্মতি জানিয়ে বললেন বঙ্গবন্ধু,
“গোপনে সাক্ষাৎ করো গিয়ে ছাত্রনেতা
সিরাজুল আলম খানের সাথে। যার
কাছে যা আছে, তা নিয়ে তৈরি হয়ে থাকো;
যদি হামলা করে, চুপ করে থাকবে না,
দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে পাঠিয়ে দেবে
জাহান্নামে, দয়ামায়া করবে না কোনো ।
অনেক সয়েছি, আর নয়; পাল্টা প্রতি-
রোধ এইবার, ঘরে-বাইরে, সর্বত্র।”

কমতে লাগলো আস্তে আস্তে মানুষের
আনাগোনা। পাখিরা ঝড়ের পূর্বাভাস
পেয়ে যেন সূর্যাস্তের আগে আগে ফিরে
গেছে নিরাপদ নীড়ে। শুধু বঙ্গবন্ধু
আর প্রহরী মোর্শেদ তীর্থের কাকের
মতো বসে আছে ধানমন্ডির এ খা খা
কবরের মতো স্তব্ধ বাড়িটিতে, বুঝি
কার প্রতীক্ষায়। নামলো ভূতের পায়ে
রাত্রি। গা ছমছম করা রাত। ভয় এসে
বাঁধতে থাকলো বাসা মনের ভেতর।
অতন্দ্র মোর্শেদ গা ঝাড়া দিয়ে করতে
লাগলো হাঁটাহাঁটি বাড়ির চত্বরে। ব্যস্ত
বঙ্গবন্ধু টেলিফোন নিয়ে। বলছেন
কথা এখানে ওখানে। হঠাৎ খবর
এলো, চলে গেছে ইয়াহিয়া খান ঢাকা
ছেড়ে আজ সন্ধ্যায় পশ্চিম পাকিস্তানে
অত্যন্ত গোপনে। গণমানুষের নেতা
ঘোরতর বিপদের আশঙ্কায় হয়ে
উঠলেন বিচলিত। গৃধ্রেরা নিশ্চয়
ভাগাড় বানাতে চায় সোনার বাংলাকে!
কাউকে না বলে, না তাঁকে, না মিডিয়াকে,
কী কারণে লেজ তুলে পালালো পশ্চিমা
শেয়াল, ভাবতে লাগলেন তিনি; যত
ভাবেন, শিউরে ওঠে গা অজানা কোনো
ষড়যন্ত্র কিংবা বিপদের আশঙ্কায়।
রাত্রি দশটা তখন; এলেন ছাত্রনেতা
তবিবর রহমান। করজোড়ে তিনি
করলেন অনুনয়: “প্রিয় নেতা, যান
সত্বর আপনি বত্রিশ নম্বর ছেড়ে।
এসে পড়তে পারে পাক-আর্মিরা যে-কোনো
মুহূর্তে। এখানে এই অবস্থায় পেলে,
মেরে ফেলবে ওরা আপনাকে।” বললেন
হেসে বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালীর নেতা,
প্রত্যুত্তরে: “বাংলার সমস্ত মানুষ
মেরে ফেলবে ওরা আমাকে না পেলে। যদি
আমাকে না পায়, ঢাকা নগরীকে ওরা
ধ্বংস করে দেবে পুরো চোখের পলকে।”
নিজের জীবন নিয়ে মাথাব্যথা কোনো
নেই তাঁর; বাঙালী ও বাংলাকে
নিয়ে তাঁর শয়নে-স্বপনে-জাগরণে
সার্বক্ষণিক ভাবনা। কে আর বেসেছে
ভালো তাঁর চেয়ে অধিক বাংলাকে, এই
বাংলায়? এরপর তাজউদ্দিন এলেন;
এলেন কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার
আমিরুল ইসলাম। তাজউদ্দিনের
কাছে জানতে চাইলেন দেশবিদেশের
খবরাখবর। কখন কী করতে হবে,
কোনটার পর কোনটা, ঠিকঠাক আছে
কিনা সবকিছু, নিলেন তা শুনে। কথা
হলো আরো কত। রটেছে খবর, আজ
রাত্রির মধ্যেই হতে পারে গ্রেফতার
করা তাঁকে। গ্রেফতার হওয়ার আগে
কী কী কাজ ঝটপট করে ফেলতে হবে
তাঁকে, তা সব নিয়েও কথাবার্তা হলো
নেতাদের সাথে। প্রাণের অধিক প্রিয়
নেতার দুহাত ধরে কেঁদে উঠলেন
তাজউদ্দিন শিশুর মতো ভগ্নকণ্ঠে:
“হায় বঙ্গবন্ধু, জীবনমৃত্যুর সঙ্গী
আমাদের, সাত কোটি বাঙালীর মহা-
নেতা, যদি বর্বরেরা করে ফ্যালে কিছু
আপনার! প্রিয় নেতা, আপনিই যদি
না থাকলেন আমাদের মাঝে, কী হবে এ
সংগ্রাম দিয়ে, বাংলার স্বাধীনতা দিয়ে!”
সহযোদ্ধা তাজউদ্দিনের কণ্ঠ ধরে
ফুঁপিয়ে উঠলেন তিনি: “জানি, বড্ড বেশি
ভালবাসো তোমরা আমাকে, তোমাদের
বঙ্গের বন্ধুকে। তাই যদি হয়, তবে
শুনে রাখো আমার নির্দেশ-ফিরে যাও
সব যার যার নির্ধারিত ঠিকানায়,
গিয়ে আপ্রাণ ঝাঁপিয়ে পড় মহাযুদ্ধে।
প্রিয় ভায়েরা আমার, তোমাদের হাতে
আমি আজ এনে দিয়ে গেলাম স্বপ্নের
স্বাধীনতা, হারিয়ে যায় না যেন আর।”
এই বলে তিনি ঠেলে দিলেন সস্নেহে,
বহু কষ্টে, প্রাণের শিষ্যদেরকে। তাঁরা
নিরুপায়, ফিরে চলে অশ্রুসিক্ত চোখে
অজানা গস্তব্যে, ভাষাহীন। ফিরে যায়
সকলেই, শুধু তিনি রয়ে যান হাতে
মৃত্যুর পেয়ালা নিয়ে, বুকে নিয়ে সীমা-
হীন দুঃসাহস, জন্মদুখিনী বাংলার
শিয়রে একাকী, তার স্বাধীনতা আর
সার্বভৌমত্বের প্রাণান্তিক প্রহরায়।

