-
কবিতার সক্রেটিস / সায়ীদ আবুবকর
নগরবাউল হয়ে অনেক হয়েছে হাঁটা। জমকালো বিদ্যুতের রোদে ভাটশালিকের পায়ে সারারাত বেড়িয়েছি খুঁজে ঢের শিল্পের আহার। ক্রোধে, ক্ষোভে ও ঘৃণায় পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মুখে অনেক মেরেছি থুতু। মানবতা- মানবতা করে কাটিয়েছি কালো দিন রক্তলাল রাজপথে। কাগজের কুসুমের কথা আর পাথরের প্যারাডাইসের কথা বলতে বলতে ক্লান্ত অবশেষে কণ্ঠ কোকিলের। আজ মৃত্তিকা আমাকে ডাকে। সুনিবিড় সবুজের শীতলতা…
-
তুমি / সাইফ আলি
কে জানে কতটা ভাসালে তা হয় নদী কে জানে কতটা মৌনতা আনে নীলে কত ঢেউ বুকে ধারণ করলে সাগর তোমাতে মানায়; যেমনটা তুমি ছিলে। কতটা গভীর রাতের আকাশ হলে তোমার চোখের তারার উপমা হয়, কত জোনাকির হেয়ালি আলোর ভিড়ে খোয়াবো তোমাকে হারানোর সংশয়? কত বর্ষার ছন্দে চলেছো তুমি আমার বুকের মেঠো পথ ধরে ধরে, কত…
-
পথের দাবী / সাইফ আলি
তুমিও কি তার গন্ধ পাও, ছন্দ বোঝো মধ্যরাতের বাতাস যখন শীতল থাকে আলতো করে নড়তে থাকে গাছের পাতা বিষণ্ন এক ডাহুক ডাকে দূরের কোথাও তুমিও কি তার একটু আধটু গন্ধ পাও? ছন্দ বোঝো? দন্দ্ব বোঝো? একটি পাখির দুইটি পাখার দন্দ্ব বোঝো? হয়তো খোঁজো স্বার্থকতা শুধুই ওড়ার কিন্তু তাতে লাভ কি হবে যখন শুধু শূন্য মুখে…
-
রীফ–সর্দার / কাজী নজরুল ইসলাম
তোমারে আমরা ভুলেছি আজ, হে নবযুগের নেপোলিয়ন, কোন সাগরের কোন সে পার নিবু-নিবু আজ তব জীবন। তোমার পরশে হল মলিন কোন সে দ্বীপের দীপালি-রাত, বন্দিছে পদ সিন্ধুজল, ঊর্ধ্বে শ্বসিছে ঝঞ্ঝাবাত। তব অপমানে, বন্দি-রাজ, লজ্জিত সারা নর-সমাজ, কৃতঘ্নতা ও অবিশ্বাস আজি বীরত্বে হানিছে লাজ। মোরা জানি আর জানি জগৎ শত্রু তোমারে করেনি জয়, পাপ অন্যায় কপট…
-
যৌবন / কাজী নজরুল ইসলাম
− ওরে ও শীর্ণা নদী, দু-তীরে নিরাশা-বালুচর লয়ে জাগিবি কি নিরবধি? নব-যৌবনজলতরঙ্গ-জোয়ারে কি দুলিবি না? নাচিবে জোয়ারে পদ্মা গঙ্গা, তুই রবি চির-ক্ষীণা? ভরা ভাদরের বরিষন এসে বারে বারে তোর কূলে জানাবে রে তোরে সজল মিনতি, তুই চাহিবি না ভুলে? দুই কূলে বাঁধি প্রস্তর-বাঁধ কূল ভাঙিবার ভয়ে আকাশের পানে চেয়ে রবি তুই শুধু আপনারে লয়ে? ভেঙে…
-
পুনর্বাসন / আহসান হাবীব
তোমাকে যে মুক্তি দেব ভুলে যাবে তুমি আমাকে, যেহেতু নেই পৃথিবীর এতবড় অরণ্যেও এতটুকু নীড়; একটু আশ্রয় নেই শুকনো কিছু ডালপালা দু’চারটি পাতার আড়াল কিছু নেই- মাঝে মাঝে দু’চারটি বুনো ফল ঝরবে না ভুলেও এখানে; অতএব ভুলে যাব তোমাকে আমাকে ভুলবে তুমি; সে কথা ভাবতে গেলে মনে পড়ে একটি কাহিনী। তখনো অনেক রাত অন্ধকারে কাঁপছে…
-
একটি অমূলক ধ্রুপদী / আবুল হাসান
যদি পারো এই ব্যাকুল বিথারে সোঁদালো স্নেহের পরশ দিও যদি নাহি পারো স্মৃতির অতলে ঢেকে রেখ সব কাকতালীয় যা কিছু আমার ছিল বহিবার সেও তো অনেক বেদনাদায়ক সেই পাখী আর আসবে না, হায় বিঁধেছে যে তার মৃত্যু শায়ক! গান রচে যাওয়া অনেক বিলাপ, গান কিসে জানে সুখ? দু’মুঠো প্রাণের হাওয়ায় যে তবু ফুলগুলো উন্মুখ! অনেক…
-
ভরহীন / আল মাহমুদ
