-
অমরত্বে নেই, সুখে ও সফলতায় নেই / সায়ীদ আবুবকর
মরে গিয়ে মর্ত্যরে মানুষগুলো কত দিন বেঁচে আছে? কত দিন বেঁচে আছে সফোক্লিস, হোমার, এরিস্টোটল, প্লেটো, দান্তে ও মিল্টন? কত দিন হলো ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে আওরঙ্গজেব, জুলিয়াস সিজার, অশোক, আকবর, চেঙ্গিজ খান, মাও সেতুং ও আব্রাহাম লিংকন? কোন্ অমরত্বের অহংকার করে মানুষ নশ্বর পৃথিবীতে, যখন রহস্যময় অনন্তের একদিন = দুনিয়ার এক হাজার বছর? আমার…
-
বিকেলের সব কথা / সায়ীদ আবুবকর
জানাযায় দাঁড়িয়ে তাদের আত্মাগুলো বটের পাতার মতো কাঁপছিল। তাদের চোখের মণির উপর শেওলার মতো ভাসছিল গোরস্থানের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। পাপদগ্ধ দেহকারাগার থেকে লাফিয়ে পড়তে চাচ্ছিল তাদের বন্দী আত্মাগুলো বিকেলের রুপোলি রোদ্দুরে। মুনকার নাকিরের ভয়ে তারা যেন তাদের স্কন্ধের দু’পাশে তাকাতে পারবে না কোনোদিন, এরকমই ভাবছিল তারা। আর তাদের মনে হচ্ছিল, এরপর থেকে তারা ধোওয়া তুলশিপাতা হয়ে…
-
মূর্তির শহর / সায়ীদ আবুবকর
এত মূর্তি চারদিকে-ঘরের ভেতর, অন্তরের ভেতর, নগরদ্বারে, সিংদরোজায়, অফিসে অফিসে, দেয়ালে দেয়ালে, টেবিলে ও বুকসেলফে, উত্তরে-দক্ষিণে, পূর্ব ও পশ্চিমে, মাটিতে ও শূন্যের উপর-যেন মূর্তির বন্যায় ডুবে গেছে সারা দেশ। নমরুদের উপাসনালয়ের যে-মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন হজরত ইব্রাহিম, কারা যেন মেরামত করে তা বসিয়ে রেখে গেছে এই শহরের অলিতে গলিতে। কাবাশরিফের ভেঙে ফেলা মূর্তিগুলো বুকের ভেতরে নিয়ে…
-
চোখ / সায়ীদ আবুবকর
রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে হায়েনার চোখ জ্বলে; বাঘ তার চোখের আলোয় পথ দেখে দেখে চলে অন্ধকারে মোড়া রাতের অরণ্যে চুপচাপ; সাপ ও বৃশ্চিক হারায় না পথ, অন্ধকার মাড়িয়ে মাড়িয়ে পৌঁছে যায় ঠিকঠিকই লক্ষ্যস্থলে; কেবল মানুষই চলতে পারে না এক পাও ধার করা আলো ছাড়া; বিদ্যুতের ব্যবহার, টর্চ লাইটের ব্যবহার মানুষই কেবল করে। হায়, এই চোখ যদি…
-
এক দেশ এক পৃথিবী / সায়ীদ আবুবকর
মানুষ আমাকে বিপ্লবের কথা বলে। আমি বলি মানুষের প্রথম বিপ্লব হোক দেশের দেয়াল ভেঙে ফেলা। সীমান্তের সব কাঁটাতার ছিঁড়ে ফ্যালো। অতঃপর বিহঙ্গের মতো পাসপোর্ট ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ো পৃথিবীর দিগ্বিদিকে। মানুষকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে বলো, আমি মানুষের ভাই। যারা দেয়ালের কথা বলে, যারা সীমান্তে সীমান্তে কাঁটাতারের উপকারিতার কথা বলে, যারা নদীদের বুকের উপর সীসার বাঁধের প্রয়োজনীয়তার…
-
সত্য / সায়ীদ আবুবকর
যখন ফিরিয়ে দেয় আদালত, শূন্যহাতে; যখন মুখের উপর ডাক্তার বলে দেয় সারবে না, তাতে কাঁচের গ্লাসের মতো ভেঙে খানখান হয়ে যায় বুক; যখন কেবলি স্বাস্থ্য ভাঙে খাদ্য, পূর্ব ও পশ্চিম তাবৎ মুলুক চলে যায় সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে; যখন একের পর এক পরাজয় নেমে আসে যুদ্ধে- যখন বিষণ্ন দুলদুল, দিশেহারা, ইমাম হোসেন ছাড়া ফিরে চলে ঘরে; তখন…
-
একটি পাতার কাহিনী / সায়ীদ আবুবকর
পাতাটি গাছের মগডালে জন্মেছিল। যখন সে কচি শিশুটি ছিলো, তাকে দেখলেই যে-কারোর দুচোখ জুড়িয়ে যেতো। যখন সে যৌবনে পা দিলো, বাতাসরা এসে তাকে প্রণয় নিবেদন করতো। সে বাতাসদের মৃদুস্পর্শে থরথর করে কাঁপতো সারাদিন। একটি কোকিল এসে তার পাশে চুপটি করে বসে থাকতো; তারপর কণ্ঠ ছেড়ে একসময় জুড়ে দিতো বসন্তের গান। প্রকৃতির নিয়মে পাতাটি একদিন হলুদ…