ক্রিং ক্রিং বেজে উঠলো টেলিফোন। তিনি
ধরলেন তুলে কানে। শুনছেন কারো
ভীত কণ্ঠস্বর: “করেছে হামলা আর্মি
রাজারবাগ পুলিশস্টেশন, পিলখানা
পূর্ব-পাকিস্তান বাইফেলস সদর
দফতর আর ঢাকা ভার্সিটিতে। স্যার,
শেষ করে ফেলছে সব। সামনে পাচ্ছে যাকে,
তাকেই করছে গুলি। আর খুঁজে খুঁজে বের
করছে প্রতিটা বাঙালীকে। কোনো চিহ্ন
রাখছে না বাঙালীর।” “হায়, খোদা!” বলে
রইলেন চোখ বুজে বঙ্গের সম্রাট।

ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমেছে রাস্তায়,
অলিতে-গলিতে, ঢাকা শহরের! যেন
রূপকথার পৃষ্ঠা ফুঁড়ে উঠেছে হঠাৎ
কোনো আজদাহা; আসমান ছোঁয়া ফণা
তুলে, করছে সে ফোঁসফোঁস; ভয়ে-ত্রাসে
কাঁপছে কলিজা সব প্রাণীর, মানুষ
কি পশু। ঢাকার হৃৎপিণ্ড বিষ-দাঁতে
ছিড়েখুঁড়ে ফেলছে যেন উন্মত্ত হায়েনা
কোনো, হঠাৎ এ রাতে; মহাদুর্যোগের
রাত, যেন মহাপ্রলয়ের অমানিশা
হঠাৎ এসেছে নেমে বাঙালীর ভাগ্যে।

