-
‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ / আহসান হাবীব
সোনামুখী নারকেলের শাখায় শাখায় আর দুধ-সুপুরির বনে এখনো কি হাওয়া বয় বঙ্গোপসাগর থেকে বিকেলে? সোনালী রোদ এখনো কি মুখ দেখে জোয়ারের জলে? বিকেলে ঢেঁকির পাড়ে ক্লান্তি এলে ঘুম পেলে পা নামিয়ে- হেলির পাতায় বোনা নরম পাখায় কিছু হাওয়া খেয়ে, তার পরে, পুকুরে ঘাটের শেষে গলাজলে বুক রেখে এখনো কি দুই চোখ ছল ছল করে আর…
-
মন / ফররুখ আহমদ
মন মোর আসন্ন সন্ধ্যার তিমি মাছ- ডুব দিল রাত্রির সাগরে। তবু শুনি দূর হ’তে ভেসে আসে-যে আওয়াজ অবরুদ্ধ খাকের সিনায়। সূর্য মুছিয়াছে বর্ণ গোধুলি মেঘের ক্লান্ত মিনারের গায়, গতি আজ নাইকো হাওয়ায় নিবিড় সুপ্তির আগে বোঝে না সে শান্তি নাই তমিস্রা পাথারে। তবু পরিশ্রান্ত ম্লান স্নায়ুর বিবশ সঞ্চরণে আতপ্ত গতির স্বপ্ন জমা হয় মনে, বুঝি…
-
সন্ধ্যা / কাজী নজরুল ইসলাম
− সাতশো বছর ধরি পূর্ব-তোরণ-দুয়ারে চাহিয়া জাগিতেছি শর্বরী। লজ্জায় রাঙা ডুবিল যে রবি আমাদের ভীরুতায়, সে মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত করি যুগে যুগে হায়! মোদের রুধিরে রাঙাইয়া তুলি মৃত্যুরে নিশিদিন, শুধিতেছি মোরা পলে পলে ভীরু পিতা-পিতামহ-ঋণ! লক্ষ্মী! ওগো মা ভারত-লক্ষ্মী! বল, কতদিনে, বল,− খুলিবে প্রাচী-র রুদ্ধ-দুয়ার-মন্দির-অর্গল? যে পরাজয়ের গ্লানি মুখে মাখি ডুবিল সন্ধ্যা-রবি, সে গ্লানি মুছিতে শত…
-
তোমাতে অমর আমি / আহসান হাবীব
মায়ের দু’চোখে শুধু তৃষ্ণা আর সারা মুখে তার কি গভীর ব্যাকুলতা বুঝিনি ! আমার শিশু চোখ নিষ্পাপ মূঢ়তা; কেবল অনন্যমনে শুদ্ধতার সমুদ্র-সাঁতার। মাকে চিনি, খেলার পুতুল, লাল ফুল, সাদা দেয়ালের সব ছবি চিনি; তবু জানি না কোথায় নামের মাধুরী আছে লুকিয়ে; মাকেও মা বলে ডাকার সেই কথা আর সুরের সুন্দর মিশ্রিত মহিমা আছে কোথায় লুকিয়ে…
-
বৈশাখী / ফররুখ আহমদ
বৈশাখের মরা মাঠ পড়ে থাকে নিস্পন্দ যখন নিষ্প্রাণ, যখন ঘাস বিবর্ণ, নিষ্প্রভ ময়দান, যোজন যোজন পথ ধূলি-রুক্ষ, প্রান্তর, বিরান; শুকনো খড়কুটো নিয়ে ঘূর্ণী ওঠে মৃত্যুর মতন; সে আসে তখনি। তখনি তো ঘিরে ফেলে উপবন, বন;-চোখের পলকে, মুছে ফেলে ঘুমন্ত নিখিল সে আসে বিপুল বেগে। কণ্ঠে তার সুরে ইস্রাফিল বজ্রস্বরে কথা কয়, জানে না সে গম্ভীর…
-
বৈশাখের কালো ঘোড়া / ফররুখ আহমদ
বৈশাখের কালো ঘোড়া উঠে এলো। বন্দর, শহর পার হয়ে সেই ঘোড়া যাবে দূর কোকাফ মুলুকে, অথবা চলার তালে ছুটে যাবে কেবলি সম্মুখে প্রচন্ড আঘাতে পায়ে পিষে যাবে অরণ্য, প্রান্তর। দূর সমুদ্রের বুকে নির্বাসিত যুগ যুগান্তর শুনেছে ঘরের ডাক দূর দিগন্তের পার থেকে, বাঁকায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বজ্রের আওয়াজে উঠে ডেকে শূন্যে ওড়ে বুকে নিয়ে সুলেমান নবীর…
-
কালবৈশাখী / কাজী নজরুল ইসলাম
১ বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হল রে পুব-হাওয়ায়, দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়, কে পাগল সেথা যাস হাঁকি – ‘বৈশাখী কালবৈশাখী!’ হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়। সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারি নে, হায়।। ২ কালবৈশাখী আসিলে হেথায় ভাঙিয়া পড়িত কোন সকাল ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা দেওয়া ওই সনাতন দাওয়া,…
-
বেহুলাবধূ / সায়ীদ আবুবকর
এখানে যখন সন্ধ্যা ঘনায় তোমার ওখানে দিনের শুরু; রাত্রি এগোয় সাপের ফণায়, কাঁপে আতঙ্কে হৃদয়, ভুরু! ওখানে যখন রাত নেমে আসে, দোয়েলেরা দেয় এখানে শিস; তরাসে তোমার গা ঘেমে আসে, যেনবা বাতাসে সাপের বিষ লোরেনা আমার বেহুলাবধূ, আর নয় দুই কিনারে বাস; এক ফুলে হবে আমাদের মধু, এক মাঠে হবে প্রেমের চাষ চার চোখে যেন…
-
ফেরা না ফেরা / ফজলুল হক তুহিন
কেউ ফিরুক বা না-ই ফিরুক আমাকে ফিরতেই হবে আমার আশ্রয়ে। পাখিরা যেমন ফিরে। ফিরে সাগর ঢেউয়েরা। মনের দিগন্ত দ্বার ভেঙে বিরল স্মৃতির হারানো মেঘেরা। কিন্তু আমার রাজপথ না ফেরার হরতাল, ব্যারিকেটে ঘেরা কারা যেন মত্ততায় মাতাল না ফেরার উৎসবে, আমার কি হবে ফেরা? ঋতু ফিরে আসে রাত ফিরে আসে ভোর ফিরে আসে নিজ পৃথিবীতে, নিজ…
-
মর্তবা খুঁজি / সাইফ আলি
অতীতকে ভুলে যেতে বর্তমানের মিঠে খাঁস চুমু দরকার ছিলো- পূনঃরায় মুখোমুখী দাঁড়িয়েছে ভাই আর ভাই, দূর দেশে বসে আছে কঠিন দাবাড়ু এক ধ্যানে, সন্দেহ জাগে- আবেগ উথলে ওঠা ভায়েদের এইসব কুলাবে কি জ্ঞানে! আমি এক অধম এখানে কপচিয়ে লেবু-জ্ঞান একা, তিতা করে ফেললাম বুঝি!!? কি করবো বলো- আমি শুধু রাজপথে পুতুলের মতো শত শহীদের মর্তবা…
-
শেয়াল / সাইফ আলি
অবশেষে সকলেই চিনে ফেলে আপোষের পথ চিনতে পারেনা শুধু কতিপয় গাড়ল বিশেষ, এইসব গাড়লেরা জীবনের মূল্য বোঝেনা শুধু বোঝে- দুর্বল নুয়ে পড়া মনোভাব নিয়ে বাঁচার চাইতে ভালো শহীদী সোপান!! ক্ষমতার মসনদে বসতে চাওনি তুমি অথচ চেয়েছো যেনো সব হয় তোমার কথায়! ময়লা থালায় বেড়ে ভাত খাওয়া বেয়াকুফি তাই ডাস্টবিনে বসে গেলে অবশেষে মহোদয়! বাহ!! অথচ…
-
তাকে দেখলে চিনি / সায়ীদ আবুবকর
তাকে দেখলে চিনি, মনে নেই বাড়িঘর। মুখ মনে আছে, চোখ মনে আছে, ভুলে গেছি শুধু তার গোলাপি অন্তর। ২৮.৪.২০১২ ইংরেজি বিভাগ, সিরাজগঞ্জ কলেজ
-
ফালগুনের স্মৃতি / ফজলুল হক তুহিন
ফালগুনের এই রাতের আকাশ রাতের বাতাস ফুলের সুবাস খুলে দিলো বন্ধ মনের আগল আজ কী আমি স্মৃতির ছোঁয়ায় হয়ে যাবো সেই পুরোনো পাগোল? ২. তোমার বিরল হাসির মতো জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পূর্ণিমা চাঁদ এই উঠোনে এসেছিলো নেমে নীল ফাগুনের স্বপ্ন স্বপ্ন রাতটা জানি পড়েছিলো তোমার আমার প্রেমে। আমরা যখন জ্যোৎস্না ধুলোয় হাঁটছি পাশাপাশি শান্তি হাওয়ায় শ্বাস…
-
তিস্তার জল / সাইফ আলি
তিস্তার জল পাবো সেই জলে করবো গোসল কাটবো সাঁতার, চুক্তি কি হয়ে গেছে; জল খসলো না তবু ভারত মাতার!!?
