• অভিনয় / সায়ীদ আবুবকর

    আমি শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অভিনয়রত মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকি প্রতিদিন। রিকশাঅলা, মুটে, মজুর, পথচারী, দোকানদার, ক্রেতা ও ভিক্ষুকদের অভিনয় দেখতে দেখতে ফিরে আসি ঘরে। অতঃপর ড্রয়িং রুমের টিভির পর্দায় নায়কনায়িকাদের অভিনয় দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমি তাঁকে বললাম, বিশ্বের সেরা সব অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয় সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী? তিনি ভ্রু কুঁচকালেন। -আমি বরং কুকুর ও…


  • তিনি / সায়ীদ আবুবকর

    আমি জন্মকে স্বাগত জানাই, ধিক্কার জানাই মৃত্যুকে। আমি ফুলকে স্বাগত জানাই, ধিক্কার জানাই কণ্টককে। আমি দয়াকে স্বাগত জানাই, ধিক্কার জানাই নিষ্ঠুরতাকে। আমি প্রেমকে স্বাগত জানাই, ধিক্কার জানাই ঘৃণাকে। আমি বৃষ্টিকে স্বাগত জানাই, ধিক্কার জানাই খরাকে। আমি আহারকে স্বাগত জানাই, ধিক্কার জানাই দুর্ভিক্ষকে। আমি স্বাস্থ্যকে স্বাগত জানাই, ধিক্কার জানাই অসুখবিসুখকে। আমি মৈত্রীকে স্বাগত জানাই আর ধিক্কার…


  • মানুষের গান গাই / সায়ীদ আবুবকর

    তারপরও মানুষই শ্রেষ্ঠ। মানুষই যাপন করে নিশ্চিন্ত জীবন। অরণ্যে প্রাণীরা কামড়াকামড়িরত একে অপরের সাথে। জলের অতলে হাঙর-কুমির-মৎস্য একে অপরকে খেয়ে ফেলবার নিষ্ঠুর খেলায় মত্ত সারাক্ষণ। পাখিরাও পেটের পূজায় মগ্ন। কেবল বৃক্ষেরা বুঝি খানিকটা সামাজিক। কিন্তু ঝড় এসে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে যায় তাদেরকেও খড়কুটোর মতো। আকাশের নিচে মানুষ তুলেছে ছাদ, বৃষ্টি এসে যাতে না পারে ভিজিয়ে দিতে;…


  • বাঘ ও হরিণ / সায়ীদ আবুবকর

    আমি তাঁকে বললাম, বাঘেরা হরিণ খায় তবু কেন হরিণেরা বাঘের পাশেই থাকে? তা-ই তো থাকবে,এ-ই তো নিয়ম। ক্ষিধে না লাগলে বাঘেরা কখনও হামলে পড়ে না হরিণের উপর। যদি বাঘদের কাছাকাছি না থাকতো, কবেই বিলুপ্ত হয়ে যেতো তারা পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে! মানুষ নির্বিঘেœ ঢুকে পড়তো বনে, ট্রাক ভর্তি করে তাদেরকে নিয়ে আসতো কসাইখানায় এবং সাবাড় করে…


  • যে-সুরে প্রলয় থেমে যায় / সায়ীদ আবুবকর

    আমাকে বাজাও সেই সুরে, যে-সুরে প্রলয় থেমে যায়, সাগরের পানি থেমে গিয়ে হয়ে যায় স্থির, দাউদাউ অগ্নিকুণ্ড নিভে গিয়ে হয়ে যায় ফুলের বাগান; যে-সুর শোনার জন্যে কান খাড়া করে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে অরণ্যের গাছপালা, পাখিরা উদাস হয়ে বসে থাকে অশ্বত্থের ডালে, মাছেরা কিনারে এসে ভেসে ওঠে সুরের তৃষ্ণায়;যে-সুর শীতের রোদ্দুরের মতো ঢুকে পড়ে শরীরের রন্ধ্রে…


  • মুক্তির গান / সায়ীদ আবুবকর

    বাঁচার উপায় কী? -শারীরিক বাঁচতে চাও তো হারাম-হালালের পরওয়া কোরো না, যা-ই পাও খেয়ে যাও গোগ্রাসে; আত্মিক বাঁচতে চাও তো মানুষের সঙ্গ ছেড়ে চলে যাও নির্জনে, কিছু যদি জোটে খেয়ো, না জুটলে পাতানাতা খেয়ো, তাও না জুটলে চাতকের মতো চেয়ে থেকো সারাদিন আকাশের দিকে অমৃত বারির আশায়। পৃথিবী যে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, হত্যা,…


  • পাপবীক্ষণ / সায়ীদ আবুবকর

    পাপ কী? -পাপপুণ্য ভিন্ন কোনো জিনিস নয়, বৎস। কেউ তার স্ত্রীর কাছে যায়, কেউ যায় পতিতার কাছে। একই ফুলে বোলতা খুঁজে পায় বিষ, মৌমাছি পায় মধু। পাপকে আমরা চিনতে পারবো কিভাবে? -এর রঙ সোনার চেয়ে উজ্জ্বল, খোশবু রজনীগন্ধার চেয়েও মধুর, ভুনা গোশতের চেয়েও লোভনীয় এর স্বাদ। পাকা তেতুলের মতো একে দেখলেও মুহূর্তের মধ্যে গালে চলে…