সকল যাত্রার পরে তোমাকেই পাবো বলে ভাবি জীবনের জগতের অন্তিমের তুমি অবসান। দহনের পুরস্কার, কবিদের রহস্যের চাবি মৃতের কানের কাছে বিদায়ের বিমর্ষ আজান। আমারও সফর শেষ। পৃথিবীর কিনারায় একা নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে ভাবি কাকে বলে পরম বিশ্রাম কোন পর্দা খুলে গেলে পাওয়া যায় অন্তিমের লেখা স্তব্ধতার মত শুধু বলে ওঠা, তোমাকে পেলাম। তোমার নামের প্রেমে দরিয়ার…
-
বৃষ্টিকাব্য / সাইফ আলি
ছুঁয়ে দাও ধুয়ে দাও নগরির চোখ, পঁচা সুখ এ অসুখ মুছে দাও; ফের লেখা হোক- ফোটা ফোটা অনবরত তোমার ছন্দে, এ শহর আমার শীতল হোক আসুক জ্বর, থরথর কাঁপুক রাজপথ, ঘর জানালার কাচ; চায়ের কাপ, উত্তাপ বুকের। স্বার্থপর চুমুকের পর অনবরত তোমার শব্দে কিছুক্ষণ অন্তত বুকের ভেতর জাগুক হৃদয়। ছুঁয়ে দাও ধুয়ে দাও আমাদের চোখ…
-
আহ্ আমি যদি পারতাম / ফজলুল হক তুহিন
তাদের মতন আমি যদি ঘুমিয়ে থাকতে পারতাম তিন শ বছর দূরের কোন গুহায় কিংবা নিজ বাসস্থানে। জেগে উঠে আমার শহর কতটা বিশ্বাসী আর কতটা মৃত পাথর হলো তা দেখতে পারতাম। আহ্ আমি যদি পারতাম- কী নিশ্চিন্তে, প্রশান্তিতে ঘুমের মধ্যেই বয়ে যেত এক একটি শতাব্দী দেখতে পেতাম আকাক্সক্ষার শান্তিগন্ধী সবুজ শহর, সুখময় গ্রাম আমার ভ্রমণ হতো…
-
উৎসর্গ কবিতা (আমার কোথাও যাওয়ার নেই) / সায়ীদ আবুবকর
কেশবপুরবাসী শরীর শীতল করে, ভিতর শীতল করে এই ঘোলাপানি, এ পানিতে স্নান করে ভোরের দোয়েল আর আমার হৃদয়; পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ এখনও আগের মতো করে কানাকানি তখন এ নদ দেখে কত মধু মধুদেশে মহাকবি হয়! অন্য কোনোখানে গিয়ে বাঁচবো কি একদিনও এ জমিন থুয়ে? বিদেশবিভুঁই গিয়ে কী করে মানুষ বাঁচে, আমি ভেবে মরি; আমার কেশবপুর…
-
মুখ ও মুখোশ থেকে বেরিয়ে / আল মাহমুদ
কতবার তোমাকে বলেছি যে দেখো আমার কোনো প্রতিযোগী নেই আমার পরাজয়ের সম্ভাবনা যেখানে ষোল আনা সেখানে আমি কার সাথে দৌড়াবো? তাছাড়া আমার গতি সুনির্দিষ্ট কিন্তু আমার গন্তব্য অনিশ্চিত কে জানে সেখানে কি আছে, পুরস্কার না তিরস্কার? তবে সকলেই জানে আমার আরম্ভের কথা। মায়ের ওম থেকে বেরিয়েই আমার শুরু। এ কোনো খেলা নয়, আমার পিতৃপুরুষেরাই আমাকে…
-
জাগরণ / কাজী নজরুল ইসলাম
জেগে যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের দ্বারে আসি ওরে পাগল, আর কতদিন বাজাবি তোর বাঁশি! ঘুমায় যারা মখমলের ওই কোমল শয়ন পাতি অনেক আগেই ভোর হয়েছে তাদের দুখের রাতি। আরাম-সুখের নিদ্রা তাদের; তোর এ জাগার গান ছোঁবে নাকো প্রাণ রে তাদের, যদিই বা ছোঁয় কান! নির্ভয়ের ওই সুখের কূলে বাঁধলযারা বাড়ি, আবার তারা দেবে না রে…
-
জীবন-বন্দনা / কাজী নজরুল ইসলাম
গাহি তাহাদের গান – ধরণির হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান। শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে ত্রস্তা ধরণি নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে। বন্য-শ্বাপদ-সংকুল জরা-মৃত্যু-ভীষণা ধরা যাদের শাসনে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহরা। যারা বর্বর হেথা বাঁধে ঘর পরম অকুতোভয়ে বনের ব্যাঘ্র মরুর সিংহ বিবরের ফণী লয়ে। এল দুর্জয় গতিবেগ সম যারা যাযাবর-শিশু – তারাই গাহিল…
