• বসন্তবৈরী / আল মাহমুদ

    এবারই প্রথম। ব্যর্থ কোকিলের ঝাঁক বাংলার বিমর্ষ সবুজকে বিদীর্ণ করে দিয়ে ভাঙা গলায় কুহু ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে প্রান্তরে মিলিয়ে গেল। তুমি যখন উঠোন পেরুলে তখন কোনো সম্ভাষণ নেই। না-প্রকৃতির না-ঋতুচক্রের। আমি ইচ্ছে করলে আমার ক্যাসেটে বন্দি নকল পাখির ডাক তোমাকে শুনিয়ে দিতে পারি। একেবারে নির্ভুল কুহুধ্বনি। যদিও গাছে কোনো ফুল ফোটাতে আমি পারব না।…


  • জনশূন্য আমার বিবেক / আল মাহমুদ

    ধানের বাতিকগ্রস্ত ভূমিহীন কৃষাণ যেমন বসে থাকে ধান কাটা শূন্য মাঠে ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তেমনি আমিও চেয়ে দেখি আকাশের নীল প্লেটে একগুচ্ছ মেঘের কুন্তল। যেন-বা আমার মায়ের হাতে বেড়ে দেওয়া ঈদের পোলাও। আর- ঝালের রেকাবী থেকে গুঞ্জরিত হিংয়ের গন্ধের মতো কিছু তাপ ঢুকে যায় আমার দেহেও। অতীত কিছুই নেই; সবি বর্তমান। আজ নেই, কালও বুঝি…


  • শূন্যতাকে মানি না / আল মাহমুদ

    শুধু চোখের দৃষ্টি কমে এসেছে এমন নয়। বিচরণের ক্ষমতাও এখন ক্লান্ত। অথচ নিত্য বিচরণের ক্ষেত্র হে আমার পৃথিবী, হে আমার মহাদেশ, হে আমার দেশ, আমার গ্রাম ও আমাদের শহর আমার পা আর উঠতে চায় না। আমার দেহের সবচেয়ে ব্যবহৃত অঙ্গ-প্রতঙ্গের মধ্যে এ প্রাচীন পদদ্বয় আমাকে জানান দিচ্ছে গাছের মতো কিছুকাল স্থানু হয়ে থাকতে। বৃক্ষের স্বভাব…


  • মানুষের দীর্ঘশ্বাস / আল মাহমুদ

    দেখত দেখতে বহুদূর চলে এসেছি। পথে পথে ধসে পড়েছে ইন্দ্রিয়ের ছলাকলা। এক নদীর পাড়ে খুলে পড়ে গিয়েছিল আমার চোখের আলো। কত খুঁজলাম, কিন্তু সন্ধ্যার আবছা একটা চশমার মতবসে গেল আমার নয়নে। তারপর প্রান্তর পেরুতে গিয়ে ধসে পড়েছে আমার শ্রবণ ইন্দ্রিয়। এখন কলরবমুখর কত নগর পেরিয়ে যাই শুনতে পাই না। মানুষের কান্না না শুনতে পারা কত…


  • দাম / আল মাহমুদ

    বাংলাদেশে এখন হালকা মেঘের খেলা। যেন কোমর দোলাচ্ছে মৌসুমী বায়ুর আনাগোনা। শুধু বিক্রি বিক্রি বিক্রি। বিকিকিনির খেলা। কী আছে তোমার? রূপ, রঙ্গ, তামাশা, কবিতা? শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিয়ে থমকে দাঁড়ানো? এই হলো বিকিয়ে দেয়ার বাতাস। যদি বেচারই কিছু না থাকে ডুবে যাও বঙ্গোপসাগরে। হ্যাঁ, আমার আছে কবিতা। প্রতিটি শব্দের জন্যে চাই এক লক্ষ্ ডলার প্রতিটি…


  • ভূত-ভবিষ্যৎহীন এই অন্ধকার / আল মাহমুদ

    অন্ধকারের মধ্যে আরো অন্ধকার। স্তব্ধতার মধ্যে যেমন আমি আমাকে খুঁজে বেড়াই। তেমনি অন্ধকারেরও একটা ওম আমাকে বোঝাতে চায় যে আমি কেউ নই। আমি কী সত্যিই কেউ নই? আমি কি আমি নই? তাহলে এই অনুভব কোত্থেকে আসে, আমি হাঁটছি। আমি কি করে বুঝি চতুর্দিকে খানাখন্দর, গহ্বর। চলতে হবে আমি জানি পা টিপে টিপে, মৃত্যুকে এড়িয়ে কিংবা…


  • আমার চলা / আল মাহমুদ

    দেখো কীভাবে হাঁটে লোকটা। দেখলে মনে হবে দাঁড়িয়েই আছে। কিন্তু আমরা বুঝতে না পারলেও তার চলার মধ্যে একটা এগিয়ে যাওয়া আছে। ধীর লক্ষ্যভেদী যাত্রা। যেনো খরগোশদের কথোপকথন। সে পরিচিত কচ্ছপকে নিয়ে আদি মশকরা। আসলে আমি তো দাঁড়িয়ে নেই। ঘড়ির ঘন্টার কাঁটার মতো অস্থানু। অথচ দেখলে মনে হয় চলছে না। খুব মিহি আওয়াজের নিঃশব্দ হৃদপিন্ডের মতো।…