ঘাতকেরা করেছে টার্গেট সকলের
আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শুয়ে ছিলো
শিক্ষার্থীরা হলে-হলে; কত দূর গ্রাম-
গ্রামান্তর হতে বাংলার, এসেছে তারা
উচ্চ শিক্ষা নিতে প্রাচ্যের এ অক্সফোর্ডে।
মূর্খসুর্খ দীনহীন শান্তশিষ্ট সব
কৃষকের ছেলেপুলে; বিকিয়ে সর্বস্ব,
কত স্বপ্ন নিয়ে চোখে আর বুকে কত
আশা, পাঠিয়েছে পুত্রদের, পিতাগণ
উন্নত এ জ্ঞানপীঠেÑসোনার মানুষ
হয়ে করবে জাতির সেবা, কত স্বপ্ন
সকলের! কিন্তু হায়, ঘাতক বন্দুক
হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো জ্ঞানহীন
বর্বর আর্মিরা তাদেরই উপর! দেশ-
রক্ষার তুমুল মন্ত্রে উজ্জীবিত করে
দিয়েছে লেলিয়ে তাদেরকে পাকিস্তানী
রাষ্ট্রনায়কেরা; তারা জানে, ধূর্ত তারা,
যদি কোনো জাতিকে দমিয়ে রাখতে চাও,
রাখতে চাও ক্রীতদাস করে, তবে তার
শিক্ষিত সন্তানদের হত্যা করে ফ্যালো,
ধুলায় গুঁড়িয়ে দাও যত বিদ্যাপীঠ;
জ্ঞানী হলে, তারা বলবে সাম্যের কথা,
স্বাধীনতা চাবে, চাবে দাঁড়াতে নিজের
পায়ে, নুয়াবে না মাথা কোনোদিন খাকি-
পোশাকের সামনে; অতএব নির্বিচারে
হত্যা করে ফ্যালো সব, টিকিয়ে রাখতে
চাও যদি গদি, চাও ঘুমাতে আরামে।
ঝাঁপিয়ে পড়লো তারা গভীর নিদ্রায়
মগ্ন ছাত্রদের ’পরে সেভাবে, যেভাবে
কত দিন না খাওয়া হন্যে হায়েনারা
হামলে পড়ে হরিণের ’পর। কেউ কেউ
দরজা-জানলা খুলে ছিলো শুয়ে, বাইরের
মুক্ত হাওয়া ঢুকবে ঘরে, এ আশায়। হায়,
পেলোই না তারা টেরÑহলের মেইন
গেট ভেঙে, কখন যে ঢুকেছে ঘাতক,
কারণ সবাই ততক্ষণে হয়ে গেছে
খুন, অব্যর্থ বুলেটে। হৈ-চৈ হট্টগোলে
ধড়পড় করে জেগে ওঠে কিছু ছাত্র;
হাতে প্রাণ নিয়ে ছুটতে থাকে তারা, যদি
ছুটে বাঁচা যায়! হানাদার হায়েনারা
ফেটে পড়ে বীভৎস হাসিতে, আর গুলি
করে মারতে থাকে কি-হরষে, যেন পাতি-
ঘুঘু! মারে, কাটে ও খোঁচায় বেয়োনেটে;
করে কেউ বা জবাই, যেন কুরবানির
পশু। অতঃপর বীভৎস সেইসব
লাশের উপর জোড়ে বিজয়ের নৃত্য
উল্লাসে নির্দয়আর্মি-জওয়ানেরা। রক্তে
ডুবে গেছে সব ছাত্রাবাস। ভিজে গেছে
রাতের বাতাস প্রতিরোধহীন মরে
পড়ে থাকা সব উচ্চ শিক্ষিত বাঙালি-
যুবকের স্তব্ধ ক্রন্দন ও দুচোখের
রক্তঅশ্রুতে। নিন্তব্ধ হৃদয় তাদের
বলে যেন কেঁদে কেঁদে: “মাগো, পারলে না
জানতে, কোন্ সে শয়তান মেরে গেছে
তোমার খোকাকে। হায়, পিতা, ঘাতকেরা
দিলো না পূরণ করতে তোমার স্বপ্ন!”

