-
কবির অভাব দেশ / আল মাহমুদ
হয়তো বা স্বপ্ন ছিলো । ঘুমঘোর মিথ্যার ম্যাজিক আমাকে দেখিয়ে ছিল বাষ্পরুদ্ধ চেহারা তোমার। পাখির বিলাপে ভরা ঘোরলাগা গ্রামের কুটিরে একটি বালক শুধু শুনেছিল নদীর রোদন। এখন সে পাড়ি দেয় সপ্তসিন্ধু, দশদিকে চোখ মায়ার কাজলে ভেজা দৃষ্টি তার ক্লান্তির রুমালে মুছে নিয়ে ঘরে এসে দেখে কেউই অপেক্ষায় নেই। তার কোনো দেশ নেই। নিরুপায় ভিসার বিপাকে…
-
মানুষের দীর্ঘশ্বাস / আল মাহমুদ
দেখত দেখতে বহুদূর চলে এসেছি। পথে পথে ধসে পড়েছে ইন্দ্রিয়ের ছলাকলা। এক নদীর পাড়ে খুলে পড়ে গিয়েছিল আমার চোখের আলো। কত খুঁজলাম, কিন্তু সন্ধ্যার আবছা একটা চশমার মতবসে গেল আমার নয়নে। তারপর প্রান্তর পেরুতে গিয়ে ধসে পড়েছে আমার শ্রবণ ইন্দ্রিয়। এখন কলরবমুখর কত নগর পেরিয়ে যাই শুনতে পাই না। মানুষের কান্না না শুনতে পারা কত…
-
ভুলের দিগন্তে / আল মাহমুদ
যদি ভুল পথে এসে থাকি তবে জেনো ভ্রান্তিই আমার ধ্রুব। এখন গাছ সাক্ষী আমি আর ফিরব না। নদী সাক্ষী আমি আর ফিরব না। মেঘ, পাখি আর পাল তোলা নাওয়ের কসম, যে পায়ের ছাপ আমার পেছনে রেখে এলাম তা মৃত্যুর দিগন্তে গিয়ে একবার নিঃশ্বাস ফেলবে। ভুলের পুরস্কার যদি মৃত্যু, তবে তাই হোক। অথচ আমার যৌবনে আমাকে…
-
দাম / আল মাহমুদ
বাংলাদেশে এখন হালকা মেঘের খেলা। যেন কোমর দোলাচ্ছে মৌসুমী বায়ুর আনাগোনা। শুধু বিক্রি বিক্রি বিক্রি। বিকিকিনির খেলা। কী আছে তোমার? রূপ, রঙ্গ, তামাশা, কবিতা? শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিয়ে থমকে দাঁড়ানো? এই হলো বিকিয়ে দেয়ার বাতাস। যদি বেচারই কিছু না থাকে ডুবে যাও বঙ্গোপসাগরে। হ্যাঁ, আমার আছে কবিতা। প্রতিটি শব্দের জন্যে চাই এক লক্ষ্ ডলার প্রতিটি…
-
ভূত-ভবিষ্যৎহীন এই অন্ধকার / আল মাহমুদ
অন্ধকারের মধ্যে আরো অন্ধকার। স্তব্ধতার মধ্যে যেমন আমি আমাকে খুঁজে বেড়াই। তেমনি অন্ধকারেরও একটা ওম আমাকে বোঝাতে চায় যে আমি কেউ নই। আমি কী সত্যিই কেউ নই? আমি কি আমি নই? তাহলে এই অনুভব কোত্থেকে আসে, আমি হাঁটছি। আমি কি করে বুঝি চতুর্দিকে খানাখন্দর, গহ্বর। চলতে হবে আমি জানি পা টিপে টিপে, মৃত্যুকে এড়িয়ে কিংবা…
-
আমার চলা / আল মাহমুদ
দেখো কীভাবে হাঁটে লোকটা। দেখলে মনে হবে দাঁড়িয়েই আছে। কিন্তু আমরা বুঝতে না পারলেও তার চলার মধ্যে একটা এগিয়ে যাওয়া আছে। ধীর লক্ষ্যভেদী যাত্রা। যেনো খরগোশদের কথোপকথন। সে পরিচিত কচ্ছপকে নিয়ে আদি মশকরা। আসলে আমি তো দাঁড়িয়ে নেই। ঘড়ির ঘন্টার কাঁটার মতো অস্থানু। অথচ দেখলে মনে হয় চলছে না। খুব মিহি আওয়াজের নিঃশব্দ হৃদপিন্ডের মতো।…
-
জলবেশ্যা / আল মাহমুদ
পেঁয়াজ আর রসুনের মরশুমে লালপুর হাটের চারপাশের গ্রামগুলোতেও পেঁয়াজ রসুনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। হাটের দুমাইল দূর থেকেও বাতাসে কাঁচা পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধটা বেপারিদের নাকে এসে লাগে। গন্ধটা তখন আর শুধু পেঁয়াজের গন্ধ থাকে না। রসুনেরও একটা অহংকারী গন্ধ আছে, যা বাতাসে পেঁয়াজের গন্ধের সাথে মিশে বাতাসকে স্বাদযুক্ত করে তোলে। এ ধরণের কাঁচা মশলার মরশুমে শুধু…
-
বিপরীত উচ্চারণ / আল মাহমুদ
আমি নিসর্গের ভাষা বুঝি। নৈশব্দও আমার কাছে কখনো কখনো বাঙময়। শৈশবে গাছ, মাছ, পাখি ও পতঙ্গের সাথে কথা বলে আমি অভ্যস্ত কিন্তু অসুবিধে হচ্ছে মানুষকে নিয়ে। আমার ধারণা ছিল আমি যখন মানুষ। মানুষের ঘরেই জন্মেছি। তখন পৃথিবীর তাবৎ মানুষের ভাষা আমি বুঝব। কত অনায়াসে আমি প্লেনের জানালা দিয়ে মেঘের সাথে কথা বলতে বলতে আটলান্টিক পাড়ি…
-
কবিতার কথা / আল মাহমুদ
