-
হুদহুদ পাখির কৈফিয়ত / আল মাহমুদ
ও রাজা সোলেমান, কেন আমার একটু এদিক ওদিক উড়ে বেড়ানোতে আপনি এমন তিতিবিরক্ত? আল্লাহ আপনাকে মানুষের, জিন ও হাওয়ানদের রাজা বানিয়েছেন। ও বাতাসকে হুকুম করার মালিক, সহস্র প্রাণের উপর দয়া দেখানোর জন্যই তো নবী-রসুলগণ আসেন পৃথিবীকে নরম করতে। আপনি পিঁপড়ে থেকে শুরু করে আমার মত হুদহুদ পাখিরও ভাষা বোঝেন। বোঝেন প্রতিটি অশ্রুসিক্ত নয়নের অনুনয়। আর…
-
দেশ মাতৃকার জন্য / আল মাহমুদ
একজন কবি আর কি দিতে পারে? এই নাও আমার পরিস্রুত ভাষা নাও কবিতা- আমার রক্ত। কলমের কালির চেয়েও মহার্ঘ। নাও আমার অশ্রুজল দ্যাখো এতে যদি তোমার মরে যাওয়া স্রোতগুলো নদীকে বিহ্বল করে ঘোলা পানির তোড় নিয়ে সমুদ্রের দিকে ধাবমান হয়। নাও অক্ষিগোলক। যদি এতে তোমার ভবিষ্যৎদৃষ্টি একবিংশ শতাব্দীকে দুটি তীক্ষ্ন তীরের মত গেঁথে ফেলে। আমার…
-
প্রার্থনার ভাষা / আল মাহমুদ
একটু জানান দাও হে প্রভূ, তুমি হাল ধরে আছো আমার মত এক টলটলায়মান দিগভ্রান্ত নৌকোর। জানান দাও তুমি আছ এক ছেঁড়াখোড়া আর সাত তালিমারা পালের ফুলে ওঠা অদৃশ্য বাতাস হয়ে। আমি পাড়ি দিয়ে এসেছি পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গের উল্টো দিক থেকে সময়ের উল্টো দিক থেকে আমার যাত্রা। আমি পেওছুব তোমার নির্ধারিত কিনারে। তোমার নির্বাচিত উপত্যকায়। আমার আয়োজন…
-
গন্তব্যের কাছাকাছি এসে / আল মাহমুদ
নদীটা পেরিয়েই মনে হল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সব শব্দ আমাকে ছেড়ে গেছে। ঢেউ, বৈঠা আর পানির ছলছলানির সাথে এতক্ষণ নিরুদ্দেশ যাত্রার যে প্রতিবাদ উঠেছিল। আশ্চর্য নৈশব্দের মধ্যে কখন সব তলিয়ে গেল। শত্রুতাও কি এখন এমন সবুজ মাঠ? যতদূর চোখ যায় বিদ্বেষ হয়ে গেছে পাকা ধানের দুলুনি? আমার পরিশ্রম দেখে যারা একদা বলত, আর একটি মাত্র নদী আর…
-
অন্ধের ভূমিকা / আল মাহমুদ
ছিলাম তো মুখ ফিরিয়ে। ভেবেছিলাম উদয়াস্তে আমার কি ভূমিকা? আলোর আভায় ও বিকিরণে আমি স্তস্তিত পাথরের পাথরের জমাটবাঁধা অন্ধকার মাত্র। দায় ও দায়িত্ব থেকে দূরে দিন আর রাতের নিয়মগুলেঅ আবর্তিত হোক। আমি জানবো না কারা পৃথিবীতে এল গেল। আর অন্ধের ধর্ম তো স্থকিরতা। চোখ মেলে আছি অথচ দেখছি না কিছুই। এ ছাড়া আমার অন্ধত্বকে আমি…
-
খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (৫) / আল মাহমুদ
নারীর কামিনী দেহ যামিনীর তৃতীয় প্রহরে আতর-চন্দনে লেপে যে পুরুষ একবার ছোঁয়, নিখিলের নগ্নতাকে জেনো সে-ই আলিঙ্গনে ধরে সৃজনের পঞ্চভূত তার সাথে একখাটে শোয়; নিসর্গের নীতি মেনে এসো পতি, মেঘবৃষ্টি গণি জগতের উপকার জ্যোতিষের শাস্ত্রে লেখা নাই; ঋতুর বৈচিত্রে কাঁপে লীলাবতী খনার ধমনী মাটির মাহাত্ম্য গেয়ে এসো দোঁহে লাঙলে দাঁড়াই। কিষাণের সোনা জেনো কার্তিকের কর্ষনের…
-
খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (৪) / আল মাহমুদ