  • এক মুহূর্তের অন্ধকারসুখ / সায়ীদ আবুবকর

    আমার সর্বাঙ্গে যত পাপ তার চেয়ে বেশি অনুতাপ। আমার নফস বাজপাখির মতো এক-একটা ছোবল মেরে ফেলে দিয়ে যায় আমাকে পাপের অন্ধকারে। সে-অন্ধকারের ভেতর কেবলি নর্তকীর নাচ আর শরাবের নীল নেশা। যখন রাতান্তে ঘোর কেটে যায়, আমি আদমের পা নিয়ে ছুটোছুটি করি চারদিকে হাওয়ার সন্ধানে। আমার অন্তর পোড়ে তুষের আগুনে সারাদিন। আমার দুচোখ বঙ্গোপসাগর হয়ে দুরন্ত…


  • যদি দুনিয়াদার হতাম / সায়ীদ আবুবকর

    এ কেমন কথা, পৃথিবীর নৈরাজ্য সন্ত্রাস খুনজখম দেশদখল বোমাবাজি এসব আপনাকে বিচলিত করে না একটুও। তিনি বললেন, কিই বা করতে পারতাম যদি এ সমস্ত নিয়ে ভেবে ভেবে ব্যাকুল হতাম সারাদিন? যেখানে দিবস আছে সেখানে রাত্রি থাকবেই, যেখানে হাবিল আছে সেখানে কাবিল; যেখানে জীবন, আজরাইল সেখানে। খুনোখুনি লুটপাট গুপ্তহত্যা চুরি ও ধর্ষণ কোন্ কালে ছিলো না…


  • হে গাড়ল / সায়ীদ আবুবকর

    কেবলি শরীর নিয়ে বেঁচে আছো তুমি। রমণী দেখলেই এঁড়ে গরুর মতো তেড়ে যাও হুট করে অথচ তোমাকে গরু বললেই ক্ষেপে যাও কি-ভীষণ। দুনিয়ার উচ্ছিষ্ট নিয়ে নেড়ে কুত্তার মতো মেতে আছো প্রতিদিন তুমুল কলহে অথচ তোমাকে কুত্তা বললেই তোমার চেহারা পাল্টে যায়। কারো ভালো দেখলেই কেউটের মতো ছোবল দিয়ে বসো আক্রোশে অথচ নিজেকে কেমন সাপের চেয়ে…


  • ব্যথার বাঁশি / সায়ীদ আবুবকর

    জানতে চাইলাম, সঙ্গীতকে কি হারাম করা হয়েছে? তিনি বললেন, যে-সঙ্গীতে শরীর নাচে, আমি তার কথা বলতে পারবো না; কিন্তু যে-সঙ্গীত হৃদয় নাচায়, আমি তার সম্বন্ধে দুএকটা কথা বলতে পারবো। তাহলে কি ধরে নেবো কিছু কিছু গান হারাম করা হয়নি? -যে সমস্ত গান শুনে হৃদয়ের অন্ধকার আনন্দে কেউটের ফণা তুলে নাচে, আমি তাদের কথা বলতে পারবো…


  • গোলক ধাঁধা / সায়ীদ আবুবকর

    জ্ঞানীরা বলেন মানুষের আত্মা মরে না। কিন্তু আমার আত্মা যে মরে গেছে! যেভাবে চৈত্রের দাবদাহে পুকুুরের পানি শুকাতে শুকাতে তলায় গিয়ে ঠেকে, তখন পুকুরের মাছগুলো কাঁদার ভেতর লুকিয়ে থেকেও যেমন বাঁচাতে পারে না নিজেদেরকে; আমার আত্মাও সেইভাবে আমারই অত্যাচারে মরতে মরতে নিঃসাড় হয়ে গেছে। হায়, আমার কী উপায় এখন? তিনি বললেন, যেভাবে মাটির নিচে পুতে…


  • দিব্য দর্শন / সায়ীদ আবুবকর

    তিনি প্রকাশিত হতে চাইলেন। ফলে সৃষ্টি হলো মহাবিশ্ব। সৃষ্টি হলো পাহাড়পর্বত, সাগর, নদী, অরণ্য, আকাশ। সৃষ্টি হলো চন্দ্র, সূর্য, নীহারিকা, ছায়াপথ, অন্ধকার, আলো। বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক, হরিণ, গরু, ভেড়া, ছাগল, কুকুর। এমনকি আরশোলা, সাপ, কেঁচো। বিদ্যুৎগতি ফেরেস্তা, জিন। আদম, হাওয়া। মানুষ বললো, আমরা তোমাকে দেখতে পাবো না চোখে? তিনি বললেন, চক্ষুষ্মানরা দেখতে পাবে। আমাকে শুনতে…


