বৃষ্টি / সায়ীদ আবুবকর

বন, নদী, গ্রাম, মাঠ ভিজছে বৃষ্টিতে,
ভিজছে মাঠের গরু, শালিকের ঘর;
রোমাঞ্চিত কায়া আজ সুখসুখ শীতে,
দুধজলে ভিজে যায় বাউলঅন্তর।

বাউলঅন্তর যায় ভিজে পুরোপুরি
যেভাবে কাকেরা ভেজে দলবেঁধে ছাদে;
কোন্ কালে কে অন্তর করেছিল চুরি,
সেই শোকে গৃহকোণে কেউ যেন কাঁদে!

গৃহকোণে চোখে কারো বয়ে যায় নদী,
আকাশ যে কার শোকে কেঁদে জার জার!
যত দূর চোখ যায়, অথই জলধি
যত দূর মন যায়, প্রণয়পাথার।

বৃষ্টি! বৃষ্টি! বৃষ্টি! আহা, ঝরে ঝরঝর-
ভিজে গেছে দুধজলে বাউলঅন্তর।

২৮.৭.২০১৩ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

বেহুলাবধূ / সায়ীদ আবুবকর

এখানে যখন সন্ধ্যা ঘনায়
তোমার ওখানে দিনের শুরু;
রাত্রি এগোয় সাপের ফণায়,
কাঁপে আতঙ্কে হৃদয়, ভুরু!

ওখানে যখন রাত নেমে আসে,
দোয়েলেরা দেয় এখানে শিস;
তরাসে তোমার গা ঘেমে আসে,
যেনবা বাতাসে সাপের বিষ

লোরেনা আমার বেহুলাবধূ,
আর নয় দুই কিনারে বাস;
এক ফুলে হবে আমাদের মধু,
এক মাঠে হবে প্রেমের চাষ

চার চোখে যেন দেখি এক ভোর
দু-হৃদয়ে এক রাত্রি ছুঁয়ে;
ভালবেসে হবো কালের কবর
পাশাপাশি এক জমিনে শুয়ে

২.১০.২০১২ মিলনমোড়. সিরাজগঞ্জ

তাকে দেখলে চিনি / সায়ীদ আবুবকর

তাকে দেখলে চিনি, মনে নেই বাড়িঘর।
মুখ মনে আছে, চোখ মনে আছে, ভুলে গেছি শুধু তার
গোলাপি অন্তর।

২৮.৪.২০১২ ইংরেজি বিভাগ, সিরাজগঞ্জ কলেজ

হীরকের খনি / সায়ীদ আবুবকর

হাতে লেগে আছে স্তনের ঊষ্ণতা,
ভিজে গেছে সুখে প্রেমার্ত এ হাত;
কানে লেগে আছে কোকিলের কথা,
বুকের গভীরে ছড়ায় মৌতাত।

ঠোঁটে লেগে আছে চাঁদের চুম্বন,
বুকে গিয়ে পড়ে সুখের ফোয়ারা;
মনে লেগে আছে জুলেখার মন,
সারা অঙ্গ তাই সুখে দিশেহারা।

চোখে লেগে আছে সমুদ্রের ঢেউ,
চোখজুড়ে তাই চাঁদের চাহনি;
এরকম করে বলেনি তো কেউ
‘তুমিই আমার হীরকের খনি!’

৮.৩.২০১৪ কাজলা, রাজশাহী

হৃদয়ের সুখে / সায়ীদ আবুবকর

শরীর ঈর্ষায় মরে হৃদয়ের সুখে,-
হৃদয় যাপন করে যেন বা পরীর
ফুলেল জীবন; তাই চোখে-ঠোঁটে-মুখে
দোজখের দীর্ঘশ্বাস ছড়ায় শরীর।

দু-হৃদয় এক হয়ে যেন প্রজাপতি
অসীম আনন্দে ওড়ে রঙিন ডানায়;
প্রণয় তাদের দেছে আলোকের গতি,
বিশ্বাসে জীবন ভরে কানায় কানায়।

কোথায় মেক্সিকো আর কোথায় এ বঙ্গ,
দোঁহার হৃদয় তবু আটটি প্রহর
একসাথে একখানে করে প্রেমরঙ্গ;
জলে-স্থলে-শূন্যে তারা বেঁধেছে যে ঘর।

হৃদয়ের সুখ দেখে অঙ্গে পাকে জট,
দু-শরীর দুই দেশে করে ছটফট।

২১.৪.২০১৩ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

মেয়েটা / সায়ীদ আবুবকর

মেয়েটা মাছের মতো হাঁটে
পথেঘাটে।
যখন সে পথের মাথায় এসে থামে,
মনে হয় তাকে পুরে রাখি হৃদয়ের একুইরিয়ামে।