পান খাও হে পন্ডিত কথা কও রসভরা ঠারে না জানো ভেষজবিদ্যা সার কর শাস্ত্রের বচন; পানের মহিমা বলি শোনো স্বামী, খনার বিচারে শাওন পানের মাস। এই লতা রাবণের ধন। এই পান মুখে দিয়ে চার্বাকের বেদের বিরোধী গুয়ার সোয়াদ চেখে পঞ্চমুখে ভজে ইহকাল; তির্যক যুক্তিতে কাটে চতুর্বেদ, ব্রাহ্মণের বোধি; বলে এ জগৎ সত্য অন্য সবি শূন্যের…
-
খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (৩) / আল মাহমুদ
নারীর দেহের চেয়ে নম্য কিছু নেই পৃথিবীতে সব শাস্ত্র ঘেঁটে শেষে হে জ্যোতিষী নারীতে আরাম; রোহিণী তারার ওম একমাত্র নারী পারে দিতে মাতাবধূকন্যা কহ, নারী এক রহস্যের নাম। মেদিনীর সাথে শুধু স্ত্রীদেহের তুলনা সরস গবংসহা তনুদেহা মানুষের তপস্যার ফল; কৃষির আরম্ভে নারী, পশুরাও নারীতে বিবশ নারী শক্তি, নারী স্বাস্থ্য, জ্ঞানীদের পিপাসার জল। এহেন ধনের বাড়া…
-
খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (২) / আল মাহমুদ
প্রকৃতির ছায়া আমি হে রাজন, আমিই সৃজন মানুষের শুক্র ধরি। বুঝি উষ্ণ বীর্যের বেদনা, ধানে ও কাউনে বাঁচি, রক্ষা করি চাষীর গোধন, বরাহের পুত্রবধূ মিহিরের ঠোঁটকাটা খনা। মাঘের শেষের মেঘে আকাশের কটোরা গড়ায় তবু কেন বৃষ্টি নেই, নদী শুষ্ক, বলো কার পাপ? খনার গণনা বলে দেশ জ্বলবে দারুণ খরায়, ইঁদুরেরা তাজা হবে। রাজ্যে হবে চরের…
-
খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (১) / আল মাহমুদ
ঋতুর রহস্য গাই, এ দোষে কি কেটে নেবে জিব? তাহলে হে পুরুষেরা কাটো শত কবির রসনা, নিয়মের মন্ত্র লিখি। লাক্ষণিক নক্ষত্রের দীপ নারীর প্রেরণা হয়, তোমরা শোনো খনার বর্ণনা। যে মাঘে বুকের মাংস গুটি বেঁধে হয়েছে স্তনন তখন থেকেই জেনো নারী শেখে নিসর্গের ভাষা আগাম ইশারা হয়ে ঝরে যায় খনার বচন চাষার ঘামে ও কামে…
-
ভরহীন / আল মাহমুদ
সকল যাত্রার পরে তোমাকেই পাবো বলে ভাবি জীবনের জগতের অন্তিমের তুমি অবসান। দহনের পুরস্কার, কবিদের রহস্যের চাবি মৃতের কানের কাছে বিদায়ের বিমর্ষ আজান। আমারও সফর শেষ। পৃথিবীর কিনারায় একা নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে ভাবি কাকে বলে পরম বিশ্রাম কোন পর্দা খুলে গেলে পাওয়া যায় অন্তিমের লেখা স্তব্ধতার মত শুধু বলে ওঠা, তোমাকে পেলাম। তোমার নামের প্রেমে দরিয়ার…
-
মুখ ও মুখোশ থেকে বেরিয়ে / আল মাহমুদ
কতবার তোমাকে বলেছি যে দেখো আমার কোনো প্রতিযোগী নেই আমার পরাজয়ের সম্ভাবনা যেখানে ষোল আনা সেখানে আমি কার সাথে দৌড়াবো? তাছাড়া আমার গতি সুনির্দিষ্ট কিন্তু আমার গন্তব্য অনিশ্চিত কে জানে সেখানে কি আছে, পুরস্কার না তিরস্কার? তবে সকলেই জানে আমার আরম্ভের কথা। মায়ের ওম থেকে বেরিয়েই আমার শুরু। এ কোনো খেলা নয়, আমার পিতৃপুরুষেরাই আমাকে…
-
শুধু চোখ আর পায়ের পিস্টন / আল মাহমুদ
যদি কবির কাজ হয় আশাকে জাগিয়ে তোলা তাহলে হে কীর্তিনাশিনী নদী পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নেমে এসো আমার স্রোতস্বিনী কররেখা হয়ে। আমার হাতের ভেতর নাচুক ইলিশের ঝাঁক। হৌমাছের দীর্ঘ নিঃশ্বাসে খুলে যাক আমার বাতায়ন। আর তুমি, ওগো অনন্তকালের তুমি, তুমি হয়ে যাও দিগন্তে দাঁড়ানো একটি নগ্ন তালগাছ। যার পাতায় দোলানো বাবুইয়ের বাসা তোমার কলরব পূর্ণ স্তনযুগল নেমে আসুক…
