Covers Available 02 / Saif Ali

Advertisements

তার কোনো নাম লেখা নেই / সাইফ আলি

সদ্য খোড়া কবরটার দেয়ালের কিছু জায়গা দাদরোখাদরো হয়ে আছে। যিনি কবরটা খুড়ছেন তিনি বহুবার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি, আলগা মাটি; খসতে কারো উসকে দেওয়া লাগে না। গোরখোদক চাচা একবার শুয়ে পড়ে দেখলেন লম্বায় ঠিক হবে কিনা। ছয় ফিট লম্বা মানুষটার ঘার কিছুটা কাত হয়ে থাকলো। তবে যার জন্য কবরটা খোড়া হয়েছে সে সর্বোচ্চ পাঁচ ফিট হতে পারে।

খোড়াখুড়ির কাজ শেষ হলে আমার উপর কোদাল পাহারা দেওয়ার মহান দায়িত্ব অর্পণ করে তিনি চলে গেছেন। সারি সারি কবরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেমন যেনো অস্বস্তি বোধ করছি। সদ্য খোড়া কবরটার পাশেই একটা ছোট্ট কবর। এক সপ্তাও হয়নি। জন্মের কয়েক ঘন্টা পরেই মারা গিয়েছিল। চাচা বলছিলেন- কবরটা ভালো যায়গায় হয়েছে, নিষ্পাপ শিশুর কবরের পাশে। আহা! নিষ্পাপ; কত বড় সার্টিফিকেট শিশুটার!

ঘুরে ঘুরে কবর দেখছি। কোনো কোনোটায় নাম পরিচয় দেওয়া আছে। গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ছিলেন হয়তো; নামের প্রয়োজন ফুরোয়নি এখনো! একটু এগিয়ে গেলাম,  প্রবেশপথের পাশেই; একটা কবর। নাম লেখা আছে তবে তা আগের জনের। কিছুদিন আগেই এখানে নতুন একজনকে শুয়ানো হয়েছে। নাম আগেরটাই আছে। পরের জনের নামটা জানি আমি। কাছের বড় ভাই ছিলেন। স্বপ্নবাজ মানুষ, বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর চোখদুটো এখনো তাকিয়ে আছে। সামনের দুটো দাঁত উঁচু ছিলো। হাসলে অদ্ভুত সুন্দর দেখাতো ভাইকে। শেষ যখন দেখা হয়েছিলো তখন আমার অনেক অভিযোগ। কান্না চেপে হাসতে হাসতে বলেছিলাম- ভাই, এভাবে আর কতোদিন? তার মুখে হাসি!

কবরটার পাশে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে। দিনটা কি বার ছিলো মনে নেই। ঢাকা থেকে বাড়িতে এসেছিলাম ছুটিতে। হঠাৎ শুনলাম তিনি আর নেই। লাশ রাখা ছিলো, সাহস নিয়ে দেখতে পারিনি। নখগুলো তোলা, চোখগুলো তোলা… কিভাবে দেখতাম। বৃষ্টির দিন। কান্না লুকানোর চেষ্টা করিনি। বৃষ্টিভেজা জানাজার পর এই কবরেই শোয়ানো হয়েছিলো। এখানে তার কোনো নাম লেখা নেই।

কুঁড়ি টাকা কেজি / সাইফ আলি

: চাচামিয়া শাঁক যদি ভালো না হয় টাকা ফেরত দিতে হবে কিন্তু…
: ঠিক আছে বাপু নিয়ে যাও…টাকা দিয়া লাগবে না, খায়ে যদি তিতে লাগে তালি আর টাকা দিয়া লাগবে না; নিয়ে যাও।
: তালি দেন হাফ কেজি, টাকা দিয়েই দিলাম… আপনার কথায়
: না না বাপু তুমি নিয়ে যাও তো… গরিবির টাকা না দিলিউ হয়।
: না রাখেন।
চাচামিয়া দশ টাকার নোটটা পকেটে ঢুকিয়ে ঘাম মুছলেন। বাজারের রাস্তার উপরের ঝুড়ি ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন চাচামিয়া। রোদে তার তেলতেলে মাথাটা চক চক করছে। ঝুড়িতে পালং আর মটরের শাঁক।
: শাঁক কত করে কাকা?
: কুঁড়ি টাকা কেজি। দেবো… খুব ভালো হবেনে…
: দেন এক কেজি। আর পালং..?
: নেও তিন আটি দশ টাকা দিয়েনে… পাঁচ টাকা আটি বেচছি…
: দেন। কিন্তু চাচা আটি তো ব্যগে ধরবে না, আরো কিছু বাজার করতি হবে। আপনার কাছেই রাখেন আমি ঘুরে এসে নিচ্ছি।
: ঠিক আছে যাও।
এরপর কিছুক্ষণ এটা ওটা কেনাকাটা করে যখন চাচামিয়ার কাছে পালঙের আটি নেওয়ার জন্য ফিরে এলাম তখন তার পাশে এক যুবক। যুবকের কথায় কান পেতে যা জানতে পারলাম তা হচ্ছে বাড়িতে চাচি বেশ অসুস্থ। টিউমারটা কাটতে না পারলে ক্যান্সার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাচামিয়া মাথা ঘাম আর চোখের পানি এক করতে করতে বললেন… দেখি আল্লায় কি করে।
: চাচা, শাঁক কত করে…
: কুড়ি টাকা কেজি… নেও বাপু ভালো হবেনে… খুব কচি শাঁক… ইটটুউ তিতে হবে না…

হাত ধরেছি অন্ধকারে / সাইফ আলি

এবং তোমার দুঃখগুলো ধুইয়ে দিতেই হাত ধরেছি
হাত ধরেছি অন্ধকারে;
হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে
অন্ধ হলাম অন্ধ এমন
দুচোখ বুজে খুব সহজেই পেলাম তোমার হৃদয় হাতে
হাতের মুঠোয় তোমার দু’হাত
চোখের গভীর শীতল স্রোতে
ভাসিয়ে দিলাম আমার ভেলা
এবং তুমি সঙ্গে ছিলে!

খুড়িয়ে খুড়িয়ে আর কতদূর / সাইফ আলি

খুড়িয়ে খুড়িয়ে আর কতদূর যাবে হে জননী?
উল্টেছে পায়েসের থালা, দুধের বাটিটা
আমাদের মুখে মুখে সোনার চামচ!
শূন্য চামচ করে আয়নার কাজ, মলিন ঠোঁটের ছবি
তিলহীন ঠোঁট কাপে কান্নায় ক্ষোভে
তোমার ছেলেরা মাগো খাবারের লোভে
তোমার আচল বেচে বনে গেছে বিরাট বণিক
অথচ গোলায় তার তিনবেলা ব্যাঙের বিলাস!

তবুও প্রেম ছিলো / সাইফ আলি

পাহাড় জানলো না মেঘের কোনোকথা
ঝর্ণা শুনলো না সমুদ্রের গান
তবুও প্রেম ছিলো; আকাশ ভিজে ছিলো
প্রেমের বৃষ্টিতে-

ফুলেরা বেঁচে ছিলো মাটির ঘ্রাণহীন
পাখির বাসা ছিলো পুরোন খড়খড়ে,
তবুও ফুল ঝরে মাটির বুক ছোঁয়
গভীর প্রেম থাকে পাখির দৃষ্টিতে।