-
যেখানেই দৃষ্টি রাখি / সাইফ আলি
যেখানেই দৃষ্টি রাখি পুড়ে যায় ভেঙেচুড়ে খান খান হয়ে যায়, রোদেলা দুপুর হঠাৎ বিমর্ষ মেঘে ঢেকে যায়; অন্ধকারে ডুবে যায় সকালের মিঠে আলো। যেখানেই চোখ রাখি, যেখানেই রাখি এই স্বপ্নালু দৃষ্টি আমার- কবুতর ঘর ছেড়ে পাড়ি দেয় বহুদূর বনে, তছনছ হয়ে যায় ভিটেমাটি চিরায়ত শান্ত এ নদীর হঠাৎ ভাঙনে! ধানখেত পুড়ে যায়, ভেসে যায় হাওড়ের…
-
তার কথা ভাবলেই / ফজলুল হক তুহিন
তার কথা ভাবলেই কেন যেন অসংখ্য নদীর স্রোত চোখের সুস্বচ্ছ ক্যানভাসে আকাঁ হয়ে যায়। সেই স্রোত বাংলাদেশের মানচিত্র করেছে প্লাবিত জীবন্ত, শোভিত- বিশ্বাসের পাল ওড়ে পদ্মা মেঘনা ও যমুনায়। দশ দিগন্তে, পদ্মার ঢেউয়ে যে নাম ধ্বনিত পিতৃপুরুষের জন্মভূমি যার প্রাণে আলোকিত সময়ের অন্ধকার রাত তার হাতে পরাজিত তিনি আমাদের আত্মার বাদক- শাহ্ মখদুম। তার বিশ্বাসের…
-
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন / আবদুল মান্নান সৈয়দ
[হযরত আলী রা. -এর বর্ণনানুসরণে] তিনি ছাড়া কেউ জ্ঞানী নয়, সকলেই জ্ঞানের অনুসন্ধানকারী। -রাহজুল বালাঘা: হযরত আলী রা. তাঁকে কেউ দেখেছে কি মরচক্ষে? দৃষ্টির নন্দনে? কেবল হৃদয়ে তাঁকে কেউ কেউ করে অনুভব। সমস্ত বস্তুর মধ্যে মিশে তিনি আছেন গোপনে- অথচ স্পর্শ তাঁকে করতে পারে না এইসব। সমস্ত দ্যাখেন তিনি- কিন্তু তাঁর দৃষ্টি নেই কোনো। নির্মাণ…
-
শুধু চোখ আর পায়ের পিস্টন / আল মাহমুদ
যদি কবির কাজ হয় আশাকে জাগিয়ে তোলা তাহলে হে কীর্তিনাশিনী নদী পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নেমে এসো আমার স্রোতস্বিনী কররেখা হয়ে। আমার হাতের ভেতর নাচুক ইলিশের ঝাঁক। হৌমাছের দীর্ঘ নিঃশ্বাসে খুলে যাক আমার বাতায়ন। আর তুমি, ওগো অনন্তকালের তুমি, তুমি হয়ে যাও দিগন্তে দাঁড়ানো একটি নগ্ন তালগাছ। যার পাতায় দোলানো বাবুইয়ের বাসা তোমার কলরব পূর্ণ স্তনযুগল নেমে আসুক…
-
সকল প্রশংসা তাঁর / আবদুল মান্নান সৈয়দ
সকল প্রশংসা তাঁর- যিনি ঊর্ধাকাশের মালিক; নক্ষত্রের চলাফেরা চলে যাঁর অঙ্গুলিহেলনে; আমরা আশ্রিত তাঁর করুণায়: জীবনে, মরণে; তাঁর আলো চন্দ্র-সূর্য-তারাদের আলোর অধিক। তাঁরই মুক্তা প্রজ্জ্বলিত ঘন-নীল রাত্রির ভিতরে; তাঁরই হীরা দীপ্যমান দিবসের পূর্ব ললাটে; যুক্ত করে দেন তিনি তুচ্ছতাকে- অসীমে, বিরাটে; সমস্ত সৌন্দর্য তাঁরই লোকোত্তর প্রতিভাস ধরে। বিপর্যয় দিয়ে তুমি রহমত দিয়েছো তোমার, দুঃখের দিনের…
-
নাবিকের চোখ / সাইফ আলি
কিছু কোলাহল মুছে যেতে যেতে দাগ রেখে যায়, মোছে না সে দাগ; কিছু কিছু সুর ঘিরে থাকে কিছু মায়াবী সময়- মুছে ফেলা দায়। কিছু মানুষের দৃষ্টির কোনো হিসেব মেলে না কথার থাকে না অর্থ কখনো তবু সে দৃষ্টি অন্দরে কিছু হিসেব মিলায় বাহির তখনো অবুঝের মতো চেয়ে চেয়ে থাকে; এলোমেলো কথা পাশাপাশি বসে কি ছবি…