মেয়েটা পাখির মতো কথা কয়
সমস্ত সময়।
তার কথা শুনতে শুনতে হতভম্ব হয়ে যায় কান;
মনে হয় কত পানসে, কত অর্থহীন পৃথিবীর আর সব গান।

মেয়েটা ফুলের মতো হাসে।
তার পাশে
আর কোনো হাসি
মনে হয় কত জং ধরা, কত আলুথালু, কত বিশ্রী, কত বাসি।

৫.১১.২০১৩ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

ছায়ার মানুষ / সায়ীদ আবুবকর

সে হাঁটছে জ্যোৎস্নার ভেতর, কিন্তু তার ছায়া নেই;
এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে হাঁটছে সে এক মনে-
শুধু তার ছায়া নেই।

কে এই লোকটা? আমি ভাবি। চোখের চশমা খুলে
সে তাকালো এক নজর আমার চাহনির দিকে।
তারপর আগের মতোই হাঁটতে হাঁটতে মিলে গেল
নিশীথের ছায়ার ভেতর।

কে এই লোকটা? আবারও অবাক হয়ে আমি ভাবি।
সে কি কোনো গোরস্থান থেকে উঠে এসেছিল আজ রাতে,
নাকি তার বসবাস সবসময় আমারই সাথে সাথে?

৮.৮.২০১৩ নাটোর

থুতু / সায়ীদ আবুবকর

রসুলবিদ্বেষী ব্লগারদের বিরুদ্ধে

যারা ফুলের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়,
জ্যোৎস্নার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে ন্যাংটা তরবারি নিয়ে নাচে,
ঝর্ণার কুলকুল ধ্বনির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের গান গায়
আর ভালবাসার বিরুদ্ধে মিছিল নিয়ে ছুটে চলে হায়েনার মতো;
আমি কবি, যার কাজই হলো কোকিলের কণ্ঠে সত্য আর সুন্দরের গান গাওয়া,
আজ ঘৃণায় তাদের মুখের উপর ছুঁড়ে মেরে গেলাম আমার যত থুতু।

২০১৩ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

কারবালা / সায়ীদ আবুবকর

যত দূর চোখ যায়, লাশ আর লাশ, আর শুধু দেখা যায় শকুনের গলা-
এখানে এখন রাস্তায় যায় না চলা
মানুষের পায়ে; তবু বারবার বিধ্বস্ত অন্তরে
ঘরের বাইরে যাই আর ভয়বিদ্ধ পায়ে ফিরে ফিরে আসি ঘরে।

হঠাৎ শকুন এত, রাস্তায় রাস্তায়-
কি-উল্লাসে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়
সীমারের শরে ধরাশায়ী সব স্বজনের নীল লাশ;
কান্নায় ও পচা গন্ধে ভারী হয়ে আছে ক্ষুব্ধ বঙ্গের বাতাস;

তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তখন জগৎ শেঠ
ও মীর জাফর আলী খান দোলায় বিপুল পেট
আর হেসে গড়াগড়ি যায়
টিভির পর্দায়।

২০১৩ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ

কোথা থেকে এলো এ বিহঙ্গ / সায়ীদ আবুবকর

উৎসর্গ: মজলুম সম্পাদক মাহমুদুর রহমান

এ বিহঙ্গ কোথা থেকে এলো,      কণ্ঠে যার শুধু অগ্নি ঝরে?
সে-অগ্নিতে মুহূর্তে স্বদেশ           জ্বলে উঠে হয়ে গেল সোনা;
সে-বিহঙ্গ বেঁধেছে যে বাসা         ষোলো কোটি সবুজ অন্তরে,-
ব্যাধের কী সাধ্য তাকে ধরে,        বৃথা তার সব জাল-বোনা!

সব লাশ ভূত হয়ে গেছে,            বেঁচে আছে শুধু ঈশা খান-
ইতিহাস ফুঁড়ে আজ দ্যাখো        একজনই শুধু কথা কয়;
যে-বিহঙ্গ গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতে           গেয়েছিল স্বদেশের গান,
মনে রেখো, তার রোম ছোঁয়া       দু-পেয়ে ব্যাধের কর্ম নয়।

এ বিহঙ্গ কোথা থেকে এলো,       কণ্ঠে যার সমুদ্রের ঢেউ?
সে-ঢেউয়ের অমোঘ আঘাতে     জেগে উঠলো সুপ্ত জনপদ;
যে-ছিলো নিষ্প্রাণ শুয়ে গোরে,    প্রাণের মিছিলে এলো সেও;
ফিরে পেল ঢেউ সব নদী,           এমনকি হাওড় ও হ্রদ।

সাহসের অগ্নিস্পর্শে যার             জ্বলে উঠলো ফের সারা বঙ্গ,
বিমুগ্ধ বিস্ময়ে আজ ভাবি,           কোথা থেকে এলো এ বিহঙ্গ?

১১.৪.২০১৩ মিলনমোড়, সিরাজগঞ্জ