বাঙালি সেপাই যত, শুয়ে ছিলো পিল-
খানায়, ব্যারাকে; পাকিস্তানী পিশাচেরা
করলো কাপুরুষের মতো অতর্কিত
হামলা তাদের উপর। চোখের পলকে
হয়ে গেল পিলখানা বীভৎস কসাই-
খানা; শত শত সুপ্ত বাঙালি-সৈনিক
কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই, পড়লো ঢলে
অকাল মৃত্যুর হিম কোলে। মাতাপিতা-
স্ত্রী-সন্তান জানতে পারলো না ঘুণাক্ষরে,
কী ঘটেছে কপালে তাদের, এ কুক্ষণে।
হায়, কোন্ অপরাধে জীবন তাদের
করে দিলো বরবাদ ঘাতকেরা? কোন্
সেবা তারা করেনি রাষ্ট্রের? জীবনের
ঝুঁকি নিয়ে দিয়েছে পাহারা রাত্রিদিন
স্বদেশের মানচিত্র; এ মৃত্যুই বুঝি
পুরস্কার তার? কী অপরাধ তাদের?
বাঙালী হওয়াই বুঝি একমাত্র পাপ,
যার খেসারত দিতে হলো এইভাবে
বলীর পাঁঠার মতো? দেখে যাক বিশ্ব-
বিবেক নিরীহ বাঙালীর পরিণতি;
জেনে যাক বিশ্বের মানুষ অমানুষ-
দের ঘৃণ্য বর্বরতা সবুজ বাংলায়।

রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে
একসাথে চালালো তান্ডব ভয়াবহ,
পাক-আর্মিরা। বাঙালি-পুলিশের ’পর,
ডুবে ছিলো যারা গভীর নিদ্রায় নানা
স্বপ্নে, হঠাৎ দস্যুরা ছুড়তে লাগলো
গুলি তুমুল বৃষ্টির মতো। এক পলক
জেগে উঠে ঢলে পড়তে লাগলো ঘুমন্তরা
একে একে ভিজে ওঠা মৃত্যুর কাঁর্পেটে।
পঁচিশে মার্চের কালো রাত হয়ে উঠলো
টকটকে লাল পুণ্য তাদের রুধিরে।
হে স্বাধীনতার প্রথম শহীদগণ,
মরোনি তোমরা, বরং তারাই গেছে
মরে চিরতরে, সীমারের মতো যারা
নির্বিচারে করে গেছে খুন; একবার
মরে গিয়ে হয়ে গেছো অমর তোমরা
কোটি কোটি বাঙালীর হৃদয়সাম্রাজ্যে।

দুখিনী বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ যে-সস্তান
সহস্র বছরে, যাঁর বুক জুড়ে শুধু
বাঙালীর ব্যথা, এ হেন বর্বর হত্যা-
যজ্ঞে জ্বলে উঠলেন তিনি ঈশা খাঁর
মতো, যাঁর প্রলয় হুঙ্কারে কেঁপে উঠলো
মানসিংহের তরবারি। বজ্রকণ্ঠে
তিনি দিলেন ঘোষণা : “এ বার্তাই হতে
পারে শেষ বার্তা আমার। বাংলাদেশ
সম্পূর্ণ স্বাধীন আজ থেকে। বাংলার
মানুষের প্রতি জানাই আহ্বান আমি:
আপনারা যে যেখানে যে-অবস্থাতেই
থাকুন না কেন, দখলদার পাকিস্তানী
হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ান
রুখে, সর্বশক্তি দিয়ে। সংগ্রাম চালিয়ে
যান, যতক্ষণ পর্যন্ত না একজনও
পাকিস্তানী আর্মি থেকে যায় বাংলার
বুকে। জানি, আমাদের বিজয় নিশ্চিত।”
জাতির উদ্দেশ্যে এই ওয়ারলেস-বার্তা
পাঠিয়ে দিলেন তিনি অনতিবিলম্বে।
দাবানলের মতো তা ছড়িয়ে পড়লো
সারা বঙ্গে মহূর্তের মধ্যে, আর বিশ্ব-
মিডিয়ায়। ‘বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন
আজ থেকে’-এ্যাটোম বোমার মতো ভারী
এ বার্তা ঘৃতাগ্নি দিলো জ্বেলে বাঙালীর
রক্তে রক্তে, শিরায় শিরায়। সর্বোপরি,
ঘটে যাওয়া ঢাকার ঘটনা মর্মান্তিক,
ছড়িয়ে পড়লো জেলায় জেলায় আর
বিভাগে বিভাগে সমস্ত ক্যান্টনমেন্টে।
বাঙালি সৈনিক, সেপাই কি কর্মকর্তা
যত, অস্ত্রাগার ভেঙে তুলে নিলো অস্ত্র
হাতে হাতে। যশোর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম-
ক্যান্টনমেন্টে এ বার্তা পৌছার পর,
সে-রাতেই বাঙালি সৈন্যরা অবতীর্ণ
হলো প্রতিরোধযুদ্ধে পাক-সৈন্যদের
সাথে। চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশন থেকে
সম্প্রচার করা হলো বঙ্গবন্ধুর এ
স্বাধীনতার ঘোষণা। সকাল হতে না
হতেই সমস্ত জাতি জেনে গেল, শুরু
হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ; বহু প্রতীক্ষার
স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম শুরু হয়ে
গেছে শেষমেশ; জেনে গেল গোটা বিশ্ব,
পাকিস্তান থেকে অবশেষে হয়ে যাচ্ছে
বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ চিরতরে। হায়,
শুধু লাশ আর লাশ আর ছোপছোপ
রক্তের বন্যায়, মধ্য রাতের আগেই,
ভরে গেল ঢাকা, প্রাচ্যের এ তিলোত্তমা
প্রাচীন শহর! পাক-আর্মিদের রুদ্র
ধ্বংস-অভিযানের বীভৎস বার্তায়
উত্তেজিত মহান মুজিব সারা ঘরে
করতে লাগলেন পায়চারি, একা একা;
বাইরে মোর্শেদ, বিশ্ব্স্ত প্রহরী তাঁর,
কান খাড়া করে শুনতেছে থেকে থেকে
গোলাগুলির আওয়াজ গুমোট বাতাসে।