-
হীরকের খনি / সায়ীদ আবুবকর
হাতে লেগে আছে স্তনের ঊষ্ণতা, ভিজে গেছে সুখে প্রেমার্ত এ হাত; কানে লেগে আছে কোকিলের কথা, বুকের গভীরে ছড়ায় মৌতাত। ঠোঁটে লেগে আছে চাঁদের চুম্বন, বুকে গিয়ে পড়ে সুখের ফোয়ারা; মনে লেগে আছে জুলেখার মন, সারা অঙ্গ তাই সুখে দিশেহারা। চোখে লেগে আছে সমুদ্রের ঢেউ, চোখজুড়ে তাই চাঁদের চাহনি; এরকম করে বলেনি তো কেউ ‘তুমিই…
-
নিরন্তরের কবিতা / ফজলুল হক তুহিন
আজকের এই সকালবেলাটা গতিহীন হোক ছবি হয়ে থাক রৌদ্র-ছায়ার হাওয়ার বেলা আমি বিছানায় শুয়ে বসে থেকে উপভোগ করব সকাল। আমার ডানের জানালা- আমার পৃথিবী দেখার চোখ। কেউ জানবে না, কি যে ভালোলাগা; কী গাঢ় বাতাস উদোম উঠোন, কি নীল আকাশ- আশ্বাসে মন ভরে যায়। বিছানায় শুয়ে দেখতে পাচ্ছি ডালিমের প্রাচুর্য সবুজের ফাঁকে সুন্দরীদের লজ্জায় ফেটে…
-
যারা নিচু হয় / সাইফ আলি
তোমার কি ভয় তুমি নিশ্চয় প্রতিবাদী নও, কথা কম কও, চিন্তা করোনা কিছুটি নিয়েই; তুমি নাকি এই অজপাড়াগাঁর লক্ষি ছেলেটি! কিচ্ছু বোঝো না, নিরিবিলি থাকো, কাউকে খোঁজো না। তা তো বেশ করো তবে যদি ধরো কেউ এসে গাঁও লুট করে যায় তোমাকে কি তারা গদিতে বসিয়ে আঙুর খাওয়াবে, অথবা নিরিহ প্রাণী বলে কিছু ছাড় দিয়ে…
-
হৃদয়ের সুখে / সায়ীদ আবুবকর
শরীর ঈর্ষায় মরে হৃদয়ের সুখে,- হৃদয় যাপন করে যেন বা পরীর ফুলেল জীবন; তাই চোখে-ঠোঁটে-মুখে দোজখের দীর্ঘশ্বাস ছড়ায় শরীর। দু-হৃদয় এক হয়ে যেন প্রজাপতি অসীম আনন্দে ওড়ে রঙিন ডানায়; প্রণয় তাদের দেছে আলোকের গতি, বিশ্বাসে জীবন ভরে কানায় কানায়। কোথায় মেক্সিকো আর কোথায় এ বঙ্গ, দোঁহার হৃদয় তবু আটটি প্রহর একসাথে একখানে করে প্রেমরঙ্গ; জলে-স্থলে-শূন্যে…
-
পারিনি বুঝতে আমি / ফজলুল হক তুহিন
পারিনি বুঝতে আমি। পারে কী সবাই? পারে হয়তো সে, মনকে যে করেছে জবাই! আমি যে মনের ভৃত্য। মনের বৃত্তেই চলি। একদিন যে লিখেছে তোমার প্রণয় পদাবলী। একদিন যে নাগর ছিল তোমারই শরীর সভায়। পারিনি বুঝতে আমি অথচ সেদিন তোমার মুখকে আমি ভেবেছি অন্য নারীর তোমার বুককে আমি দেখেছি অন্য নারীর তোমার সুখকে আমি মেখেছি অন্য…
-
মেয়েটা / সায়ীদ আবুবকর
মেয়েটা মাছের মতো হাঁটে পথেঘাটে। যখন সে পথের মাথায় এসে থামে, মনে হয় তাকে পুরে রাখি হৃদয়ের একুইরিয়ামে। মেয়েটা পাখির মতো কথা কয় সমস্ত সময়। তার কথা শুনতে শুনতে হতভম্ব হয়ে যায় কান; মনে হয় কত পানসে, কত অর্থহীন পৃথিবীর আর সব গান। মেয়েটা ফুলের মতো হাসে। তার পাশে আর কোনো হাসি মনে হয় কত…