  • জাহরা ভাদুগড়ী / আল মাহমুদ

    মাঝে মাঝে মেয়েটার কথা মনে পড়ে। এসেই বলতো, আমি জাহরা বানু। তিতাস পাড়ে বাড়ি। ঘন ঘন কলিংবেল চেপে সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত। কেউ দরজা খুলে দিলে হাসত, আমি জাহরা। স্যারকে কবিতা শোনাতে এসেছি। আমি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। হাসতাম। মৃদু হাসতাম। হাতের ইঙ্গিতে বলতাম, ভেতরে এসো। লম্বায় তালগাছের মতো সটান। এলো খোঁপা বাঁধা। দেখতে শীর্ণকায়…


  • মৎস্যগন্ধ্যা ঋতুর উপলব্ধি / আল মাহমুদ

    বিপর্যস্ত উন্দ্রিয়গুলোর উপর মাদুর বিছিয়ে সূর্যাস্ত দেখছি। অন্ধকার ছুটে আসছে পশ্চিম থেকে। আর ইবলিশের হাসির মতো গুমগুমিয়ে উঠছে বিদ্রুপ। কে এই হারামজাদাকে জানিয়ে দেবে এটা শরৎকাল। ওর কানে আমি পরগাছা গজিয়ে তুলেছি। ওর চোখে শেয়ালেরা হিসি করছে। ওকি জানে আমিই পুঁজির রাজা! ওকে কে বলে দেবে আমার নামই নতুন বিশ্ব নিয়ম? আমি ওর মগজে উঁইপোকা…


  • অমরতার আলেয়া / আল মাহমুদ

    সবাই বলে পার হয়ে যাও। আমি হন্তদন্ত হয়ে অতিক্রম করেছি নদী। পরামর্শ কিংবা বলা যায় অনুচ্চারিত দৈববাণীর ধমক আমার কর্ণকুহরে ক্রমাগত আছড়ে পড়তে থাকে, পার হয়ে যাও। আমি আমার ক্ষত-বিক্ষত হাঁটুর খটখটানি তুলে উল্লংঘন করি গৌরীশৃংগ। তবু সেই দৈবাদেশ এবার শ্রবণেন্দ্রিয় থেকে সরে গিয়ে হৃৎপিন্ডের দুলুনিতে বাজতে থাকে, পার হও! পার হও! কেন পার হবো?…


  • স্বপ্নের উৎপাত / আল মাহমুদ

    সারা জীবন আমি উদ্ভট স্বপ্নের মধ্যেই পাশ ফিরে শুয়েছি। দুঃস্বপ্নের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে বালিশের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে সান্ত¦না খুঁজেছি। ভেবেছি, ওটা ছিল স্বপ্ন। সম্ভবত আমি ঘুমকাতুরে লোক বলে খোয়াবের জ্বীন আমার পিছু ছাড়তে চায় না, ঘুমের শুরুতেই অস্বাভাবিক একটা শিরশিরানি আমার হৃৎপিন্ড থেকে নিঃসৃত হয়ে মস্তিষ্কের সব স্বপ্নের খুপড়িতে ফোকাস ফেলে। আমি দেখি গাছগুলো স্থান…


  • কালঘুম / আল মাহমুদ

    এতদিন আমাকে নিয়ে কারো কাছে উদ্বেগই ছিল না। পরিবারের একটা প্রায়ান্ধ মানুষ কোথায় কীভাবে আছে এ-নিয়ে কেউ ভাবত না। কারণ ছেলে-মেয়েদের ধারণা ছিল আব্বা ঘরের যেখানেই খাকুন বই নিয়েই আছেন সজাগ। কেবল আহার-বিহারের সময় স্ত্রী একটু তাগাদা দিতেন বলতেন ওঠ… যেন একটা পাথরকে ঠেলে গড়িয়ে নাইতে নিয়ে যাচ্ছেন। আমার খাওয়া হয়ে গেলে এ-বাড়ির সবাই ঝাঁকবেঁধে…


  • পাথর ও রক্তের বিবাদ / আল মাহমুদ

    কী আছে অনাস্বাদিত? ঠোঁট রেখে কঠিন শিলায় পাথরের গন্ধ শুঁকি পেতে চাই সৃষ্টির লবন। গ্রানিটে জিহ্বা লাগে, আলজিভে শ্যাওলার স্বাদ স্বাদ নয়, এ কেবল পাথর ও রক্তের বিবাদ। অভুক্ত কবির মুখে, আলজিভে জমেছে যে পানি এ দিয়ে নরম হয় জগতের প্রকৃতিনিচয়, কেবল অনম্য তুমি। পাথরের চেয়েও পাথর। হাসো বাসো নাশ করো মানুষের সব বরাভয়। ২.…


  • না কোন শূন্যতা মানি না (উৎসর্গ) / আল মাহমুদ

    আমি আর ফিরবো না। সময়ের বিপরীত গতি কেন যে আমাকে টানে? টানে নদী টানে চরভূমি, কিংবা চুম্বক সেই, যার নাম কবির নিয়তি, হয়তো বিস্মৃতি টানে। মৃত্যু টানে। টেনে ধরো তুমি স্মৃতির অদৃশ্য বাহু এতদূর বাড়ায় আঙুল বাড়িয়ে দিয়েছে দেখো তুলে নিতে কবির হৃদয় কিন্তু এতো মাংস মাত্র, রক্তরস, যদিও তুমূল আক্ষেপের আলোড়নে জপে চলে প্রেমের…