-
নাম তার কারিনা কাপুর / সায়ীদ আবুবকর
দুর্বল একটি কঙ্কালের উপর কিছু মাংস; মাংসের উপর কিছু রঙ; এইসব নিয়ে স্বল্পবসনা সে হাতপা দুলিয়ে টিভির পর্দায় নাচছিল। নাচার সময় তার মনে হচ্ছিল তাকে চমৎকার দেখাচ্ছে। লোকেরা দুনিয়ার কাজ ফেলে রেখে হাঁ-করে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। তাদেরও মনে হচ্ছিল তাকে চমৎকার দেখাচ্ছে। আমি লোকগুলোর দিকে একবার তাকাচ্ছিলাম আর একবার তার দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমি বুঝতে…
-
ছবির মানুষ / সায়ীদ আবুবকর
হাঁটাহাঁটি করে, হাসাহাসি করে, কানাঘুষা করে রাতদিন শুধু ছবির মানুষ ছবির শহরে। খবরে কাগজে ছাপা ছবি যেন এ মানুষগুলো রাস্তা ও ঘাটে ওড়ায় কেবলি ধোয়া আর ধুলো। মানুষগুলোর ঠোঁটে যত কথা বাজে সারাদিন যেন তা পেপারে ছাপা মিছে কথা কাগুজে রঙিন। রাতদিন শুধু ছবির মানুষ ছবির শহরে ভূতদের পায়ে ভিলেনের মতো হাঁটে আর ঘোরে।
-
মানুষ আমাকে গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে / সায়ীদ আবুবকর
মানুষ আমাকে গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে। আমি বুঝিই না গণতন্ত্র বলতে কী বুঝাতে চায় তারা। যা বোঝে না তাই নিয়ে খালি তর্ক করে চলে তারা পথেঘাটে। তারা সাপবিচ্ছুর মতো কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে চায়ের দোকানে বসে চা খায় আর তৃপ্তির হাসি ছড়াতে থাকে চারদিকে। নির্বাচিত সেই লোকগুলো যখন হায়েনার মতো তাদের হাড়মাংস চেটেপুটে খেয়ে…
-
আলেম / সায়ীদ আবুবকর
আমি তাঁকে বললাম, আলেম বলতে কি এমন সব লোককে বুঝায় যারা লম্বা আলখেল্লা পরে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে বুক ফুলিয়ে হাঁটে আর দুয়েকটা আরবি বলে দরাজ গলায়? -বাহির দেখে বিভ্রান্ত হয়ো না, বৎস, যেমন বিভ্রান্ত হয়েছিল মুসা তাঁর হাতের ছড়িটি নিয়ে। ছড়িটি যখন সাপ হয়ে গিয়েছিল তখন তো ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল তাঁর চোখ। আবার স্মরণ করো…
-
বেহেস্তের ফুল / সায়ীদ আবুবকর
মা পবিত্র, প্রিয়া পবিত্র, কন্যা পবিত্র। অপবিত্র শুধু পতিতারা। নারী তো পৃথিবীর কাননে ফোটা বেহেস্তের ফুল। বিবি হাজেরা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মা, ইসমাইলকে বুকে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন দিগ্বিদিক, যাঁর পায়ের আঘাতে খা খা মরুভূমির বুকের উপর একের পর এক জেগে উঠছে মরুদ্যান, বেহেস্ত থেকে ঝর্ণা নামিয়ে এনে পানি পান করাচ্ছেন তাঁর তৃষ্ণার্ত…
-
প্রিয়া ও মা / সায়ীদ আবুবকর
যদি প্রিয়া বলো, তার ঠোঁট মুখ্য হয়ে ওঠে, তার চোখ, চোখের ভুরু, চোখের চাহনি, অমাবশ্যা রাত্রির মতো একমাথা চুল আর বক্ষদেশে দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ডালিম পর্বতমালা মুখ্য হয়ে ওঠে, মুখ্য হয়ে ওঠে রহস্যাবৃত তার সমস্ত শরীর; তখন হরিণকে নাগালে পাওয়া কোনো ক্ষুধার্ত বাঘের মতো জেগে ওঠে দেহ, জেগে উঠে ছুটতে থাকে, ছুটতে ছুটতে তৃপ্তির কিনারে…
-
শিশিরজীবন / সায়ীদ আবুবকর