রাত্রি একটা পনেরো মিনিট। ধানমন্ডির
অন্ধকার-আকাশ হঠাৎ ভরে গেল
উৎকট উজ্জ্বল আলোয়, কোনো জ্বিন
কিংবা অগ্নিপি- যেন আসমান থেকে
এসেছে নেমে। “মোর্শেদ!” বলে বঙ্গবন্ধু
উঠলেন হেঁকে: “দেখ্ তো, কিসের আলো
আসছে কোত্থেকে।” বলে তিনি সিঁড়ি বেয়ে
গেলেন দোতলায় উঠে, দেখতে সচক্ষে
চোখ ধাঁধানো এ আলোর উৎস। এর
কয়েক মুহূর্ত পর গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে,
আতঙ্ক ছড়িয়ে চারদিকে, ঢুকে পড়লো
পাক-আর্মিরা সশব্দে, বত্রিশ নম্বরে।
“হ্যান্ডস আপ!” বলে উঠলো চীৎকার করে
কেউ। প্রহরী মোর্শেদ ঘুরে দাঁড়াতেই,
হঠাৎ পেছন থেকে মাথার পশ্চাত-
দেশে করলো আঘাত কেউ। সাথে সাথে
সংজ্ঞা হারিয়ে সে পড়ে গেল। তীব্রগতি
ঝটিকার মতো বঙ্গবন্ধু, যেন ক্ষুব্ধ
বাঘ, ছুটে এলেন; নিরস্ত্র তিনি, তবু
তাঁর কণ্ঠ যেন কামানের গোলা; “গুলি
বন্ধ র্ক!” বলে করলেন চীৎকার:
“এত বড় স্পর্ধা তোদের, তুলেছিস
হাত আমার লোকের গায়ে। আমি তাকে
জীবিত দেখতে চাই।” হঠাৎ নিস্তব্ধ
চারদিক। মারমুখো আর্মিরা হঠাৎ,
চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো, হয়ে গেছে
চুপ। পাক আর্মি-অফিসার এক, খুব
বিনয়ের সাথে বলে উঠলো, “স্যার, সরি;
ওরা ভুল করে ফেলেছে; ব্যবস্থা নিচ্ছি
আমি তাকে সুস্থ করে তোলার; আপনি
নিশ্চিন্ত থাকুন। তবে আমাদের সঙ্গে,
এই মুহূর্তে, ক্যান্টনমেন্টে যেতে হবে
আপনাকে। আপনি প্রস্তুত হোন।” “আমি
তৈরি” বলে বাংলার মহানেতা ধরা
দিলেন স্বেচ্ছায়, যেন দুরন্ত ঈগল
মুক্ত আকাশের মায়া ভুলে ঢুকে গেল
কি-সহজে সুসজ্জিত খাঁচার ভেতর!

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘কালো রাত্রি’ পর্ব ;নাম ‘ষষ্ঠ সর্গ’।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s