আমার মেয়ে খাঁচায় একটা ময়না পুষতো। আদরে আব্দারে কিভাবে যেন পাখিটার নাম দাঁড়িয়ে গেল কবিতা। বাইরে থেকে কেউ ঘরে এলেই ‘কবিতা, কবিতা’ বলে পাখিটাকে তোয়াজ করতো। এমন কি আমিও যে কিনা জন্তু-জানোয়ার পোষার ঘোর বিরোধী। মাঝে মধ্যে পাখিটার চকচকে কালো পালক ও হলদে ঝুটি দেখে হঠাৎ বলে ফেলেছি, কি রে কবিতা? আমার ডাকে পাখিটা সহসা…
-
শতাব্দীর শেষ রশ্মি / আল মাহমুদ
অস্তমিত শতব্দীর শেষ রশ্মি তোমার চিবুকে ছায়া ও কায়ার মতো স্পর্শ দিয়ে নামে অন্ধকার; লাফায় নুনের ঢেউ। রক্তাম্বর জলধির বুকে আবার নামের ধ্বনি, কার নাম? সেও কি তোমার? ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নই। কিন্তু জেনো কবির নয়ন ভেদ করে গ্রহান্তর, পার হয় সমস্ত উদ্যম, কেন এত রক্ত তবে, কেন এত মৃত্যুর বয়ন তাঁত বুনে ব্যর্থতার? নক্সাি তোলে…
-
জাহরা ভাদুগড়ী / আল মাহমুদ
মাঝে মাঝে মেয়েটার কথা মনে পড়ে। এসেই বলতো, আমি জাহরা বানু। তিতাস পাড়ে বাড়ি। ঘন ঘন কলিংবেল চেপে সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত। কেউ দরজা খুলে দিলে হাসত, আমি জাহরা। স্যারকে কবিতা শোনাতে এসেছি। আমি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। হাসতাম। মৃদু হাসতাম। হাতের ইঙ্গিতে বলতাম, ভেতরে এসো। লম্বায় তালগাছের মতো সটান। এলো খোঁপা বাঁধা। দেখতে শীর্ণকায়…
-
স্বপ্নের উৎপাত / আল মাহমুদ
সারা জীবন আমি উদ্ভট স্বপ্নের মধ্যেই পাশ ফিরে শুয়েছি। দুঃস্বপ্নের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে বালিশের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে সান্ত¦না খুঁজেছি। ভেবেছি, ওটা ছিল স্বপ্ন। সম্ভবত আমি ঘুমকাতুরে লোক বলে খোয়াবের জ্বীন আমার পিছু ছাড়তে চায় না, ঘুমের শুরুতেই অস্বাভাবিক একটা শিরশিরানি আমার হৃৎপিন্ড থেকে নিঃসৃত হয়ে মস্তিষ্কের সব স্বপ্নের খুপড়িতে ফোকাস ফেলে। আমি দেখি গাছগুলো স্থান…
-
কালঘুম / আল মাহমুদ
এতদিন আমাকে নিয়ে কারো কাছে উদ্বেগই ছিল না। পরিবারের একটা প্রায়ান্ধ মানুষ কোথায় কীভাবে আছে এ-নিয়ে কেউ ভাবত না। কারণ ছেলে-মেয়েদের ধারণা ছিল আব্বা ঘরের যেখানেই খাকুন বই নিয়েই আছেন সজাগ। কেবল আহার-বিহারের সময় স্ত্রী একটু তাগাদা দিতেন বলতেন ওঠ… যেন একটা পাথরকে ঠেলে গড়িয়ে নাইতে নিয়ে যাচ্ছেন। আমার খাওয়া হয়ে গেলে এ-বাড়ির সবাই ঝাঁকবেঁধে…
-
পাথর ও রক্তের বিবাদ / আল মাহমুদ
কী আছে অনাস্বাদিত? ঠোঁট রেখে কঠিন শিলায় পাথরের গন্ধ শুঁকি পেতে চাই সৃষ্টির লবন। গ্রানিটে জিহ্বা লাগে, আলজিভে শ্যাওলার স্বাদ স্বাদ নয়, এ কেবল পাথর ও রক্তের বিবাদ। অভুক্ত কবির মুখে, আলজিভে জমেছে যে পানি এ দিয়ে নরম হয় জগতের প্রকৃতিনিচয়, কেবল অনম্য তুমি। পাথরের চেয়েও পাথর। হাসো বাসো নাশ করো মানুষের সব বরাভয়। ২.…
-
না কোন শূন্যতা মানি না (উৎসর্গ) / আল মাহমুদ
আমি আর ফিরবো না। সময়ের বিপরীত গতি কেন যে আমাকে টানে? টানে নদী টানে চরভূমি, কিংবা চুম্বক সেই, যার নাম কবির নিয়তি, হয়তো বিস্মৃতি টানে। মৃত্যু টানে। টেনে ধরো তুমি স্মৃতির অদৃশ্য বাহু এতদূর বাড়ায় আঙুল বাড়িয়ে দিয়েছে দেখো তুলে নিতে কবির হৃদয় কিন্তু এতো মাংস মাত্র, রক্তরস, যদিও তুমূল আক্ষেপের আলোড়নে জপে চলে প্রেমের…
-
সোনালী কাবিন / আল মাহমুদ
এক. সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিনী যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি, আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি; ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন, ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি; দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি।…