  • উপক্রমণিকা / সায়ীদ আবুবকর

    অমর অক্ষয় এ কবিতাও জানি মরে যাবে একদিন, ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে মুখ থুবড়ে পড়বে সব খ্যাতি ও অমরতা। পেঁয়াজের খোসার মতো উড়তে থাকবে কেওকারাডাং, হিমালয় পর্বতমালা, টুইন টাওয়ার ও চীনের প্রাচীর। নিউটন ও আইনস্টাইনের দুচোখ উল্টে যাবে; উল্টে যাওয়া সে চোখের উপর উড়ে এসে পড়তে থাকবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নক্ষত্ররাজির নীল ছাই। কোথায় হারিয়ে যাবে হাজার…


  • পৃথিবী ২০০৩ / সায়ীদ আবুবকর

    এখানে অন্ধকার বৈদ্যুতিক আলোয় মশা ধরে ধরে খাওয়া টিকটিকির মতো আলো ধরে ধরে খায়। এখানে সন্ত্রাস মানুষের হাড়গোড় কটমট করে খাওয়া রূপকথার রাক্ষসের মতো জীবন ধরে ধরে খায়। এখানে অবিশ্বাস শ্মশানের আপোড়া লাশ চেটেপুটে খেয়ে ফেলা শেয়ালের মতো হৃদয় ধরে ধরে খায়। এখানে মহেঞ্জোদারো আর ব্যবিলনি সভ্যতার সমস্ত কবর ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে, এ্যাটোমের দীপ জ্বেলে জ্বেলে…


  • শান্তিবাদ / সায়ীদ আবুবকর

    বলো, ভালবাসা ছাড়া মুক্তি নেই আজ কারো। বলো, প্রণয়শরাব ছাড়া শান্তি কারো নেই পৃথিবীর। দেশ নয়, জাতি নয়, অর্থ বিত্ত বীরত্বও নয়, বলো, আজ মুক্তি শুধু, শান্তি শুধু ফুলেল নারীর বুকে আর ঠোঁটে। বলো, যুদ্ধের খিচুড়ি নয় আর, নারীর হৃদয়ে আজ রাঁধাবাড়া হবে প্রেমক্ষীর। বলো, যুদ্ধে জেতা নয়, প্রেমাঙ্গনে নারীর হৃদয় জয় করে নেবে যে-ই,…


  • মধ্য রাতে / সায়ীদ আবুবকর

    মধ্য রাতে যাই ঘুমাতে ঘুম আসে না ঘুম পাই বাতাসে শুনতে, কোথাও কাঁদতেছে মজলুম। কাঁদতেছে কেউ বোমা হামলায় কাঁদতেছে কেউ খিদেয় কী করি, হায়, তাদের জন্যে, কী দেই তাদের কী দেই? কলম বললো, আমায় ধরো লেখো এমন লেখা যে-লেখাতে হয় জালিমের উচিত শিক্ষা শেখা। অস্ত্র বললো, আমায় ধরো যুদ্ধ শুরু হোক বাঁচতে হলে মরতে হবে,…


  • ঘৃণার কবিতা / সায়ীদ আবুবকর

    বিলকিস বললো, ‘হে পারিষদবর্গ, আমাকে একটি সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে। সেই পত্র সুলায়মানের পক্ষ থেকে এবং তা এই – অসীম দাতা, দয়ালু আল্লার নামে শুরু; আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন কোরো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও।’ বিলকিস বললো, ‘হে পরিষদবর্গ, আমাকে আমার কাজে পরামর্শ দাও। তোমাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোনো কাজে সিদ্ধান্ত…


  • হে হুজুর / সায়ীদ আবুবকর

    তুমি বুঝি ভেবেছিলে, পৃথিবীর সমস্ত আরাম জালি দিয়ে পেড়ে পেড়ে, ভরে দেয়া হবে তোমার নফসের ঝুড়ি। অতঃপর ভীতির সাথেই গোলামের মতো এসে বলবেন কেউ- ‘শান্তিগাছটার সবগুলো আম এক বারে পেড়ে এনে, দিয়ে যাওয়া হলো এই ঝুড়ির ভেতর। হুজুর এখন জাগ দিয়ে মজা করে খান একা একা, পাকিয়ে পাকিয়ে।’ তুমি বুঝি ভেবেছিলে, যদি এই মন্ত্র পড়ো…


  • তেলঅলাদের গান / সায়ীদ আবুবকর

    তেলা মাথায় তেল মাখাতে শুধুই আমরা চাই ভাই আতেলাদের তেল মাখানোর তেল আমাদের নাই ভাই। তোমরা যারা তেলমহাজন করো তেলের কারবার আমরা তাদের আত্মীয় হই, বলতে চাই তা বারবার। কিন্তু যারা দীনভিখিরি মৃত্যু যাদের সামনেই আমরা তাদের আত্মীয় নই, তাদের কোনো দাম নেই। খুলনা ২২.০৮.১৯৮৭