-
যাবনা তোমার সাথে, হে দেশজননী / আল মাহমুদ
আমি আর যাবনা তোমার সাথে, হে আমার দেশজননী, আর না। কারণ তোমার যাত্রা উদ্দেশ্যবিহীন কিন্তু আমার কলম আমার নিশান হয়ে দুলে উঠে লিখছে, না না না। ও রক্তাম্বর পরিহিতা স্বৈরিণী স্বদেশ, তোমার দিগ্বলয়ে কেবল হা হুতাশ আর স্বজন হারানোর বিলাপ। তোমার স্তনাগ্রচূড়ায় মানবশিশুর জন্যে তিক্ত নিম মাখানো প্রত্যাখ্যানের কৃষ্ণবলয়। আমি আর না। ছেড়ে দাও আমার…
-
বাতাসের মুখে লাগাম দিয়ে / আল মাহমুদ
ইচ্ছে ছিল দেখতে দেখতে যাওয়ার। আমার কৈশোরের পথও ছিল ছায়াশীতল। বৃক্ষ ও পাখির অরণ্যের একঘেয়েমি পেরিয়েই যে নদী তা আমি জানতাম। যেমন জানে ডিমের ভেতরকার পাখির কুসুম। চিরকাল ভেবে এসেছি একটা নদীর লেজ ধরতে পারলেই আমার গন্তব্যে অর্থাৎ মস্তকে গিয়ে দাঁড়াবো। একেবারে ফণার ওপর। এক মধ্য দুপুরের নদী যেখানে বাঁক ধরেছে সেখানে পৌঁছেই দেখি ডাঙা…
-
কবির অভাব দেশ / আল মাহমুদ
হয়তো বা স্বপ্ন ছিলো । ঘুমঘোর মিথ্যার ম্যাজিক আমাকে দেখিয়ে ছিল বাষ্পরুদ্ধ চেহারা তোমার। পাখির বিলাপে ভরা ঘোরলাগা গ্রামের কুটিরে একটি বালক শুধু শুনেছিল নদীর রোদন। এখন সে পাড়ি দেয় সপ্তসিন্ধু, দশদিকে চোখ মায়ার কাজলে ভেজা দৃষ্টি তার ক্লান্তির রুমালে মুছে নিয়ে ঘরে এসে দেখে কেউই অপেক্ষায় নেই। তার কোনো দেশ নেই। নিরুপায় ভিসার বিপাকে…
-
ভুলের দিগন্তে / আল মাহমুদ
যদি ভুল পথে এসে থাকি তবে জেনো ভ্রান্তিই আমার ধ্রুব। এখন গাছ সাক্ষী আমি আর ফিরব না। নদী সাক্ষী আমি আর ফিরব না। মেঘ, পাখি আর পাল তোলা নাওয়ের কসম, যে পায়ের ছাপ আমার পেছনে রেখে এলাম তা মৃত্যুর দিগন্তে গিয়ে একবার নিঃশ্বাস ফেলবে। ভুলের পুরস্কার যদি মৃত্যু, তবে তাই হোক। অথচ আমার যৌবনে আমাকে…
-
বিপরীত উচ্চারণ / আল মাহমুদ
আমি নিসর্গের ভাষা বুঝি। নৈশব্দও আমার কাছে কখনো কখনো বাঙময়। শৈশবে গাছ, মাছ, পাখি ও পতঙ্গের সাথে কথা বলে আমি অভ্যস্ত কিন্তু অসুবিধে হচ্ছে মানুষকে নিয়ে। আমার ধারণা ছিল আমি যখন মানুষ। মানুষের ঘরেই জন্মেছি। তখন পৃথিবীর তাবৎ মানুষের ভাষা আমি বুঝব। কত অনায়াসে আমি প্লেনের জানালা দিয়ে মেঘের সাথে কথা বলতে বলতে আটলান্টিক পাড়ি…
-
কবিতার কথা / আল মাহমুদ
আমার মেয়ে খাঁচায় একটা ময়না পুষতো। আদরে আব্দারে কিভাবে যেন পাখিটার নাম দাঁড়িয়ে গেল কবিতা। বাইরে থেকে কেউ ঘরে এলেই ‘কবিতা, কবিতা’ বলে পাখিটাকে তোয়াজ করতো। এমন কি আমিও যে কিনা জন্তু-জানোয়ার পোষার ঘোর বিরোধী। মাঝে মধ্যে পাখিটার চকচকে কালো পালক ও হলদে ঝুটি দেখে হঠাৎ বলে ফেলেছি, কি রে কবিতা? আমার ডাকে পাখিটা সহসা…
-
শতাব্দীর শেষ রশ্মি / আল মাহমুদ
অস্তমিত শতব্দীর শেষ রশ্মি তোমার চিবুকে ছায়া ও কায়ার মতো স্পর্শ দিয়ে নামে অন্ধকার; লাফায় নুনের ঢেউ। রক্তাম্বর জলধির বুকে আবার নামের ধ্বনি, কার নাম? সেও কি তোমার? ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নই। কিন্তু জেনো কবির নয়ন ভেদ করে গ্রহান্তর, পার হয় সমস্ত উদ্যম, কেন এত রক্ত তবে, কেন এত মৃত্যুর বয়ন তাঁত বুনে ব্যর্থতার? নক্সাি তোলে…