এক ফোঁটা জীবন অথচ মহাসাগরের পানিবরাবর আশা। ক’বসন্তের ভঙ্গুর যৌবন অথচ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব সুন্দরীকে হাতের মুঠোতে নিয়ে হাজার বছর ভোগ করার অদম্য ঈপ্সা। ঘাসের ডগায় জমা শিশির-জীবন নিয়ে চব্বিশ ঘন্টাই মানুষ বিভোর হয়ে থাকে অমরতার স্বপ্নে। কোনো মানে হয় বলুন? তিনি বললেন, যতই দিন যাবে ততই মানুষ অমরত্বের জন্যে অন্ধ হয়ে যাবে। লম্বা লম্বা…
-
একটি কুকুরের দর্শন / সায়ীদ আবুবকর
লোকগুলো একত্রিত হয়েছিল অডিটোরিয়ামে। একটি কুকুর রাস্তার পাশে শুয়ে অডিটোরিয়ামের প্রশস্ত দরজা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল তাদের কাণ্ডকারখানা। লোকগুলো মাঝেমধ্যে করতালি দিচ্ছিল। কুকুরটি ভাবছিল, নিশ্চয়ই কোনো খানাপিনা হবে সব শেষে। বিরতি দিয়ে দিয়ে মাইকে কেউ ঘোষণা করছিল কারো নাম; তিনি স্টেজে উঠে গেলে মহামান্য কেউ তাঁর গলায় পরিয়ে দিচ্ছিল সোনার তকমা। কুকুরটির কানে কয়েকটি শব্দ…
-
তুমি শুধু দ্যাখো তুমি তোমাকে চেনো কিনা / সায়ীদ আবুবকর
জন্তুর পাশে যখন মানুষ দাঁড়ায়, কত সহজে মানুষকে যায় চেনা; মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ালেই পাকিয়ে যায় তালগোল। বাঙালির পাশে যখন মালয়েশিয়ান দাঁড়ায়, বুঝা যায় এ মানুষ এক নয়; মালয়েশিয়ানের পাশে আমেরিকান দাঁড়ায়, বুঝা যায় এ মানুষ এক নয়; আমেরিকানের পাশে মিশরীয় দাঁড়ায়, বুঝা যায় এ মানুষ এক নয়। যখন জাপানীরা কথা বলে, তার পাশে নেপালীরা…
-
যদি মিথ্যেই হতো / সায়ীদ আবুবকর
যদি মিথ্যেই হতো, সূর্য উঠতো না, সন্ধ্যা নামতো না দিন শেষে, ঘাসের ডগায় জমতো না রাতের শিশির, এ জীবন বিড়ির মতো পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যেতো। যদি কাল্পনিকই হতো, বাতাস বইতো না, নতুন পাতা ধরতো না গাছে, সবুজ পাতারা হলুদ হয়ে গিয়ে ঝরে ঝরে পড়তো না ধুলোয়, জীবনচক্র থেমে যেতো। যদি আজগুবি হতো, পিপাসা নিবারিত…
-
গরুর চোখ দিয়ে দেখো না জীবন / সায়ীদ আবুবকর
যখন শরীর আত্মার উপর চড়ে বসে তখন মানুষ যদি সাপবিচ্ছু বাঘভাল্লুক গরু ও গাধার মতো আচরণ করতে থাকে, অবাক হয়ো না। মানুষ পুলিশ দিয়ে বন্ধ করতে চায় চুরিডাকাতি খুনখারাবি স্মাগলিং ধর্ষণ; দুর্নীতি দমন কমিশন দিয়ে প্রতিরোধ করতে চায় রাষ্ট্রের দুর্নীতি; তুমি ঘোড়াকে জোর করে নদীর কিনারে নিয়ে যেতে পারো, জোর করে তাকে খাওয়াতে পারবে না…
-
বাঁচার উপায় / সায়ীদ আবুবকর
আমি তাঁকে বললাম, বাঁচার উপায় কী? তিনি বললেন, তুমি তো ফাঁদে পড়া কবুতরের মতো পড়ে গেছ রমণীর জালে। পালাও যেভাবে বিড়াল দেখে ইঁদুর পালায়, বাঘ দেখে হরিণ পালায় আর পানি দেখে জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর। বৎস, তোমার নফসের পায়ে শিকল লাগিয়ে দাও, দুচোখে লাগাও ঠুসি, ঠোঁটকে সংযত করো, দুহাতে পরাও বেড়ি। স্ত্রী, কন্যা, মাতা ও ভগ্নি…
-
তখন হে বন্ধু যদি বেঁচে থাকো / সায়ীদ আবুবকর
যখন ফুলের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে মানুষ, তার ড্রয়িং রুম ভরে ফেলবে কাগজফুলে; যখন কোকিলের চেয়ে কাকের সঙ্গীত জনপ্রিয়তা পাবে আর দুর্বৃত্তরা আসীন হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়; যখন ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে, বেশ্যারা ঘাড় উঁচিয়ে হেঁটে বেড়াবে সমাজে, প্রেমিকপ্রেমিকারা লাঞ্ছিত হয়ে আত্মাহুতি দেবে নিরুপায়; যখন মানুষ মানুষের চেয়ে কুকুরকে বেশি ভালবাসবে, অসুখেবিসুখে ভুগে বিনি চিকিৎসায় মারা…